-
“ভয়ের পুকুর”
এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে ঠিক করলাম আমরা সবাই মিলে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাব। পাশের বাড়ির আমার দুই বান্ধবীও আমাদের সাথে বেড়াতে যাবে। সে এক অনেক মজার ব্যাপার! পরের দিন সকাল বেলা আমরা সবাই মিলে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে উঠে বসলাম । প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। আমার গ্রামের বাড়িতে। ভিতরে সবাই সাগ্রহে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। তাদের অপেক্ষার বাঁধ ভাঙ্গলো আমাদেরকে দেখে । তারা সবাই খুব খুশী হলো আমাদেরকে দেখতে পেয়ে। আমার খুব মজা লাগছে কারন অনেকদিন পর সুশীতল গ্রামে আসতে পেরে। নাওয়া সেরে খাওয়া দাওয়া করলাম। তারপর কিছু সময় একটু বিশ্রাম করলাম। বিকেলে আমার বান্ধবীরা সহ গ্রাম দেখতে বের হলাম। আমাদের বাড়ির কিছুটা দূরে একটা বিশাল পুকুর অনেক পুরনো তাই এখানে লোকজন খুব কম আসে। পুকুর পাড়ে নানা রকম গাছপালা আছে। তারপর পুকুর পাড়ের পাশে নানারকম ধানক্ষেত ও সবজি ক্ষেত আছে। এরচেয়ে বেশি দূর যাওয়ার সাহস হলো না । আমরা ফিরে আসলাম বাড়ীতে। এরপর একসাথে নাস্তা খেয়ে আমরা গল্প গুজব করতে লাগলাম গল্পের যেন শেষ হয় না। অনেক রাত অব্দি আমরা নানারকম গল্প করতে লাগলাম ।এরপর যখনই আমরা শুতে যাব ঠিক তখনই সেই সময় পুকুর পাড়ের দিক থেকে একটা ভয়ানক আওয়াজ এলো। আমরা সবাই ভয় পেয়ে গেলাম তারপর নানা রকম অদ্ভুত অদ্ভুত আওয়াজ শুনতে পেলাম। সেগুলো খুব একটা ভালো ছিল না। কিছুক্ষণ আওয়াজ হওয়ার পর আর কোন আওয়াজ হলো না। আমরা সবাই শুয়ে পড়লাম। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় আমরা তিনজন নাস্তা সেরে পুকুর পাড়ে গেলাম । সকালবেলা পুকুরের রূপ দেখতে খুবই চমৎকার লাগে। কিন্তু রাতের বেলা ঠিক আগের রাতের মতো শব্দ হচ্ছিল। প্রায় কয়েক রাত এমন শব্দ হতে লাগলো কিন্তু আজ রাতে আগের রাতের চেয়েও ভয়ঙ্কর কিছু শব্দ হতে লাগলো ।কি যে ভয়ের তা বলার মত নয়! আমার হাত একদম শিউরে উঠল ।অনেকক্ষণ যাবৎ হতে লাগলো এসব ভয়ানক কান্ড কীর্তি। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে গেল ।জানালা দরজা গুলো বাতাসে দুলতে লাগলো । সারা বাড়ি অন্ধকারে ছেয়ে গেল। জানালা দরজাগুলোর বিকট শব্দ হতে লাগলো। ঘরে এতটা অন্ধকার ছিল যে পাশের মানুষ কেউ দেখা যাচ্ছিল না । কি যে তান্ডব শুরু হলো নিজেও বুঝে উঠতে পারলাম না। জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস আস্তে লাগল । এরপর জানালা দিয়ে একটু বাহিরে তাকাতেই যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না । বাহিরে রাশি রাশি ধোঁয়া উঠতে লাগল। কোথাও কোন আগুনের চিহ্ন নেই অথচ এত ধোঁয়া! ধোঁয়া গুলো বাতাসের সাথে মিশে ঘরে আসতে লাগল। আর সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ হয়ে জানালাগুলো বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ ধোঁয়ার মধ্যে থাকতে থাকতে হঠাৎ এক সময় ধোঁয়া গুলো সব মিলিয়ে গেল । সুন্দর সুগন্ধে সমস্ত ঘর ভরে গেল। ধোঁয়া গুলো কোথায় গেল বোঝা দায়। মনে হল অন্ধকার আরো বেড়ে গেল । হঠাৎ হা!হা!হা! হাসির শব্দ হতে লাগলো । দরজা-জানালাগুলো আপনা আপনি খুলে গেল । আমি ভয়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম । হাসির শব্দ, কান্নার শব্দ হতে লাগলো প্রচন্ডভাবে ।মনে হল শব্দগুলো সব পুকুর পাড় থেকে আসতে লাগলো ।