-
অসমাপ্ত রুহানি ১ পর্ব/
লেখিকা :তানজিনা তালুকদার।ভোরের আকাশে অন্ধকার সরে গিয়ে সবেমাত্র সূর্যে আগমন ঘটে। সূর্যে কিরণে চারপাশ চিকচিক করে উঠে। পাখিদের ডাকাডাকি শুরু হয়েছে ফজরের আযানের পর থেকে। আযানের সুমধুর ধ্বনি ও পাখিদের ডাকাহাকিতে চোখ খোলে তাকান, ফারজানা তাজরিন। চোখ কচলিয়ে কিছুক্ষন চুপচাপ বিছানার উপর বসেন।চোখ থেকে ঘুম ছাড়ানোর চেষ্টা করেন।বেশ খানিকক্ষণ পর বিছানা থেকে ওযু করে নামাজ আদায় করে নেন।
তারপর রান্নাঘরে হাজির হন বাচ্চাদের জন্য নাস্তা বানানোর জন্য। নিত্যদিনের সকাল শুরু হয় এভাবেই। ব্যাতিক্রমী সকাল তেমন হয়না।তবে, বছররে একটা দিনেই ব্যতিক্রম হয়ে যায়।ভোর থেকে রান্নাঘরের জানালা খোলে রেখেছেন। হাতের কাজের ফাঁকে বাহিরে বারবার চোখ বুলান।
হঠাৎ হাতের কার্য থামিয়ে কৌতূহলী চোখে রাস্তার পানে তাকান।চোখ বড় বড় করে ফেলেন।সাদা শাড়ি পরিহিতা একজন মহিলাকে দেখতে পান।বয়স ৩১-৩২ হবে।গায়ের রং চকচকা কালো।হাতে একখানা চিঠি ঝুলে আছে। নিস্তেজ দেহে হেঁটে চলেছেন। আশ্চর্য চোখে চেয়ে বিড়বিড় করেন। এবাসায় এসেছি ৯ বছর হয়।তারপর থেকে প্রতিবছর এই দিনে অদ্ভুত কিছু দেখি।আশ্চর্য হওয়ার সাথে সাথে ভিতরে ভয় অনুভূত হয়। আশেপাশে বাড়ি বলতেও নেই। উনাদের বাসার ঠিক অপজিটে রাস্তার ওপারে একটি মাত্র খুঁড়েঘর আছে।কারোর চলাফেরা নেই বাড়িটায়। কেমন নিস্তব্ধ নিরিবিলি।দেয়ালে বিরানো বাড়িটায় প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় আলো জ্বলে উঠে। উনি খুবেই অবাক হন।কেও থাকেনা কিন্তু সন্ধ্যার আলোর রশ্মি দেখা যায়।সন্ধ্যায় আলোর তেজশ্রি আলোর জলকরেখায় বাড়ির আঙিনায় ফোটে উঠে। খুব আগ্রহ জন্মায় উনার মনে। প্রায় সময় ইচ্ছে হয় বাড়িটায় গিয়ে ঘুরে আসতে। সাহস সঞ্চয় করে গেইট পর্যন্ত গিয়ে থমকে যান, ভিতরে যাওয়ার সাহস হয়না। এতটা নিস্তব্ধ নিরিবিলি শুধু গোরস্হানেই হয়।ভয় পেয়ে মনে জাগ্রত হওয়া শত মনচিন্তাকে দাফন করে বাসায় ফিরে আসেন।তবে আজ বড্ড ইচ্ছা হচ্ছে ওই সাদা শাড়ি পরিহিতা মহিলার সাথে কথা বলতে।এবাড়ির রহস্য আবছায়ায় জড়িত সত্যকে উন্মোচন করতে।হাজারো চিন্তাভাবনাকে মনে দাফন রেখে দরজা খোলে বেরিয়ে যান।মনে ঝড়ো হওয়া শত প্রশ্নের অবসান ঘটাবেন আজ।মেয়েটার পিছু নেন, গেইট খোলে ভিতরে প্রবেশ করেন। এই প্রথম গেটের ভিতরে পা রাখলেন।শরীর থরতর করে কাঁপছে অনবরত। ডুব গিলে গলা ভেজানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন।প্রচন্ড ভয়ের তোপে কপালের পাশে ঝড়ো হয় ঘাম,গড়িয়ে পড়ে দিকবেদিক। হাঁটার গতি স্লো। অচেনা মেয়েটার পিছু পিছু হাঁটতে থাকেন।আচমকা হঠাৎ থমকে দাঁড়ান।সাদা শাড়ি পরিহিতা মহিলা ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে থাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে চেয়ে বললেন, কে আপনি?
