Profile Photo

Ashik MokamiOffline

  • ashikmokami
  • Profile picture of Ashik Mokami

    Ashik Mokami

    • 19 hours, 26 minutes ago

    উপকথা November: ৩

    মহাভোজের আগে

    (প্রিকুয়েল: ভিনগ্রহীদের আসর)

    ভূতেদের মহাভোজের ঠিক এক বছর আগের কথা। তখনো আশিক আর সিনা বেঁচে ছিল, আর পার্টি দেওয়ার শখটাও ছিল। সমস্যা ছিল একটাই: কেউ আসত না।

    গত ঈদে ওরা ত্রিশজনকে দাওয়াত দিয়েছিল। এসেছিল দুজন। একজন ভুল বাড়িতে, আরেকজন শুধু জানতে এসেছিল বিদ্যুৎ বিল কত এল। সিনা সেদিন ছাদে বসে ডিশ অ্যান্টেনার দিকে তাকিয়ে বলল, “পৃথিবীর মানুষ যদি না আসে, অন্য কোথাও থেকে আসুক।”

    আশিক হাসতে হাসতে বলল, “তাহলে পুরো মহাবিশ্বকে দাওয়াত দিয়ে দে।”

    সিনা সত্যিই দিয়ে দিল। ফুফাতো ভাইয়ের পুরনো সিগন্যাল বুস্টার ডিশের সঙ্গে জুড়ে, একটা মেসেজ টাইপ করে, “Send” চেপে দিল। দুজনেই ভেবেছিল মজা। কেউ জবাব দেবে, এটা ভাবেইনি।

    “মহাবিশ্বের সব প্রাণীকে দাওয়াত! এক দিন, এক উঠান, ফ্রি ইলিশ। ড্রেস কোড: যে চামড়া, খোলস, গ্যাস বা জেলি নিয়ে জন্মেছেন, সেটাই। অস্ত্র আনবেন না। (আনলেও গেটে জমা রাখতে হবে, সেখানে ভুলু আছে।) — আশিক ও সিনা, পৃথিবী, তৃতীয় গ্রহ, বাঁ দিকের গলির শেষ বাড়ি।”

    ভুলু হলো ওদের কুকুর। এক মাস আগে বৃষ্টির রাতে এসে বারান্দায় বসে ছিল, আর যায়নি। দেশি, বাদামি, এক কান খাড়া আর এক কান ঝুলে থাকা। ওর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল: রাত হলেই ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ে, যেন কারও সঙ্গে কথা বলছে। সিনা বলত, “ও চাঁদ দেখে।” আশিক বলত, “না, ও মনে হয় কারও সঙ্গে ফোনে আছে।”

    মেসেজ পাঠানোর তিন দিন পর, ভোর পাঁচটায়, আকাশ ছিঁড়ে গেল।

    অতিথিরা

    উঠানের ঠিক মাঝখানে নামল একটা বিশাল চকচকে জিনিস, দেখতে অনেকটা উল্টো করে রাখা স্টিলের বাটির মতো। আশিক আর সিনা বারান্দা থেকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। ভুলু লেজ নাড়তে নাড়তে সবার আগে গেটে গিয়ে দাঁড়াল, যেন সে অনেকদিন ধরে এই মুহূর্তের অপেক্ষায়।

    আর তারপর একে একে নামল ওরা।

    জর্বাক্স-৯, অ্যান্ড্রোমিডা থেকে। বিশাল স্বচ্ছ জেলিফিশের মতো, বাতাসে ভেসে চলে, প্রতিটা শুঁড়ে একটা করে স্ট্যাম্প। সে এসেই বলল, “ফর্ম ৪৪ক জমা দিয়েছেন? আন্তঃগ্যালাকটিক উঠান ব্যবহারের অনুমতিপত্র কই?” আশিক বলল, “আমরা তো শুধু দাওয়াত দিয়েছি।” জর্বাক্স-৯ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “ঠিক আছে, আমি নিজেই এখন অনুমতি দিলাম, তারপর নিজেই সেটা অনুমোদন করলাম।” আসলে জর্বাক্স-৯ ভিতরে ভিতরে একজন নিঃসঙ্গ, যার পুরো জীবন কেটেছে ফর্ম পূরণ করে। জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে দাওয়াত দিয়েছে, তাই ফর্ম ছাড়া কিছু বলতে গেলে গলা কাঁপে।

    গ্র্যান্ডমাস্টার প্লুগ, সবচেয়ে প্রাচীন প্রাণী। একটা বিশাল বেগুনি তালের মতো ঢিবি, মুখ নেই, কথা বলে সরাসরি মাথার ভেতরে। সমস্যা হলো, সে শুধু প্রবাদ বলে, আর সবগুলোই ভুল। “যে গাছে চড়ে সে-ই ডিম পাড়ে।” “ডুবন্ত মানুষ ছাতা ধরলে শীতে মরে না।” সবাই বিভ্রান্ত, কিন্তু কেউ মুখে বলে না, কারণ উনি অসম্ভব বয়স্ক, আর সবাই ধরে নিয়েছে এর মধ্যে কোনো গভীর জ্ঞান লুকিয়ে আছে। আসলে প্লুগ নিজেও জানে না সে কী বলছে। তার অনুবাদক যন্ত্রটা তিন হাজার বছর আগে নষ্ট হয়ে গেছে।

