-
দাবাড়ু
~হাসান আমিনইরিনা দাবার বোর্ড সামনে নিয়ে বসে আছে। কালকে ফাইনাল খেলা। প্রতিপক্ষ হিরণ। তুখোড় দাবাড়ু। এ পর্যন্ত স্কুলের কোন স্টুডেন্ট তাকে হারাতে পারেনি।
ইরিনা একমনে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। গুটিগুলো সাজিয়েছে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। ইরিনা কোনো গুটি সরাচ্ছে না। কিছু একটা নিয়ে খুব ভাবছে।
– কিরে এত কি ভাবছিস?
ইরিনা মায়ের কথার কোন উত্তর দিল না। শীলা তার মেয়ের পাশে এসে বসলেন।
– মা! এত কি ভাবছিস?
ইরিনা এ কথারও কোন উত্তর দিল না।
– ইদানীং এমন মনমরা হয়ে থাকিস কেন বলতো?
– আমার কিছু হয়নি মা। কাল আমার ফাইনাল খেলা। প্র্যাকটিস করছি। বুঝতে পেরেছ?
ইরিনা রেগে যাচ্ছে। ওকে আর ঘাটানো ঠিক হবে না। শীলা রান্নাঘরে চলে গেলেন।ইরিনা ক্লাস নাইনে পড়ে। ওদের ব্যাচের সবাই মোটামুটি দাবা খেলতে পারে। প্রত্যেক ক্লাসে দুটো করে দাবার বোর্ড আছে। একটা ছেলেদের অন্যটি মেয়েদের। পুরো স্কুলের মধ্যে ক্লাস নাইনের স্টুডেন্টরা সবচেয়ে বেশি প্র্যাকটিস করে। খেলা প্রতিদিন হয়। ছেলেদের মধ্যে খেলা খুব একটা না জমলেও মেয়েদের খেলা দারুণ জমে যায়। পুরো টিফিন টাইম মেয়েরা দাবা খেলেই কাটিয়ে দেয়। এজন্য পুরো স্কুলে ক্লাস নাইনের মেয়েদের পারফরম্যান্স দুর্দান্ত। বাধ সাধে শুধু হিরণ। এই একটা ছেলেই আছে যে কিনা দাবার বোর্ডে পুরো স্কুলকে কাৎ করে রেখেছে।
ইরিনা এই মুহূর্তে হিরণকে নিয়ে ভাবছে। হিরণ কখনো মেয়েদের সাথে খেলেনা। ইরিনা কখনো তাকে কোন মেয়ের সঙ্গে খেলতে দেখেনি। কেন খেলে না? অন্য ছেলেরা তো ঠিকই খেলে! হারে জেতে। কত মেয়ে হিরণকে সাধে দাবা খেলার জন্য। কিন্তু না, হিরণ কখনো খেলে না। যদি ওকে কেউ জিজ্ঞেস করে, এই, তুই মেয়েদের সাথে কেন খেলিস না রে? জবাবে ও শুধু হাসে। কিছু বলে না।
ইরিনা ভাবতো, মেয়েদের কাছে হেরে যাওয়ার ভয়ে হয়তো খেলে না। ইজ্জত নিয়ে টানাটানি হয়ে যাবে।
ইরিনার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো চলতি এই স্কুল টুর্নামেন্টে। চারটে মেয়ের সঙ্গে হিরণকে খেলতে হয়েছে। চারজনই খুব বাজেভাবে হেরেছে।
ইরিনা শুধু ভাবছে যে, কাল পুরো স্কুলের মেয়েরা ইরিনার দিকে তাকিয়ে থাকবে। কাল যদি ইরিনা হেরে যায়, পুরো স্কুলের মেয়েরা হারবে।-কিরে মা! দাবা নিয়ে চুপচাপ বসে আছিস?
ইরিনা মাথা তুলে খানিকক্ষণ বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
– এত টেনশনের কি আছে! খেলাই তো। হারজিত থাকবে। তুই যে এই পর্যন্ত জিতে আসতে পেরেছিস এই তো অনেক।
ইরিনা মুচকি হাসলো।
– আমাকে এই খেলাটা জিততেই হবে বাবা। আই নিড ইয়োর হেল্প।
আনিস সাহেব মেয়ের সামনে বসলেন।
– বল কিভাবে তোকে হেল্প করতে পারি?**********
হিরণ আজ সকাল সকাল স্কুলে চলে এসেছে। ফাইনাল খেলা যেখানে হবে সেখানে বসে আছে। হেলাল স্যারের জন্য অপেক্ষা করছে। হেলাল স্যার হচ্ছেন দীঘারপাড়া হাইস্কুলের দাবার মাষ্টার। প্রত্যেক বৃহস্পতিবারে স্কুলে একটা দাবা খেলা হয়। হেলাল স্যার একসঙ্গে দশজনের সাথে দাবা খেলেন। পাঁচটা ছেলে পাঁচটা মেয়ে। প্রায়ই মেয়েদের কাছে হেরে যান। তবে ছেলেদের সাথে কখনো হারেন না। ব্যাতিক্রম হিরণ এই একজন খেলোয়াড়ই আছে যার সাথে কিনা স্যার একা খেলেন।
হিরণ ভাবছে স্যারের কাছে একবার ফোন দেবে কিনা। ফাইনাল ম্যাচের আগে একটু প্র্যাকটিস করে নিলে ভালো হতো। এমন সময় বিধানের গলা শোনা গেল।
– কিরে ফিশার! এত সকাল সকাল, কি মনে করে?
