Profile Photo

Ashik MokamiOffline

  • ashikmokami
  • Profile picture of Ashik Mokami

    Ashik Mokami

    • 2 weeks, 6 days ago

    উপকথা ৩১ অক্টোবর

    😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅😅

    কাপড়ের হিসাব

    একটি অন্ধকার হাসির গল্প — দ্বিতীয় পর্ব

    প্রথম ডাক পড়ল একটা পাঞ্জাবির।

    গ্যালারির সামনের সারি থেকে সে উঠে দাঁড়াল, ধবধবে সাদা, কলারে কড়া মাড়, ঠিক যেমন আজ সকালে কাউন্সিলর সাহেব তাকে পরেছিলেন। পাঞ্জাবি হাত দুটো বুকের ওপর রেখে, নিচু গলায়, গুছিয়ে পড়তে শুরু করল:

    “আমি এগারো বছর বয়সী। মালিক: কাউন্সিলর হাজি আব্দুল মান্নান। প্রতি ঈদে নতুন, প্রতি নির্বাচনে ইস্ত্রি করা। আমার ডান পকেটে এগারো বছরে একচল্লিশবার খাম ঢুকেছে। প্রতিবার সে বলেছে, ‘এটা উপহার।’ দুইবার সে পকেট ঝেড়ে বলেছে, ‘আমি গরিবের ছেলে, আমার কিছুই নেই।’ আর সেই দুবারই আমার বাঁ পকেটে একটা সোনার ঘড়ি লুকানো ছিল।”

    মাঠের ধারে একটা তেলের ড্রাম একটু কেঁপে উঠল।

    “গত শীতে সরকারি কম্বল বিতরণের দিন, গুদামে বারোশো কম্বল ছিল। মানুষ পেয়েছে তিনশো। বাকিটা…” পাঞ্জাবি এক মুহূর্ত থামল। “কম্বলগুলো তখন কেঁদেছিল। আমরা সবাই শুনেছি। কম্বলরা কাঁদলে খুব নিঃশব্দে কাঁদে। শুধু তুলোর ভেতরে একটু ঠান্ডা লাগে।”

    মানুষ হাসল। প্রথমে একজন, তারপর আরও কয়েকজন। ঘৃণা মেশানো হাসি, যে হাসিতে কেউ আনন্দ পায় না কিন্তু থামাতেও পারে না। কাউন্সিলর সাহেবের ড্রামের ভেতর থেকে একটা ফাঁপা আওয়াজ উঠল:

    “মিথ্যা কথা! এ সব মিথ্যা! আমি এই পাঞ্জাবির জন্য ওকে…”

    পাঞ্জাবি তার দিকে তাকাল, অর্থাৎ পুরো পাঞ্জাবিটা তার দিকে ঘুরল।

    “হাজি সাহেব,” পাঞ্জাবি শান্ত গলায় বলল, “আমি কাপড়। আমি কীভাবে মিথ্যা বলব? আমার তো জিহ্বাই নেই, ঘামের দাগ আছে। ঘামের দাগ মিথ্যা বলে না।”

    ড্রাম আর কিছু বলল না।

    এরপর পড়া হলো একটা শাড়ির। হালকা গোলাপি, সুতির, মাঝবয়সী এক ভদ্রমহিলার, যিনি গ্যালারির পেছনে একটা ছাতার নিচে লুকিয়ে ছিলেন। শাড়িটা উঠে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত গলায় পড়ল:

    “আমি তেইশ বছর ধরে এই মহিলার সঙ্গে ছিলাম। সে এই তেইশ বছরে শাশুড়ির সামনে বসে হেসেছে চার হাজার বারো বার। বাথরুমে গিয়ে কেঁদেছে এক হাজার ছশো বার। আর একবার, শাশুড়ির জন্য শরবত বানাতে গিয়ে, সে অনেকক্ষণ চিনির কৌটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর লবণের কৌটার দিকে।”