    ক্যাপ্টেন ক্রিল, সরীসৃপ যোদ্ধা, গায়ে সবুজ বর্ম, কোমরে তিনটা অস্ত্র। সে এসেছিল পৃথিবী দখল করতে। কিন্তু পথে মেসেজটা পেয়ে ভাবল, “ফ্রি ইলিশ? আগে খেয়ে নিই, তারপর দখল।” বুক ফুলিয়ে ঘোষণা করল, “আমি ক্রিল! ছয়টা গ্রহ ধ্বংস করেছি!” সিনা বলল, “আপনি কি চা খাবেন?” ক্রিল বলল, “…একটু চিনি দেবেন?” আসলে ক্রিলের ছয়টা গ্রহের মধ্যে পাঁচটা ছিল খালি পাথর, আর একটা ছিল তার ভাড়া বাকি পড়া ফ্ল্যাট। সে ওইটাই ধ্বংস করেছে।

    লুলু, বাতাসের মতো গ্যাসের মেঘ, গোলাপি আভা, হালকা সুবাস। ভীষণ রোমান্টিক, আর প্রতিটা জিনিসের প্রেমে পড়ে। উঠানে ঢুকেই বারান্দার সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল, “কী সুন্দর পাখা!” তারপর সারাদিন ফ্যানের চারপাশে ঘুরে ঘুরে প্রেমের গান গাইল। ফ্যান ঘুরেই চলল, কোনো জবাব দিল না। সিনা পরে বলল, “ওর অন্তত একটা সম্পর্ক টিকে ছিল, মানে কেউ ছেড়ে যায়নি।”

    কিউব, একটা নিখুঁত কালো ঘনক, কোনো মুখ, কোনো হাত নেই। কথা বলে না, শুধু প্রতিটা জিনিসের সামনে দাঁড়িয়ে গায়ে এক থেকে পাঁচ তারা জ্বালিয়ে রেটিং দেয়। বাড়ির দরজা পেল দুই তারা। আশিকের শার্ট পেল এক তারা। ভুলু পেল পাঁচ তারা, আর কিউব মুহূর্তের জন্য একটু কেঁপে উঠল, যেন কেউ খেয়াল করলে লজ্জা পাবে। সবাই ধরে নিল ওটা শুধু আলোর কারসাজি।

    ডা. স্কুইশ, মহাকাশের সবচেয়ে বিখ্যাত চিকিৎসক, দেখতে বিশাল ভায়োলেট রঙের স্কুইড। আটটা হাত, প্রত্যেকটায় আলাদা যন্ত্র। যার সঙ্গেই দেখা হয়, তার পেট টিপে বলে, “ইন্টারেস্টিং।” আশিকের পেট টিপে বলল, “ইন্টারেস্টিং।” সিনার পেট টিপে বলল, “আরও ইন্টারেস্টিং।” ভুলুর পেট টিপে হঠাৎ চুপ হয়ে গেল। সবাই জিজ্ঞেস করল, “কী হলো?” স্কুইশ ফিসফিস করে বলল, “কিছু না। কুকুরটা… সুস্থ। খুবই সুস্থ।” ভুলু লেজ নাড়ল, যেন কিছু লুকাচ্ছে।

    সম্রাজ্ঞী ভাজ, পোকামাকড়ের মতো মহাজাগতিক মৌচাকের রানি, সঙ্গে এক হাজার ড্রোন। ভাজ কথা বলে “আমরা” দিয়ে, আর সব ড্রোন একসঙ্গে উত্তর দেয়। “আমরা খুশি।” “আমরা খুশি।” “আমরা খুশি।” কিন্তু তাদের মধ্যে ৪১২ নম্বর ড্রোন সবার চোখ এড়িয়ে লাইন থেকে সরে এসে আশিকের কানে ফিসফিস করে বলল, “আমার নাম রহিম। আমি একা কিছু করতে চাই। আমি চা খেতে চাই।” আশিক সঙ্গে সঙ্গে একটা কাপ এনে দিল। রহিম জীবনে প্রথম একা একটা চুমুক দিল, আর তার চোখে জল চলে এল।

    ফুচকা, মাত্র তিন সেন্টিমিটার লম্বা একটা বাচ্চা এলিয়েন, কমলা রঙের, চার চোখ। সঙ্গে কেউ নেই, কীভাবে এল কেউ জানে না। এসেই ভুলুর মাথায় উঠে বসে পড়ল, আর ভুলু এমন ভঙ্গিতে তাকে বয়ে বেড়াল যেন এটাই ওর সারা জীবনের চাকরি। ফুচকার প্রিয় প্রশ্ন: “পৃথিবীর মানুষ কেন একে অন্যকে এড়িয়ে চলে?” কেউ উত্তর দিতে পারল না।

    আর সবার শেষে, যখন আশিক-সিনা ভাবল সবাই এসে গেছে, উঠানের এক কোনায় বাতাস কুঁচকে গেল, আর একজন হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল।