ফারজানা তাজরিন আঁতকে উঠে চারপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে কারোর উপস্থিতি চোখে পড়ে কিনা দেখে নেন। দারেকাছে কারোর অস্তিত্ব নেই। সংশয় হয়, এই মহিলা যদি কোনো প্রকার অস্বাভাবিক আচরণ করে আঘাত প্রাপ্ত করে,তাহলে কেও সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেনা। অঘটন ঘটলে কেও জানবেই না। উত্তেজিত হয়ে একা একা কোনো আসতে গেলেন সে ভয়ে মনে তাড়া দিয়ে বেড়াচ্ছে।চোখের দৃষ্টি স্হির রেখে কাঁপাস্বরে বললেন,আমি ফারজানা তাজরিন। ওই যে রাস্তার ওপারে ওটা আমার বাসা।আপনাকে প্রতিবছর এইদিনে এখানে আসতে দেখি,তাই আজ আপনার পিছু নিলাম।আপনার নাম কি?
আনহা।
ওই খুঁড়েঘরে কে থাকে?
আমার অতীত।
ফারজানা তাজরিন চমকে উঠে দুকদম পিছিয়ে যান।এখন পুরোপুরি ভয়ে পাচ্ছেন এই মহিলাকে। কি ভয়ঙ্করভাবে কথা বলে। উনার গা শিউরে উঠছে প্রতি ক্ষণেক্ষণে। অতীত বলতে বুঝলাম না?
আনহা ফিক করে হেসে উঠে।
২ জানুয়ারি ২০০৪ সাল।খনখনে শীতে মানুষের অবস্থা বেহালদশা। পুরো দিন দিনরাত থাকে কুয়াশার দখলে।মাঝে মাঝে সূর্যিমামার আগমন পাওয়া যায় নামে মাত্র। রোদের তেমন তাপ নেই বলতেও।চারপাশে ফসলের মুখর।সবুজ সফলা সবজি চারপাশ রাঙিয়ে তুলেছে।নৃত্যদিনের ন্যায় আজও শেখ সায়রা বানুর মঞ্জিলে গল্প আড্ডায় মেটে উঠেছে উনার রেখে যাওয়া উত্তরসূরিরা।শেখ সায়রা বানুর দুই ছেলে। বড় ছেলের নাম সামসুল হক আর ছোট ছেলের নাম এনামুল হক। তবে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২২-১১-১৯৮৮ সালে সামসুল হক মারা যান। উনার মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়ে এনামুল হকের কাঁধে ।তিনি পেশায় একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।পেশা জীবনে শিক্ষকতার সময় কোনো বেআইনি কাজ করেন নি।সবসময় নৈতিক নিষ্টার সাথে জীবন অতিবাহিত করেছেন। এলাকায় উনার বেশ সুনাম রয়েছে।সুনামের আরোও বিশেষ একটা কারণও আছে বটে,বড় ভাই মারা যাওয়ার পর থেকে উনার সন্তানদের নিয়ে যৌথ পরিবারে একসাথে বসবাস করছেন।ওদের লেখাপড়া, খাবার,কাপড়, চিকিৎসা,বিয়ে,সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।সামসুল হকের ৫ সন্তান।এহসান হক, তাসিন হক, আরিফহক,জুনায়েদ হক,সামিয়া হক।এনামুল হকের ৩ সন্তান। আনাস হক,ইসমাইল শেখ প্রীতম,ও প্রতীক হক।
প্রীতমের নামের বিশেষত হলো,চেহারায় তার দাদার আকৃতি মিল পাওয়া যায়। তাই তার জন্মের পর শেখ সায়রা বানু খুশি হয়ে কর্তার নাম জুড়ে দেন।প্রীতমকে দেখলে উনার আত্মা জুড়িয়ে যায়।এনামুল হকের কাঁধে শুধু প্রীতম, প্রতীকের বিয়ের দায়িত্বটা রয়ে গেছে।তাদের বলে কয়েও বিয়েতে রাজি করানো সম্ভব হয়নি বলে এখন আর এইসব বিষয় আলোচনা করেন না।উনি হতাশ হয়ে রাগে বলেছেন ওরা যা খুশি তাই করুক, আমি আর ওদের বলতে যাবোনা। এতেই প্রীতম আর প্রতীক যেনো খুশিতে আটখানা।প্রীতমের বয়স ২৭শের কোটা ছুই ছুই। আর প্রতীকের বয়স ২৫।
