-
অনুবাদগল্প
রঙ
মূল : আদহাম আদিল
অনুবাদ : মোঃ খালিদ সাইফুল্লাহ সাদিছেলেটি জন্ম থেকেই অন্ধ। জন্মের এক বছর না পেরোতেই ডাক্তার তার মাকে জানায়, ‘দুঃখিত মহোদয়া, আপনার ছেলে অন্ধ।’
এরপর পেরিয়ে যায় কয়েক বছর। এক সকালে ছেলেটি তার মাকে প্রশ্ন করে, ‘মা, আমাকে বলো তো রঙ কী?’
ক্ষণিকের জন্য হতভম্ব হয়ে যান মা। দ্বিধান্বিত কণ্ঠে জবাব দেন, ‘রঙ তো রঙই বাবা!’
‘তা তো জানিই। কিন্তু আমি জানতে চাইছি রঙ দেখতে হয় কেমন?’
মা এক ভরাট দীর্ঘশ্বাসমাখা দৃষ্টিতে তাকান তার ছেলের দিকে। ছেলের চোখে ধরা পড়ে না তা। অতঃপর বলেন, ‘রঙ হচ্ছে বস্তুর নাম। যেমন ধরো, লাল রঙ হচ্ছে গিয়ে টুপির রঙ। হলুদ হচ্ছে জামার রঙ। নীল হচ্ছে পাজামার রঙ। সাদা হচ্ছে জুতার রঙ। সবুজ হচ্ছে জ্যাকেটের রঙ আর কালো হচ্ছে গিয়ে বোরকার রঙ।’
এবারে খানিকটা নীরবতা ছেলেটির মুখে। একটুপর সে বলে উঠে, ‘কিন্তু আমি জানতে চাইছি এই রঙ প্রকাশ পায় কীভাবে?’
মায়ের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নীরব অশ্রু। তাঁকে ঘিরে নেয় হীমশীতল নীরবতা। এ প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা নেই। জানা ছিল না কখনও।
মা কড়া নাড়েন এক ব্যক্তির দরজায়। লোকেরা বলেছে, তিনি মাদরাসায় শিশুদেরকে পড়ান। দেখা গেল লোকটি দেখতে খাটো হলেও তাঁর আকৃতি বিশাল। যেভাবে ভূমির প্রান্তকে ছুঁয়ে যায় নদীর জল, তেমনি করে বার্ধক্য ছুঁয়েছে তাঁকে। নাকের উঁচুতে ছোট্ট একটি চশমা আর সামনে খুলে রাখা ঢাউস সাইজের একটি বই।
‘কী ব্যাপার নিয়ে এসেছেন জনাবা?’ ভদ্রলোক অত্যন্ত মোলায়েম কণ্ঠে কথাটি বললেন।
মা তখন ব্রীড়াবনত। পেছনে তাঁর সন্তান। বিনীত কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘জনাব, আমার অসহায় ছেলেটির প্রশ্নের কোনো সমাধান আছে কি আপনার কাছে?’
‘কী তার প্রশ্ন? শুনি তো!’ মুচকি হেসে বললেন লোকটি।
মা পেছন থেকে তার ছেলেকে এগিয়ে আনলেন। কাঁধে আদর করে কথা বলতে বললেন তাকে।
‘আমি জানতে চাই রঙ কী?’