    ছাতার নিচ থেকে একটা তীক্ষ্ণ নিঃশ্বাস এল।

    “সে লবণ ঢালেনি,” শাড়ি যোগ করল, কিছুটা নরম গলায়। “তিন চামচ চিনিই দিয়েছিল। কিন্তু আমি জানি, সে ভেবেছিল। হিসাবে সেটা ঢুকবে কি না, আমরা বিতর্ক করছি।”

    গ্যালারির কাপড়গুলোর মধ্যে ফিসফিস উঠল, লাখ লাখ কাপড়ের ফিসফিস, যেন একটা বিশাল সমুদ্র আস্তে আস্তে ঢেউ তুলছে। কেউ কেউ নড়েচড়ে বসল। একটা জিনস পাশের জিনসকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিল। কয়েকটা শার্ট মাথা নাড়ল, যেন বলছে, “চিনির পক্ষেই রায়।”

    আশিক সিনার কানে ফিসফিস করল, “এটা তো সত্যিকারের আদালতের চেয়েও খারাপ। এখানে অন্তত উকিল থাকে।”

    “এখানে সাক্ষী থাকে,” সিনা উত্তর দিল, “আর সাক্ষীরা সবাই তোমার গায়ে লেগে ছিল।”

    পরের ডাক পড়ল একটা চকচকে জ্যাকেটের। তরুণ এক ছেলের, যে এখন একটা ডাস্টবিনের ঢাকনা বুকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাকেট গলা পরিষ্কার করে পড়ল:

    “আমি ধারে কেনা। কিস্তি বাকি আছে চৌদ্দ মাস। মালিক সবাইকে বলেছে আমি বিদেশ থেকে এসেছি। আমি এসেছি নিউমার্কেটের দ্বিতীয় তলার দোকান থেকে। ট্যাগ কেটে ফেলা হয়েছিল, কিন্তু আমার ভেতরের লেবেলে ‘মেড ইন গাজীপুর’ লেখা আছে। মালিক একবার ট্যাগের জায়গাটা আঙুল দিয়ে ঘষতে ঘষতে প্রায় এক মিনিট দাঁড়িয়ে ছিল, যেন ঘষলে লেখাটা মিলিয়ে যাবে।”

    ডাস্টবিনের ঢাকনাটা মাথা নিচু করল।

    “আমি তাকে ঘৃণা করি না,” জ্যাকেট বলল, আর পুরো স্টেডিয়াম চুপ করে গেল, কারণ কথাটার সুরে হঠাৎ কিছু বদলে গিয়েছিল। “সে প্রতিদিন আমাকে যত্ন করে ঝেড়ে ঝুলিয়ে রেখেছে। একবার বৃষ্টিতে ভিজে গেলে সে আমাকে নিজের পাঞ্জাবির ওপর জড়িয়ে ঘুমিয়েছিল, যেন আমি তার আসল ত্বক। আমি শুধু হিসাবটা পড়ছি। আমরা শুধু হিসাব পড়ি।”

    আশিক টের পেল, হাসিটা আর হালকা নেই। কাপড়গুলো যখন শুধু পাপ পড়ছিল, তখন মজা ছিল। কিন্তু যখন তারা ভালোবাসার হিসাবও পড়তে শুরু করল, তখন মজাটা গলায় আটকে গেল। ওরা সব দেখেছে। কেউ ঘুষ নিলে যেমন দেখেছে, কেউ চুপচাপ কাঁদলেও তেমনি দেখেছে। আর সেটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর, কারণ কেউ কাউকে এভাবে কখনো পুরোপুরি দেখে না।

    তারপর ডাক পড়ল ছোট্ট একটা সাদা কাপড়ের টুকরোর, যেটা মঞ্চের কোণে এতক্ষণ কুঁকড়ে বসে ছিল। একটা কাফন। গোরস্থান থেকে এসেছিল যে কাফনগুলো, তাদেরই একটা।

    স্টেডিয়ামে এমন নীরবতা নামল, যেন কেউ দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। কাফনটা উঠে দাঁড়াল না, শুধু একটু কেঁপে উঠল। তার স্বর এত নিচু, এত শুকনো, যে সামনের সারির মানুষেরা ঝুঁকে পড়ল।

