-
“সর্বশ্রেষ্ঠত্ব” বা “ইমামুল আম্বিয়া” মতবাদ সম্পূর্ণ বর্জনীয়
ইসলামের শেষনবীর নামে মিথ্যাচারই ইসলাম ধর্মে একমাত্র মিথ্যা নয়; হাজারো মিথ্যা আর বিভ্রান্তি একেবারে শুরু থেকেই দীনের মধ্যে অনুপ্রবেশ করাতে শয়তানের নেতৃত্বে কুচক্রী মহল সচেষ্ট ছিল। নবীর জীবদ্দশাতেই মুনাফিক সম্প্রদায় বহুভাবে নবীকে দিয়ে চেষ্টা করেছে কুরআনের আয়াতকে বদলিয়ে দিতে বা সম্ভব হলে কুরআনকেই পাল্টিয়ে ফেলতে।
“কুরআন বাদ দিয়ে ভিন্ন কিছু নিয়ে আস”
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آَيَاتُنَا بَيِّنَاتٍ قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا ائْتِ بِقُرْآَنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِّلْهُ قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِنْ تِلْقَاءِ نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ
আর যখন তাদের কাছে পাঠ করা হয় আমাদের সুস্পষ্ট বাণীসমূহ, যারা আমাদের সাথে মোলাকাতের আশা করে না তারা বলে – এ ছাড়া অন্য এক কুরআন আনো অথবা একে পরিবর্তিত করে দাও। বলো, একে আমার নিজের ইচ্ছায় বদলানো আমার কাজ নয়। আমার কাছে যা প্রত্যাদিষ্ট হয় শুধু তারই আমি অনুসরণ করি। যদি আমি আমার প্রভুর অবাধ্য হই – তবে আমি এক ভয়ঙ্কর দিনের শাস্তির ভয় করি। -১০:১৫
এ ধরণের আরও বর্ণনা রয়েছে যেখান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বহুভাবে নবীকে উত্তক্ত করা হয়েছে স্বার্থান্বেষী মহলের মর্জি মাফিক একটা গ্রন্থ রচনার। কখনও কখনও তাদের চাপে রাসূল টলে যাবার উপক্রম হয়েছেন বলেও কুরআন দাবী করে –
وَإِنْ كَادُوا لَيَفْتِنُونَكَ عَنِ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ لِتَفْتَرِيَ عَلَيْنَا غَيْرَهُ وَإِذًا لَاتَّخَذُوكَ خَلِيلًا * وَلَوْلَا أَنْ ثَبَّتْنَاكَ لَقَدْ كِدْتَ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلًا * إِذًا لَأَذَقْنَاكَ ضِعْفَ الْحَيَاةِ وَضِعْفَ الْمَمَاتِ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَكَ عَلَيْنَا نَصِيرًا
আর অবশ্যই তারা মতলব করেছিল তোমার কাছে আমরা যা প্রত্যাদেশ দিয়েছি তা থেকে তোমাকে বিচ্যুত করতে, যেন তুমি আমাদের বিরুদ্ধে তার পরিবর্তে অন্য কিছু জাল কর, আর তখন তারা তোমাকে নিশ্চয়ই গ্রহণ করবে অন্তরঙ্গ বান্ধবরূপে। আর আমরা যদি তোমাকে সুপ্রতিষ্ঠিত না করতাম তাহলে তুমি আলবৎ তাদের প্রতি সামান্য কিছু ঝুঁকেই পড়তে – সেক্ষেত্রে আমরা নিশ্চয় তোমাকে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম ইহজীবনে এবং দ্বিগুণ মৃত্যুকালে, তখন আমাদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না। -১৭:৭৩-৭৫