    টিক-টক। লম্বা, রোগা, গায়ে বিশাল রেইনকোট, চোখে ঘড়ির মতো কাচের গগলস। সে এসেছে ভবিষ্যৎ থেকে। হাঁপাচ্ছে, ঘামছে, আর আশিক-সিনাকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, “তোমরা বেঁচে আছ! এখনো বেঁচে আছ! ঠিক আছে, ঠিক আছে, এখনো সময় আছে!” দুজন একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “কীসের সময়?” টিক-টক ঢোক গিলে বলল, “শোনো, তোমাদের ইলিশ… মানে… ইলিশ… ইলিশের কাঁটা…” ঠিক তখন ক্যাপ্টেন ক্রিল চেঁচিয়ে উঠল, “ইলিশ কই?!” আর টিক-টকের বাকি কথা সবার চিৎকারে চাপা পড়ে গেল।

    খাবারের তালিকা

    তিন গ্রহ-প্রজাতির খাবার একসঙ্গে রান্না করা যে কত বড় ঝামেলা, সেটা আশিক-সিনা বুঝল সবাই বসে যাওয়ার পর।

    ইলিশ ভাপা ছিল মূল পদ। ক্যাপ্টেন ক্রিল এক টুকরো মুখে দিয়েই চোখ বন্ধ করে ফেলল। “এটা কী জিনিস? এর জন্য আমি ছয়টা গ্রহ ধ্বংস করতে রাজি!” সিনা বলল, “দয়া করে করবেন না।” ক্রিল বলল, “তাহলে আরেক টুকরো দিন।”

    বিরিয়ানি দেখে কিউব প্রথমবার নড়ে উঠল। নিঃশব্দে পাঁচটা তারা জ্বলল। তারপর আবার পাঁচটা। তারপর নিজের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট “পিং” শব্দ করল, যেটা সবাই বুঝল ওর হাসি।

    আগরবাতির ধোঁয়া ছিল লুলুর জন্য। লুলু ধোঁয়া টেনে নিয়ে গোলাপি থেকে আরও গোলাপি হয়ে গেল। “এটা কি প্রেম?” আশিক বলল, “না, আগরবাতি।” লুলু বলল, “তবু প্রেম।”

    পুরনো বিদ্যুৎ বিল দেওয়া হলো গ্র্যান্ডমাস্টার প্লুগকে, কারণ শুধু কাগজ আর অঙ্ক খেয়েই সে বেঁচে থাকে। প্লুগ গম্ভীর হয়ে বলল, “যে বিল দেয়, সে-ই রাজা।” সবাই মাথা নাড়ল। কেউ বুঝল না, তবে কথাটা গভীর শোনাল।

    ফার্স্ট এইড বক্স ডা. স্কুইশের পছন্দ। সে ব্যান্ডেজ, তুলা আর স্যাভলন সব খেয়ে ফেলে বলল, “ইন্টারেস্টিং। এবার একটু হাত কেটে দেখতে হবে।” সিনা তাড়াতাড়ি ছুরি সরিয়ে নিল।

    রসগোল্লা ছিল সম্রাজ্ঞী ভাজ আর তাঁর এক হাজার ড্রোনের জন্য। এক হাজার ড্রোন মানে এক হাজার রসগোল্লা। আশিক হিসাব করে দেখল, মাসের বাজেটের অর্ধেক শেষ। ভাজ বললেন, “আমরা সন্তুষ্ট।” বাকি নয়শো নিরানব্বই ড্রোন বলল, “আমরা সন্তুষ্ট।” একজন, রহিম, বলল, “আমি একটু বেশি সন্তুষ্ট।”

    ফুচকা পেয়ে ক্যাপ্টেন ক্রিল দ্বিতীয়বার চুপ করে গেল। প্রথম কামড় দিতেই টকঝাল জল চোখে লাগল। ক্রিল চেঁচিয়ে উঠল, “শত্রু! আমার চোখে আক্রমণ!” সিনা বলল, “এটা ঝাল।” ক্রিল ফুঁপিয়ে বলল, “আমার জাতি ঝাল চেনে না। আমরা শুধু রাগ চিনি।” তারপর আরও এগারোটা ফুচকা খেল।

    গোলমাল

    দুপুরের মধ্যে উঠানে যা হলো, সেটাকে পার্টি না বলে আন্তর্জাতিক সংকট বলাই ঠিক।

    জর্বাক্স-৯ ইলিশের জন্য ফর্ম ভরতে বসল। সবার প্লেটে একটা করে স্ট্যাম্প মেরে দিল, যাতে আর কেউ না বলতে পারে এটা অননুমোদিত। ফর্ম ভরতে ভরতে বলল, “আমার জীবনে আজই প্রথম অনুমতি ছাড়া মজা করছি। কেউ কি এটার জন্য ফর্ম বানাবে?”