-আরে তুই!
– এই আসলাম। কেন জানি মনে হচ্ছিল তোকে এখানে পেয়ে যাবো।
– এসেছিস যখন বোস, দুই দান হয়ে যাক।গুটি সাজাতে সাজাতে বিধান বললো, হ্যা রে, আজ তোর প্রতিপক্ষ কিন্তু খুব হার্ড। দ্যা গ্রেট ইরিনা।
হিরণ বললো, তাতে কি হয়েছে?
– তোর কি মনে হয় না যে তোকে একটু সিরিয়াস হওয়া দরকার?
– অত সিরিয়াস হয়ে কি হবে?
– তুই সবকিছু এত ইজিলি কিভাবে নিস বলতো?
– ইজিলি না নিয়ে উপায় নেই বন্ধু। আচ্ছা বাদ দে। এখন শোন আজকে আমার একটা প্ল্যান আছে।
– কি প্ল্যান?
– তোকে বলেছিলাম না একটা বিশেষ দিনে,,,,,,
– তার মানে তুই,,,,
– ইয়েস, আজকেই সেই বিশেষ দিন।
বিধান বললো, ওহ মাই গড!হিরণের একটা ব্যাপার আছে। সেটা হিরণ আর বিধান ছাড়া তৃতীয় কেউ হয়তো জানে না। এমনকি হেলাল স্যারও না।যেখানে কিনা স্যার হিরণের সবরকমের সিক্রেট জানে। ব্যাপারটা হলো, হিরণ ইরিনাকে অসম্ভব পছন্দ করে। এতটাই পছন্দ করে যে ইরিনার কথা ভাবলেই ওর মাথা হ্যাং হয়ে যায়। কি করবে কি না করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ইরিনা একদিন হিরণের কাছে নোট না কি যেন একটা চেয়েছিলো। তাতেই হিরণের কান-মাথা গরম হয়ে গিয়েছিলো। ইরিনা সেদিন হিরণকে বলেছিলো, তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই ফার্স্ট টাইম কোন মেয়ের সঙ্গে কথা বলছিস। হিরণ সেদিন এ কথার কোন উত্তর দিতে পারেনি।
বিধান চাল দিয়ে বললো, এই নে তোর কাঁটাচামচ। কি যেন বলে,,, হা ফর্ক এ্যাটাক। এবার কি করবা বাছাধন? হা হা
হিরণ মুচকি হেসে বললো, খেলা তো ভালোই শিখে গেছিস। তবে আর একটু খেয়াল করে খেলবি। এই নে চেক।
বিধানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
– ধেৎ, তোর সাথে পারা যায় না।
– আর খেলবি?
– না ভাই থাক, আর বেইজ্জতি করিসনে।
– কেউ তো আর দেখছে না।
– না দেখুক, আচ্ছা সে যাই হোক তুই প্ল্যান করেছিলি এক বিশেষ দিনে ,,,,,
– হ্যালো বয়েজ!!
বিধান তার কথা শেষ করার আগেই হেলাল স্যারের এন্ট্রি হলো।
– কি ব্যাপার আজ এত সকাল সকাল?