প্রশ্নটি করার সময় ছেলেটির দৃষ্টি ছিল পার্শ্ববর্তী দরজাটির দিকে।
লোকটি ভাবনার সাগরে দিলেন ডুব। দীর্ঘক্ষণ পর জবাব দিলেন, ‘বাছা, রঙ হচ্ছে আমাদের অস্তিত্বের নানাবিধ প্রকৃতি। যেমন, লাল হচ্ছে রক্তের রঙ। হলুদ হলো সূর্যের রঙ। নীল রঙ আকাশের। চাঁদের রঙ সাদা। গাছের রঙ সবুজ। আর রাতের রঙ হচ্ছে কালো।’
ছেলেটি তার মেয়ের আঁচল ধরে ফিস ফিস করে বলল, ‘আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে । কিছুই বুঝিনি আমি।’
এক প্রতিবেশী মাকে বললেন, আমি এক জ্যোতিষীর কথা জানি। যিনি দূরের ঐ গ্রামটিতে এক প্রাচীন মন্দিরে থাকেন। তিনি জানেন আকাশ-মাটির রহস্য আছে যত। মা তার অন্ধ ছেলেকে কোলে করে নিয়ে যান সেই দূরের গ্রামে। ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই জ্যোতিষীর দরজায় নাড়েন কড়া।
জ্যোতিষী দেখতে কাঠির মতো ক্ষীণকায়। শুভ্র পরিপক্ক কেশের আড়ে পাহাড়ের মতো লম্বা তার ঝুঁটি। চোখ দুটো কোটরাগত। সরু নাক, কৃষ্ণকায় মুখাবয়ব। শরীরে আঁকা উলকি। পৃথক করা যায় না কোনটি তার বুক, কোনটি তার পেট। তার শরীরজুড়ে অলংকারের দোকান। নববধূর শরীরেও থাকে না এত অলংকার তার অভিসারের রাতে।
মা অভিবাদন জানালেন তাকে। সে মাথা ঝুঁকে প্রত্যুত্তর জানাল। অতঃপর কান্নাভেজা কণ্ঠে মা বললেন, ‘ওহে সাধু, আপনার কাছে আমার অসহায় ছেলেটির প্রশ্নের আছে কি কোনো উত্তর?’
সাধু-শান্তকণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘বলুক সে, কী তার প্রশ্ন?’
মায়ের কোল থেকে নেমে ভূমির পৃষ্ঠ ছুঁয়ে ছেলেটি বলল, ‘আমি জানতে চাই রঙ কী?’
সাধু ক্ষণিকের জন্য নীরব থেকে জবাব দিলেন, ‘রঙ হচ্ছে গিয়ে আওয়াজ। লাল হচ্ছে চিৎকারের আওয়াজ। হলুদ আওয়াজ বাতাসের। বৃষ্টির আওয়াজ নীল। শিশুর আওয়াজ সাদা। নিঃশ্বাসের আওয়াজ সবুজ। আর কালো হচ্ছে মৃত্যুর আওয়াজ। এবার বুঝেছ?’
ছেলেটি জড়িয়ে ধরলো তার মাকে। বলল, ‘নিয়ে যাও আমাকে এখান থেকে মা। এই লোকটি আমাকে ভয় দেখাচ্ছে।’
এবার মা তাঁর ছেলেকে রাখলেন বাচ্চাদের গাড়িতে। তাকে নিয়ে চললেন এক জাদুকরের কাছে। দূরের এক কেল্লায় থাকে সে। লোকমুখে শোনা যায়, সে জানে মৃত্যুর মহলের কথা। বরযখের জগতে শাস্তির মুখোমুখি রুহগুলোর হতভম্বকারী প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয় সে। কিন্তু প্রশ্নের উত্তরের বিনিময়ে সে নেয় মানুষের প্রাণ। প্রশ্নের উত্তরের বিনিময়ে মা নয় তো ছেলে, যে কারও প্রাণের মায়া ছাড়তে হবে এখন। জাদুকরের দাঁড়িয়ে থাকা আর ঝুঁকে থাকা এক সমান মনে হয়। সে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আবৃত করে রেখেছে এক বৃহৎ ঢোলা চাদর দিয়ে। মাথায় তার বিরাট এক টুপি। শরীর থেকে শুধুমাত্র দুটি হাতই পাচ্ছে পৃথিবীর মুক্ত বাতাস। যে দুটি হাতের আঙুলে আছে দানবীয় নখ।
মা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘ওহে বিরাট জাদুকর! আমি এসেছি সেই দূরদেশ থেকে। জানতে চাই আমার অন্ধ ছেলেটির প্রশ্নের জবাব আপনার কাছে’।
‘এর মূল্যে কী দিতে হবে জানা আছে কি তোমার?’