    প্লুগ ক্রিলকে বলল, “যে হাতি কিনে, সে ঘোড়ার ডিম ফোটায়।” ক্রিল ধরে নিল এটা যুদ্ধ ঘোষণা। অস্ত্র বের করে ফেলল। ভুলু ঘেউ করে উঠতেই ক্রিল হাত গুটিয়ে নিল, ধীরে ধীরে অস্ত্রগুলো গেটের কাছে জমা দিয়ে এল।

    লুলু সিলিং ফ্যানকে একটা প্রেমপত্র লিখল, গ্যাসে। অক্ষরগুলো ফ্যানের বাতাসে এলোমেলো হয়ে সবার মুখে ভেসে গেল। ডা. স্কুইশ বলল, “সংক্রামক রোমান্স। ইন্টারেস্টিং।”

    আর সারাক্ষণ টিক-টক চেষ্টা করছিল সতর্ক করতে। প্রথমবার সে আশিকের হাত ধরে বলতে গেল, “শোনো, ইলিশের কাঁটা…” ঠিক তখন ক্রিল চেঁচাল, “আরেক টুকরো!” টিক-টকের কথা চাপা পড়ে গেল। দ্বিতীয়বার সিনার কাছে গিয়ে বলতে গেল, লুলু তখন গান ধরল। তৃতীয়বার প্লুগকে ধরল, কারণ প্লুগ সবার ভাষা বোঝে। বলল, “ওদের বলো, মাছে কাঁটা আছে!” প্লুগ গম্ভীর গলায় উঠে সবাইকে বলল, “মাছে বাঁচে যে, কাঁটায় মরে সে-ই!” সবাই হাততালি দিল, ভাবল দারুণ প্রবাদ। টিক-টক মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

    ফুচকা ততক্ষণে ভুলুর পিঠে চড়ে উঠানময় দৌড়াচ্ছে, আর যাকে দেখছে তাকে জিজ্ঞেস করছে, “তুমি কেন মানুষকে এড়িয়ে চলো?” স্কুইশ শুধু বলল, “ইন্টারেস্টিং।” রহিম বলল, “আমি নিজেই এড়িয়ে চলতাম। এখন আর চলি না।”

    সন্ধ্যা

    সন্ধ্যায় সবাই উঠানে গোল হয়ে বসল। আকাশে প্রথম তারা উঠছে। আশিক বলল, “আমরা তো শুধু একটা পার্টি দিতে চেয়েছিলাম। এত মানুষ, মানে এত… মানে… আসবে ভাবিনি।”

    ঠিক তখন টিক-টক দাঁড়িয়ে গেল। চোখের কাঁচ খুলে সোজা তাকাল ওদের দিকে।

    “আমি আর পারছি না। শোনো সবাই। এক বছর পর, ঠিক এই উঠানে, আশিক আর সিনা ইলিশের শেষ টুকরো নিয়ে ঝগড়া করবে। দুজন একসঙ্গে মুখে পুরবে। দুজনের গলায় কাঁটা আটকাবে। আর দুজনেই মারা যাবে।”

    উঠানে নীরবতা নামল। এত নীরব যে ভুলুর লেজ নাড়ার শব্দও শোনা গেল।

    জর্বাক্স-৯ সবার আগে মুখ খুলল। “এটা কি অনুমোদিত?” সবাই ওর দিকে তাকাল। সে লজ্জা পেয়ে বলল, “সরি, অভ্যাস।”

    আশিক সিনার দিকে তাকাল। সিনা আশিকের দিকে। আশিক বলল, “তাহলে কি ইলিশ ছেড়ে দেব?” সিনা বলল, “ইলিশ ছাড়া জীবন?” আশিক বলল, “ঠিক। ইলিশ ছাড়া জীবন মানে মৃত্যুর চেয়েও খারাপ।” সিনা বলল, “তাহলে যা হওয়ার, হবে।” দুজনে একসঙ্গে ইলিশের প্লেটের দিকে হাত বাড়াল। টিক-টক মাটিতে বসে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। কিউব নীরবে নিজের গায়ে লিখে দেখাল: “মৃত্যু। ৫ তারা। হাসিমুখে মরলে।” রহিম ওর কাঁধে হাত রাখল। ডা. স্কুইশ শেষবারের মতো ওদের দুজনকে পরীক্ষা করে বলল, “শরীর সুস্থ। এখন পর্যন্ত। ইন্টারেস্টিং।”

    ভুলুর রহস্য

    ঠিক তখন ক্যাপ্টেন ক্রিল হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়াল, অস্ত্র জমা দেওয়া গেটের দিকে একবার তাকাল, তারপর ভুলুর সামনে এসে সামরিক কায়দায় স্যালুট করল।

    “অপারেটর ভুলু-৭। মিশন রিপোর্ট প্রস্তুত?”

    আশিক আর সিনা হা করে তাকিয়ে রইল। ভুলু কান নাড়ল। তারপর, খুব ধীরে, লেজ নাড়তে নাড়তে, নিজের চোখ খুলল। দুই চোখে এক মুহূর্তের জন্য নীল আলো জ্বলে উঠল।

    প্লুগ এবার প্রথমবার সোজা কথা বলল, কারণ ভুলুর সামনে সবাই সত্যি কথা বলে। “ভুলু আমাদের পর্যবেক্ষক। ছদ্মবেশে এক মাস ধরে তোমাদের নিয়ে রিপোর্ট লিখছে। গ্যালাক্টিক কাউন্সিল জানতে চেয়েছিল, পৃথিবীর মানুষ কেমন। ভুলু রিপোর্টে লিখেছে মাত্র তিনটা শব্দ।”

    সিনা ফিসফিস করে বলল, “কী?”

