-
Shah Kamal is with Eiasin Arafat and 23 others
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::#জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল
(১১)
জমু এক পাশে দাঁড়িয়ে গেল। গরুর পাগলামো দেখতে দেখতে হাঁস-মুরগীর দোকানে এসে গেল। গৃহস্থ ঘরের অনেকে হাঁস-মুরগী নিয়ে এসেছে। পাইকারও আছে অনেক। জমু ঘুরে ঘুরে হাঁস দেখতে থাকে। বাড়িতে মেহমানদারী কাল। তাঁর কাজের শেষ নাই। চিন্তাও ঢের। এতোগুলো মানুষের জন্য কয়টা হাঁস লাগবে? বার বার তাঁর মনে এই চিন্তা। টাকা মাত্র ছয় শো। ঘুরে ঘুরে সে হাঁস দেখছে। দূর থেকে দর-দামও লক্ষ্য করছে। অনেকেই এমন আছে যারা দরদাম করতে না পারলে দূর থেকে অন্যের দরদাম করা দেখে। পরে নিজে সে দাম একটু আগ-পিছ করে জিনিস পত্র কিনে নেয়।
জমু দরদাম দেখে দেখে ক্লঅন্ত হয়। এক জোড়া হাঁস একজন ছয়শো টাকায় নিলো। অবশ্য কম দামেও নিরো কেউ কেউ। সে কী করবে? তাঁর তো মেহমান বেশি। কম নিলে হবে না। এ বাজারে ধলা রমু বড়ো পাইকার। সিগারেট টানে একটার পর একটা। যারা বাড়ি হতে দু একটা হাঁস মুরগী নিয়ে আসে তাদেরটা সে-ই নিয়ে নেয় কম দামে। তাঁর দোকানে ভীড় হলেও বিক্রি কম। বাজার হতে সব হাঁস মুরগী বেচা-বিক্রি হয়ে গেলে তাঁর দোকানে বিক্রি শুরু হয়। দিনশেষে তাঁর দোকানেও তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। আজ অনেক দোকান বসেছে। জমু হাঁটতে হাঁটতে কাহিল। একটু পর পর গামছা দিয়ে কপালটা মুছে দেয়। গরীবের কপাল। গামছা দিয়ে মুছলেও বেশিক্ষণ শুকনো থাকে না। একটু পর আবার ভিজে যায়।
গাহস করে এক দোকানদারকে জমু জিগ্যেস করে, ভাইসাব, চল্লিশ-পঞ্চাশ জন মেমান খাওয়াইতে কয়ডা হাঁস লাগবো?
– পাস্সাতরা ত লাগবোই। লইয়া যান আমার কাছে আছে।
– নিব।
– দিয়া দেই।
– আরেকটু দ্যাইখা…
দোকানদার বেশি কিছু বলে না। জমু দরদামের বাহাস বাড়ায় না। তাঁর মাথায় চরক গাছ ঘুরছে। এতা মানুষ মেহমানদারী করাটা কিভাবে সম্ভব। এতা হাঁস কিভাবে কেনা। দামও তো কম না। একজোড়া হলেও পাঁচ থেকে ছয়শো টাকার মতো লাগবে। তাঁর কাছে মোটমাট টাকাই আছে ছয়শো। তাঁর হিসাব বার বার মাথায় ঘোরপাক খায়। একেক চিন্তা একেকবার দৈবচয়নে ভেসে আসে তাঁর মন মগজের অলি গলিতে। একবার ভাবে একজোড়া হাঁস কিনবে আবার ভাবে তিনটা কিনবে। নানা ভাবনায় বিপর্যস্ত জমু ক্লান্তির নগরে হাঁটে। কোন ক্লান্তি নেই। একটা আশঙ্কা তাকে গ্রাস করতে চাইলেও মনে তাঁর ভরসার সূর্য উঁকি দেয়। মিলমিশ থাকলে একটা তিল সত্তুর জনে খায়। একটা হাঁসে চল্লিশ –পঞ্চাশ জনের কী হবে না? হবে। কেন হবে না? সে তো সত্তুর জন দাওয়াত করেনি। চাউল কিনতে হবে। সাথে আরেকটা পদ থাকলে খারাপ হতো না। কিন্তু সবাই জানে হাঁসের গোশত দিয়ে চিকন চাউলের গরম ভাত। এখন চিকন চাল না হলেও সমস্যা। বেলা গড়াচ্ছে। সূর্য ঢেলে পড়েছে। জমুর হাঁস কেনা হয়নি এখনো।
সাধ-আহ্লাদ বারবার হয় না। হলে অবশ্য রসদও লাগে। আর না হলে শেষটায় সাধের কদর থাকে না। কথায় আছে সখের তোলা আশি টাকা। কিন্তু আশি টাকা যোগারে না থাকলে যত্তো ঝামেলা। বাজারের শেষ কোণায় রোগা-টোগা এক মুরুব্বীর কাছে দুইটা হাঁস। চোখ জুড়ানো রং। হাঁস দুটো মাথা নেড়ে নেড়ে ডাকছে। জমুর নজর পরলো ঐ হাঁস দুটোর দিকে। কাছে গিয়ে মুরুব্বীকে দাম জিগ্যেস করলে সে,
– চাচা মিয়া, হাঁস দুইডা’র দাম কতো?