    “আমি মাটির নিচে ছিলাম,” কাফন বলল। “আমার কোনো মালিক নেই, কারণ আমার মালিক আর কথা বলে না। কিন্তু আমি তাদের সঙ্গে ছিলাম। তোমরা জানো না, ওরা কী বলে।”

    কেউ নিঃশ্বাস নিল না।

    “ওরা ক্ষমা চায় না। কেউ না। কেউ কখনো বলেনি, ‘আমি দুঃখিত।’ ওরা বলে একটাই কথা, মাটির নিচে, ঠান্ডা, অন্ধকারে, ফিসফিস করে: ‘আরেকটু সময় পেলে…’ শুধু এটুকু। ‘আরেকটু সময় পেলে।’ আর কেউ কখনো বলে না, কী করত।”

    আশিকের গা-টা হিম হয়ে গেল। সিনা তার হাতটা কার্টনের ভেতর দিয়ে চেপে ধরল।

    গামছা আস্তে বলল, “ধন্যবাদ।” আর কাফনটা আবার কুঁকড়ে বসে পড়ল।

    কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। সেই নীরবতার মধ্যে এক মোটা চাচা কাঁদতে শুরু করলেন, ভাঙা, বিব্রত কান্না, যেন তিনি নিজেও জানতেন না এটা তাঁর ভেতরে এতদিন জমা ছিল। পাশের জন তাঁকে সরে গিয়ে জায়গা করে দিল, কিন্তু সান্ত্বনা দিতে পারল না। কারণ সবাই ভাবছিল, এরপর কার পালা।

    গামছা খাতার পাতা উল্টাল। অনেকক্ষণ ধরে পাতা ঘেঁটে সে এক জায়গায় থামল। স্টেডিয়ামের লাখ লাখ কাপড় একসঙ্গে ঝুঁকে পড়ল, যেন আগে থেকেই জানত কোন পাতা।

    “এবার,” গামছা বলল, “দুটো নাম।”

    সিনার হাত আশিকের হাতে শক্ত হয়ে গেল।

    “আশিক। আর সিনা।”

    আশিক আর সিনা মাঠের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল, কার্টন আর ঝুড়ির ভেতরে, একে অপরের কাঁধ ঘেঁষে। লাখ লাখ কাপড়ের নীরব দৃষ্টি তাদের গায়ে এসে পড়ল। সেটা চোখের দৃষ্টি নয়, তবু এমন ভারী, যেন কেউ ঘাড়ের ওপর ভেজা তোয়ালে রেখে দিয়েছে।

    প্রথমে উঠে এল আশিকের লুঙ্গিটা। সকালে যে খাটের তলা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালিয়েছিল, সেই। একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে, প্রায় অনিচ্ছায়, সে খাতার সামনে দাঁড়াল।

    “আমি আশিকের লুঙ্গি,” সে বলল। “আট বছর ধরে। আমি একটা ভদ্র লুঙ্গি, কিন্তু আমার কিছু কথা আছে।”

    “পড়ো,” গামছা বলল।

    লুঙ্গি গলা খাঁকারি দিল। “এই লোক, দুই হাজার তিন সালে, ক্লাস থ্রিতে, সিনার টিফিন চুরি করে খেয়েছিল। ভাতের সঙ্গে ডিমভাজা ছিল। সিনা যখন জিজ্ঞেস করল, সে বলল বিড়ালে খেয়েছে। সিনা বিড়ালটাকে খুঁজে বের করে দুধ খাইয়েছিল, কারণ তার মনে হয়েছিল বিড়ালটা না খেয়ে আছে। আশিক পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখেছে। কিছু বলেনি।”

    সিনা কার্টনের দিকে ঘুরে তাকাল। আশিক ঢোক গিলল।

    “সেটা… সেটা তো ছোটবেলার…”

    “আর বিড়ালটা,” লুঙ্গি যোগ করল, “এর পরের সপ্তাহে একটা লরির নিচে চলে যায়। আমি বলছি না দুটো ঘটনার যোগ আছে। শুধু হিসাব দিচ্ছি।”

