Profile Photo

Ashik MokamiOffline

  • ashikmokami
  • Profile picture of Ashik Mokami

    Ashik Mokami

    • 2 days, 19 hours ago

    উপকথা ৫ নভেম্বর
    ❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️❤️

    সিনা সিটি—(idea)
    maybe it will be a bigger novel.

    লোকে বলে সিনা সিটি নাকি একটা শহর। ভুল। সিনা সিটি আসলে একটা লাশ, যেটাকে কেউ কবর দেয়নি, কারণ জমির দাম বেশি।
    হাজার হাজার বছর আগে মহাকাশে “সিনারি” নামে এক জাতি ছিল, দেবীর জাত। তারা তারা সামলাত, গ্রহ ঘোরাত, আর মাঝেমধ্যে ছোটখাটো মহাবিশ্বের ঝামেলা মেটাত, অনেকটা আমাদের পাড়ার বড় আপার মতো, কেউ না বললেও সবাই জানত তারা না থাকলে সব ভেঙে পড়বে। সেই জাতের সবচেয়ে ছোট আর সবচেয়ে বেয়াড়া মেয়েটার নাম ছিল সিনা। একবার এক ক্ষুধার্ত কৃষ্ণগহ্বর পুরো গ্যালাক্সিটাকে গিলতে আসছিল। বড় দেবীরা কমিটি করল, মিটিং ডাকল, তিনবার ভোটাভুটি হলো। সিনা মিটিং ছেড়ে উঠে গিয়ে কৃষ্ণগহ্বরের মুখের সামনে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। বলল, “আগে আমাকে খা।” গহ্বর খেল, আর এত বড় এক দেবীর স্বাদ সামলাতে না পেরে হিক্কা তুলে মরে গেল। গ্যালাক্সি বাঁচল। সিনা বাঁচল না, শুধু তার শরীরটা ছিটকে এসে পড়ল পৃথিবী নামের এক নোংরা গ্রহের এক নোংরা দেশের মাটিতে, চিত হয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়ে।
    মানুষ এসে দেখল এক বিশাল মেয়ের দেহ, মরেও যেটা পচে না, গায়ে হাত দিলে হালকা গরম। প্রথম সপ্তাহ লোকে ফুল দিল। দ্বিতীয় সপ্তাহে এক ঠিকাদার বলল, “এত বড় জায়গা পড়ে আছে, শুধু শুধু কাঁদলে কী হবে?” তৃতীয় সপ্তাহে ভিত্তিপ্রস্তর বসল। তার মাথা, বুক, পেট, পায়ের ওপর দিয়ে রাস্তা, বাড়ি, মার্কেট উঠল। শিরায় বসল ড্রেন, চুলে লাগানো হলো গাছ, আর চোখ দুটোয় লাগানো হলো দুই বিশাল স্ক্রিন, যেগুলো এখনো বিজ্ঞাপন চালায়: “সিনা হাসছে, আপনিও হাসুন।” শহরের নাম রাখা হলো তার নামেই, এটাকে বলে সম্মান জানানো। ফলকে লেখা হলো “দেবী সিনার স্মৃতিতে”, আর ফলকের ঠিক পেছনেই একটা পাবলিক টয়লেট।
    সেই সিনার শিরা সাফ করে আশিক।
    আশিকের বাপও এই কাজ করত, তার বাপও। বংশানুক্রমে নর্দমা। আশিক ভাবত এটা অভিশাপ, পরে ভাবল এটা চাকরি, আর শেষে বুঝল দুটোর মধ্যে তফাত শুধু বেতনের। সিনা সিটি কর্পোরেশনে তার পদ “সিনিয়র জুনিয়র সহকারী নর্দমা পরিষ্কারক (চুক্তিভিত্তিক)”। বেতন সময়মতো কখনো না, সুবিধা গন্ধ। রোজ একই রুট। ভোর ছ’টায় ডান গোড়ালি, দুপুরে নাভি, বিকেলে হৃদয়, সন্ধ্যায় চোখ, তারপর আবার গোড়ালি। বছরের পর বছর এক ইঞ্চি এদিক-ওদিক নেই।
    প্রথম প্রথম সে শুধু বিড়বিড় করত, “ভোরে উঠেই ঝামেলা।” তারপর একদিন খেয়াল করল সে ঘরের ভেতরেও আট ফুট হেঁটে ঘুরে দাঁড়ায়, আবার আট ফুট হেঁটে ঘুরে দাঁড়ায়, বাঁশ ছাড়াই, কাজ ছাড়াই। কর্পোরেশনের ডাক্তার, যে নিজেও তিন মাস বেতন পায়নি বলে একটু ঘোরের মধ্যে থাকে, ওকে দেখে বলল, “এটা চিড়িয়াখানার রোগ রে। খাঁচার বাঘ যেমন একই লাইনে পায়চারি করতে করতে পাগল হয়ে যায়, তুইও তাই। শুধু তোর খাঁচাটা একটা মেয়ে।” আশিক হাসল। ওষুধের কথা কেউ বলেনি, শুধু রোগের নামটা দিয়েছে, আর এই শহরে নাম পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা।