হিরণ, বিধান দুজনেই দাঁড়িয়ে গেল।
– আরে বোসো বোসো।
হিরণ বললো, স্যার! ম্যাচ শুরু হতে এখনো অনেক সময়। ততক্ষণে আপনার সাথে একটু প্র্যাকটিস করি।
– তোমার তো আজ ফাইনাল খেলা। প্রতিপক্ষও শক্তিশালী।
বিধান বললো, কিযে বলেন স্যার! হিরণের সাথে ইয়ার্কি নাকি। great player of the school।
স্যার বললেন, ইরিনা যেন তেন কোন প্লেয়ার না। বুঝেছ বিধান চন্দ্র রায়।
হিরণ বললো, ঠিক বলেছেন স্যার। দারুণ খেলে ইরিনা। মেয়েরা কেউ ওর সাথে পারে না।
স্যার বললেন, আমি নিজেই ওর সাথে পারি না। হা হা,,,
স্যারের কথায় হিরণ আর বিধানও হেসে উঠলো।**************
ক্লাস টেনের রুমে ফাইনাল ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছে। ম্যাচ শুরু হওয়ার আর মাত্র বিশ মিনিট বাকি আছে। এই মুহূর্তে হিরণকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
হেলাল স্যারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। প্রধান অতিথি চলে এসেছেন। তিনি প্লেয়ার দুজনকে সামনে নিয়ে বক্তৃতা দিবেন। এই মুহূর্তে একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মেজাজটা তাহলে কি পরিমান খারাপ হয়। বিধানকে ডাকতে পাঠিয়েছে কতক্ষণ হলো, তারও খোঁজ নেই। হেলাল স্যার পাগলের মতো হিরণকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, এমন সময় প্রধান অতিথির গলা শোনা গেল।“প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা” তোমরা নিশ্চয় জানো যে, দাবা খেলা এটা জ্ঞানী মানুষের খেলা, এমনকি এটা রাজা বাদশাদের অতিপ্রাচীন একটি খেলা।……
হেলাল স্যার দৌড়ে রুমের দিকে গেলেন। হিরণ আর ইরিনা মুখোমুখি বসে আছে। প্রধান অতিথি বক্তৃতা দিচ্ছেন। হেলাল স্যার হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।
ফাইনাল খেলা শুরু হয়ে গেছে। মাত্র কয়েক চাল হয়েছে। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটলো। হিরণের রাণী মারা পড়লো। হেলাল স্যারের ভ্রু কুচকে গেল। মাত্র ছয় চালের মধ্যে রাণী মারা পড়বে এমন দূর্বল খেলোয়াড় হিরণ না। নিশ্চয় এখানে কোন কাহিনি আছে। হেলাল স্যার খুব ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। আরে এতো, এতো ব্রিলিয়ান্ট উইনিং মুভ। আগামি দুই চালেই হিরণ জিতে যাবে। বিষয়টা ইরিনা মনে হয় ধরতে পেরেছে, তবে মেয়েদের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। সবাই উল্লাসে ফেটে পড়েছে।
ইরিনার কান-মাথা ঝিমঝিম করছে। হিরণ হাতি দিয়ে চেক দিতে গিয়ে আবার ফিরিয়ে নিয়েছে।তখন আর ইরিনার বুঝতে বাকি নেই যে সে রাণী খেয়ে কত বড় ভুল করেছে। আর মাত্র দুই চালে খেলা শেষ। এসময় বিস্ময়কর একটা ঘটনা ঘটলো। হিরণ রিজাইন করলো। পুরো স্কুলের মেয়েরা উল্লাসে ফেটে পড়লো। ইরিনা হতভম্ব হয়ে হিরণের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ রিজাইনের হাত মেলানোর সময় ইরিনার হাতের মধ্যে খচখচ করে উঠেছে। কিছু একটি দিয়েছে হিরণ ইরিনার হাতে। উঠার সময় কানে কানে বলে দিয়েছে, কাউকে দেখাস না প্লিজ। একটু একপাশে নিয়ে গিয়ে পড়িস।
****************
হেলাল স্যার হিরণকে ধরেছেন।
– কি ব্যাপাার হিরণ! তোমার জিতে যাওয়া ম্যাচ এভাবে রিজাইন কে দিলে কেন?
– স্যার কিছু মনে করবেন না প্লিজ। টপ সিক্রেট।
– কি এমন টপ সিক্রেট রে ভাই যেটা তুমি আমাকে বলতে পারবে না।
– sorry sir Don’t mind please. তবে বিধানের কাছে আপনাকে বলে দেবে।যাই স্যার একটা কাজ বাকি আছে।চিরকুটটা পড়ে ইরিনার মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো হলো। এই তাহলে কাহিনি। এই জন্য তাহলে হিরণ ম্যাচ হেরে গেছে। ইরিনা কমনরুমের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। হিরণকে দেখা যাচ্ছে। ইরিনার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। ইরিনাও হেসে ফেললো। আচ্ছা! চিরকুটটাতে তাহলে কি লেখা ছিল? লেখা ছিল,
How can I win if my opponent is my queen?সমাপ্ত
5 Comments
Friends
মো: নাজমুল আখতার
@faith
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
@nazmul26
Sarker S Islam
@sarkersislam
Md. Golam Mostafa Khan
@md-golammostafakhan
Sanjoy Kumar Das
@sanjoykumardas
Jaman Uddin
@jamanuddin
mizan kututbi
@mizankututbi
Burhan Ferdoushi
@burhanferdoushi
Drako Shajib
@drako


দারুণ একটা গল্প লিখেছেন আপনি, শেষটা পড়ে সত্যি মনটা একদম ভালো হয়ে গেল!