আবার ধোঁয়ায় ঘরটা ভরে গেল এবং পুকুর পাড়ের দিক থেকে সাদা সাদা আলো দেখা গেল । হঠাৎ ভূমিকম্প হওয়ার মত সবকিছু দুলতে লাগলো। মনে হতে লাগলো আমরা সবাই ঘুমের ঘোরে দুলছি। তারপর কী হলো আমার আর মনে নেই কারণ ততক্ষণে আমরা সবাই ঘুমের রাজ্যে চলে গেছি। সকাল বেলা, উঠে চারদিকে তাকিয়ে মনে হলো যেন কিছুই হয় নি। অথচ রাতে এ ঘরে তান্ডব চলেছিল। আমাদের জানালা দিয়েই পুকুর পাড় দেখা যায়। পুকুরটার কি যে শান্ত রূপ দিনের আলোয় ঝলমল করছে। আর রাতে যে কি হয় বলা মুশকিল! তখন আমরা তিন বান্ধবী মিলে ঠিক করলাম রাতে দেখতে যাবো পুকুর পাড়ে আসলে কি হয়। আমরা তিন জন সাহস করে কাউকে না জানিয়ে সন্ধ্যা বেলা পুকুর পাড়ের দিকে গেলাম। আমাদের হাতে টর্চ ছিল যাতে আমরা সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পারি। পুকুরটা খুব পুরনো তাই নানা রকম পুরনো গাছে ভরা। গাছ গুলো সব অদ্ভুত অদ্ভুত দেখতে। পুকুর পাড়ের পাশে কয়েকটি কবর রয়েছে। আমরা টর্চ নিয়ে কবর গুলোর কাছে গেলাম। পুকুরটা খুব ভালো করে দেখলাম। কিন্তু কিছুই শুনতে বা দেখতে পেলাম না। এভাবে অনেক্ষণ কেটে গেল। আমরা আর থাকতে পারলাম না। হতাশ হয়ে যখনই ফিরে আসবো ঠিক তখনই হ্যা! হ্যা! কে যেন হাসতে লাগলো। আমরা চারদিকে আলো ফেলে দেখলাম কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। তাহলে হাসছে কে? এমন সময় হঠাৎ আবার ধোঁয়ায় ভরে গেল আমদের চারপাশ। আর কবর গুলো থেকে মানুষ উঠে আসতে লাগলো। তাদের চেহারা দেখতে পারলাম না। কিন্তু তারা অনেক লম্বা আর সারা শরীর থেকে সাদা আলো চমকাচ্ছে। আমরা তো ভয়ে একে অন্যের হাত শক্ত করে ধরেছি। তারা আমদের অনেক কাছে এসে বলল, “তোমরা কে? আর এখানে কী চাও?” আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, ” আমরা এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। পুকুর পাড় থেকে রাতে অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ শোনা যায় তাই দেখতে এসেছি”। তখন ওরা বলল, “তোমরা কি জান কেন এমন হয়?” আমরা বললাম, “না আমরা কিছু জানি না।” ওরা বলল, “ঠিক আছে আমরা তোমাদের বলবো কেন এই পুকুরটা ভয়ের পুকুর হয়েছে।” আমরা বললাম, “তাড়াতাড়ি বল না হয় আমাদের খুঁজতে বের হবে সবাই কারণ আমরা না বলে এখানে এসেছি।” ওদের মধ্যে একজন বলতে শুরু করলো, “আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা। আমি আর আমার পরিবার তোমাদের এই বাড়িতে থাকতাম। অনেক সুখেই ছিলাম আমরা। কিন্তু একদিন এই সুখের মধ্যে একটা দুঃখ নেমে এলো। তোমার দাদুর দাদু ছিলেন এই এলাকার সরদার। তিনি আমাদের মোটেও পছন্দ করতেন না। তিনি আমাদের উপর মিথ্যা মামলা দিয়ে এ বাড়িটি কেড়ে নেয়। আর সেই দুঃখে আমরা এ পুকুরে ডুবে মরি। আর এই কবর গুলোতে আমাদেরকে সমাধি দেওয়া হয়। এরপর আমাদের আত্মা এই পুকুরে ঘুরে বেড়ায়। আর তোমাদের শান্তি আমরা নষ্ট করার জন্য রাতে ওসব কাণ্ড কীর্তি করি। এখন তোমরা এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাও তাহলে তোমরাও শান্তি পাবে আর আমাদের আত্মাও শান্তি পাবো। এই পর্যন্ত বলে তারা কোথায় যে মিলিয়ে গেল তা আমরা বুঝতেই পারলাম না। ওদের জন্য আমাদের খুব মায়া হলো। যতই হোক তাদের সাথে অন্যায় হয়েছে। বাড়িতে এসে সবাইকে এ কথা গুলো বললাম। আর বললাম সকালেই আমরা সবাই এ বাড়িটি ছেড়ে চলে যাব। সবাই আমার কথায় রাজি হয়ে গেল। সেই রাতে আর কোনো রূপ শব্দ হলো না। সকাল হতেই আমরা সবাই গ্রামের বাড়িটি ছেড়ে চলে গেলাম। এরপর আর কোনো দিন এই বাড়িতে আমরা আসিনি। হয়ত সেই পুকুরে থাকা আত্মা গুলো তাদের পুরনো শান্তি ফিরে পেয়েছিল। সেই পুকুরটি কি এখনই আছে? কে জানে সেই ভুতুড়ে পুকুরটি এখন কি অবস্থায় আছে।
6 Comments
Friends
মোহাম্মদ আফজাল হোসেন মাসুম
@afjalhossain
মীর অনাবিল
@miranabil
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
কাজী জহির আহমেদ
@kazizahirahmed
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Shohag arnob
@shohagarnobgmail-com



ভয় থাকে বেরিয়ে আসো।