    জর্বাক্স-৯ ফর্ম বের করে পড়ল। “‘দুজন। পাগল। ভালো।'”

    ভুলু ঘেউ করে উঠল, যেন বলছে, আর কিছু বলার দরকার ছিল না।

    আশিক চোখ মুছে বলল, “তাহলে কুকুরটা আসলে…” ভুলু তখন সিনার কোলে উঠে মাথা ঘষছে, একদম সাধারণ কুকুরের মতো। ডা. স্কুইশ বলল, “ভুলুর চোখ একটু বিশেষ। দুনিয়ার পর্দার দুই পাশই দেখতে পায়। যারা আছে, আর যারা আর নেই।”

    আশিক সঙ্গে সঙ্গে সিনার দিকে তাকাল। সিনা আশিকের দিকে। দুজনের মুখে এক অদ্ভুত হাসি।

    “যারা আর নেই?” আশিক বলল। “মানে ভূত?”

    ভুলু কান খাড়া করল।

    বিদায়

    ভোরের আগে সবাই বিদায় নিল।

    জর্বাক্স-৯ আশিকের হাতে একটা স্ট্যাম্প রেখে গেল। “এটা যেকোনো জায়গায় মারলে সব অনুমোদিত। শুধু মৃত্যু ছাড়া। ওটা আমার এখতিয়ারের বাইরে।” গ্র্যান্ডমাস্টার প্লুগ বলল, “যে সূর্য ডোবে, সে ভোরে ওঠে।” এবার প্রবাদটা কাকতালীয়ভাবে ঠিক শোনাল। লুলু ফ্যানকে শেষবারের মতো চুমু খেয়ে ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গেল। কিউব যাওয়ার সময় সিনার ডায়েরিতে সবচেয়ে বড় তারাটা এঁকে দিয়ে গেল। ডা. স্কুইশ সবার নাড়ি দেখে বলল, “ইন্টারেস্টিং,” আর এবার একটু বিষণ্ণ গলায়। ক্রিল ফুচকার দোকানের ঠিকানা চেয়ে নিল। রানি ভাজ চলে গেলেন, আর ড্রোনগুলোর মধ্যে একজন, নম্বর ৪১২, সোজা লাইনে না গিয়ে একবার পেছন ফিরে হাত নাড়ল। ফুচকা ভুলুর কানে কানে কী যেন বলে ছোট্ট হাতে ওর নাক ছুঁয়ে দিল।

    আর টিক-টক সবার শেষে গেল। যাওয়ার আগে একবার আশিক আর সিনার সামনে দাঁড়াল। কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। শেষে শুধু বলল, “আমি আবার আসব। তখন হয়তো তোমরা আর এখানে থাকবে না।”

    সে মিলিয়ে গেল।

    উঠানে রইল শুধু আশিক, সিনা আর ভুলু। আকাশ ফিকে হয়ে আসছে। সিনা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আশিক, জীবিতরা তো আমাদের পার্টিতে আসে না। এরা এল, কারণ এরা অন্য রকম।”

    আশিক বলল, “এক বছর পর আমরা… মানে আমরা তো…”

    সিনা হেসে বলল, “হ্যাঁ। তখন আমরাও ওদের দলে।”

    আশিক আস্তে আস্তে হাসল। “তাহলে আগেই দাওয়াত দিয়ে রাখি।”

    ভুলু ঘেউ করল। সম্মতি।

    সিনা ছাদের ডিশের দিকে তাকিয়ে বলল, “এবার আর আকাশে না। অন্য দিকে পাঠাব। যেদিকে… যারা আর নেই।”

    আশিক বলল, “ড্রেস কোড?”

    সিনা বলল, “যে পোশাকে মরেছে, সেটাই।”

    আর ঠিক এগারো মাস পর, ইলিশ ভাপার টেস্টিংয়ের দিন, শেষ টুকরোটা নিয়ে দুজন একসঙ্গে হাত বাড়াল।

    টিক-টকের ২৩৭তম চেষ্টা

    (মহাভোজ ত্রয়ী)

    ভবিষ্যতের সময়-দপ্তরে একটা কড়া নিয়ম আছে: একটা মৃত্যু আটকাতে সর্বোচ্চ ২৪০ বার চেষ্টা করা যাবে। তার বেশি হলে এজেন্টের চাকরি যাবে, আর ঘড়িটাও কেড়ে নেওয়া হবে।

    টিক-টক চেষ্টা করেছে ২৩৬ বার।

    সে সময়-উদ্ধার বিভাগের সবচেয়ে বিনয়ী, সবচেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এজেন্ট। পকেটে চল্লিশটা বাড়তি ঘড়ি, গায়ে সবসময় বিশাল রেইনকোট, কারণ সময়ের ফাটলে নাকি বৃষ্টি পড়ে। চোখে ঘড়ির কাচের মতো গোল চশমা। কথা বলার আগে তিনবার গলা খাঁকারি দেয়, আর কথা শেষ হলে “সরি” বলে।

    তার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র কেস: ঘটনা নম্বর ৪৪৭১২। আশিক ও সিনা। ইলিশের কাঁটা। একই মুহূর্তে দুজন। দপ্তরের ফাইলে এটার নামের পাশে লেখা: “সবচেয়ে সহজে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু।”

