-
উপকথা November 11
😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅ফ্রেম এডিট
আর্ট কলেজের গেটে ঢুকলেই তিনটা গন্ধ নাকে লাগে: তারপিন তেল, ভেজা কাদামাটি আর ক্যান্টিনের ঠান্ডা চা। আর চারটা বাজলে লাগে একটা অদৃশ্য ঘোষণা: “সিনা-আনায়া আসছে, সবাই ফ্রেমে ঢুকুন।”
আশিক সেই ফ্রেমের বাইরের লোক। পেইন্টিং ডিপার্টমেন্টের ছেলে। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে ঘুমকাতুরে, আসলে চোখ দুটো ক্যামেরার লেন্সের মতো। কিছুই মিস করে না।
সিনা আর আনায়া মানে একটা প্যাকেজ ডিল। একজনকে কিনলে আরেকজন ফ্রি, ওয়ারেন্টিসহ। একই বেরেট, একই ঠোঁটের রং। একজন কিছু বললে আরেকজন “আরে হ্যাঁ হ্যাঁ!” বলে আগেই হেসে ফেলে। সিনা ভাস্কর্যের মেয়ে, মাটি ছুঁলে তার হাতে প্রাণ আসে, ক্যামেরা অন করলে মুখে। আনায়া সেই প্রাণের ডিরেক্টর। কোন অ্যাঙ্গেলে হাসতে হবে, কোন সেকেন্ডে চুল ঝাড়া দিতে হবে, সব তার হিসাব। গত সপ্তাহে একটা ট্রানজিশন রিলস পঞ্চাশ হাজার ভিউ ছুঁয়েছে। আশিকের আঁকা শেষ তিনটা প্রদর্শনী মিলিয়ে দর্শক হয়েছে একচল্লিশজন, তার মধ্যে বারজন ছিল ক্লিনার খালা আর তাঁর পরিবার।
একদিন সাহস করে আশিক এগিয়ে গেল।
“সিনা, একটু কথা ছিল…”
আনায়া চোখের পলকে মাঝখানে। হাসিটা এত মিষ্টি যে অপমান লাগার আগে চিনির লেভেল বেড়ে যায়।
“আরে আশিক ভাই! সরি সরি, আমাদের দৌড়াতে হবে। গুলিস্তানে ভিনটেজ লেদার জ্যাকেট ড্রপ করেছে আজ!”
ব্যস। ঝড়ের মতো দুজন উধাও। আশিক দাঁড়িয়ে থাকল, হাতে তুলির মতো একটা অসমাপ্ত বাক্য।
সে বুঝল ব্যাপারটা অপমান না। অপমান করতে হলেও তো আগে একজনকে দেখতে হয়। ওদের দুনিয়ায় আশিকের কোনো অস্তিত্বই নেই। সে একটা ব্যাকগ্রাউন্ড এক্সট্রা, যার নামও ক্রেডিটে ওঠে না।
সেদিন রাতে সে হোস্টেলের ছাদে বসে সিগারেট ধরাল আর ভাবল, এই বন্ধুত্ব কীসের ওপর দাঁড়িয়ে? গভীর আত্মার টান? ঘণ্টা। এটা দাঁড়িয়ে আছে মোমেন্টামে। শপিং, লাইক, ম্যাচিং ড্রেস আর ভিউ। দুটো রেললাইন পাশাপাশি ছুটছে, ঠিক জায়গায় একটা ছোট্ট পাথর ফেললেই সব লাইনচ্যুত।
ছোট্ট পাথর। আশিক হাসল। রং মেশানোর ধৈর্য তার আছে।
প্রথমে এল ফিসফিস। একটা বেনামি আইডি থেকে আনায়ার ইনবক্সে মেসেজ, নিরীহ, প্রায় দরদি। “সিনা আপু তো এখন আলাদা কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করছে, তুমি জানো না?” জানত না। আনায়া ভাবল, কোনো বোকা ফ্যান ভুল বকছে। কিন্তু ভুল কথাও মাথায় ঢুকলে ভাইরাসের মতো থাকে।
তারপর এল গ্যালারির ঘটনা। আশিক জানত শহরের এক নামকরা গ্যালারি তরুণ শিল্পীদের নিয়ে প্রদর্শনী করছে। সে পাশের টেবিলে বসে সিনার ফোনে আসা একটা মেইলের স্ক্রিনশট “ঘটনাচক্রে” সবার সামনে মেলে ধরল, আর সেটা “ঘটনাচক্রে” আনায়ার চোখে পড়ল। মেইলটা আসলে একটা সাধারণ আবেদন-ফর্মের কনফার্মেশন। কিন্তু আনায়ার চোখে সেটা হয়ে গেল বিশ্বাসঘাতকতার দলিল: আমাকে না বলে? আমাকে ছাড়া?
আর সিনার সামনে আশিক হয়ে উঠল দুনিয়ার সবচেয়ে ভদ্র প্রেক্ষাপট।
“তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছে সিনা। সারাক্ষণ হাসা কি সোজা কাজ?”
সিনা প্রথমবার থমকে তাকাল। কেউ কখনো জিজ্ঞেস করেনি। সবাই শুধু বলত, “ওয়াও, কী ভাইব!”
