-
মিলাদ ব্যাপারটা তো উঠেই গেছে। এখন দোয়া-খায়ের চলে। আমাদের সময়ে মিলাদ একটা আকর্ষনীয় বিষয় ছিলো। দাওয়াত খাওয়ার মতোই অনেকটা। মসজিদ থেকে বাসাবাড়ীতেই মিলাদ হতো বেশী। মিলাদের পর লম্বা মোনাজাতের চেয়ে তোবারক কী দেওয়া হবে সেদিকে একটা সজাগ কৌতুহল থাকতো অনেকের মধ্যে। তোবারকের আইটেম এর উপর মিলাদে উপস্থিতি সংখ্যা নির্ভর করতো। বাসা বাড়ীর মিলাদগুলো হতো বৈঠকখানা বা ড্রয়িংরুমে। মধ্যবিত্ত অনেক বাসার ড্রয়িং রুমে, এক সাইডে ছোট একটা খাট বা ডিভান টাইপের থাকতো, যেখানে হুজুর ও অন্যান্য অগ্রজ মুরুব্বীরা বসতেন। আর বাকীরা সবাই ফ্লোরের বা কার্পেটের উপর বিছানো চাঁদরের উপর বসতো। আমার মতো স্কুল ছাত্রের নীচে বসাটাই অবধারিত নিয়ম ছিলো।
আমাদের পাড়ার মিলাদে আরেকটা আকর্ষন ছিলো। তিনি ছিলেন কুতুবউদ্দিন খালু, আমাদের বাড়ীওয়ালা। সেই সময় বছর দুয়েক হলো দারোগার চাকুরী থেকে রিটায়ার্ড করেছেন। কিন্তু চাকুরীজীবনের বিভিন্ন লোমহর্ষক ও আনন্দঘন স্মৃতিকাহিনী উনাকে তাড়া করে বেড়াতো। উনি যেকোন যায়গায় কোন শ্রোতা পেলেই হতো। আচমকা নাটকীয়ভাবে একটা ঘটন বলা শুরু করতেন। উনার গল্পগুলো তো আকর্ষনীয় ছিলোই, আমার বেশী ভালো লাগতো উনি যেই কায়দায় গল্পগুলো শুরু করতেন। দেখা যেতো, মিলাদে তখনো সব নিমন্ত্রিতরা এসে পৌছায়নি, হুজুর হয়তো এসেছেন। মুরুব্বীদের মধ্যে কুতুবউদ্দিন সাহেব এসেছেন বেশ আগেই। মুরুব্বীরা নিমন্ত্রিত হুজুরের খোশ-খবর নিচ্ছিলেন। তারপর কথা চালানোর জন্যে আর কথা আসছিলো না, এমন সময় কুতুবউদ্দিন সাহেব শুরু করতেন তাঁর স্মৃতির ঝুলি থেকে নিয়ে। যেমন তিনি উপস্থিত মুরুব্বিদের উদ্দেশ্য করেই শোনাতেন, “সময়টা মাগরীবের আগেই হবে। আমি তখন নেত্রকোনায়, মাত্র বদলি হইছি ২ সপ্তাহ হবে। দেখতে পাইলাম একজন মাঝ বয়েসী লোক দৌড়াইতে, দৌড়াইতে আমার বাসার গেইটের দিকে আসতেছে। তার হাতে একটা শটগান। নিমিষেই আমার হাত চইলা গেলো হোলস্টারে। তারপর অবাক কইরা দিয়া সে…….. ”
এমন সময় গৃহকর্তা ভেতর থেকে এসে হুজুরের উদ্দেশ্যে বলার চেষ্টা করলো, “সবাইতো মনে হয় আইসা গেছে, আর দেরী করলে মাগরিবের সময় হয়ে যাবে। আমরা মনে হয় শুরু করতে পারি। কী বলেন, হুজুর।” গৃহকর্তা জানতেন না, এখানে একটা ইন্টারেস্টিং গল্প সবাই শুনছিলেন। এমন কি স্বয়ং হুজুরও যে মশগুল ছিলেন।
হুজুর বলার চেষ্টা করলো, “হ্যা শুরু তো করবোই। দারোগা সাহেব কিছু একটা বলছিলেন। মুরুব্বী মানুষ, আমরা শুনতে পারি। মনে হয় সংক্ষেপেই শেষ করে ফেলবেন। কী বলেন”। বলে উনি এমন একটা হাসি দিলেন, কুতুবউদ্দিন সাহেব যেনো গ্রীন সিগন্যাল পেলেন গল্পে ফিরে যাবার জন্যে। তিনি আবার শুরু করলেন। কিন্তু এবার বেশ সংক্ষিপ্ত করেই বাকী অংশটুকট বলতে লাগলেন। দেখা গেলো উপস্থিত সবারই একপ্রকার সায় ছিলো। পরিবেশটা গৃহকর্তারও বুঝতে বাকী রইলো না।
এইরকম ভাবে আমি ও আরো অনেকে কুতুবউদ্দিন সাহেবের বেশ কিছু গল্প শুনেছিলাম বিভিন্ন মিলাদের অনুষ্ঠানে। অনেক সময় বিভিন্ন আলাপচারিতার প্রসঙ্গেই প্রাসঙ্গিক ভাবে গল্পগুলো শুরু হতো। উনার ব্যাক্তিত্ব ও নাটকীয় উপস্থাপনের জন্যই কিনা, আমরা অনেকেই মন্ত্রমুগ্ধের মত নির্বাক শ্রোতা হয়ে সেই গল্পগুলো শুনতাম।
মাঝে মাঝে আমাদের বাসায়ও তিনি আসতেন, বাড়ীওয়ালা বলে নয়, গল্প করার তাড়না থেকে হবে হয়তো। আত্মীয় আপনজনদের কাছে গল্প শুনে যতটা না আনন্দ পেয়েছি, তার চেয়ে ঢের আনন্দ পেয়েছি কুতুবউদ্দিন সাহেবের কাছে গল্প শুনে। উনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, আজকে অনেক বছর হবে। তবে উনার গল্প বলা নিয়ে স্মৃতি, আমার হৃদয়ে এখনো বেঁচে আছে।
ধন্যবাদ সবাইকে, ধৈর্য নিয়ে পড়ার জন্যে।
“ছেলেবেলার গল্প বলার মানুষ”
স্মৃতি রোমন্থনে – কাজী মাহবুবুর রহমান ( জুয়েল)1 Comment
Friends
Tayeba Islam
@tayeba-islam
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
তুলট ডেস্ক
@toulot
Rejwana Khan
@rejwana-khan
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
@mohammad-shahzaman


I want legible. Good luck