    কিন্তু রোগ বাড়ল। একদিন গোড়ালির ম্যানহোলে নামতেই চারদিক ঝাপসা হয়ে এল, আর পাইপের অন্ধকার ফুঁড়ে সিনা জেগে উঠল। সত্যিকারের সিনা, যে এই শহরের নিচে ঘুমিয়ে আছে। কালো ঢেউ খেলানো চুল, চোখে তারার ধুলো, আর মুখে এমন একটা বিরক্তি, যেটা কেবল হাজার বছর অপেক্ষা করা কারও থাকে। সে আশিকের দিকে তাকিয়ে বলল, “আবার তুমি?” আশিক পাইপের গায়ে হাত রেখে বলল, “সরি, সরি, আজ তাড়াতাড়ি করব।” বাইরে থেকে দেখলে একটা লোক ড্রেনের দেয়ালে হাত বুলিয়ে কথা বলছে। ভেতরে, তার চোখে, সে একটা দেবীর গোড়ালি ধরে আছে, যে গোড়ালিতে হাজার বছরের ফোসকা।
    নাভিতে গিয়ে সে বাঁশ দিয়ে খোঁচা দেওয়ার আগে অনুমতি চাইল। সিনা ফিক করে হেসে ফেলল, কারণ সুড়সুড়ি লাগে। তিনটা বিয়ের আংটি টেনে তুলতেই সে শিউরে উঠল, আর আশিক পাইপের দেয়ালে যে কাঁপুনি টের পেল, সেটা আসলে পাশের রাস্তা দিয়ে যাওয়া ট্রাকের। কিন্তু সে জানত ওটা সিনার, কারণ ট্রাক তার সাথে এত যত্ন করে কথা বলে না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে সিনা তাকে গল্প বলত। কৃষ্ণগহ্বরের গল্প, মিটিং ছেড়ে ওঠার গল্প, আর সেই মুহূর্তের গল্প, যখন সে বুঝেছিল সে আর ফিরবে না আর তখন তার প্রথম ভয় ছিল, “আমার ঘরের চাবিটা কে নেবে?” আশিক হাসত, আবার চোখ মুছত, আবার হাসত, আর হাতের ময়লা শার্টে মুছে নিত। এই প্রথম কেউ তার কাজটাকে কাজ বলে ডাকেনি, বলেছিল সেবা।
    হৃদয়ে পৌঁছে সে একদিন পাম্প হাউসের দেয়ালে কান পেতে ধুকপুক শুনল, আর বুঝল ওটা শুধু মেশিনের শব্দ নয়। ভেতরে জ্যাম হয়ে আছে হাজারখানা ভেজা ফোলা প্রতিশ্রুতি, কাগজে ছাপা: “আমি তোমাকে কখনো ছেড়ে যাব না,” “এই মাসেই শোধ করব,” “ড্রেন নিয়ে কাজ চলছে।” সবার ওপরে মেয়রের নির্বাচনী ইশতেহার, এত ঘন যে বের করতে দুইজন লাগল। সিনা বলল, “এগুলো ওরা আমার ভেতরে ফেলেছে, আমি হজম করতে পারিনি, দেবীরাও মিথ্যা হজম করতে পারে না।” আশিক ফিসফিস করে বলল, “ব্যথা পেলে বলো।” সিনা বলল না, কারণ সিনা বলে না। সিনার চোখের স্ক্রিনে তখন লেখা: “সিনা কখনো কাঁদে না।” আর সন্ধ্যায় চোখের ড্রেনে গিয়ে সে দেখল জল ঝরছে ঝরঝর করে, অনেকক্ষণ ধরে। সে দুই হাতে পাইপের মুখটা ধরল, ঠিক যেভাবে কারও গাল ধরে, আর বলল, “আমি আছি তো। আমি তো রোজ আসি।”
    নিচের রাস্তা থেকে লোকজন দেখল একটা লোক ম্যানহোলের মুখে বসে পাইপকে আদর করছে। একজন ভিডিও করে ফেসবুকে ছাড়ল, ক্যাপশন “নর্দমা কর্মীর ভালোবাসার গল্প, কতটা আবেগপ্রবণ জাতি আমরা।” তিন লাখ লাইক পড়ল। কর্পোরেশন আশিককে “জাতীয় ভালোবাসার দূত” ঘোষণা করে সার্টিফিকেট দিল, বেতন দিল না, কারণ ভালোবাসা তো আর বেতনের জিনিস না। কিন্তু ভিডিওর কমেন্টে একটা লোক লিখেছিল, “আমার দাদা বলত এই শহরের নিচে কিছু একটা জীবিত আছে।” ওই কমেন্টটা কেউ পড়েনি, কারণ তার নিচে একটা ফ্রিজের বিজ্ঞাপন ছিল।
