Profile Photo

Shah KamalOffline

  • kuriparahs112384
  • Profile picture of Shah Kamal

    Shah Kamal

    4 years, 7 months ago

    ধারাবাহিক গল্প
    :::::::::::::::::::::

    #জমশেদ আলীর মেহমানদারী

    —— শাহ্ কামাল

    (৩)
    গোলাপজাম বিবি পুকুর ঘাটে ওযু করে ঘরে এলো। ঘোমটা টানা মুখ। নামাযের সালাম ফিরিয়ে ধ্যানে বসেছে। সমাজ সংসারে এমন দু এক জন না হলে চলে না। ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে কঠিন ধরিত্রী আজ তাঁর ধ্যানের সাথে একাত্ম হয়ে যাবে। কতো ভাবনার বিস্তৃতি যেন তাড়া করছে তাকে। সামনে একটা মাটির কুপি। টিপটিপ করে জ্বলছে। বাইরের আলো বাড়ছে। কুপিটা ফু মেরে নিভিয়ে দিলো গোলাপজাম বিবি।
    হঠাৎ মাইকে ঘোষণা হল,
    “ভাইসব! আপনাদের জানানো যাচ্ছে যে, আগামী শুক্রবার বাদ জুমা জমশেদ আলী জমু’র বাড়ি সকল মুরুব্বীদের মেহমানদারী করাবে জমু ভাই। আপনারা আমন্ত্রিত।”
    পরপর দু বার মসজিদের মাইকে ঘোষণাটি ঘোষিত হলো। মন দিয়ে শুনলো গোলাপজাম বিবি।
    ধীরে ধীরে সে জমুকে ডাকলো,
    – চম্পার বাপ…?
    জমু ঘুমুচ্ছে। গরমের দিন শেষ। এমন সময় সবারই একটা শান্তির ঘুম হয়। গরম লাগে না; শীতও করে না।
    গোলাপজাম বিবি আবার জমুকে ডাকলো,
    – চম্পার বাপ…?
    আড়মোড়া দিয়ে জমু’র উত্তর,
    – কী হইছে বউ?
    গোলাপজাম বিবি কাছে এলো জমু’র। হাঁটার ধরন দেখে বোঝা যাচ্ছে সে রেগে ফোঁসফাঁস করছে।
    – কী শোনলাম মাইকে? আফনে মেহমানদারী করাইবেন?
    গোলাপজাম বিবি প্রশ্ন করে জমুকে।
    – হ। সামনের শুক্কুর বার। জুমা বাদ। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত, বউ।
    জমু’র রেকর্ড করা উত্তর।
    – করছেন কিডা….
    – ক্যান, বউ?
    – মাইকে বললে মেলা মানু হইবো। এত মানু….
    – চিন্তা কইরো না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ব্যবস্থা কইরা দিবো।
    বিছানা হতে উঠে বসলো জমু।
    গোলাপজাম বলতে শুরু করলো,
    – বুদ্ধি সুদ্ধি হইলো না আফনের। টেকা পাইবেন কই? থালা বাটিও তো লাগবো।
    ওর কথায় পাত্তা দেয় না জমু।
    – অতো চিন্তা কইরো না, বউ। তুমি কাওরে বলবা? তোমার জ্বিন সাধনের আছে কেউ? দাওয়াত দিলে দিও।
    জমু’র কথা কিছুটা মেজাজ বিগরায় গোলাপজাম বিবি। মুখ পর্যন্ত লম্বা ঘোমটার জন্য তাঁর রাগ বোঝা যায় না। তবে জবাবের ধরণে তা সহজেই আঁচ করা যায়,
    – লাগবো না। আমার কাউরে বলা লাগবো না। ঠেকলে আমারে বললে টেকা পয়সা দিতে পারুম না। নিজের ভাত খায় লতা পাতা দিয়া উনি হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের ভাত খাওয়াইবো; গরম ভাত!
    এ কথা বলে সামনে থেকে চলে যায় জমু।