    আর তার সঙ্গে একটা গোপন কারণ ছিল, যেটা সে কাউকে বলেনি। ভবিষ্যতের স্কুলের ইতিহাস বইয়ে আশিক-সিনার জন্য আস্ত একটা পাতা বরাদ্দ। শিরোনাম: “ভূতেদের মহাভোজ: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পার্টি।” টিক-টক ছোটবেলা থেকে ওই পাতা মুখস্থ করেছে। সে ভেবেছিল, এমন দুজন মানুষকে মরতে দেওয়া যায় না।

    বইয়ের পাদটীকায় একটা ছোট্ট কথা ছিল, যেটা সে কখনো পড়েনি। ওটা সে পড়বে অনেক পরে।

    প্রথম চেষ্টা

    সবচেয়ে সোজা উপায়: সরাসরি বলা।

    টিক-টক দরজায় কড়া নাড়ল। আশিক খুলল। টিক-টক তিনবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “আপনারা এক বছর পর ইলিশের কাঁটায় মরবেন। সরি।”

    আশিক বলল, “ওহ, বিমা এজেন্ট! সিনা, বিমাওয়ালা এসেছে!” সিনা ভেতর থেকে চেঁচাল, “আমাদের বিমা লাগবে না, বলে দাও!” দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

    সেদিন টিক-টক ঠিক করল, তাহলে ইলিশটাকেই সরাতে হবে।

    সতেরোতম চেষ্টা

    টিক-টক পুরো শহরের সব ইলিশ কিনে নদীতে ছেড়ে দিল। বাজারে একটা ইলিশ নেই।

    আশিক আর সিনা বাজার থেকে খালি হাতে ফিরে এল, মুখ কালো। কিছুক্ষণ বসে থেকে দুজন একসঙ্গে বলল, “চল, নিজেরাই ধরি।” নৌকা ভাড়া করে নদীতে নামল। ঝড়ের মধ্যে। পরের ঘটনাটা টিক-টক দূর থেকে দেখল, দূরবীনে। সেদিন সে প্রথমবার বুঝল, মৃত্যুর কারণ কাঁটা নয়। কারণ ইলিশ।

    সাতচল্লিশতম চেষ্টা

    টিক-টক ভবিষ্যৎ থেকে একটা কাঁটাহীন ইলিশ-যন্ত্র নিয়ে এল। কাঁটা ছাড়া নিখুঁত ফিলে, একদম নিরাপদ।

    আশিক এক টুকরো মুখে দিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “কাঁটা ছাড়া ইলিশ মানে আত্মা ছাড়া শরীর।” সিনা বলল, “এই যন্ত্র আমাদের বাড়ি থেকে বের করো।” পরদিন দুজন বাজারে গিয়ে কাঁটাওয়ালা ইলিশ কিনে এনে খুব যত্ন করে রান্না করল, আর ঠিক আগের মতোই শেষ টুকরো নিয়ে ঝগড়া বাধাল। টিক-টক তখন জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছিল।

    বাষট্টিতম চেষ্টা

    এবার কুকুর। টিক-টক ঠিক করল, ভুলুকে দিয়ে শেষ টুকরোটা সরিয়ে দেবে।

    ভুলুকে সে প্রতিবারই দেখত, আর প্রতিবারই অদ্ভুত লাগত, কারণ ভুলু প্রতিবার ঠিক তার দিকে তাকিয়েই লেজ নাড়ত, যেন অনেক পুরনো বন্ধুকে দেখছে। এবার সে একটা বিস্কুট দিয়ে ইশারা করতেই ভুলু বুঝে গেল। ভোজের দিন শেষ টুকরোটা মুখে নিয়ে সোজা ছুট!

    আশিক আর সিনা দুজন ভুলুর পেছনে দৌড় দিল। বিকেল পর্যন্ত ভুলুকে খুঁজে পাওয়া গেল না। সন্ধ্যায় ফিরে এসে দেখা গেল, ভুলু নিজেই টুকরোটা শেষ করে নাকে লেজ গুটিয়ে ঘুমাচ্ছে। টিক-টক হাত মুঠো করে বলল, “হয়েছে! এবার বেঁচে গেল!” কিন্তু ভুলুর সামনে দিয়ে আশিক আর সিনা এসে আরও ইলিশ কিনে আনল, আর আরও ইলিশ। আসল সমস্যা টুকরো নয়, ওদের ভালোবাসা।

    ভুলু টিক-টকের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে ঘেউ করল। টিক-টক ঠিক বুঝতে পারল না, তবে মনে হলো ওটা বলছে, “চেষ্টা করেছ, ভালো। এখন থামো।”

    একানব্বইতম চেষ্টা

    ঠিক আছে, ছদ্মবেশ। টিক-টক নিজের নাম দিল “টিক্কু ভাই”, ঘরের পাশে বাসা নিল, প্রতিদিন চা খেতে গেল, ওদের গল্প শুনল, ওদের জোকে হাসল। দুই মাসের মধ্যে ওরা তাকে ইলিশ ভাপার নিমন্ত্রণ দিল।

    টেবিলে বসেই টিক-টক শেষ টুকরোটা নিজের প্লেটে তুলে নিল। “এটা আমি খাচ্ছি!” ওর গলায় কাঁটা আটকাল না, কারণ ভবিষ্যতের মানুষের গলা কাঁটা-প্রতিরোধী। আশিক আর সিনা দুজন মিলে ওকে একদম সম্মান জানিয়ে বলল, “টিক্কু ভাই, আপনি আমাদের সবচেয়ে বড় ইলিশ-ভক্ত!” তারপর পরদিন আরও ইলিশ কিনে আনল ওর জন্য।