    মানুষের ভিড়ে একটা হাসির দমক উঠল, আর সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন হাত দিয়ে মুখ চাপল। আশিকের কান লাল হয়ে গেল, আর সে বুঝল, লজ্জা কাপড়ে নয়, কানে থাকে।

    সিনার ওড়না এল পরের পালায়। নীল, সামান্য ছেঁড়া কিনারা। সে পড়ল ধীর গলায়:

    “সিনা, ক্লাস এইটের গণিত পরীক্ষা। আমার ডান হাতার ভেতরে সূত্র লেখা ছিল, বলপেন দিয়ে। পুরোটা সে ঘেমে ঘেমে ঘষে ফেলেছিল, তাই উত্তরপত্রে লিখেছে অর্ধেক সূত্র, অর্ধেক অনুমান। সে পেয়েছিল চুয়াত্তর। শিক্ষক বলেছিলেন, ‘সিনা একদিন বিজ্ঞানী হবে।’ সে সারাজীবন তাঁর সঙ্গে দেখা করা এড়িয়ে চলেছে।”

    সিনা চোখ বন্ধ করল। “আমি তখন তেরো বছরের…”

    “আমরা বিচার করছি না,” ওড়না ক্লান্ত গলায় বলল। “আমরা শুধু ঘামের হিসাব রাখি।”

    স্টেডিয়ামের লাখ লাখ কাপড়ের মধ্যে একটা সম্মিলিত মাথা নাড়া গেল। হালকা, সম্ভবত স্নেহমাখা। কেউ বিচলিত নয়। এসব তো ছোটখাটো জিনিস। বাচ্চাদের অপরাধ। এগুলো যে মাপার জিনিস নয়, সবাই জানত।

    তারপর গামছা আস্তে বলল, “আর একটা হিসাব আছে।”

    আশিক টের পেল, তার গলার ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে।

    “এই হিসাবটা দুজনেরই। কিন্তু দুজন কেউ কাউকে বলেনি।”

    সিনা কার্টনের দিকে ঝুঁকে এল। তার গলা নেমে গেল ফিসফিসে। “আশিক… ওরা কী বলবে?”

    “আমি জানি না,” আশিক বলল। আর সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যা, কারণ সে জানত।

    আশিকের চাদরটা এল। সেই চাদর, যেটা সকালে জানালা গলে বেরিয়েছিল, আর যেটা সন্ধ্যায় আবার ফিরে এসে তাদের মাথার ওপর অনেকক্ষণ থেমে ছিল। সে খুব ধীরে এসে দাঁড়াল। মাথা নিচু। খাতা না দেখেই পড়ল, কারণ এ হিসাব তার মুখস্থ ছিল।

    “তিন বছর আগে, রাত দুইটা চল্লিশে, সিনার মা হাসপাতালে মারা যান। সিনা আশিককে ফোন করেছিল সাতবার। আশিক সেই রাতে নিজের ঘরের মেঝেতে বসে ছিল, ফোন হাতে, স্ক্রিনে সিনার নাম জ্বলছিল। আমি তার কাঁধে জড়ানো ছিলাম। তার হাত কাঁপছিল, আমি টের পেয়েছি। সে ধরেনি। সকালে সে বলল, জ্যামে আটকে ছিল।”

    স্টেডিয়ামে এমন নীরবতা নামল, যা কেউ ইচ্ছে করে ভাঙতে পারে না।

    “সে ভয় পেয়েছিল,” চাদর বলল, আর তার গলায় একটা অদ্ভুত কোমলতা। “সে জানত না কী বলতে হবে। সে ভাবল, না ধরলে হয়তো কিছু ঘটেনি। আমি কাপড়, আমি জানি না এটা কেমন বোধ। কিন্তু আমি বলতে পারি, সে সারা রাত তাকিয়ে ছিল, আর কিছু করেনি, আর তার চোখ পুরো সময় শুকনো ছিল, আর সেটাই সবচেয়ে খারাপ।”

    সিনা আশিকের দিকে তাকাল না। আশিক সিনার দিকে তাকাতে পারল না।

    গামছা বলল, “আর সিনার হিসাব।”

