-
-পানপাতাটা মেলে ধরো।আর কতোক্ষন ছেলেটা এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে?
-কী রে,সরা,পিড়ি ধরে থাকতে থাকতে যে হাত ব্যথা হয়ে গেছে।
-মুখখানা দেখাও তো বাপু,বউ এর মুখ দেইখা খাইতে বসমু।সকলের বহুবার বলার পর মুখ থেকে পানপাতা সরালো প্রতীমা।গাঢ় খয়েরী রঙের বেনারসীতে বেশ মিষ্টি লাগলে ও শারীরিক গঠনে একটু বেশীই মোটা সে।গায়ের রঙ তেমন বেশি সাদা নয়।অনেকটা ঘি গলিয়ে নিলে যেমন হয় তেমন।জোড়া ভ্রু,চিকন ঠোট আর ভাঙা গালে তাকে বউ সাজে বেশ মানিয়েছে।কিন্তু সকলে কি সেই সৌন্দর্য স্বীকার করবে?
ছেলেবাড়ির মধ্যে থেকে একজন তো বলেই ফেললো -‘এমা বউয়ের রং দেখি চাপা।’বিয়ের কনে এবং কনের আত্বীয়স্বজনের সামনে এইসব কথা যে শোভা পায় না তা বোধহয় এরা জানে না অথবা জানলে ও হয়ত গুরুত্ব দিচ্ছে না নিচু জাত বলে।পাত্রীর মুখ দেখার পর পাত্র একপলক তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলেছে।বোধহয় বেশি লজ্জাশীল। প্রতীমা মনে মনে ভাবলো- ‘বেশ ভালোই হলো।ও বেশি বেশি মজার কথা বলবে আর তিনি লজ্জায় মাথা নিচু করে ঘর থেকে বের হয়ে যাবে আর প্রতীমা হাসতে হাসতে কুটিকুটি হবে।
‘আচ্ছা, সে ও কি আমার মত বৃষ্টি পছন্দ করে?যখন প্রচন্ড ক্ষিদে পায় তখন কি লবন মরিচ দিয়ে পেয়ারা খায়?গরম কালে কি পুকুরে একঘন্টা ধরে সাতার কাটে?বর্ষাকালে মেঘের জন্য চাঁদ দেখা যায় না।তিনি ও আমার মতো বর্ষাকালে আকাশে চাঁদ খুজার মত পাগলামি করবে?মাঝে মাঝে কি নৌকা করে এই গ্রাম থেকে ওই গ্রামে নিজে মাঝি সেজে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে??তার ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে কমলা রঙের চাদর পেচানো পুরোহিত বলে উঠলো -‘ লগ্নের সময় আর বেশি নেই।তাড়াতাড়ি মালাবদল করো।’
একে একে মালাবদল,সম্প্রদান,সাতপাক সবকিছুই ভালমতো সম্পন্ন হয়েছে।তবে সাত পাকের সময় প্রতীমা শাড়ী পেঁচিয়ে পড়ে যেতে নিয়েছিলো।কিন্তু সঞ্জয় ধরে ফেলেছিলো।ধরেই মাথা নিচু করে আবার উঠে দাঁড়িয়ে ঘুরা শুরু করেছিলো।সঞ্জয় হচ্ছে বরের নাম।এই কান্ডে আশপাশ থেকে অনেক হাসাহাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।সাহস হয়নি সেদিকে তাকানোর।সম্প্রদান করার সময় বাবার মুখ দেখে মনে হয়েছিলো অনেক খুশি তিনি।মনে হয়,ঘাড় থেকে বোঝা কমে যাচ্ছে কিংবা বড় মেয়ে বড়লোকের বউ হচ্ছে তাই।কিন্তু সেই হাসি বেশীক্ষন রইলো না।পুরোহিত যখন পিতলের চামচে সিঁদুর ভরে পাত্রের হাতে তুলে এগিয়ে দিয়েছিলো তখন পাত্রের মা কয়েকজন মানুষ আর একজন সুন্দরী মেয়েকে সাথে নিয়ে বিয়ের আসরে এসে উপস্থিত হলেন।শাশুড়ি দেখতে সুন্দর,হালকা মোটা,গায়ে স্বর্ণের ভারি গহনা।ওই গহনা দেখে প্রতীমার মনে হলো সেই গহনার টাকা দিয়ে তাদের পুরো বছর চলে যাবে।এত বড়লোক ঘরে বিয়ে হচ্ছে আমার? সামলাতে পারব ত সব কিছু?ছেলের মা এসেই উচ্চস্বরে বলল- ‘এই বিয়ে হবে না।’মাথা নিচু করে ছিল প্রতীমা।এই কথা শুনে প্রতীমা মাথা তুলে সঞ্জয়ের দিকে তাকালো।কিন্তু তার মার কথা শুনে তার ভিতর যে খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হলো না।তবে মনে মনে যে একটু অবাক হয়েছিলো সেটা মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছিল প্রতীমা।পাত্রীর বাবা হরিদাস পাল বললেন- “কেন মা জননী,এইরকম কেন করচ্ছেন?মেয়ে আমার খুব লক্ষী।রাধতে জানে,ঘর গোছাতে জানে।আপনাদের বাড়িতে একবারে শ্রী ফিরে আসবে ওর গোছানোতে।আর যৌতুকের টাকা ও আমি মাস শেষে বেতন থেকে কেটে আস্তে আস্তে দি…..”