    একশো বিশতম চেষ্টা

    টিক-টক ঠিক করল, ওদের পৃথিবী থেকেই সরিয়ে নেবে। মঙ্গল গ্রহে। সেখানে কোনো ইলিশ নেই, কোনো কাঁটা নেই, কোনো ঝগড়ার কারণ নেই।

    আশিক আর সিনাকে সে রাতে ঘুমের মধ্যে মহাকাশযানে তুলে মঙ্গলে নিয়ে গেল। এগারো দিন ওরা লাল পাথরের মধ্যে বসে রইল। বারোতম দিনে সিনা বলল, “আমার ইলিশ লাগবে।” আশিক বলল, “আমারও।” দুজন কাঁদতে কাঁদতে নিজেরাই যানে উঠে ফিরতি পথে রওনা দিল। পৃথিবীতে নেমে প্রথম কাজ: বাজারে দৌড়, ইলিশ কেনা, ভাপা রান্না। তেরো মিনিটের মধ্যে ঘটনা শেষ।

    টিক-টক সেদিন বসে লিখল রিপোর্টে: “ইলিশ-বিচ্ছেদ কাঁটার চেয়েও ভয়ংকর।”

    একশো অষ্টআশিতম চেষ্টা

    এবার টিক-টক নিখুঁত পরিকল্পনা করল। সময়: বিকেল চারটা। জায়গা: উঠান। শ্রোতা: আশিক আর সিনা, চায়ের কাপ হাতে। হাতে লিখিত বক্তৃতা, তিন পাতা।

    সে গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে শুরু করল, “প্রিয় আশিক ও সিনা, আজ আমি আপনাদের সামনে একটা গুরুত্বপূর্ণ…”

    ঠিক তখন একটা ছাগল উঠানে ঢুকল। ছাগলটা সোজা এসে টিক-টকের তিন পাতার বক্তৃতা চিবোতে শুরু করল। টিক-টক “এই!” বলে কাগজ কেড়ে নিতে গেল। ছাগল “ম্যা” বলে কাগজ নিয়ে পালাল। সিনা বলল, “দুঃখিত, ছাগলটা আমাদের নয়।” আশিক বলল, “কিন্তু আপনি কী যেন বলছিলেন?” টিক-টক ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে বলল, “কিছু না। কিছুই না।”

    ছাগলটা দূর থেকে একবার ফিরে তাকাল। মনে হলো, ওর চোখে অপরাধবোধ নেই।

    দুইশো চৌদ্দতম চেষ্টা

    এই চেষ্টার আগে টিক-টক দপ্তরের আর্কাইভে গিয়ে সেই বইটা আবার খুলল। প্রথমবারের মতো পাদটীকাটা পড়ল।

    “ভূতেদের মহাভোজ আয়োজিত হয়েছিল আশিক ও সিনার মৃত্যুর পরের এক রাতে। ইতিহাসে এটিই মৃতদের একমাত্র পূর্ণ সম্মেলন। আশিক ও সিনা বেঁচে থাকলে এটি কখনো ঘটত না। — সময়-সংরক্ষণ বিভাগ।”

    টিক-টক অনেকক্ষণ বইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর, খুব ধীরে, নিজের রেইনকোটের হাতায় মুখ মুছল।

    মানে, সে যত ওদের বাঁচাতে চেয়েছে, তত সে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পার্টিটাকেই মুছে ফেলতে চেয়েছে। যে পার্টির পাতা সে ছোটবেলা থেকে মুখস্থ করেছে।

    সে কোনো উত্তর পেল না। শুধু উঠানে ফিরে গিয়ে দেখল, ভুলু বসে আছে, আর ওর চোখে অদ্ভুত নীল আলো। ভুলু ধীরে ধীরে টিক-টকের জুতোর ওপর মাথা রাখল।

    দুইশো ছত্রিশতম চেষ্টা

    দপ্তরে ফিরে এসে টিক-টক গেল ম্যাডাম ক্রোনার ঘরে। ম্যাডাম ক্রোনার কানে বালির ঘড়ির দুল। তিনি কখনো হাসেন না, শুধু কাগজ থেকে চোখ তুলে বলেন, “হিসাব?”

    “দুইশো ছত্রিশ, ম্যাডাম।”

    “আরও চারটা বাকি।” ম্যাডাম ক্রোনা কলম নামিয়ে রাখলেন। “এই কেসটা সবচেয়ে সহজ ছিল, টিক-টক। কাঁটা। ইলিশ। দুজন মানুষ। আপনি পারছেন না কেন?”

    টিক-টক আমতা আমতা করে বলল, “ম্যাডাম, আমি একটা কথা ভাবছি। ওদের না বাঁচিয়ে, যদি মৃত্যুটাকে… মানে সুন্দর করা যায়?”