    তারপর এল সেই দিন, যেদিন আশিক জানতে পারল আসল ঘটনা। হৃদয়ের পাম্পের পেছনের দেয়ালে সে একটা নতুন নোটিশ দেখল: “সিনা মেগা মল: নির্মাণ শুরু আগামী মাসে। হৃদয়ের পাম্প স্টেশন কংক্রিট দিয়ে ভরাট করা হবে।” তলায় মেয়রের সই। সিনা ধীরে বলল, “ওরা আমার হৃদয়ে ফুডকোর্ট বানাবে।” আশিক জীবনে প্রথমবার রেগে গেল। চিৎকার করে ম্যানহোল থেকে উঠে ছুটল কর্পোরেশনের অফিসে, আর অফিসের বড়বাবু তাকে শান্ত গলায় বলল, “তুই অসুস্থ, ডাক্তার সার্টিফিকেট দিয়েছে। এই নে তিন মাসের ছুটি।” ছুটি, বেতনহীন। রোগটা তাকে বাঁচাল না, বরং ওকে ঘরে আটকে রাখার প্রমাণ হলো। কেউ তার কথা বিশ্বাস করল না, কারণ যে লোক পাইপের সাথে কথা বলে, তার কথায় প্রমাণ লাগে না, শুধু চিকিৎসা লাগে।
    তিন দিন সে ঘরে বসে রইল। জানালা দিয়ে সিনার চোখের স্ক্রিন দেখল, ঘরের ভেতর আট ফুট হাঁটল, ঘুরল, আবার হাঁটল। ডাক্তারের ভাষায় “রুট ভাঙার” চেষ্টা। কিন্তু চতুর্থ দিন ভোর ছ’টায় অ্যালার্ম ছাড়াই সে উঠে পড়ল। দরজা খুলে সোজা গেল ডান গোড়ালির ম্যানহোলে। ঢাকনা তুলল, নামল, আর নিচ থেকে ভেজা গলায় বলল, “সরি, দেরি হয়ে গেল, মিস করেছিলে?”
    সেদিন সে আর বাঁশ নিয়ে যায়নি। নিয়ে গেছিল ডাক্তারের দেওয়া ছুটির কাগজটা, আর বাথরুম থেকে চুরি করা এক বস্তা সিমেন্ট, উল্টো দিকে। সে ঠিক করেছিল হৃদয়ের পাম্পটা কংক্রিট ঢালার আগেই নিজে সাফ করে এমন চালু করে দেবে যে ওরা বন্ধ করতে পারবে না। গোড়ালি, নাভি, সব পেরিয়ে সে পৌঁছাল হৃদয়ে, আর শেষ ইশতেহারটা টেনে বের করতেই পাম্প ধড়ফড় করে জেগে উঠল। পুরো শহরে একসাথে আলো জ্বলে উঠল। সিনা তার দিকে তাকাল, হাজার বছর পর প্রথম হাসি, আর বলল, “আশিক, এবার আমি যাচ্ছি।”
    আশিক বলল, “কোথায়?”
    সিনা বলল, “যেখানে ছিলাম। মিটিংটা এখনো শেষ হয়নি।”
    আর ঠিক তখনই সিনার চোখের দুই স্ক্রিন বিজ্ঞাপন চালানো থামিয়ে দিল, আর বিশ সেকেন্ড একদম কালো হয়ে থাকল। পুরো শহর ভাবল লোডশেডিং। মোবাইলে লোকে লিখল “আবার কারেন্ট গেল!” দোকানদাররা জেনারেটর চালাল। মেয়র প্রেসমিটিং ডেকে বলল, “ড্রেনের উন্নয়নকাজের ফল, জনগণ ধৈর্য ধরুন।” আর সিনার নিচে, শিরার ভেতর, কেউ জানল না একটা লোক হাঁটু গেড়ে বসে আছে, দুই হাতে সিমেন্টের বস্তা ধরে, কাঁদছে আর হাসছে একসাথে।
    পরদিন সকালে কর্পোরেশনের নোটিশ বোর্ডে ঝুলল:
    “সিনার শিরা আজ সম্পূর্ণ পরিষ্কার। ধন্যবাদ সকল কর্মীকে।”
    আর নিচে ছোট করে:
    “কর্মী আশিক অননুমোদিত ছুটি ভেঙে কাজে যোগ দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের মামলা। ডাক্তারি রিপোর্ট: রোগী এখনো আট ফুট হাঁটছে। সুস্থ হয়নি।”
    আর সিনা সত্যিই গিয়েছিল কিনা, নাকি পুরোটাই আশিকের রোগ, সেটা শহরের কেউ জানে না। শুধু জানে, সেদিনের পর থেকে ডান গোড়ালির ম্যানহোলের ঢাকনাটা রোজ ভোরে একটু গরম থাকে।

