-
আমার ছেলে
আবু নাঈম
আমার ছেলেটা ঠিক তোমার মতোই ছিল।জানো? পড়াশুনার প্রতি ওর কোন মনোযোগই ছিলনা।ওকে পড়তে বসাতে আমি কখনোই পারতামনা।ধরো সকালবেলা,আমি ওকে পড়তে বলে একটু বাইরে গেলাম।এসে দেখি,সে ঘরের আঙ্গিনায় কি যেন করছিল,আমাকে দেখেই দৌড়ে পালিয়েছে।আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম,কিসের যেন দু’চারটে ঢাল-লতা এনে লাগানোর চেষ্টা করতেছিল।খুব মেজাজ গরম হয়েগেলো আমার।না,আমি ওকে ডেকে আনিনি।আমি যতক্ষণ ঘরে ছিলাম,সে আর ঘরে আসেনি।আমিও খুব একটা মাথা ঘামাইনি এটা নিয়ে।দুদিন পর আমি দুপুরের খাবার খেয়ে ওর রুমে গেলাম।খেয়ে শুয়েছিল,আমি রুমে ঢুকতেই উঠে বসলো।আমি খাটের একটা কোনায় বসলাম।তারপর ওকে লক্ষ্য করে বললাম,পড়তে ভালো লাগেনা তাইনা?কোন উত্তর পাইনি আমি।নিজে থেকেই আবার বললাম,পড়তে ভালো না লাগলে পড়ার দরকার নাই।তবে হ্যাঁ,আমার থেকে পালিয়ে বেড়িওনা।তোমার যা ভালো লাগে করো,আমি বাধা দেবো না। কেমন যেন বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।উঠে দাঁড়ালাম আমি,পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে টেবিলে পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দিয়ে রেখে বললাম,এখানে কিছু টাকা আছে। বিকেলে একটু বাজারে যেও,আর তোমার যা ভালো লাগে কিনে নিও।
রাতে খাবার পর ওর রুমে উঁকিদিয়ে দেখি, খুব গুছানো টেবিলে কিছু বই,পত্রিকা কাটিং ইত্যাদি নিয়ে ঘাটাঘাটি করছে।আমি আর আগ বাড়াইনি,চলে এলাম নিজের কক্ষে। বেশকিছু দিন কেটে গেলো,সে নিজের একটা বাগান সাজিয়েছে,ঘরে বাইরে,নিজের কক্ষে অনেক গাছ লাগিয়েছে।খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে ইদানিং।সকালে গাছ রোদে দিচ্ছে,বিকেলে ঘরে নিচ্ছে,বাইরের গাছগুলো দু’চারদিন পর পর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে রোদ লাগাচ্ছে।ভালোই কাটছে ওর দিনগুলো।
আমার মন খুব একটা স্বস্তিতে নেই।ওকে নামাজ পড়তে দেখিনা অনেক দিন ধরে।কিছু বলছিও না আমি কোনকিছু নিয়ে।
হঠাৎ একদিন দেখলাম খুব মন খারাপ ওর,বাসায় কারো সাথে কখনো কিছু শেয়ার করেনা।নিজের মতোই থাকে।
তাই মন খারাপের কারণ জানতে ইচ্ছে হলো খুব।গেলাম ওর কাছে,পাশে বসে হাত বাড়িয়ে ওকে নিজের কাছে টেনে নিলাম,আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।পিঠে হাত বুলিয়ে জানতে চাইলাম,কি হয়েছে? কোন সমস্যা হয়েছে তোমার?