    “এটা আমাদের কাজ নয়।”

    “তাহলে এটা আমার কাজ,” টিক-টক বলল। নিজের গলা শুনে সে নিজেই চমকে উঠল, কারণ এই প্রথম সে “সরি” বলেনি।

    ম্যাডাম ক্রোনা কিছু বললেন না। শুধু দুলের বালিটা একবার ঘুরে গেল।

    দুইশো সাঁইত্রিশতম চেষ্টা

    এবার টিক-টক কোনো পরিকল্পনা করল না। শুধু ভোরে উঠে রেইনকোট পরে সময়ের ফাটলে ঢুকল।

    উঠানে নেমে সে দেখল, আজ কেমন যেন ভিড়। ভিনগ্রহীরা এসেছে। জেলিফিশ ফর্ম ভরছে, গ্যাসের মেঘ ফ্যানের প্রেমে পড়েছে, সরীসৃপ যোদ্ধা ফুচকা খেয়ে কাঁদছে, আর একটা বাচ্চা এলিয়েন ভুলুর মাথায় চড়ে বসে আছে। দেখে টিক-টকের মনে হলো, এই চেষ্টায় অন্তত দৃশ্যটা সুন্দর।

    সে সারাদিন বলার চেষ্টা করল, আর সারাদিন কেউ না কেউ থামিয়ে দিল। সন্ধ্যায় সে আর পারল না। সোজা উঠে দাঁড়িয়ে সবার সামনে বলল, “আমি আর পারছি না। শোনো সবাই। এক বছর পর…”

    বলে দিল। পুরোটা।

    আগের ২৩৬ বারে এই জায়গায় সব সময় একটা জিনিস হয়েছে: আশিক আর সিনা ভয় পেয়েছে। কেউ পালিয়ে গেছে, কেউ বিছানায় লুকিয়েছে, কেউ ইলিশ ছেড়ে দিতে গিয়ে কেঁদেছে। এবার তা হলো না।

    আশিক সিনার দিকে তাকাল। সিনা আশিকের দিকে। আশিক বলল, “ইলিশ ছাড়া জীবন?” সিনা বলল, “মৃত্যুর চেয়েও খারাপ।” দুজন একসঙ্গে ইলিশের প্লেটের দিকে হাত বাড়াল।

    আর তারপর, ভোরের একটু আগে, দুজন ছাদের দিকে তাকিয়ে খুব ছোট একটা কথা বলল, যেটা টিক-টক সত্যি শুনেছিল: “এবার আর আকাশে না। যারা আর নেই, তাদের দিকে।”

    টিক-টকের হাতের ঘড়ি হঠাৎ কেঁপে উঠল। সে ঘড়ির পর্দায় তাকাল। পাদটীকাটা সেখানে জ্বলছে, আর এই প্রথম, পাশে একটা ছোট্ট সবুজ তারা।

    বিদায়

    সব অতিথি চলে যাওয়ার পর টিক-টক সবার শেষে গেল। যাওয়ার আগে একবার ওদের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল। শেষে শুধু বলল, “আমি আবার আসব। তখন হয়তো তোমরা আর এখানে থাকবে না।”

    দপ্তরে ফিরে সে ঘড়িটা ম্যাডাম ক্রোনার টেবিলে নামিয়ে রাখল। “ইস্তফা।”

    ম্যাডাম ক্রোনা অনেকক্ষণ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে প্রশ্ন করলেন, “ওদের বাঁচাতে পারলেন না, তাহলে এখন কী করবেন?”

    “একটা পার্টিতে যাব,” টিক-টক বলল। “আমন্ত্রণ পাইনি। কিন্তু কাছাকাছি থাকব।”

    ম্যাডাম ক্রোনা এবার প্রথমবার একটু হাসলেন। “বৃষ্টি হতে পারে। রেইনকোটটা নিয়ে যান।”

    শেষ রাত

    এগারো মাস পর, এক বিকেলে, ইলিশ ভাপার টেস্টিংয়ে আশিক আর সিনা শেষ টুকরোটা নিয়ে ঝগড়া করল, আর একসঙ্গে মুখে পুরল। টিক-টক সেটা দেখেনি। সে তখন গ্রামের বাইরে বসে ছিল।

    পরদিন রাতে সে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পাশ দিয়ে গেল। গায়ে বিশাল রেইনকোট, পকেটে চল্লিশটা বাড়তি ঘড়ি, আর হাতে একটা ছোট্ট ফুল। উঠান থেকে খিলখিল হাসির শব্দ আসছে। চেয়ার সরানোর আওয়াজ। কারো ঘুমপাড়ানি গান। আর একটা কুকুরের খুশি-খুশি ঘেউ ঘেউ।

    টিক-টক গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইল, ভেতরে ঢুকল না, কারণ ওটা মৃতদের পার্টি। কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকাটাই যথেষ্ট ছিল।

    সে ফিসফিস করে বলল, “দুইশো সাঁইত্রিশ বার ইলিশ জিতেছে।” তারপর একটু থেমে, নিজের অজান্তেই হেসে ফেলে যোগ করল, “কিন্তু এবার আমিও হারিনি।”

    1 Comment
    • আশিক মোকামী, আপনার এই মহাজাগতিক ও আবেগঘন আখ্যানটি পড়ার সময় জর্বাক্স-৯ এর সেই ফর্মের জটিলতা থেকে শুরু করে টিক-টকের নিঃস্বার্থ চেষ্টার দৃশ্যগুলো বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল এবং ইলিশের ঘ্রাণ যেন কল্পনায় এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করেছিল।

Skip to toolbar