    1
    3 Comments
    • শহরের লোভে চাপা পড়া এক দেবীর হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে অবহেলিত শ্রমিকের নীরব মমতা, অথচ তার প্রাপ্য থাকে শাস্তির নোটিশ…..🤍🖤

    • Ashik Mokami, আপনার লেখা এই ‘সিনা সিটি’-র গল্পটা পড়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল, বিশেষ করে “সিনার শিরা সাফ করে আশিক” – লাইনটা পড়ে মনে হলো বাস্তব আর রূপকথার কী অদ্ভুত এক মেলবন্ধন তৈরি করেছেন আপনি!

    • সিনা ও আশিকের এই সম্পর্কের বুনন অত্যন্ত চমৎকার এবং প্রতিটি শব্দ যেন এক গভীর আবেগের চিত্র এঁকেছে। বিশেষ করে আপনার এই বাক্যটি হৃদয়ে দাগ কেটে যায়— “আশিকের চোখে, সে একটা দেবীর গোড়ালি ধরে আছে, যে গোড়ালিতে হাজার বছরের ফোসকা।” এমন রূপকনির্ভর এবং মানবিকতার গল্প আপনি আরও লিখতে থাকুন, কারণ আপনার লেখনশৈলীতে এক অনন্য সংবেদনশীলতা ফুটে উঠেছে। আপনার সৃজনশীল যাত্রায় অনেক শুভকামনা রইল!

Skip to toolbar