জানালো ওর একটা গাছ মরে গেছে,খুব পছন্দের ছিলো গাছটা।আমারো খারাপ লাগলো এটা ওটা বলে শান্তনা দিয়ে চলে আসলাম।আর আসার সময় বলে এলাম,মনটা হালকা হলে সময় করে আমার কাছে এসো,কিছু কথা বলবো।
রাতেই সে আমার স্টাডিরুমের দরজায় এলো।বাবা আসবো? বলে অনুমতি চাইল।আমি ওকে আসতে বললাম।এসে একটা চেয়ার নিয়ে আমার মুখোমুখি বসলো।অভ্যাসটা আমারো,যখন কারো সাথে বসতে যাই,কেন জানি মুখোমুখি বসি।
তারপর শুরু করলাম,হালকা মুড়ে কথা বলছি আমি।বাগান নিয়ে ওর ইচ্ছে,পরিকল্পনা জেনে নিলাম।আরো কিছু টুকটাক কথা বলে ওকে আমার প্রতি মনযোগী করে নিলাম।তারপর বলতে শুরু করলাম,এই যে তুমি গাছ লাগাও,গাছের যত্ন কর,রোদে দাও আবার যায়গামতো নিয়ে রাখো।এতে নিশ্চয় তোমার কোন প্রত্যাশা বা প্রাপ্তি থাকে? যদি তুমি সব ঠিকঠাক দেখ তোমার ভালো লাগে আবার একটু এদিক ওদিক হলে খারাপ ও লাগে। ঠিক তেমনি তোমাকে সৃষ্টি করার পিছনেও আল্লাহর কোন না কোন প্রত্যাশা প্রাপ্তি নিশ্চয় থাকার কথা।তুমি সেই বিষয়ে কখনো চিন্তা করেছো? নিজের ভালো লাগার কাজ করবে ভালো কথা,তোমার সৃষ্টিকর্তা তোমার কাছে কি চায় সেটার প্রতি তোমার খেয়াল রাখা উচিৎ নয় কি? তারপর দেখ,তোমার গাছটা মরে গেলো,কিন্তু কেন মরলো,কি করলে এটাকে বাঁচানো যেতো, এটা জানার জন্য ও তো তোমার কিছু শিক্ষার দরকার আছে নাকি? একটু একটু করে পড়াশুনা করেও তো নিজের ভালো লাগার কাজগুলো করা যায় নাকি??কোন উত্তর আমি কোন কালেই ওর থেকে পাইনা,আজো পাইনি।উত্তর আমি ওর থেকে প্রত্যাশাও করিনা। শুধু বললো,আমি কি এখন যাবো বাবা?? বললাম যাও।
ফজরের সময় উঠে দেখি সে আমার আগেই জামায়াতে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছে।নামাজ শেষে মসজিদে অনেক্ষণ ধরে কুরআন তেলাওয়াত করলো,তারপর বাসায় এসে গাছে পানি দিলো।আজ দেখি পড়তেও বসেছে। সময় মতো নাস্তা খেয়ে স্কুলে গেলো।ওর পুরো একটা নতুন রুটিন তৈরী হলো।জীবনটা ভিন্ন একটা গতি পেলো।দেখতে দেখতে সে নবম শ্রেনীতে উঠলো।একদিন আমাকে এসে জানালো,সে বিজ্ঞান বিভাগ নিতে চায়।বললাম যে বিভাগে পড়তে ভালো লাগবে সেই বিভাগ নাও,তবে একটু ভেবেচিন্তে নিও।পড়াশুনা ভালোই চলতে লাগলো।এস এস সি পরিক্ষাও দিয়ে দিয়েছে,রেজাল্ট যেদিন হলো, সেদিন আমাকে এসে জানালো নিজের রেজাল্টের কথা।জানতে চাইলাম,তোমার প্রত্যাশা এবং প্রচেষ্টা অনুযায়ী সফলতা কতটুকু? বললো প্রচেষ্টার থেকে সফলতা কিঞ্চিৎ উপরে আছে।জানতে চাইলাম,এটাকে তুমি কিভাবে মূল্যায়ণ করবে? বললো সব ঠিক আছে বাবা,তবে আমাকে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য আরেকটু ভালো করতে হবে যা আমি আগে বুঝতে পারিনি।আমি আর কিছু বলিনি, কারণ সে নিজের একটা পথ তৈরী করেছে,নিজের জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।আর তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য সঠিক গতিও সে নিজেই সেট করতে পারবে।3 Comments
Friends
বাহার উদ্দিন আহমেদ (শ্রাবণ)
@bahar3244
আব্দুল্লাহ
@g-m-abdulah
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou


সুন্দর গদ্য। অভিনন্দন।