সন্ধ্যার পর সবাই একত্র হয়ে,ছাদের মধ্যস্তায় লাখড়িতে আগুন জ্বালিয়ে গোল বৃত্তের মতো আগুনের চারপাশ ঘিরে বসে। শীতের তীব্রতায় থেকে রক্ষা পেতে তারা আগুন পোহায়।আকাশে থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। চারপাশ আলোকময় লাগছে।আকাশের দিকে তাকিয়ে এহসান হক গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,শোন প্রতীক, গত সাপ্তাহে ছোট আম্মুকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলি, ডাক্তার কি বলেছে?কাজের চাপে খুঁজ নিতে পারিনি।প্রতীকের চেহারায় মলিনতার চাপ অসহায় কণ্ঠে বলে, ডাক্তার বলেছে আম্মুকে কেনো প্রকার টেনশন করতে দেওয়া যাবেনা।আম্মুর হার্ট দূর্বল সাথে ডায়াবেটিস উটা নামা করছে।আলহামদুলিল্লাহ এখন সবকিছু নরমাল। সুস্থতা অনুভব করছেন।
পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় এহসান হকের কথা সবাই মেনে চলার চেষ্টা করে। বাবার সমতুল্য আসনে বড় ভাইকে বসিয়েছে।পরিবারের ৭০% খরচ উনি একাই বহন করেন।কোনো মাসে পুরো খরচ একাই দেন।মূলত এরজন্য পরিবারে সবার থেকে উনার আলাদায় পরিচয়।রাশভারী কণ্ঠে এহসান হক বললেন,সবাই শোনো সতর্কতা সহিত বলতাছি, কোনো তুচ্ছ বিষয়ে ছোট আম্মুকে রাগাবিনা তোরা। ২ভাই কর্মের জন্য দেশের বাহিরে পরিবার নিয়ে চলে গেছে।ওরা ছুটি পেলে দেশে আসে,ছুটি না মিললে বছরের পর বছর পার হয়ে যায় ওদের কোনো খুঁজ পাওয়া যায়না। তাই উপস্থিত যারা রয়েছি আমরা সবাই একসাথে থাকবো। একে অন্যের কথা মেনে চলবো। কেও কোনো বিপদে পড়লে, তারে বিপদ থেকে টেনে তুলবো।তাকে সর্বচ্ছো সাহায্য করবো।কখনো একা ছেড়ে দিবোনা। একতা আর প্রতিবন্ধকতা দেখলে ছোট আম্মু দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।চিন্তাও কম করবেন।
সবাই একসাথে বলে, ঠিক বলেছো দাদাভাই।আমরা সবসময় তোমার কথা মাথায় রাখবো। ভুলভাল কেনো কাজ করবোনা। আম্মুকে হতাশ হতে দিবনা।
এনামুল হক ছাদের দরজার কাছে উপস্থিত হয়ে চুপিসারে বাতিজা ও নিজ সন্তানদের মধ্যে গুরুদায়িত্বশীল কথা শুনে মুচকি হেসে দেন।আজ উনার অনেক গর্ব হচ্ছে ভালো শিক্ষায় ওদের মানুষ করতে পেরেছেন। পরিবারের একান্নবর্তীটা ওদের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।ছেলেদের এমন বন্ধত্বপূর্ণ আচরণ দেখে মনে খুশির জোয়ার বয়ে যায়।গত কালকে বাজারে গিয়েছিলেন কিছু সদাই কিনার জন্য।তখন দেখা হয় উনার পুরাতন দিনের একজন স্কুল শিক্ষকের সাথে। কয়েকবছর একি স্কুলে একসাথে চাকরি করছেন। অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় দুইজনের মধ্যে টুকিটাকি কথা হয়।কথার বলার মধ্যে হঠাৎ উনি পারিবারিক জামেলার কথা বললেন। উনার তিন ছেলের মধ্যে খুবেই গন্ডগোল সৃষ্টি হয়েছে। তারা সবাই পৃথক হয়ে আলাদা জীবনযাপন করবে।যৌথ পরিবারে একজনের বেশি টাকা খরচ হচ্ছে তো অন্যজনের কম।মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়ে একে উপরকে দোষারোপ করে বলে,পরিবারে টাকা খরচ না করে নিজের জন্য সঞ্চয় করছে।এসব উল্টা পাল্টা কথা কাটাকাটি নিয়ে বিশৃঙ্খলা পরিবেশ তৈরি হয়েছে।