টুপির ভেতর থেকে এক ভীতি-জাগানিয়া কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হলো শব্দগুলো।
‘আমি তা ভালো করেই জানি!’ ছেলেকে শেষবারের মতো আলিঙ্গন করতে করতে উত্তর দিলেন মা। ছেলের গালে লেপে দিলেন মমতার চুম্বন। চোখজুড়ে তাঁর কান্নার ঢল। ছেলেকে মাটিতে বসিয়ে দিয়ে মা মনোযোগী হলেন জাদুকরের দিকে। জাদুকর খুলে দিল তার ঢোলা চাদরের গৃহের দরজা। মা প্রবেশ করলেন তাতে। অতঃপর চাদর দিয়ে চেপে ধরা হলো তাঁকে। ক্ষণিকের চিৎকারের পর মূর্ছা গেলেন তিনি। উড়ে গেল তার প্রাণ বায়ু ধরা ত্যাগ করে।
এবার জাদুকর তাকালেন ভূমির কোলে বসা ছেলেটির দিকে। বজ্রসম কণ্ঠে তাকে বললেন, ‘বলো, কী তোমার প্রশ্ন?’
ছেলেটি শব্দের উৎসের প্রতি লক্ষ্য করে উত্তর দিল, ‘আমি জানতে চাই রঙ কী?’
উত্তর দিতে গিয়ে হয়রান হয়ে গেল জাদুকর। পেল না এই প্রশ্নের কোনো উত্তর। হতাশ হয়ে কাছের বৃক্ষটির ঢালে বসে থাকা বিরাটাকারের ঈগলটিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করল ছেলেটিকে ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে। ঈগলটি মুহূর্তেই ছোঁ মেরে নিয়ে গেল তাকে। অতঃপর নিক্ষেপ করল তার গ্রামের বিলে।
এরপর নিজ গৃহে একাকী ক্রন্দনরত জীবন কাটল ছেলেটির কয়েক বছর। অপেক্ষায় ফিরে আসবে তার মা। নিয়ে আসবে তার কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তর। কিন্তু তার প্রশ্নের আসে না কোনো উত্তর। হারিয়ে যাওয়া মা আর আসে না ফিরে। এক বিকেলে সে বসেছিল বিলের ধারে এক কাকতাড়ুয়ার পাশে। এমন সময় এক অপরিচিতা মেয়ে তাকে বলল, ‘কাকতাড়ুয়ার পাশে বসে আছ কেন?’
‘সে যে আমারই মতো’।
‘তা কী করে হয়?’
‘কারণ, সে পারে না কথা বলতে। আর আমি পারি না দু চোখ দিয়ে দেখতে। এই পৃথিবীর উঠোনে আমরা দুজন কেবলই পুতুল’।
‘তুমি কেনই-বা দেখতে চাও?’
মেয়েটি বুঝতে পারল সে খুবই অবান্তর এক প্রশ্ন করেছে। তাই সে দূরে সরে যায় নীরবে।
ছেলেটি জবাব দেয়, ‘কারণ আমি জানতে চাই, কী সেই রঙ?’
‘এটি জানা কি এতই গুরুত্বপূর্ণ?’
‘নিঃসন্দেহে। এর জন্য আমি হারিয়েছি আমার মাকে।’
পথ চলতে চলতে কথা বিনিময় হচ্ছে তাদের। দু কদম হাঁটার পর মেয়েটি চিৎকার করে বলল, ‘থামো, অচিরেই আমি তোমাকে জানিয়ে দেব রঙ আসলে কী?’
ছেলেটি দাঁড়াল। অঙ্গভঙ্গিতে তার নৈরাশ্য। বিদ্রুপমাখা কণ্ঠে সে বলল, ‘সত্যিই?’
মেয়েটি এসে দাঁড়াল ছেলেটির সম্মুখে। চেহারাকে ছেলেটির আরেকটু কাছে নিয়ে গিয়ে প্রক্ষেপণ করলো এক গভীর নিঃশ্বাস। একগোছা চুল এনে ছড়িয়ে দিল ছেলেটির নাকের উপর। ঠোঁট দুটোকে এগিয়ে এনে গভীর অনুরাগে ফিস ফিস করে বলল, ‘কিছু কি টের পাচ্ছ?’