    জমু আর চম্পা রান্না ঘরে। রান্না ঘর বললে ভুল হবে। কচু পাতা যেমন মাথার উপর ছাতার মতো বড়ো একটা পাতা নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে তেমনি একটা ভাঙাচুড়া চালা মাথার উপর। চারদিকে বেড়া নাই। নিচে একটা চুলা। চোখ ধোঁয়ায় লাল করে চাল ভাজছে জমু আর তাঁর মেয়ে। একটা বাটি হাতে নিয়ে চম্পা বসে আছে। বাটিতে চাল ভাজা মাখিয়ে খাবে কাঁচা মরিচের কুচি আর পেঁয়াজ দিয়ে। সরিষার তেলও আছে। জমু’র ঘরে কিছু থাক আর না থাক কাদির মিয়ার ঘাই ভাঙানো সরিষার তেল উদিন-সুদিন বারোমাস থাকে।
    বাতাসার নানী। সত্তর বয়স শেষ করে আশির দিকে চলছে। মাইকের ঘোষণা তাঁর কানেও পৌঁছেছে। গ্রামে মাইকের ঘোষণা কয়েকজন শুনলেই হলো। বাদ বাকিরা অন্যদের কাছে শুনে নেয়। বাতাসার নানী কারো কাছে শোনেনি। সরাসরি মাইকেই শুনেছে নিজের কানে। বয়স যতোই হোক বাতাসার নানী ফুলপুরের নিউজ টুয়েন্টি ফোর। আশে পাশের কয়েক তল্লাটের তাজা খবর তাঁর চ্যানেলে রিজার্ভ থাকে। এখন সমস্যা হলো মাইকে মুরুব্বীদের দাওয়াতের কথা বলা হয়েছে কিন্তু মুরিব্বী কী শুধু পুরুষরা নাকি মহিলারাও দাওয়াত পাবে? বাতাসার নানী এই প্রশ্নের উত্তর দরকার। জমু’র বাড়ি না ঢুকেই উঠোন হতে তাঁর গলা হাকানি,
    – কিরে জমু, কী শোনলাম? মেহমানদারী করাবি নি?
    – বাতাসার নানী গো….. আফনের শইলডা ভালা নি?
    চুলায় চাউলের ভাজায় এক হাত নাড়তে নাড়তে জমু’র উত্তর দেয়।
    – হ। ভালাই।তর বউ কই? চম্পা, ও চম্পা তর মায় কই?
    – মা ঘরে। চম্পা উত্তর দেয়।
    জমু’র চাল ভাজা শেষ। পেঁয়াজ মরিচ কাটতে হবে। বাতাসার নানীর বয়স বাড়লেও শরীরের তেজ কমে নাই; এখনো দু’চোখ বন্ধ করে অনেক কাজ করে ফেলে। জমুকে বটি হাতে নিতে দেখে নিজেই বটি নিয়ে নেয় জমু’র হাত থেকে। পেঁয়াজ ছিলতে ছিলতে বলে,
    – কী রে জমু? মাইয়া ছিলারা দাওয়াত পাইবো তর?
    – দাওয়াত দিসি কইলো ক্যাডা?
    – মাইকে শোনলাম।
    – কী শেনছন?
    – ভাইসব..বইলা কি জানি…
    – কথা তো তয় পরিষ্কার।
    – মাইকে ত ভাইবোইন সাব বলে নাই।
    – নাহ। হেইডা বলে নাই।
    পেঁয়াজ কাটা বন্ধ হয় বাতাসার নানীর।
    জমু বাতাসার নানীকে শুক্রবার জুমা বাদ দাওয়াতের কথা পাশের গাঁয়ে বলতে না করে। তাঁর মুখের কোন ঠিকঠিকানা নাই। কোথায় কী বলে বসে। মহিলাদের দাওয়াত না করলেও জমু বাতাসার নানীকে শুক্রবার সকাল সকাল ওর বাড়ি আসতে দাওয়াত দেয়।
    বাতাস নানী বাটিতে পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ, সরিষার তেল আর লবণ হাতে কচলে তাতে চাল ভাজা মাখায়।
    জমু, চম্পা আর বাতাসার নানী আয়েশ করে চাল ভাজা খেতে খেতে গল্প করে।
    চাল ভাজা ওদের খুব পছন্দের খাবার। সকাল বেলা নাহয় সন্ধ্যা বেলা মাঝে মধ্যে ওরা খায়।
    গল্প করার ফাঁকে ফাঁকে চাল ভাজা খেতে থাকে তিন জনেই। গোলাপজাম যোগ দেয় না ওদের সঙ্গে।
    (চলবে)

    10
    9 Comments
Skip to toolbar