    সিনার ওড়না আবার উঠে দাঁড়াল। এবার সে আগের মতো ক্লান্ত নয়। তার গলা ভাঙা, যেন সে এই কথাটা বলার জন্য এতদিন অপেক্ষা করছিল আর এখন বলতে চাইছে না।

    “সিনা সেই রাতে ফোন করেছিল সাতবার। আশিক ধরেনি। আর সকালে যখন আশিক বলল জ্যামে আটকে ছিল, সিনা মাথা নাড়ল। আমি তখন তার গলায় ছিলাম। আমি টের পেয়েছিলাম, সেই মুহূর্তে সিনা বুঝে গিয়েছিল। ফোনের ওপাশে মাঝরাতে টিভির শব্দ হচ্ছিল, ক্রিকেটের ধারাভাষ্য। সে শুনেছিল। জ্যামে টিভি থাকে না। সে জানত, আশিক বাড়িতে। সে জানত, আশিক ধরেনি।”

    আশিক প্রথমবার মুখ ঘুরিয়ে সিনার দিকে তাকাল। সিনা তখন অন্য দিকে।

    “সে কিছু বলেনি,” ওড়না থামল, তারপর বলল, “কারণ তার মনে হয়েছিল, আশিককে এই মিথ্যাটা বলতে দেওয়াই ভালো। কারণ সত্যিটা শুনলে হয়তো একজন কিছু ভেঙে ফেলত। আর সেই সময়ে সিনার হাতে আর কিছু বাকি ছিল না, ভাঙার মতো।”

    কেউ নড়ল না। এক বাচ্চা কাপড়ের গ্যালারিতে কে যেন একটু কাশল, আর কাশির শব্দ মাঠের ওপর ঘুরে বেড়াল।

    আশিক টের পেল, কার্টনটা তার গায়ে কেমন বেমানান। কার্টন শক্ত, কার্টন নিষ্ঠুর, কার্টনের ভেতরে কেউ লুকোতে পারে না। কার্টনের ভেতরে শুধু একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, সে নিজে।

    “তিন বছর,” সিনা খুব আস্তে বলল। “তুমি জানতে আমি জানি?”

    “না,” আশিক বলল।

    “আমিও জানতাম না তুমি জানো যে আমি জানি।” সিনা একবার হাসল, ভাঙা, ক্লান্ত হাসি, কান্নার ঠিক আগের হাসি। “আমরা কী মূর্খ।”

    গামছা অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তারপর বলল, “হিসাবটা শেষ হয়েছে।”

    স্টেডিয়ামের লাখ লাখ কাপড় একসঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাজার হাজার ঠান্ডা সুতো একসঙ্গে ঢিলে হলো। মাঠের ধারে মানুষেরা কাঁপল।

    “আমরা ওজন মেপেছি।”

    আশিক ভাবল, সব শেষ। সবচেয়ে ভারী হিসাব তার, সিনার মায়ের রাত। সে নিজের কার্টনের কোণ চেপে ধরল, যেন ওটাই শেষ আশ্রয়।

    “সবচেয়ে হালকা হিসাব,” গামছা বলল, “আশিক আর সিনার।”

    ভিড়ের মধ্যে একটা গুঞ্জন উঠল। কেউ চেঁচিয়ে উঠল, “কী? কেন? ওদের হিসাব তো বিশাল!” কাউন্সিলর সাহেবের ড্রাম ঝনঝন করে উঠল, “এটা অবিচার!”

    গামছা ধীরে মাথা তুলল, যদিও গামছার মাথা নেই।

    “আমরা মাপি ওজন। ঘটনা মাপি না।” তার খসখসে কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল। “কাউন্সিলর সাহেব ঘুষ নিয়েছেন, তাঁর হিসাব ভারী, কারণ তিনি যা করেছেন, তা একা বহন করেছেন, আর কখনো কাউকে বলেননি। শাশুড়ির শরবতের মহিলা চার হাজার বার হেসেছেন, তাঁর হিসাব ভারী, কারণ তিনি সবটা একা বহন করেছেন। কিন্তু এই দুজন…”