শতচেষ্টা করেও উনার ছেলেদের মধ্যে মনোমালিন্য শেষ করতে পারছেন নাহ। হতাশায় বাড়িতে ভালো লাগছেনা তাই বাজারে এসেছিলেন সময় কাটানোর জন্য। বাড়িতে শান্তি না থাকলে বাড়িটাকে জলন্ত আগ্নি কুন্ডলি মনে হয়। পরিবারের লোকজনের ভিন্ন মত কথা হৃদয় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়।বিসাক্ত ধোয়া শ্বাস নিতেও উনার কষ্ট হয়।চলার পথে পুরোনো পরিচিত মানুষ পেয়ে সহজ সরলতায় মনের গভীরে লুকোনো কষ্টের কথা বলতে শুরু করেন।এনামুল হক এক ধ্যানে মনোযোগ দিয়ে সহকারির মর্মান্তিক ঘটনা শুনতে থাকেন।উনাকে সমবেদনা জানিয়ে বাসায় ফিরে শান্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন নাহ।সহকারির বলা কথাগুলো মনে ঘুরপাক খাচ্ছিলো।একইরকম গন্ডগোল যদি উনার পরিবারে সৃষ্টি হয়, তাহলে এমন সংকটাপূর্ণ সময়ে উনি কি করবেন? কার কাছে যাবেন? এই সমস্যা সমাধান করার জন্য? আর কাকেই বা বলবেন?মন ভালো নেই বলে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে আসতেই ছেলেদের এই ভ্রাতিত্ব আচারণ দেখে মনে শান্তি নীড় খুঁজে পেয়েছেন।সর্বাঙ্গে শীতল বাতাস প্রবাহিত হতে থাকে। চিন্তায় মাথা ব্যাথা শুরু হয়েছে, তবে এখন তা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।ওদের কথা শোনে ঠোঁট চেপে হেসে যাচ্ছেন।উনার ভাইয়ের রেখে যাওয়া আমানত আর নিজের সন্তানের মধ্যে যেনো কখনো জামেলা না হয়।সবসময় সুখমায়ায় আবদ্ধ হয়ে জীবন পার করে।কথার ভীরে হঠাৎ ছাদের দরজায় চোখ পরতে এহসান হক নোময়ীয় কণ্ঠে ডাক দেয়, ছোটআব্বু ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছো? আমাদের পাশে এসে বসো।
বাতিজার ডাকে এনামুল হকের ধ্যান ভাঙে। মুচকি হেসে ছেলেদের পাশে বসে টুকটাক বিষয় নিয়ে অনেকক্ষন গল্প স্বল্প করেন।দিনকাল কেমন কাটছে?চাকরি পাশাপাশি ব্যবসা সামলানো চারটি খানিক কথা নয়।দায়িত্ববান ব্যাক্তি হিসাবে ছেলেদের প্রতিটি কাজে নজর রাখেন।চোখ দুটো উত্তরের আসায় শুষ্ক দৃষ্টি অর্পণ করে এহসানের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
দুপাশে ঘাড় নাড়িয়ে প্রতিউত্তরে এহসান বলল,আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ রহমতে অনেক ভালো চলছে।লাভবান হচ্ছি।আমার জন্য দোয়া করো ছোটআব্বু। কোনো জামেলায় যেনো না পরি।
এনামুল হক ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন, দোয়া করি সবসময় যেনো সফলতা অর্জন করতে পারো। তোমার বাবা গোটাজনম ন্যায় ও সত্যের পথে চলেছেন। তোমরাও উনার সম্মান ধরে রেখে জীবন সাজিয়ে তোলো।
এহসান হক নোমনীয় স্বরে বললেন,ছোট আব্বু আমি ভাবছি একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করবো। হাফেজী মাদ্রাসা। ছেলেরা হাফেজ হয়ে বের হবে।আল্লাহ পথে চলবে।তোমাদের সিদ্ধান্ত জানতে চাই।এনামুল হক একগাল হেসে বলেন, মাশাআল্লাহ অনেক ভালো চিন্তাধারা বাবা। আল্লাহ তোমার নেক হায়াত দান করুন।
এহসান হক মুচকি হেসে ভাইদের দিকে তাকান।তারা খুবেই উৎফুল্ল। প্রস্তাবে খুশি হয়েছে মুখের হাসিতেই বুঝা যাচ্ছে।