যদি শেষনবী নিজের থেকে কুরআনে কিছু প্রবিষ্ট করাতেন, সেক্ষেত্রে তাঁকে মেরে ফেলার শাস্তির হুঁশিয়ারিও উচ্চারিত হয়েছে সূরা হাক্কায় (৬৯:৪৪-৪৭) যা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে। কুরআনের নিখাদ সত্য ও সৌন্দর্যকে ঢেকে দিতে সেই দূরভিসন্ধিমূলক চক্রান্ত আর প্রচেষ্টা এখনও জারি আছে। কতশত মিথ্যার সমাবেশ করা হয়েছে তার কোন লেখাজোখা নেই – তবে সেই সকল মিথ্যার গোড়া বা ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে, নবীর নামে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ‘ইমামুল আম্বিয়া’ তত্ত্ব। যেভাবে খ্রিস্টান সম্প্রদায় নবী ঈসাকে আল্লাহর পুত্র ঘোষণা করে অপরাধ করেছে; নবী মুহাম্মদকে আল্লাহর সমকক্ষ বানিয়ে সম্প্রদায়গতভাবে মুসলিমরা তার চেয়ে জঘণ্য অপরাধ করেছে। কেননা এই যাবতীয় বাড়াবাড়ি দ্বারা শেষ পর্যন্ত শেষনবীকে তারা স্রষ্টার “বিকল্প খোদা” হিসেবে দাঁড় করিয়ে শয়তানের চক্রান্তের আসল এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করেছে।
সেই বিচারে শিরক ও মিথ্যার এই মহাপ্রাচীরকে সম্মিলিতভাবে ভেঙ্গে ফেলতে পারলে অন্যান্য আবর্জনা চিহ্নিতকরণ ও দূরীকরণ সহজ কাজে পরিণত হবে। ধর্মের সেই হীন গোষ্ঠী যারা মিথ্যার বেসাতি ফেরি করে বেড়ায়, তারা তাদের স্বার্থে যেমন নবীকে আসমানে উঠায় আবার সেই তারাই তাঁর নামে কুৎসিত, নোংরা, অশ্লীল আর কালিমা লেপন করতেও ছাড়ে নি যেন তারা নিজেরাও সেই একই অপকর্ম করার ধর্মীয় ম্যান্ডেট উপভোগ করতে পারে। আল্লাহ তাঁর শেষনবী সম্পর্কে যা এবং যতটুকু বলেছেন, সেটাই যথাযথ, সুন্দর – মনের মাধুরি মিশিয়ে তাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আমাদের মতো করে বলা যাবে না। “ইমামুল আম্বিয়ার” মিথ্যা তত্ত্বটি মুসলিম সম্প্রদায়কে পঙ্গু করে দিয়েছে; তাদের স্বাধীন চিন্তা-চেতনার পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছে। তাদেরকে নবী মুহাম্মদের নামে ধর্মীয় অপনেতৃত্বের দাসে পরিণত করেছে – যেভাবে পূর্ববর্তী যুগেও হয়েছিল।
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
তারা তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদিগকে তাদের প্রভুরূপে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মারইয়াম-পুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের এবাদতের জন্য। তিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তা থেকে তিনি পবিত্র। -৯:৩১
যে দোষে পূর্ববর্তী সম্প্রদায় দায়ী, শেষনবীর উম্মতেরাও সেই একই অপরাধের দাগী আসামী।
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ قُلْ فَمَنْ يَمْلِكُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ أَنْ يُهْلِكَ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا يخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
তারা নিশ্চয়ই অবিশ্বাস পোষণ করে যারা বলে – নিঃসন্দেহে আল্লাহ, তিনিই মাসীহ, মারইয়ামের পুত্র। তুমি বলো- কার তাহলে বিন্দুমাত্র ক্ষমতা আছে আল্লাহর বিরুদ্ধে যখন তিনি চেয়েছিলেন মারইয়াম-পুত্র মাসীহকে বিনাশ করতে, আর তাঁর মাতাকে, আর পৃথিবীতে যারা ছিল তাদের সবাইকে? বস্তুতঃ আল্লাহরই মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবীর রাজত্ব আর এই দুইয়ের মধ্যে যা আছে। তিনি সৃষ্টি করেন যা তিনি ইচ্ছে করেন। আর আল্লাহ সব কিছুর উপরে সর্বশক্তিমান। -৫:১৭
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ
