Profile Photo

Nushrat MohimaOffline

  • Nushrat-Jahan-Mohima
  • Profile picture of Nushrat Mohima

    Nushrat Mohima

    4 years, 9 months ago

    রহস্যময় বাড়ি

    লন্ডন থেকে দেশে ফিরে একটা মনের মতো বাড়ি খুঁজছিলাম। রাস্তা থেকে দূরে, চারিদিকে নিরিবিলি পরিবেশ, বাড়ির পাশে বাগান থাকবে। সর্বপরি শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে দূরে নির্জন পরিবেশে থাকা। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না ওই রকম বাড়ি। বেশ কিছুদিন পরে রাস্তায় হাঁটতে বের হয়েছি হঠাৎ একটা সাইনবোর্ডে চোখ আটকে গেল। স্বল্পমূল্যে একটি পুরাতন বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে। রাস্তা থেকে ৫০ গজ দূরে বাড়িটি। খুবই কৌতূহল নিয়ে আগাতে লাগলাম।
    ৫০ গজ এসে পুরনো আধভাঙ্গা একটি বাড়ি দেখতে পেলাম। পাশে বেশ সুন্দর ফুলের বাগান। বাড়ির সামনে একটি বিশাল ঝর্ণা। এক দিকে একটি পুকুর আছে। সবকিছুই যেন আমার মনের মতো লাগলো। বাড়ির পাশে একটি ছোট্ট দোতলা বাড়ি। সেখানে বেল দিতেই এক বয়স্ক লোক বের হলো।
    তিনি আমাকে বললেন, “কি ব্যাপার? কাকে চান?” আমি বললাম, “যে বাড়িটি ভাড়া দেয়া হবে আমি তার মালিক কে চাই।” “আমি সেই মালিক”, তিনি বললেন। আমি বললাম, ” চাচা বাড়িটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে যদিও এটা দেখতে বেশ পুরনো তবুও এটি আমার মনের মতো একটা বাড়ি। ভদ্রলোক বললেন, “বেশ তো নিতে পারো বাড়িটি। তবে পুরনো বাড়ি একটু সাবধানে থাকিও। কোন অসুবিধা হলে আমাকে বলিও।” আজ যাই, কালকে বাড়িতে উঠবো এই বলে আমি ভদ্রলোকের বাড়ি থেকে প্রস্থান করলাম।
    রাতে ফ্ল্যাটে এসে সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। সকালে উঠে নতুন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। দশটার মধ্যে পৌঁছে গেলাম। দেখি ভদ্রলোক সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, “তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম Young Man।” তিনি নিজেই আমার জিনিসপত্র উপর তুলে দিলেন। ভিতর দেখতে বেশ ভালো। গুছানো পরিপাটি। তবুও নিজের পছন্দ মতো ঘরগুলোকে সাজিয়ে নিলাম। ভদ্রলোক বললেন, “এইযে ছাদের চাবি প্রয়োজন মতো ব্যবহার কর।”
    একা মানুষ আমি। লন্ডনে পড়াশুনা করেছি। বিয়ে এখন করি নি। তবে রান্না করতে পারি। বিদেশে থেকে এতা ভালোই রপ্ত করে ফেলছি। বিকেলে বারান্দায় বসে চা নাশতা করলাম। সন্ধ্যেবেলা ডিম ভুনা ও ভাত রান্না করলাম রাতের জন্য। রাতে খেয়ে ঘুমাতে গেলাম। হঠাৎ মনে হলো কে যেন সিঁড়িতে হাঁটছে। কে সিঁড়িতে হাঁটছে বলতেই আওয়াজ থেমে গেল। মনের ভুল ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল বেলা বাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম এই বাড়িতে আমি ছাড়া আর কি কোন ভাড়াটিয়া থাকে? তিনি বললেন, “না। পুরনো বলে কেউ থাকে না আর সবাই বলে এই বাড়িতে নাকি ভুত আছে। আমি বললাম, ” তাই নাকি, তাহলে তো ভালোই হলো দুইজন মিলে থাকা যাবে। ভদ্রলোক বললেন, “মশকরা করবেন না। সাবধানে থাকবেন। ” কথা শেষে আমি বাগানে গিয়ে ফুল দেখতে লাগলাম আর ভাবলাম, “এতো সুন্দর পরিবেশের বাড়িতে কি সত্যি ভুত থাকতে পারে?” উত্তর না ভেবেই ঘরে চলে গেলাম।