রাতের প্রহর চলমান।এনামুল হক ছেলেদের পাশে বসে আগুন পোহান।পুরোনোদিনের গল্প তাদের শুনান। ছোট আব্বুকে পাশে পেলেই তারা অতীতের গল্প শোনার জন্য পাগল হয়ে উঠে।
এনামুল হক ঘড়ির দিকে দৃষ্টি রেখে বললেন, চলো রুমে চলে যায়। কুয়াশা বেশি পড়ছে।আব্বুর দৃষ্টি অনুসরণ করে প্রতীক বলল, হুম ঠিক বলেছো আব্বু। চোখ ঘুরিয়ে সামনের দিকে চেয়ে বলে, দাদাভাই চলো,নিচে যাই।
মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক উওর দিয়ে এহসান হক বলেন, হো চল ছোটআম্মু অপেক্ষা করছেন। তারপর দেখবো বিরক্ত হয়ে বকাবকি শুরু করে দিয়েছেন। তারচেয়ে ভালো উনার রাগ উঠার আগেই আমরা চলে যায়।
সবাই শব্দ করে হেসে দেয়।ছাদের দরজা আটকিয়ে দিয়ে তারা নিচে নামতে শুরু করে।
সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে উম্মে জাহানারা কয়ফিয়তের স্বরে বলেন, সন্ধ্যা থেকে এই পর্যন্ত্য ছাদে কি করছিলে তোমরা?
রুষ্ট কণ্ঠ শোনে সবাই হতবম্ভ হয়ে ডুব গিলতে থাকে। বুঝতে বাকি নেই যে উম্মে জাহানারা প্রচুর রেগে আছেন।এনামুল হক ছেলের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে এসে হলরুমে চোখ পরতেই দেখেন উম্মে জাহানারা ও আসমা কুনতুম বাড়ির বউদের সাথে নিয়ে বসে টুকটাক কথাবার্তা বলছেন।
এনামুল হক ভীতিকর গলায় কাপাঁস্বরে বলেন, এইতো কি আর করবো?ছেলেদের সাথে বসে একটু গল্প করছিলাম।তাসিন হক এক গাল হেসে মিষ্টিস্বরে বলল,ছোটআম্মু খেতে দাও।
উম্মে জাহানারা দমকের স্বরে বলেন, এই স্বাভাবটা কখনো পরিবর্তন করবিনা তুই? কথায় কথায় এতো হাসিস কেনো?বোকার মতো হেসে তারপর কথা বলবি।এটা কি অভ্যাস তোর?
তাসিনের এই অভ্যাসের জন্য প্রায়সময় মায়ের কাছে দমক খায়।কথা বললে প্রথমে এক গাল হাসবে তারপর কথার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।বুঝবেনা পরিস্থিতি অনুকূলে আছেকি নেই।এজন্য ছোটআম্মু তার প্রতি বেশি বিরক্ত হন।
বাড়িটা নীরব হাওয়া ছড়িয়ে পরেছে। বাচ্চারা ঘুমিয়েছে। নয়তো ওদের চিৎকার চেঁচামেচিতে বাড়িতে থাকার উপায় নেই।রাশভারী কণ্ঠে উম্মে জাহানারা ডেকে বলেন, এ্যাই তোবা সবার জন্য খাবার ভার।
প্রতিউত্তরে তোবা মাথা নিচু করে বলে,এক্ষুনি টেবিল সাজাচ্ছি ম্যাডাম।মূলত তোবাকে রাখা হয়েছে বাড়ির কাজে সাহায্যের জন্য। বাড়ির বউরা চাকরি করে সারাদিনে ক্লান্ত শরীরে কেনো কাজকর্ম করতে পারেনা।অসুস্থ বলে উম্মে জাহানারা কোনো কাজ করতে পারেন নাহ। উনার বড় জা আর তোবা মিলে বাড়ির সব কাজ সামলে নেন।আসমা কুনতুম সারাদিন টুকিটাকি কাজ করেন এবং নাতিদের দেখেশুনে রাখেন। পরিবার বড় হওয়ায় ডাইনিং টেবিলের আয়তনও বড়ো। এনামুল হক অনেক স্বাদ করে বড়ো টেবিল বানিয়েছেন। যেনো পুরো পরিবার একসাথে বসে খাওয়া দাওয়া করতে পারেন। উনার কাছে মনে হয়, একটা পরিবারের সুন্দর্য হলো অন্তত খাবার সময়টায় একসাথে বসে গল্প গুজব করে খাওয়া দাওয়া করেন। এতে বাড়ির গিন্নি আর কর্তাদের মধ্যে মিল মহব্বত বাড়ে।
গলা খাকাড়ি দিয়ে এনামুল হক এক পলক সবার দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে বলেন, কাল বিয়েতে কে, কে যাবে?