ছেলেটি জবাব দিল, পেন্ডুলামের মতো দুরুদুরু বুকে, রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠে, ‘আমি টের পাচ্ছি। আমার বুকের ভেতর প্রবলভাবে দুলে উঠছে কিছু’।
‘এটিই হচ্ছে লাল রঙ।’
ছেলেটি এক ঝটকায় সরিয়ে দিল মেয়েটিকে। আরেকটু হলেই মেয়েটি পড়ে যেত মাটিতে। মেয়েটি সজোর বলে উঠে, ‘ওহে নরাধম অন্ধ।’ অতঃপর ক্ষুরের মতো ধারালো কণ্ঠে সে বলে, ‘এখন তুমি কেমনবোধ করছ?’
‘আমি বুঝেছি, তুমি খুবই নীচ একটি মেয়ে।’ কণ্ঠে তার ভীষণ রাগ।
মেয়েটি জবাব দিল দৃঢ়তার সাথে, ‘এই হচ্ছে হলুদ রঙ।’
এবার মেয়েটি ছেলেটির কাছে এসে বসল। হাতের তালু স্থাপন করল ছেলেটির মাথায়। ভালোবাসায় হাত বুলাতে লাগলো তার চুলে। কণ্ঠে ঢেলে মমতা সে বলল, ‘কান পেতে শোনো ঐ দূরে চড়ুই পাখিদের কিচিরমিচির ধ্বনি।’
ছেলেটি মাথা তুলে তার কর্ণকুহরকে পূর্ণ মনোযোগী করল সেদিকে। মেয়েটি পূর্ণ করল তার কথা, ‘এবার কেমন অনুভব করছ?’
‘প্রশান্তি!’ শান্ত কণ্ঠে ছেলেটির জবাব।
মেয়েটির কন্ঠে তখন উৎফুল্লতা। বলল সে, ‘এটিই হচ্ছে নীল রঙ।’
মেয়েটি এবার তাকালো ছেলেটির বসার ভঙ্গির দিকে। তার ভেতরজুড়ে বয়ে গেল ভীষণ এক মরু সাইমুম। আকাশ ভেঙে কান্না এলো তার। ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ল তপ্তাশ্রু। ভিজে গেল ছেলেটির হাত। সে হাত উঠিয়ে আনল মেয়েটির গালে। অনুভব করতে তার অশ্রুর কথা। সে বলল, ‘তুমি কি আমাকে দেখে কাঁদছ? আমি আসলেই জানি না, এখন আমি কেমন বোধ করছি?!’
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল এবার। হাসির দ্যুতির সাথে একাকার হয়ে গেল অশ্রুর জল। বলল, ‘এই হচ্ছে সাদা রঙ।’
মেয়েটি এবার দিগন্তে তাকিয়ে দেখে অস্তাচলের লালিমা নিয়ে এসেছে সূর্যাস্তের বার্তা। অতঃপর মৃদু হাসিমাখা কণ্ঠে ছেলেটির কানে কুচক্রীর মতো ফিসফিস করে বলল সে, ‘যখন তুমি বাবা হবে তখন বুঝবে সবুজ রঙ কী?’
এবার বিদায়ের পালা। সে বিদায় জানাল ছেলেটিকে। একটু দূর গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। যেন আচমকা মনে পড়েছে কিছু। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে দূর থেকেই চিৎকার করে বলল, ‘যখন তুমি প্রথমবার তোমার মাকে হারিয়েছিলে, মনে আছে কি তখন তোমার কেমন লেগেছিল?’
‘হ্যাঁ। আমার তা খুব মনে আছে’। চিৎকার করে জবাব দিল ছেলেটি।
‘সেটিই হচ্ছে কালো রঙ।’
এ কথা বলেই মেয়েটি মিশে যায় অন্ধকারের সাথে।নবধ্বনি, ঈদসংখ্যা ২০২০-এ প্রকাশিত
3 Comments
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
তুলট ডেস্ক
@toulot
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
রাদ আহমদ
@raad_ahmad
Sayed Mahmud
@sayed-mahmud


Beautiful……beautiful story! There will always be hope, even just a spark, or one candle, it can do many things in the dark..