-তার কোনো দরকার নেই।আমি তোমার মেয়ে কে আমার ছেলে বউ হিসাবে মেনে নিতে চাই না।
-কেনো…..
-তোমার মেয়ের গায়ের রঙের দিকে তাকাও।দেখতে পেরেছো কি ময়লা।আর যৌতুকের দুই লক্ষ টাকা তুমি হাতে হাতে দিতে পারো নি।তাছাড়া অপেক্ষা করার ধাত নেই আমার আবার।আর তাছাড়া আমার একমাত্র ছেলের বউ হবে সুন্দর,শিক্ষিত,বুদ্ধিমতী। কি দেখে যে সঞ্জয়ের বাবার এই মেয়েকে পছন্দ হলো বুঝতেই পারছি না। এই যে দেখতে পাচ্ছো এই মেয়েকে,ওর নাম পুষ্প।ওর বাবা আমাকে একদম হাতে হাতে নগদ দুই লক্ষ টাকা আর বিয়ের জন্য তিন ভরি গহনা দিচ্ছে।মেয়েকে সাজালেই দেখতে পাবে।আর মেয়ের রুপ ত দেখতেই পাচ্ছো।
-জননী,আমার মেয়ের কি হবে?ও যে লগ্নভ্রষ্টা হয়ে যাবে।(কাদতে কাদতে বলল হরিদাস পাল)
-তা বাপু তুমি জানো,তোমার মেয়ের কি হবে না হবে তা বলি কি করে।বিয়ে ত এখন ও হয়নি। হলে না হয় আমার একটা দায় ছিলো।দেখেছো গো মেয়ে, এই ছেলে তোমার স্বামীই হবে, না হয় এতক্ষন বিয়ে টিয়ে হয়ে বিদায় অনুষ্টান হয়ে যেত।কথাটা পুষ্পর দিকে ফিরে বলল।
এই কথা শুনে পুষ্প একদম মাথা নিচে নামিয়ে ফেলল।বুঝা যাচ্ছে যে লজ্জা পাচ্ছে ভীষন।আর তার প্রতীক হিসেবে রয়েছে মুখের সেই হাসি।দুই গাল একদম লাল আভা ধারন করেছে লজ্জার কারনে।এই সব কিছু তাকিয়ে দেখছে প্রতীমা।একবার সঞ্জয়ের দিকে তাকালো।দেখলো মুখ নিচে নামানো।এতো টাই নামানো যে পাশ ফিরে দেখা যাচ্ছে না তার মুখের অভিপ্রায়।
-এই কে আছিস?যা, ওকে নিয়ে না।ভালোমত সাজিয়ে আনবি।আর যে গয়না গুলো আছে সবগুলো শরীরে পরাবি।একটা ও যেন বাদ না যায়।
ছেলের দিকে দেখলো যে তার ছেলে এখন ও প্রতীমার সাথেই বসে আছে।তার উদ্দেশ্য বলল- সঞ্জু বাবা বসে আছো কেন?উঠে এসে আমার পাশে বসো। ওর সাজতে যতক্ষন লাগে ততক্ষন অপেক্ষা করবে।না হয় মেয়ের অনেক ভাইবোন আছে তাদের সাথে আলাপ করবে।উঠে এসো।
প্রতীমা ভেবেছিলো হয়ত সঞ্জয় উঠবে না। বলবে – না মা,আমি প্রতীমাকেই বিয়ে করবো।শুধু তো সিদুরদান বাকি।ওটা হলেই বিবাহসম্পুর্ণ।কিন্তূ না সে কিছুই করলো না।
কি অদ্ভুদ সে উঠে গেলো।কয়েক মিনিট আগেও যার সাথে সাতপাক ঘুরলো,যার সাথে গাঁথছড়া বাধলো সেই গাঁথছড়া ছিন্ন করে চলে গেলো।