নিশ্চয়ই তারা অবিশ্বাস পোষণ করে থাকে যারা বলে – নিঃসন্দেহে আল্লাহ, তিনিই মাসীহ, মারইয়ামের পুত্র। অথচ মাসীহ বলেছেন – হে ইসরাইলের বংশধরগণ! আল্লাহর ইবাদত করো যিনি আমার প্রভু ও তোমাদেরও প্রভু। নিঃসন্দেহে যে আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার নিরূপণ করে, আল্লাহ নিশ্চয়ই তার জন্য নিষিদ্ধ করেছেন স্বর্গোদ্যান, আর তার আবাসস্থল হচ্ছে আগুন। আর অন্যায়কারীদের জন্য থাকবে না কোনো সাহায্যকারী। -৫:৭২
এই কলুষিত বিশ্বাসটি জগদ্দল পাথেরের মতো তাদের বুকের উপর চেপে বসে আছে। এই মিথ্যা বিশ্বাসটিকে তাদের অন্তঃকরণে জবরদস্তিমূলক ভাবে চাপিয়ে দেবার কারণে তারা কুরআনে বিদ্যমান এর বিপরীত সত্য নিয়ে যখন কঠিন সংকটে পড়ে যায় আর মোল্লাতন্ত্রের ধারকদের কাছে ফয়সালার জন্য দৌড়ায় তখন তারা কুরআনের বিকৃত অর্থ শুনিয়ে দেয়; এরপরও প্রশ্ন করলে বলে, আপনারা এতো কিছু বুঝবেন না। শেষনবীকে “সর্বশ্রেষ্ঠ” বলার মাধ্যমে কমপক্ষে ৫ টি বড় মাপের জুলুম আমরা করছি-
এক. আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ – কেননা আল্লাহ কোথাও শেষনবীকে সর্বশ্রেষ্ঠ বা সকল নবীগণের ইমাম বা নেতা বলেন নি।
দুই. শেষনবীর নামে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি যা তিনি নন এবং যার সূত্র ধরে দীনে বহু বিভ্রান্তির আমদানি হয়েছে।
তিন. নবী ইবরাহীমসহ অন্যান্য নবীগণকে শেষনবীর মোকাবেলায় ‘ছোট’ করে দেখানোর ঔদ্ধত্য ও দুঃসাহস প্রদর্শন।
চার. কোটি কোটি মুসলিম জনতাকে বিভ্রান্ত করার মাধ্যমে তাদের ঈমান-আমল নষ্ট করা হচ্ছে।
পাঁচ. শেষনবীর প্রতি অজ্ঞতাপ্রসূত অতিদরদ প্রদর্শনের নামে তাঁকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিয়ে আমরা শিরক করছি।শিরক না করা স্রষ্টার সাথে সাক্ষাত লাভের অন্যতম শর্ত
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُوا لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
(হে নবী) বলো – আমি নিঃসন্দেহে তোমাদেরই মতন একজন মানুষ, আমার কাছে প্রত্যাদিষ্ট হয়েছে যে নিঃসন্দেহে তোমাদের উপাস্য একক উপাস্য, সেজন্য যে কেউ তার প্রভুর সঙ্গে মোলাকাতের কামনা করে সে তবে সৎকর্ম করুক এবং তার প্রভুর উপাসনায় অন্য কাউকেও শরিক না করুক। -১৮:১১০
আল্লাহর শেষনবী নিজেই তাঁকে অযাচিতভাবে বড় বানানোর প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করে গেছেন; আমরাও সেই একই কর্তব্যে শামিল হই। সর্বশেষ নবীর নামে চালানো যুগ যুগ ব্যাপী এই মিথ্যার মূলোৎপাটনে ভূমিকা রাখার জন্য সবাইকে উদাত্ত আহবান জানাই। আমরা যারা নিজেদেরকে ‘মুসলিম’ বলে পরিচয় দেই, ইসলামের মধ্যে অনুপ্রবেশকৃত পাহাড় সমান যাবতীয় বিভ্রান্তি ও শিরকের বেড়াজাল ভাঙ্গার আগে তাদের কর্তব্য শেষনবীর নামে “সর্বশ্রেষ্ঠত্ব বা ইমামুল আম্বিয়ার” যে মিথ্যার মহাপ্রাচীর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে তা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া। এই সাহসিকতাপূর্ণ ঈমানী কাজটি আমরা যত দ্রুত সম্পন্ন করতে পারব, আমরা সারা বিশ্বে তত দ্রুত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা, নিপীড়ন-নিষ্পেষণ থেকে মুক্ত হবো, ইনশা-আল্লাহ।