হাঁপানি রোগীর মতো শ্বাস নিতে নিতে মুরুব্বী বলল, এক হাজার টেকা, বাজান।
জমু দাম শুনেই চুপ। মুখ থেকে কোন শব্দ বের হয় না তাঁর। এতো দাম চায় বলেই কেউ কিনেনি এখনো। তবুও সে দরদাম করে,
– দাম কমান, চাচা।
– বিশ টেকা কম দেও।
– না চাচা, দুইডা পাশশো দেই।
– অইব না। একটার দাম কইছো। যদি নেও একবারে নয়শো।
জমু চুপচাপ সামনে থেকে চলে গেল। হাঁটতে ক্ষুধা লেগেছে তাঁর। একবার সে চারদিকে তাকিয়ে সময় আন্দাজ করে। আছরের আজান পরে যাবে।
এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে হিসাব মিলে না জমু’র। ধলা রমু’র পাইকারী দোকানে এসে দাঁড়ায় সে। তাঁর দোকান ভরতি হাঁস মুরগীতে। সব রকমের হাঁস-মুরগী আছে। কম দামী, বেশি দামী। দাম করার সাহস হয় না। ধলা রমু তাকে ডাক দেয়। রমুর ডাকে যেন তাঁর হালে পানি এসেছে। প্রকৃতির জড়তায় মানুষের কত না বলা কথা হৃদয়ে থেকে যায়। কত আশার কবর হয়। ভাবনার মমি হয়। তবে কেউ হাত বাড়ালে অন্তরের মরা বাসনাও হয়ে উঠে চির যৌবনা। রমু’র ডাকে জমু’র বুকেও একটা স্বস্তি।বাজারের শেষ দিকে একটা টিনের ছাউনি আছে রমু’র দোকানে। সে দোকানের কাছে রমু’র ডাকে সাড়া দিয়ে জমু দাঁড়ায়। জমু কিছু বলার আগে রমু জিগ্যেস করে,
– লাগবো কিছু? ভালা রাতা আছে।
– না ভাই। আমার হাঁস দরকার।
– অভাব নাই। কয়ডা লাগবো কন। হাঁস বেশি রাখছিলাম। হুনছি ফুলপুরের কেডা যানি মেমান খাওয়াইবো হাঁসের গোশ দিয়া। ভাবজি আমার দোকানে হাঁস নিতে আইবো। তয় খবর নাই। বড় অডার গুলা আমি পাই। আইজকা কপাল খারাপ।
জমু আক্ষেপের দৃষ্টিতে রমু’র দিকে তাকায়। কত কথা তাঁর চোখে। একজনের স্বপ্ন কত জনের স্বপ্নে গড়ায়। জমু’র মেহমানদারীর কথা রমও জানে এ বাজার হতে। বড়োসড়ো মেহমানদারীতে বেশি সদাইপাতি লাগবে তাই স্বাভাবিক। সে হিসেবই করেছিল রমু। জমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রমুর কথা শুনছে। কিন্তু সে বলে না সে-ই যে জমু। কাল তাঁর বাড়িতেই মেহমানদারী। জমু দোকানের সবচেয়ে সুন্দর এক জোড়া হাঁস দেখিয়ে দাম জিগ্যেস করে,
– এই জোড়ার দাম কত?
– কত দিবেন?
– আপনের জিনিস আপনেই বলেন।
– এক হাজার দ্যান। ঝাক্কাস দুইডা হাঁস লইছেন।
দাম শুনে জমু ঢোক গিলে ছোট করে। কী বলবে ভেবে পায় না। তবুও তাঁর ভেতর থেকে একটা উত্তর আসে,
– পাঁশশো হয় না, ভাই?
রমু দাম শুনে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। বলে,
– এতো কমে ক্যামনে? এক্কেবারে আটশ দ্যান। আর কমে পারুম না।
– আসলে আমার কাছে এতা টেকা নাই। কমছেকম দুইডা হাঁস দরকার।
জমু’র মুখটা ছোট হয়ে আসে। ওকে দেখে একটা মায়া হয় রমু’র। ব্যবসায় লোকসান করে তো আর বেচা যায় না। তাঁরও তো সংসার আছে। পরিবার আছে। রমুকে সবাই কিছুটা ধড়িবাজ মনে করলেও ভেতরটায় দয়ামায়া বলে কিছু আছে। আজ তাই দেখা যাচ্ছে। জমু’র অবস্থা দেখে আরো একশো টাকা কমিয়ে দেয়। কিন্তু জমু’র পক্ষে তা সম্ভব নয়। নিমিষেই তাঁর মাথা থেকে একজোড়া হাঁস কেনার চিন্তা চলে যায়। তাঁর পছন্দ করা হাঁসর মধ্যে একটা হাঁস দোকানের সবচেয়ে বড়ো। জমু ঐ হাঁসটা দেখিয়ে দাম জানতে চায়। রমু’র বুঝতে বাকি নেই যে ওর কাছে তেমন টাকা নেই। বেশি ভাবনা না করে সোজা ভাষায় সে জমুকে জানিয়ে দেয়,
– একজোড়া লাগবো না তাইলে? এইডা নিলে একদাম পাঁশশো।
– চাইশশো রাইখেন।
– লাভ হইবো না।
– আরো পঞ্চাশ টেকা দিয়েন।
– পারমু না, ভাই।
রমু দাম নিয়ে কথা বাড়াতে চায় না। প্রসঙ্গ পাল্টে জিগ্যেস করে,
– হাঁস দিয়া কী করবেন?
– মেমান খাওয়ামু। হাঁস আরো দরকার কিন্তু টেকা নাই।(চলবে)
7 Comments
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim


বিলিন জীবনাচার উঠে আসছে অপরুপ হয়ে। অভিনন্দন।