-
আত্মজ (গল্প)
আজমাইনের গল্প
আমার নাম আজমাইন, আমার বয়স দুই। আমি আমার আব্বু-আম্মুর একমাত্র ছেলে ছিলাম, কিন্তু এখন আর নেই! মানে এক মাস আগে হুট করেই আব্বু আম্মু কোত্থেকে বাবু মতো কি একটাকে বাসায় নিয়ে এসেছে, এসে বলেছে এটা নাকি আমার ভাই! আমার খুব, খুব মন খারাপ হয়েছিলো আম্মুর কোলে ওই পুটলিকে দেখে। আরে আমার আম্মু, আমাকে সবসময় কোলে নেয়, আমি আম্মুর কাছে ঘুমাই, আর এ কোথা থেকে এসে সোজা আম্মুর কোলে উঠে গেলো! মানে হয় কোনো! আমার তো একদম সহ্য হচ্ছিলো না পুচকেটাকে! আবার কেমন মিয়াও মিয়াও করে শব্দ করছিলো! আরে আজব, কী সমস্যা হচ্ছে সেটা আমার মতো করে বললেই তো হয় আম্মুকে, তা না খালি মিয়াও মিয়াও!
আমি ইদানীং কথা বলতে শিখেছি। অবশ্য কথা আগে থেকেই বলতে পারতাম, কেউ আসলে বুঝতো না। মানে বুরররর, ব্লাহহহ, বে বে এরকম ভাবে কেউ কথা বললে আপনি কিছু বুঝবেন? আমি এতদিন এভাবেই কথা বলতাম, আমি তো জানতাম আশেপাশের সবাই বুঝতে পারছে। আম্মু আব্বুকেও দেখতাম হ্যা হ্যা করছে, আসলে তারা বুঝতোই না! নাইলে যখন তাদের মতো করে বাব্বাহ বা মাহ বললাম তখন এত খুশি হলো কেন বলেন তো! নাহ, এদের ভাব-সাব বোঝাই মুশকিল, বেশ মুশকিল! আরে, আমার তো একটা নিজের ভাষা ছিলো, কিন্তু দেখো তোমাদের সাথে যোগাযোগ বাড়াতে আমার তোমাদেরকেই নকল করতে হলো! এটা কি ভালো হলো? আবার তোমাদের দেখি নকলই ভালো লাগে? যাকগে, আমার কি!
আমি কিন্তু বেশ হাসিখুশি, সবার সাথে মিশি এমনকি সবার কোলেও যাই। কিন্তু যেই আম্মু অই পুচকেটাকে সাথে নিয়ে এসেছে, সবাই আমাকে সবসময় বলছে আমি নাকি অনেএএএক মন খারাপ করেছি, পুচকেটাকে হিংসাও করছি! কি অদ্ভুত কথা বলেন তো! আমার একটু মন খারাপ হয়েছে, তা তো আমি মানছি। কিন্তু হিংসা করবো ওকে!এহ!আর কাজ নাই! এইটুকু একটা মানুষ, সারাদিন শুয়ে থাকে আর মিয়াও মিয়াও করে, বাথরুম এলে তো বলতেও পারে না (আমি অবশ্য এখন আম্মুকে বলতে পারি বাথরুম চাপলে, হাসছেন কেন, আশ্চর্য! হাসবেন না!) তাকে আমি হিংসা করতে যাবো কেন?ও কি আমার মতো সুন্দর করে মা ডাকতে পারে, পারে না! আমি কি সুন্দর করে কুটকুট করে বিস্কুট খাই, ও তো তাও পারে না!
********সকালে ঘুম থেকে উঠেছি, বেলা হয়েছে বেশ!গতকাল রাতে আম্মুর সাথে অনেক খেলেছি,অনেক! আম্মু অবশ্য ঘুমে কাহিল হয়ে যাচ্ছিলো, তবুও আম্মু আমার সাথে খেলছিলোই! কিন্তু কি করা বলেন, আব্বু তো সময়ই পায় না, সারাদিন অফিসে থাকে, বাসায় এসে আবার দেখি চুলার ওপর কি নিয়ে যেন খুটখুট করে! তো এতকিছু শেষ করে আবার আহনাফকে নিয়েও বসে থাকে। দাদু ছিলো, সেও এখন আমাদের কাছে নেই! কিন্তু আমার তো একটু খেলতে হয় বলুন! নইলে নতুন নতুন যা শিখি এগুলো ভুলে যাবোনা? এইজন্যই আম্মুর সাথে খেলি! অথচ বড় মানুষগুলো মানে দাদু, নানু শুধু শুধুই আমাকে মিথ্যা বলে, যে অই আহনাফ মানে পুচকেটা এসেছে দেখে আম্মু নাকি আমাকে আগের মতো ভালোবাসবে না,আদর করবে না!হুহ, ওরা তো জানে না আম্মুর আজমাইন একজনই!