আমাদেরকে সত্যিকার ‘মুসলিম’ হতে হলে শেষনবীর নামে চালানো এই মিথ্যার মহাপ্রাচীর ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতেই হবে। একইসাথে ইসলামের মূল শিক্ষার বিরুদ্ধে উত্থাপিত যে কোন আপত্তি বা অভিযোগকেই যে কোন মুসলিমের স্বাগত জানানো কর্তব্য – কেননা তার উত্তর কুরআনে অতি সুন্দরভাবে ও সর্বোত্তম পন্থায় (আহসানা তাফসীরা) বলে দেয়া হয়েছে। তাই শেষনবীর নামে চালানো এই মিথ্যাচারের অভিযোগগুলোকে খন্ডন করতে আমাদের দায়িত্ব কুরআনের শরণাপন্ন হওয়া। কাজেই তাদেরকেও ধন্যবাদ যারা ‘ইমামুল আম্বিয়া’ তত্ত্বের নামে বহু বিদঘুটে বিষয়ের উদ্ভব ঘটিয়েছেন আর আমাদেরকে কুরআনের অপেক্ষাকৃত গভীরে প্রবেশ করে সেগুলোর অসারতা উদ্ঘাটন ও খন্ডনের সুযোগ করে দিয়েছেন।
“ইহুদি-নাসারার দালাল (?)”
বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকাংশ সদস্য মূলতঃ আসমানী বাণী কুরআনের ব্যাপারে আন-পড়, অজ্ঞ। ‘শোনা-ইসলাম’ এবং ‘দেখা-ইসলাম’-এর মধ্যেই মুসলিম হিসেবে আমাদের বেড়ে ওঠা এবং জীবন-যাপন। যাপিত ‘ইসলামী জীবনকে’ কুরআন দিয়ে যাচাই করার ইচ্ছা, আকাঙ্খা আর প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা আমরা খুব কমই করি। কেননা আমরা অতিমাত্রায় পার্থিব – কাল্লা বাল তুহিব্বুনাল ‘আজিলাতা, ওয়া তাজারুনাল আখিরাহ। দুনিয়া অর্জনের জন্যে হেন অর্থ-সময়-শ্রমের বিনিয়োগ নেই যা আমরা করি না, কিন্তু কুরআন পড়ে ঈমান-আমলকে বিশুদ্ধ করার বেলায় এগুলোর সবটাতেই আমাদের ভীষণ টান পড়ে। ভেজালের সাগরে হাবুডুবু খেয়ে আমরা অনুধাবনই করতে পারি না, আসল কী আর নকল কী? বস্তুত কুরআন দিয়ে নিজেদের ঝালিয়ে নিলে দেখব আমরা প্রকৃতপক্ষে নকল মুসলিম, মুনাফিক; মানব সমাজের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট শ্রেণি।
কুরআনের প্রথমেই তাই বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে একদল আছে যারা মুখে বলে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং আখিরাতেও বিশ্বাস করি, কিন্তু আল্লাহ নিজে তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন যে, তারা কপট, মুনাফিক, এবং ধিকৃত। তো এই রূঢ়, নিষ্ঠুর এবং ভীষণ প্রতিকূল বাস্তবতায় যখন কোন আল্লাহর বান্দা ‘নকল ইসলামের’ মোকাবেলায় কুরআনের বিশুদ্ধ সত্যকে কারও সামনে তুলে ধরতে চায় তখন এক অনির্বচনীয় সুকঠিন প্রতিরোধের মুখে তাকে পড়তে হয়। সর্বশেষ নবী যে সর্বশ্রেষ্ঠ না- বাংলায় ও ইংরেজিতে এ সংক্রান্ত আমার বিস্তারিত লেখনি দেশের এবং দেশের বাইরের বহু জনপ্রিয় ‘ইসলামী চিন্তাবিদ’ নামে খ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে বিনিময় করা হয়েছে। কুরআন থেকে তুলে আনা হুজ্জাত বা যুক্তি ও দলিলের বিরুদ্ধে সেসব পন্ডিতদের কোন শক্ত অবস্থান আমি দেখতে পাইনি।