সঞ্জয় উঠে মায়ের পাশে গিয়ে বসলো।একবার প্রতীমার দিকে তাকালো।দেখলো প্রতীমা আহত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।সে চোখ নামিয়ে আনলো।দোষীদের মাথা উঁচু করার অধিকার নেই।প্রতীমা সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবছে – ‘একবার কি প্রতিবাদ করতে পারতো না সে?একজন কে বিয়ে করতে এসে অন্যজনকে বিয়ে করে নিচ্ছে।কোনো শৃঙখলা নেই এই সমাজের।
টানা দুইঘন্টা পর লাল বেনারসি পরে আসলো কনে।কী অর্পূব লাগছে তাকে!এমনিতেই সে সুন্দরী।তার উপর এতো সাজগোজ দেখে মনে হচ্ছে স্বর্গ থেকে কোনো দেবী এসে নেমেছে।কিন্তু তার রুপের বেশিরভাগই তো কৃত্রিম।তার সাদা ধবধবে ত্বকের নিচে প্রতীমার সেই গোলগাল ঘি রঙের ত্বক হেরে গেলো।চোখের সামনে নিজের আধ-স্বামী অন্য মেয়েকে সিঁদুর পরালো অথচ যেটা আমার প্রাপ্য ছিলো।এই কথা ভেবেই কেন জানি হাসি পেলো।পাশে বাবা কান্নাকাটি করছে।বুঝতেই পারছে না কান্নাকাটি করে আর যা ই হোক মানুষের ভাগ্য বদলানো যায় না।যদি যেত তবে সকলে চেষ্টা বাদ দিয়ে দুঃখদেবীর কাছে কান্নাই ভিক্ষা চাইতো।
জীবনে অনেকভাবে পাত্রীবদল হয়েছে কিন্তু এইরকম কি হয়েছে?শুধুমাত্র যৌতুকের টাকা আর মোটা, কালো হওয়ায় বিয়ে হলো না।এই কি তবে সমাজের নিয়ম?টাকা আর রুপের কাছে গুণ কি তুচ্ছ?এই স্থানে এত বড় ঘটনা ঘটে গেলো, অথচ কেউ প্রতিবাদ করলো না।কিন্তু নতুন করে যখন বর-বউ সাতপাক ঘুরছিলো কত ফুলের পাপড়ি, শাখের ধবনি শোনা যাচ্ছিলো।অবশ্য তাদের মতে এটাই ঠিক ছিলো।কিন্তু আজ যে একটা মেয়ের সারাজীবনের সুখ চলে গেলো সেজন্য কি কেউ সহানুভূতি দেখাবে?কেউ কি এই পাত্রীবদল হওয়ার প্রতিবাদ করবে?কে দিবে এইসব প্রশ্নের উত্তর?..কে???…….গল্পের নাম : “পাত্রীবদল”
লেখনীতে : “মুসকান হিম্রাদিতা – ছদ্মনাম ”[দয়া করে কেউ কপি করবেন না।ভাল লাগলে লাইক,শেয়ার করে পাশে থাকবেন]
7 Comments
Friends
Jahin Hashem Chowdhury
@jahinhc
Humayun Kabir Surjo
@humayunkabir-surjo
Foyzur Khan
@foyzur-khan
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
Kabi Doctor Mohammad Zakir Hossain Biplob
@zakir-hossain
Al mamun abdullah
@almamunabdullah
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
মোঃ ফয়সাল আহমেদ
@foysalk1119
মোঃ মুহিউদ্দীন
@md-muhiuddin



সুন্দত লেখা। অভিনন্দন।