সবাই হাতের কার্য থামিয়ে অবাক চোখে তাকায়। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চেয়ে প্রতীক বলে,কার বিয়ে আব্বু?এনামুল হক উদ্দিগ্নো দৃষ্টি উম্মে জাহানারার দিকে ত্যাগ করে কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করেন, কি গো তুমিও ভুলে গেলে?
ভুরু কুঁচকে উম্মে জাহানারা শূন্যের দিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করেন।কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। উনার কর্তা কার বিয়ের নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন? কই উনার তো কিছু মনে পরছেনা। কিছুক্ষন চুপ থেকে আবার মনে করার চেষ্টা করেন।বরংবার বিফল হন। নিরুট কণ্ঠে বলেন, কার বিয়ের কথা বলছেন আপনি?আমার তো মনেই নেই।
এনামুল হক গিন্নির কথা শুনে এক গাল হেসে বলেন, এ কইদিনে ভুলে গেলে? তুমি তো বিয়েতে টাকাও দিয়েছো।এখন বলতে পরছোনা?
উম্মে জাহানারা কণ্ঠে রাগ ঝেরে বলেন, কর্তামশাই হেয়ালিপনা না করে বলেন। আপনার মশকরা আমার ভালো লাগছেনা।
উপস্থিত সবাই আগ্রহ নিয়ে বসে আছে কার বিয়ের দাওয়াতে যেতে হবে,তা শুনার জন্য। এনামুল হক রসিকতা রেখে বলেন, আমাদের বাসায় যে কাজ করতো নাফিসা মাহতুমের বড় মেয়ে আনাহিয়া মাহতুমের বিয়ে কাল।নাফিসা গতকাল আবার আসছিলো বলে গেছে আমাদের যেতেই হবে।আমি বার বার বললাম,যে সবাই কাজে থাকবে যেতে পারবেনা। কিন্তু ও মানার পাত্রী নয়। যেতেই হবে এটাই লাষ্ট কথা বলে চলে গেছে।
উম্মে জাহানারা এক আকাশ সমপরিমান বিরক্তি নিয়ে নাক মুখ কুঁচকে বলেন,আপনি তো ভালো করে জানেন যে,আমি নিম্নশ্রেণী মানুষদের সাথে চলাচল করতে অভ্যস্ত নয়। ওদের সংস্পর্শে গেলে আমার এলার্জি দেখা দেয়।গা শিউরে উঠে।আমি এসব ছোটলোকি কারবারে যেতে পারবোনা। বিয়েতে যাওয়ার জন্য আমাকে জোর করবেন নাহ,দয়া করে।ছেলেদের নিয়ে যেতে পারেন, তবে বাসার ফিরে বাহিরে গোসল করে পরিশুদ্ধ হয়ে রুমে প্রবেশ করতে হবে।
মায়ের কথা শুনে ছেলেরা এক, এক করে কাজের অজুহাতে বিয়েতে যাবেনা বলে দেয়। এনামুল হক দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন তবে গিন্নির কথায় অবাক নন তিনি। কারণ উম্মে জাহানারা সবসময় এরূপ ব্যবহার করে কথা বলেন। এটা উনার অভ্যাস।এই অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য উনাদের দুইজনের মধ্যে অনেকবার মনোমালিন্য হয়েছে। এতেও কাজ হয়নি।উনি নিজেকে পরিবর্তন করেন নি।যেহেতু নাফিসা কুনতুম এবাড়িতে অনেক বছর যাবৎ কাজ করছে তাই ভেবেছিলেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিয়েতে যেতে গিন্নি রাজি হবেন। উনি এমন হতাশ হবেন তা কল্পনাও করতে পারেন নি। নিমিষেই যেনো উনার খাওয়ার ইচ্ছেটা মরে গেছে। আনাহিয়ার মাকে কথা দিয়েছিলেন যে বাড়ির সবাইকে নিয়ে বিয়েতে উপস্থিত হবেন।উনার সাথে যাবার জন্য কেও রাজি হচ্ছেনা।উনি আনাহিয়ার মাকে কথা দিয়েছিলেন অনন্ত ছেলেদের সাথে নিয়ে বিয়েতে হাজির হবেন। উনি কথা রাখতে পারবেন না।তাই কষ্টটা বোধয় বেশিই হচ্ছে।চোখজোরা সরলতার মেঘাচন্ন চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে প্রতীককে বলেন, তুমি সাথে চলো বাবা।প্রতীক তড়িঘড়ি করে বলে,আব্বু আমি যেতে পারবোনা। ব্যাংকে কাল অনেক কাজ আছে। উপস্থিত না থাকলে বড়সড়ো জামেলায় মোকাবেলা পড়তে হবে। সরি আব্বু, কাজ না থাকলে আমি অবশ্যই তোমার সাথে যেতাম।এনামুল হক চেঁচিয়ে বলেন, তোমরা কেউ আমার সাথে যেতে পারবেনা?