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রণীত পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ইসলাম শিক্ষা বইতেও অত্যন্ত ভিত্তিহীন ভাবে এই ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ তত্ত্ব নবীন শিক্ষার্থীদের গলাধঃকরণ করানো হয়। এর প্রণেতাদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রশিদ সাহেবের সাথে আমি বহু চেষ্টা করেও আলোচনায় বসতে পারি নাই। কিসের ভিত্তিতে তারা এই মিথ্যা শেখান তার জবাব আমি তার কাছে প্রত্যাশা করেছিলাম। আমার লেখা তিনি পড়েছেন, কিন্তু বসতে রাজি হননি। অথচ আমার ব্যাপারে তিনি এই অভিযোগ দায়ের করতেও ছাড়েন নাইঃ “এসব লোক হলো ইহুদি-খ্রিস্টানদের এজেন্ট”। এটি একটি মাত্র দৃষ্টান্ত। এ ধরণের বহু আক্রমনাত্মক এবং ভিত্তিহীন অপবাদ অনেকের কাছ থেকেই শুনতে হয়। এর বাইরে আরও বলা হয় কাদিয়ানি, নাস্তিক, ফেতনাবাজ, ইত্যাদি।
এরূপ যাবতীয় অপবাদ এবং আক্রমনের বিপরীতে আমি একেবারেই অবিচলিত। অবিচলিত এজন্য যে, অভিযোগগুলো সত্য নয়। আমি কী সে ব্যাপারে মহান আল্লাহ তা’য়ালাই সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট। বিনীতভাবে নিবেদন করতে চাই – আমি একজন মুসলিম; অবশ্যই আমি মুসলিমদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। শুধু তাই নয়, আমি এমন একজন মুসলিম হতে চাই যে আল্লাহ তা’য়ালার উপর সন্তুষ্ট এবং আল্লাহও তার উপর সন্তুষ্ট। সকলের প্রতি সালাম!
“ইমাম-আলেম-ওলামা” সম্প্রদায়ের প্রতি
এটা জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন যে, বইটিতে বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের সকলের প্রতি অভিযোগের আঙ্গুল উত্তোলন করা হয়নি। আবার কিছু ক্ষেত্রে আপাত আক্রমনাত্মক ভাষাভঙ্গীর ব্যবহার হয়েছে বলে কারও কাছে মনে হতে পারে, সেটাও বস্তুত কারও প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত বা শত্রুতামূলক নয়; বরং একান্ত আত্ম-সমালোচনা মূলক। আমার যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি এবং কুরআনী নির্দেশ মোতাবেক মুসলিম হয়েই মৃত্যুবরণ করতে কায়মনোবাক্যে সর্বক্ষণ আল্লাহর কাছে আকুতি জানাই ও প্রার্থনা করি, বহু ক্ষেত্রে তাদের আত্ম-সংশোধন ভীষণ জরুরী।
আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে যতদূর কুরআনের সমঝ দান করেছেন পুরো লেখার মধ্য দিয়ে তা থেকে ভাব প্রকাশের চেষ্টা করেছি। সেটা করতে গিয়ে ইচ্ছাকৃত, অনিচ্ছাকৃত বা অজ্ঞতাপ্রসূত যে কোন ভুলের দায় আমার। আমি সেজন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। যে কোন বোদ্ধা মহল থেকে এই লেখার বিষয়ে মতামত শ্রবণ এবং বিবেচনা করার জন্য আমার মনের দরজা-জানালা উন্মুক্ত রইল।
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
হে আমাদের রব্ব, আমাদেরকে এবং ঈমানে আগ্রহী আমাদের ভ্রাতাগণকে ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব্ব, তুমি দয়ালু, পরম করুণাময়। -৫৯:১০
আর শেষনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর প্রতি আমরা সেভাবেই শ্রদ্ধাশীল এবং তাঁর রেসালাতের প্রতি আনুগত্য ও দরদ তেমন ভাবেই প্রকাশ ও চর্চা করার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যেভাবে তা আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের কাছে দাবী করেন। আল্লাহরব্বুল ‘আলামিন যেন সেই মানদন্ডে আমাদের সকলকে উত্তীর্ণ করেন।