    রাতের খাবার শেষে একটু দেরিতেই ঘুমাতে গেলাম। হঠাৎ করে একটু দমকা হাওয়া হলো। ভাবলাম, “যাক এই গরমে একটু শান্তি পেলাম।” কিছুক্ষণ পর আবারও সেই অদ্ভুত পায়ের আওয়াজ। আজকে আর কিছু বলল না। দেখি কি হয় এই ভেবে শুয়েই রইলাম বেডে। আওয়াজটি আসতে আসতে সিড়িঁ বেয়ে ছাদে চলে গেল। তারপর ছাদে পায়চারি করতে লাগলো। কতক্ষণ করলো তা মনে নেই কারণ তার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছি আমি। এভাবেই প্রতিটি রাত কাটে আমার পায়ের আওয়াজের পর হাসি কান্নার আওয়াজ শুনতে পাই। মনে হয় এই বাড়িতেই কেউ এসব করছে। মাঝে মাঝে ভয় লাগে আবার ভাবি তা করে করুক আমার তো কোন ক্ষতি হচ্ছে না।
    বেশ কিছুদিন পর আমি দুদিনের জন্য কাজে গেছিলাম। এসে দেখি রুমের মধ্যে একটা খাম পড়ে আছে। তুলে দেখলাম তাতে লেখা,”চলে যাও এ বাড়ি থেকে।” ব্যাপারটি নিয়ে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। দেখলাম চিঠিটি যে দিক দিয়ে এসেছে ওপাশটি বন্ধ। দরজার নিচ দিয়ে এসেছে চিঠিটি। অনেক খুঁজেও ঘরটি পেলাম না অথচ ঘরটি এই বাড়ির মধ্যেই রয়েছে। কী আশ্চর্য! সারাদিন এই ব্যাপারটি নিয়েই ছিলাম। রাতে হঠাৎ এক পুরনো বন্ধু এলো এই বাসায়। সে এসব ভুত প্রেত্ন নিয়ে গবেষণা করে। তাকে খুলে বললাম ব্যাপারটা।
    সে রাতে এই বাড়িতে থাকতে চাইলো। কারণ তার ধারণা আজকে কিছু আসবে দরজার নিচ দিয়ে। তার নির্দেশে আলো নিভিয়ে ঘরে অপেক্ষা করছি রাত ১২ টার পরে সত্যি একটা চিঠি এলো। চিঠি খুলে দেখা গেল লেখা,”চলে যাও আর কারণ জানতে চাইলে বন্ধ ঘরটিতে এসো।” দুই জন মিলে খুঁজে ঘরটির দরজা পেলাম। ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকলাম। এই ঘরে আগে কখনও ঢুকিনি
    ভাঙ্গা জিনিস পত্রে ঘরটি ভর্তি। দেয়ালে ঝুল দেখতে পেলাম। মনে হলো পুরনো এই ঘরের জিনিসপত্র। চিঠিটির উল্টো দিকে লেখা এটি মোমবাতির সামনে ধরে শ্যাটল বলে ডাকতে হবে। চিঠির কথা মতো তাই করলাম। অনেকক্ষণ পর ঘরটি কিছুটা কেঁপে উঠলো। অন্ধকার একটু কমে গেল আর দেয়ালে একটি ছায়ামূর্তি দেখা গেল। রোহিত বললো,”কে তুমি? কী চাও এখানে? ছায়ামূর্তিটি বলল,”আমি শ্যাটল। এটা আমার আর আমার স্বামীর বাড়ি।”
    তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,”অনেক সুখে দিন কাটছিল আমাদের। দুই জনের পরিবার আমাদের। এটা ছিল আমাদের শোবার ঘর। কিন্তু কয়েক বছর পর আমাদের মধ্যে কিছুটা ঝগড়া শুরু হলো। এভাবেই চলতে থাকলো। তারপর একদিন আমার স্বামী আমাকে মারল। আমি ওকে খুব ভালোবাসতাম । তাই ওর এরকম আচরণ আমি মেনে নিতে পারিনি। এই ঘরেই আত্মহত্যা করি আমি। আমার মৃত্যুর পর সে এ বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। তারপর স্বাভাবিক ভাবে তার মৃত্যু হয়।
    আমার আত্মা আজও এ বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। কেউ থাকতে আসলে আমি ওকে ভয় দেখালে সে চলে যায়। এখন তোমরাও চলে যাও। এতক্ষণ আমি চুপ করে সব শুনলাম। রোহিত আত্মার সাথে কথা বলছিল। এবার আমি বললাম,”আমি এই বাড়িতে থাকি। খুব পছন্দের ছিল বাড়িটা আমার। কিন্তু আপনার আত্মার শান্তির জন্য আমি কালকে সকালেই এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।” এরপর ছায়ামূর্তিটি হঠাৎ উধাও হয়ে গেল।
    সারারাত জেগেই রোহিত আর আমি কাটালাম। সকাল হতেই বাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে সব বলে জিনিস পত্র নিয়ে বাড়িটি ছেড়ে চলে গেলাম। হয়তো শ্যাটলের আত্মা আজকে রাতে শান্তিতে থাকবে। বাড়িটি এভাবেই থাকবে ওর আত্মাকে নিয়ে এক রহস্যময় পরিবেশে।

    14
    8 Comments
Skip to toolbar