-
ঘড়িওয়াল বুড়োটা প্রতিদিনের মতো আজও তার চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে একটা প্রাচীন ম্যান্ডেল ক্লক ঠিক করায় মন দিয়েছেন। দোকানে থরে থরে সাজানো শত শত ঘড়ি কোনোটা চলছে টিকটিক শব্দে, কোনোটার কাঁটা কবেই থেমে গেছে। পথচলতি মানুষ বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখে আর ভাবে, বুড়োটা বুঝি কেবল লোহা-লক্কর আর মেকানিক্যাল যন্ত্রের হিসাব মেলাচ্ছে।
কিন্তু দোকানের ভেতরের নিস্তব্ধতা অন্য কথা বলে। ঘড়ির নিখুঁত টিকটিক শব্দের আড়ালে বুড়ো আসলে নিজের জীবনের হিসাব মেলাচ্ছিলেন।
সারাজীবন তিনি এই শরীররূপী খাঁচাটাকে কত যত্নেই না আগলে রাখলেন! ঘড়ির মেকানিজমের মতো যত্ন করে তেল দিয়েছেন, ধুলোবালি জমতে দেননি। কিন্তু আজ এই পড়ন্ত বেলায় এসে তার মনে হচ্ছে, এই যে কাঠামো বা খাঁচা – এর আসল সৌন্দর্য তো এর বাহ্যিক রূপের মাঝে নয়। আসল রহস্য লুকিয়ে আছে এর ভেতরে থাকা অদৃশ্য চালকটার মাঝে। যাকে সাধকেরা বলেন “অচিন পাখি”।
সে কখন যেন বিনা নোটিশে এই খাঁচায় এসে বাসা বেঁধেছিল। সারাজীবন তার কলকাকলিতে মুখরিত ছিল এই সংসার, এই চেনা পৃথিবী। অথচ আজ সম্পর্কের ভিড়ে, মানুষের কোলাহলেও মানুষ বড্ড একা! ঠিক খাঁচাবন্দি একটি পাখির মতো, যে হয়তো চারপাশের খাঁচার ভাষা খুব ভালো বোঝে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার সমস্ত টান কেবল ওই অন্তহীন আকাশের দিকে।
যে কোনো মুহূর্তে, কারো ইশারায় সেই অচিন পাখিটা দরজা খুলে উড়ে যাবে। তখন এই সাজানো খাঁচাটা নিছকই পড়ে থাকবে একখণ্ড জড়পদার্থ হয়ে।
আজ ফকির লালন সাঁইয়ের প্রয়াণ দিনে এই ভাবনাটাই বারবার মনে দোলা দেয়। পার্থিব অর্জন, অহংকার, কিংবা খাঁচা নিয়ে আমাদের যত অহমিকা সবই আসলে সাময়িক। আসল সাধনা তো এই নশ্বর খাঁচায় বসে সেই অচিন পাখির সুর চেনার এবং নিজের আত্মার সাথে তার সংযোগ ঘটানোর।
যত দিন এই মন নামক খাঁচায় অচিন পাখিটার বাস, তত দিনই এ জীবনের সার্থকতা। পাখি উড়ে গেলে বাকি থাকে কেবল শূন্যতা আর ইতিহাস।আজ বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবসে, তাঁর প্রতি আমাদের অন্তহীন শ্রদ্ধা। জাত-পাত, গোঁড়ামি আর সব কৃত্রিম বিভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে তিনি মানুষকে চেনার যে চিরন্তন মন্ত্র দিয়ে গেছেন, তা আজও আমাদের বিভ্রান্ত সময়ে একমাত্র আলোর দিশারী। সাঁইজির স্মৃতির প্রতি গভীর প্রণতি।
আবু তাহের রিপন
সতেরো অক্টোবর ছাব্বিশ।6 Comments-
-
আপনার লেখাটির প্রতিটি ছত্রে ঘড়িওয়ালার ব্যস্ততা আর অচিন পাখির আকুতি যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। লালন সাঁইজির দর্শনের সাথে মানবজীবনের এই নশ্বরতার মেলবন্ধন আমাকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে, যা যেন এক পরম প্রশান্তির আবেশ তৈরি করে। এমন গভীর উপলব্ধিতে ভরা লেখা উপহার দেওয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ, আপনি একইভাবে মনের আয়নায় জমে থাকা অনুভূতিগুলো নিয়মিত লিখে যান।
-
-
Friends
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
MD.Mazharul Islam Ripon
@md-mazharulislamripon
Salful Alam
@alamict9
1 Sen
@1sen
Shruti Radhe
@shrutiradhe
Shruti
@shruti
শায়লা এ্যামিন
@shaylaaemin945gmail-com
নাজমুর রহমান
@nazmur
Farhan Sadik
@farhansadik


খাঁচা একদিন পড়ে থাকবে, পাখি উড়ে যাবে—তবু মানুষকে ভালোবাসার যে শিক্ষা লালন সাঁই দিয়ে গেছেন, তা কখনো ফুরোবার নয়। সাঁইজির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও প্রণতি।