إِنِّي أَخَافُ إِنْ عَصَيْتُ رَبِّي عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ
আমি আমার রব্বের অবাধ্য হতে ভয় পাই কেননা, আমি একটি মহাদিবসের শাস্তিকে ভয় করি। -৬:১৫, ১০:১৫ ৩৯:১৩
অমুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি
ইসলামের গন্ডির বাইরে মানবজাতির প্রতিটি সদস্যের প্রতিও সনির্বন্ধ অনুরোধ থাকবে তারা মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর চরিত্র দেখে ইসলাম সম্পর্কে যেন বিভ্রান্ত না হন; সেক্ষেত্রে নিজেই ক্ষতিগ্রস্থ ও সত্য থেকে বঞ্চিত হবেন। তারা সকলে কুরআন অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করলে এই কথা তাদের কাছে স্পষ্ট হবে যে, এটা নবী মুহাম্মদের নিজস্ব কোন রচনা নয়। আমরা এই পুস্তকে ইতিমধ্যেই দেখিয়েছি যে, একজন লেখক তার নিজের জন্য বিব্রতকর ও অসম্মানজনক বিষয় কিছুতেই তাঁর গ্রন্থে স্বহস্তে লিখবেন না যা কুরআনে রয়েছে।
ঐসব বিষয়াবলী যেখানে রাসূলকে কঠোর ভাষা প্রয়োগে কথা বলা হয়েছে – তা কুরআন ঐশি গ্রন্থ হবার এক প্রকৃষ্ট দলিল। এর বাইরে পুরো কুরআন যত্নের সাথে পড়লেই এর অপার্থিবতা কড়া নাড়বে যে কোন সংস্কারমুক্ত মনের দরজায়, ইনশা-আল্লাহ।
وَمَا كَانَ هَذَا الْقُرْآَنُ أَنْ يُفْتَرَى مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ
আর কুরআন সে জিনিস নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ তা বানিয়ে নেবে। অবশ্য এটি পূর্ববর্তী কালামের সত্যায়ন করে এবং সে সমস্ত বিষয়ের বিশ্লেষণ দান করে যা তোমার প্রতি দেয়া হয়েছে, যাতে কোন সন্দেহ নেই – তোমার রব্বের পক্ষ থেকে। -১০:৩৭
مَا كَانَ حَدِيثًا يُفْتَرَى وَلَكِنْ تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ كُلِّ شَيْءٍ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
এটা (কুরআন) কোন মনগড়া কথা নয়, কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করে তাদের জন্যে পূর্বেকার কালামের সমর্থন এবং প্রত্যেক বস্তুর বিবরণ রহমত ও হেদায়েত। -১২:১১১
ইহুদি সম্প্রদায় যেভাবে নবী ঈসা মাসীহ ইবনে মারইয়ামকে স্বীকার না করার মাধ্যমে এবং তাঁকে হত্যা চেষ্টার মাধ্যমে কঠিন, গুরুতর ও গর্হিত অপরাধ করেছিল, ঠিক তেমনি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও শেষনবী মুহাম্মদকে স্বীকার ও মেনে না নেয়ার মধ্য দিয়ে একই অপরাধে অভিযুক্ত ও অপরাধী।
আমরা সবাই কুরআনী সত্যে প্রত্যাবর্তন করি; সবার আগে মুসলিম নামধারী সম্প্রদায় কুরআনে ফিরে আসুক, কেননা তারা নিজেরাই কুরআন যথাযথ অধ্যয়ন করে নি; শুধু তাই নয় তারা প্রকৃত প্রস্তাবে কুরআন প্রত্যাখ্যানকারীও বটে। মৃত্যু আসার আগেই আমরা সকলে শর্তহীনভাবে সত্যকে কবুল করে নেই।
*****
2 Comments
Friends
মুহাঃ আবুবকর ছিদ্দিক
@abubokargmail-com
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
তুলট ডেস্ক
@toulot
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor


অভিনন্দন।