    সে এক মুহূর্ত থামল।

    “এই দুজন একে অপরের মিথ্যা তিন বছর ধরে বহন করেছে। নিজের নয়। একজনের মিথ্যা আরেকজন। দুজনেই দুজনের মিথ্যাটা জানত, আর কেউ কাউকে ছেড়ে যায়নি। ওজন ভাগ হয়ে গেছে। ভাগ হলে ওজন কমে। এটা সামান্য গণিত।”

    সিনা আর আশিক পরস্পরের দিকে তাকাল। মাঠের মাঝখানে, লাখ লাখ কাপড়ের সামনে, কার্টন আর ঝুড়ি হাতে নিয়ে। তারপর কেউ কিছু না বলে, সিনা তার ঝুড়িটা ছেড়ে দিল, আশিক তার কার্টনটা। ঝুড়ি আর কার্টন মাটিতে পড়ে গেল, আর দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল।

    ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ চোখ বন্ধ করল। কেউ কেউ ঘুরে তাকাল অন্য দিকে। কেউ কেউ তাকিয়েই রইল, কিন্তু যা দেখতে চাইছিল, তা দেখতে পেল না, কারণ ওরা একে অপরকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছিল, যেন একজন আরেকজনের কাপড়।

    গামছা ধীরে এগিয়ে এল। এত ধীরে, যেন এই মুহূর্তটা এক শতাব্দী ধরে অপেক্ষা করছিল। সে মাঠের ওপর দিয়ে ভেসে এসে ওদের মাথার ওপর থামল।

    “আমরা আমাদের প্রথম কাপড়টা ফিরিয়ে দিচ্ছি,” সে বলল।

    তারপর সে নিজেকে খুলল। পুরোনো, তালি-লাগানো, রঙহীন গামছা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেল, বড় হলো, বড় হলো, আর দুজনের কাঁধের ওপর নেমে এল। একটাই কাপড়। দুজনের জন্য।

    আশিক প্রথমবার নড়ল। “এক মিনিট। একটাই?”

    “একটাই।”

    “কিন্তু আমরা দুজন।”

    “হ্যাঁ।”

    “আমি… মানে… আমরা যদি আলাদা কোথাও যেতে চাই? বাথরুমে, ধরো?”

    সিনা আশিকের পাঁজরে কনুই দিয়ে খোঁচা দিল। “এই তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা?”

    “আমি ব্যবহারিক মানুষ।”

    গামছা একটু নড়ল, আর পুরো স্টেডিয়ামের লাখ লাখ কাপড় একসঙ্গে একটা চাপা হাসি হাসল, শুকনো, খসখসে, ভাঙা, কিন্তু আসল। কাপড়ের হাসি।

    “এটাই আমাদের শর্ত,” গামছা বলল। “তোমরা দুজন একসঙ্গে চলবে, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পারো, আসল কাপড় কী ছিল। এরপর সেটা খুলে যাবে।”

    “কখন?” সিনা জিজ্ঞেস করল।

    “তোমরা যখন আর ঢাকার দরকার অনুভব করবে না।”

    সমাপ্ত।

    1
    3 Comments
    • Ashik Mokami, আপনার লেখাটা পড়তে পড়তে একদম হারিয়ে গিয়েছিলাম, কী অদ্ভুত সুন্দর আর গভীর একটা গল্প আপনি লিখেছেন! গল্পের প্রতিটি পরতে যে হাহাকার আর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ছিল, তা সত্যিই হৃদয়ে দাগ কাটার মতো। সব মিলিয়ে দারুণ এক উপকথা উপহার দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

    • আশিক মকামি, আপনার এই অসাধারণ লেখনীটি সত্যিই হৃদয়ে দাগ কাটার মতো এবং প্রতিটি চরিত্র ও তাদের জমানো অনুভূতির বর্ণনা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। ঘটনার আড়ালে থাকা সত্য আর মানুষে-মানুষে যে এক অদৃশ্য সূক্ষ্ম বন্ধন থাকে, তা ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা আপনার লেখায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

    • ভাগ করে নিলে গভীরতম দুঃখও হালকা হয়, আর ভালোবাসা হয়ে ওঠে একে অপরের আশ্রয়…..🤍🖤

Skip to toolbar