ফলাফল এল পনেরো দিনের মাথায়, আর এল বিস্ফোরণের মতো। ভাইরাল কোলাবের ক্রেডিট আর টাকা নিয়ে ক্যাম্পাসের করিডোরে দুজনের চিৎকার। আনায়া বলল, “তুই আমাকে ইউজ করেছিস!” সিনা বলল, “আর তুই আমার ফোলোয়ারদের কাঁধে চড়ে ঘুরিস!” দুজনেই অক্ষরে অক্ষরে সত্যি বলছিল, শুধু ভুল দিনে। শেষে আনায়া ফোনটা তুলে সিনাকে ব্লক করল। চোখের সামনে, লাইভ। একটা আস্ত বন্ধুত্ব মরল এক ট্যাপে, বিনা জানাজায়।
সেদিন বিকেলে আশিক দাঁড়িয়ে ছিল সিঁড়ির নিচে, হাতে দুই কাপ চা।
সিনা কাঁদছিল। আশিক চুপ করে শুনল। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ল, “হুম, কষ্ট তো লাগবেই”, “ও ঠিক করেনি।” বিজয়ীর গর্ব বুকের ভেতর চেপে রেখে দিল, মুখে রাখল একদম নিখুঁত দুঃখী ভাব। সিনা তার কাঁধে মাথা রাখল। ফাঁকা করিডোর ধরে তারা হাঁটল অনেকক্ষণ। আশিকের মনে হলো, জীবনের প্রথম সে নিজের ছবির কেন্দ্রে ঢুকেছে। ফ্রেম এডিট সম্পন্ন।
কিন্তু শিল্পীরা জানে, কিছু ছবি শেষ করার পরই খারাপ হতে শুরু করে।
প্রথম সপ্তাহে সিনা কাঁদল। দ্বিতীয় সপ্তাহে চুপ হয়ে গেল। তৃতীয় সপ্তাহে স্টুডিওতে আসা বন্ধ করল।
আশিক বুঝতে পারেনি সিনার হাসিটা সিনার ছিল না। ওটা ছিল দুজনের যৌথ বিদ্যুৎ-সংযোগ, আর আশিক নিজ হাতে মেইন সুইচটা অফ করে দিয়েছে। ক্যামেরা নেই, ম্যাচিং জামা নেই, নেই “চল চল দৌড়াই!”। মাটি ছোঁয়ার শখও গেল। ঘরে পর্দা টানা, ফোনের স্ক্রিন অন্ধকার, আর মেয়েটা বিছানায় এমনভাবে শুয়ে থাকে যেন নিজের শরীরটাই আর ভাড়া দিতে পারছে না। জামাকাপড় ঢিলে হয়ে ঝুলছে, চোখের আলো নিভে এসেছে। যে মেয়ে একসময় সারা ক্যাম্পাসকে ফ্রেমে ধরে রাখত, সে এখন নিজের ঘরের দেয়ালটাই দেখে।
আশিক রোজ আসে। চা আনে, বই আনে, গল্প শোনায়। সিনা শুধু বলে, “হুম।” কখনো সেটাও বলে না।
একদিন আশিক ক্যানভাসের সামনে বসে নিজের হাতে সিনার পোর্ট্রেট আঁকতে গেল। দুই ঘণ্টা পর দেখল, ছবির মুখে রং নেই, শুধু ধূসর। পুরো ক্যানভাস ধূসর। কারণ যে সিনাকে সে আঁকতে চায়, সে আর কোথাও নেই। আছে শুধু এই মেয়েটা, যাকে সে নিজের ইচ্ছামতো বানিয়েছে: একা, নির্ভরশীল, আর পুরোপুরি তার।
ইচ্ছাপূরণ হয়েছে। অক্ষরে অক্ষরে।
ওদিকে আনায়া নতুন বেরেট কিনে নতুন বান্ধবীর সঙ্গে নতুন রিলস বানাচ্ছে। হাসছে, লাইক পাচ্ছে। জীবন চলে। শুধু এই গল্পে দুজন মানুষ আর চলেনি: একজন ঘরে ঘুমিয়ে, আরেকজন তার পাশে বসে বুঝতে পেরেছে, ফুল পেতে গিয়ে সে পুরো বাগানটাই পুড়িয়ে ফেলেছে। হাতে এখন শুধু শুকনো শিকড়।
আশিক তবু আঁকে। কী আর করবে? তার ফ্রেম তো ফাঁকা হয়নি। ফ্রেমের ভেতরে একজন আছে, শুধু রংটা নেই।3 Comments-
Ashik Mokami, আপনার এই রচনায় মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব এবং আবেগের খেলা এত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে যে আমি শেষ পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়েছি। কাহিনীটির বাঁক বদল এবং শেষ পরিণতির বিষাদমাখা অনুভূতিগুলো যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। আপনার লেখনীর এই সূক্ষ্ম ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে ভবিষ্যতে আরও চমৎকার সব সৃষ্টি উপহার দেওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।
Friends
সৃষ্টির বিস্ময়
@1ff4f40742b37a84604c6bb76fb8ef34
Ferdaus Sorkar
@ferdaussorkar1
Tasnim-Akter-Mim
@tasnim-akter-mim
Antor Bosu Antu
@antu
MadBangla
@madbangla
নাঈম অরণ্য
@aronnonaim
সিরাজুল ইসলাম
@sherajulislam
নুরুল ইসলাম শান্ত
@santo23
Sanzida Shetu
@sanzidashetu

আপনার লেখাটি পড়ে শেষ করতে না করতেই মনের ভেতর কেমন জানি একটা বিষণ্ণতা কাজ করছে। এই লাইনটি সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে— “ফুল পেতে গিয়ে সে পুরো বাগানটাই পুড়িয়ে ফেলেছে।”