সবাই ভয়ে স্তম্বিত হয়ে আঙ্গুল উঠিয়ে প্রীতমের দিকে ত্যাগ করে বলল,ও যাবে।
এহসান হক কণ্ঠস্বর নরম করে আদেশের স্বরে বলেন,প্রীতম তুই কাল ছোটআব্বুর সাথে বিয়েতে যাবি।আর এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আমি ভালোকরেই জানি তুই কলেজ থেকে একদিনের ছুটি নিতে পারবি।
প্রীতম নিরুপায় দৃষ্টিতে আব্বুর দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক আছে আব্বু আমি তোমার সাথে যাবো। তবে দুপুর ২ টার সময় বাসায় ফিরে আসতে হবে।কারণ, কাল আমার স্টুডেন্টদের প্রাইভেটে পরিক্ষা আছে। ওদের পরিক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গেছে, কাল যেকোনো উপায়ে পরিক্ষা নিতে হবে।আর এই কাজটা খুবেই গুরুত্বপূর্ণ।
এনামুল হক মৃদু হেসে বলেন, সমস্যা নেই তুমি ঠিক সময় ওকান থেকে চলে এসো। আমি বিয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব শেষ করে তারপর বাসায় আসবো।তবে এই কথায় চিরধার্য্য রইলো।সবাই মাথা নেড়ে হ্যাঁ সম্মতি দেয়।
সবাই আড়চোখে প্রীতমের দিকে চেয়ে মুচকি হেসে দেয়।প্রীতম খাওয়া দাওয়া শেষ করে চুপচাপ সোফায় বসে।তার ইচ্ছে নাই বিয়েতে যাওয়ার।একপ্রকার জোর পূর্বক যেতে হচ্ছে।
প্রতীক দাঁত খিলিয়ে হেসে বলল, আহারে, এখন এত ভাবতে হবেনা। রাজি হয়ে গেছে, অমত করার উপায় নেই।
প্রীতম নিরুত্তর ভঙ্গিতে রুমে চলে যায়।গল্পটা পড়ার জন্য সবাইকে অনুরোধ রইলো। আর হ্যাঁ অবশ্যই মন্তব্য করবেন।
1 Comment
Friends
গাজিবর রহমান
@gaziborrohman
ফেরদাউস সরকার (বিন নূরী)
@ferdaussorkar
Rubel Ahmed
@rubelahmed
Zaman. com
@zaman-com
নূরুল আমিন সোহাগ
@aniketprantor
MD.Mazharul Islam Ripon
@md-mazharulislamripon
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
আপনার গল্পের প্লটটা বেশ রহস্যময় আর ইন্টারেস্টিং, বিশেষ করে ওই সাদা শাড়ি পরা মহিলার রহস্যটা বেশ টানটান উত্তেজনার! আপনি কি পরবর্তীতে আনহায়ার এই অতীত এবং প্রীতমের কানেকশনটা নিয়ে আরো বড় কোনো টুইস্ট রেখেছেন?
লেখকরা একে অপরের গল্পে নিয়মিত লাইক আর কমেন্ট করলে গ্রুপটা অনেক প্রাণবন্ত থাকে, তাই দয়া করে অন্যদের লেখাতেও একটু সময় দেবেন কি?