যাকগে, বিছানা থেকে নেমে চোখ মুছে মুছে বাইরে এসে দেখি রুবা ফুপি আর মেজো দাদু এসেছে! আমি তো খুশি হয়ে গেলাম! এই ফুপিটা অনেক ভালো! আমাকে অনেএএএক আদর করে, আমরা অনেএএএক খেলি! দৌড়ে উঠতে যাবো কোলে, ওমা! ফুপিও দেখি পুচকেটাকে কোলে নিয়ে বসে আছে! আরে আজব, আবার হাসছে ওকে নিয়ে, আমার সাথে যেভাবে কথা বলতো ওর সাথেও ওভাবেই কথা বলছে! দুচ্ছাই, থাকো তোমরা ওকে নিয়ে! গেলাম না তোমাদের কাছে!
আম্মু আমাকে মুখ ধুইয়ে দিলো, নাস্তা খাইয়ে দিলো, আবার ঘুরে ঘুরে আহনাফ মানে পুচকেটাকেও দেখছে। আমি ঘুরছি সবার আশেপাশে, বরই হাতে নিয়ে।আহনাফ মনে হয় ঘুমিয়ে পড়েছে, এহ, এত মানুষের মধ্যে ভোস ভোস করে ঘুমাচ্ছে।কোথায় সবার সাথে কথা বলবে, খেলবে, তা না খালি ঘুম! আমি তখন কি করলাম জানেন? আস্তে করে উঠে ফুপির পেছন দিয়ে গিয়ে ওর সামনে বসলাম। এত কাছ থেকে অবশ্য আগে দেখিনি, ইস কি ছোট হাত-পা! কেউ যাতে না দেখে এমনভাবে আলতো করে একটা চিমটি দিলাম!হে হে হে, চিমটি খেয়ে সাথে সাথে পুচকেটা উঠে গেলো! ওমা আবার কেমন বড় বড় করে তাকালো দেখুন! আমি ভেবেছিলাম ঠোট উলটে বোকাটা আবার মিয়াও মিয়াও শুরু করবে! ওমা তাকিয়েই আছে! আমি হাতের বরইটা দেখিয়ে জিগেস করলাম ” খাবি, খাবি, এতা খাবি?” বোকাটা আমার কথার জবাব না দিয়ে ফুরুত করে বমি করে দিলো! আরে জ্বালা! এভাবে কেউ বমি করে, কই আমি তো কখনো করি না! ফুপিদের সামনে মান-ইজ্জত নিয়ে টানাটানি!ইসস!
******এরপর কেটে গেছে আরো কয়েক মাস, বুঝলেন! আহনাফ এখন বসতে পারে, আমারও ওকে এখন অত খারাপ লাগে না! বসে বসে ও বুররররর করে মুখ দিয়ে বুদবুদি বানায় আর একা একাই হাসে! এই খেলাটা আমিও খেলতাম একসময়, কিন্তু এখন যদি খেলি আম্মু দিবে পিট্টি! তাই খেলিনা আসলে! অবশ্য আম্মুও ইদানীং কেমন জানি চুপচাপ হয়ে গেছে! আগের মতো অনেক দৌড়াদৌড়ি করে না, অনেক কথা বলে না, আহনাফের সাথে আমিই কথা বলি,বোকা পুচকেটা খালি বুদবুদ বের করে!
মাঝে মাঝে আমার কি মনে হয় জানেন, এই যে আমি এখন একটু বড় হয়েছি এটা না হলেই মনে হয় ভালো হতো! তাহলে আম্মুকে বার বার বিভিন্ন ভাবে আমাদের জন্য খাবার তৈরি করতে হতো না, আমাদের দুইজনকে কোথায় কোথায় কার কাছে রেখে অফিসে যাবে তা ভাবতে হতো না, দুইজনকে দুই সময় ঘুম পাড়াতে হতো না! মানে আম্মুর কাজ একটু সহজ হতো আর কি! আব্বুও তো সারাদিন সময় পায় না,আর যাই বলেন না কেন আমাদেরকে আম্মুর মতো কেউ সামলাতেও পারে না। আমিও যদি আহনাফের সমান হতাম তাহলে এক খাবারেই দুজন খেতাম, আবার দুজনকে আম্মু একসাথে অফিস নিয়ে যেতো। আমার তো মনে হয় সেটাই ভালো হতো!
আমারও ভালো হতো!আমিও আহনাফের সাথে বুররররর করে বুদবুদ বের করতাম,কেউ কিচ্ছু বলতো না! কিন্তু চাইলেই কি আর সব হয়?
6 Comments
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot
সালাম আলী আহসান
@otibnp
শওকত শাফি
@showkotshafi
নির্বোধ সুদীপ্ত
@sajalbhowmick



Nice history. Thank you