Profile Photo

Shah KamalOffline

  • kuriparahs112384
  • Profile picture of Shah Kamal

    Shah Kamal is with Shomik Adhikary Nandon and 22 others

    4 years, 7 months ago

    ধারাবাহিক গল্প
    :::::::::::::::::::::

    #জমশেদ আলীর মেহমানদারী

    —— শাহ্ কামাল

    ( ১২)

    জমু’র কথা শেষ হয় না। তাঁর চোখ লালচে হয়ে যায়। দ্রারিদ্র্যতার ভাষা বুক ফেটে চোখে গড়ায়। কত হাজারো মানুষের বুকের গভীরের এমন চাহনি চোখে অশ্রæ হয়ে ঝরে। কেউ এসবের খোঁজ নেয় না। তবে জমু’র জন্য কেমন একটা মায়া পরে গেছে রমু’র। দোকান হতে একটু ছোট দেখে আরো একটি হাঁস বেছে জমু’র পছন্দের হাঁসটার সাথে বেঁধে জমুর হাতে হাঁস জোড়া তুলে দেয়। জমু অবাক হয়ে তাকায়। হাঁস জোড়া হাতে দিয়ে রমু বলে,
    – চাইশশো দ্যান।
    -ক্যান? বললেন একটাই চাইশশো।
    – হ। একটাই চাইশশো। আরেকটা ভাইরে হাদিয়া দিসি। লইয়া যান।
    জমু টাকা বের করে দেয়। কোন কথা বলে না। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। হাঁস জোড়া নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চালের দোকানে যায়। হাতে দু’শো টাকা এখনো আছে। চাউলের দরদাম বুঝে তাঁর হিসেবে গোলমাল লেগে যায়। ভাল মানের চিকন চাউল পঞ্চাশ টাকা কিলোতে বিক্রি হচ্ছে। জমু তা কনিতে পারবে না। অতো টাকা নাই। আটত্রিশ টাকা কিলোতে পাঁচ কেজি চাউল নিয়ে সে বাড়ির পথে রওয়ানা দেয়। মাগরিবের আযান কানে ভেসে আসছে।
    মানুষজন বাড়ির দিকে যাচ্ছে। খানিক পথ হেঁটে এসে অটোস্ট্যান্ডে আসে জমু। ফুলপুরের দিকে অটো গাড়ি যায়। সিরিয়ালে মানুষজন উঠছে। জমু’র দিকে কারো নজর নাই। বাম হাতে চাউলের পুটলি আর ডান হাতে হাঁস জোড়া নিয়ে অটোতে উঠবে জমু। হাঁস জোড়া একটু নাড়া দিয়ে উঠতেই জমু বাঁধনটা দেখে নিল। কোন সমস্যা নাই। তবে বাঁধনটা একটু ফসকে গেছে মনেহচ্ছে। অটো গাড়িতে জমু এক পা রাখতেই ছোট হাঁসটা ছুটে দৌড় ঝাপ শুরু করে দিলো। সামনের কয়েকজন ধরার চেষ্টা করলেও রাস্তা পার হয়ে হাঁসটা সামনে এগিয়ে যায়। জমু চলতি রাস্তার গাড়ি দেখেশুনে সামনে এগোয়। কিন্তু হাঁসটা ধরতে পারে না।
    আলো কমছে। চারদিক ঝাপসা ঝাপসা। অনেক সময় চারদিক খুঁজলেও সে আর হাঁসের নাগাল পায় না। একটা হাঁস আর হাতে চাউল নিয়ে ফুলপুরের অটোতে উঠে জমু।

    আর সব বৃহস্পতিবারের মতো মোম বাতি জ্বলছে না জমু’র ঘরের কোণায়। নেকবরের বউ আসলেও চলে গেছে। গোলাপজাম ঘরের কিছু কাজ কর্ম করেছে ওকে নিয়ে। কাল মেহমানদারী। কত কিছু গোছানোর আছে। গোলাপজামের গোছগাছ শেষ। ভাল-ভালোয় সবকিছু শেষ হলেই ভালো। দিনভর রাজ্যের পেরেশানিতে কেটেছে গোলাপজামের দিন। জমু বাজারে গেছে সেই সকালে। ফিরবার নামটুকু নেই। তাকে নিয়ৌ কত চিন্তা তাঁর মাথায় ঘুরঘুর করে। মানুষটা এখনো ফিরলো না। কুপির মিটিমিটি আলো জ্বলছে। ঘোমটা টেনে কোরআন তিলোয়াত করছে গোলাপজাম। চৌকিতে বসে আছে চম্পা। একটা জুতার বাক্সে তাঁর পুতুলদের বসবাস। জুতার বাক্স নিয়ে পুতুলদের তত্ত্ব তালাশ করছে সে। পুতুল যত্নআত্তির ফাঁকে সে বার বার বাইরের দিকে কান পাতে কেউ আসলো কিনা। উঁকিও মারে মাঝেমধ্যে। দরজাটা পুরো খোলা না। জমু বাজার থেকে আসবে। তাই আধো খোলা। গুনগুন করে গাণ ধরে চম্পা, আগে চলে দাসী বান্দী পিছে সখিনা…
    গোলাপজামের কানে চম্পার গুণগুনানি পোঁছায়। গোলাপজাম একটা আয়াত পুরো শেষ করে মাথাটা ওর দিকে ঘোরায়। ছোট মেয়েছেলে। খুব রাগ হয় না তাঁর উপর। তবে চম্পা পারদর্শী মেয়ে। মায়ের চাহনির মানে বোঝে। কুরআন তিলোয়াতের সময় গান গাওয়া ঠিক হয়নি। তাই সে চুপ হয়ে যায়। পুতুলের বাক্সটা রেখে দেয় পাশে। মায়ের কুরআন তিলোয়াতে মন দেয়।
    রাত বাড়ছে। উঠোনের দিকে প্যাঁক প্যাঁক আওয়াজ শুনে চম্পা বুঝতে পারে আওয়াজটা হাঁসের ডাকের। সে চৌকি হতে তাড়াহুড়ো করে নেমে দরজার দিকে যায়। বাইরে অন্ধকার হলেও বাবাবে চিনতে তাঁর ভুল হয় না। সর্ম্পকের রেখাপাত এমনই; নিঃশ্বাসের আগে শরীরের ঘ্রাণে রক্তের টান অনুভব করা যায়। আলো অন্ধকার সেখানে কোন বাঁধা নয়। জমু তাঁর কাছে চলে আসে। চাউলের পুটলিটা চম্পা হাতে নেয়। হাত উঁচু করে হাঁসটা উপর দিকে ধরতেই খুব খুশি হয় চম্পা। ঘরে চাউলের পুটলি রেখে সে হাঁসটা ধরতে যায়। জমু দেয় না। ঘোমটার আড়াল হতে কুরআন তিলোয়াতের ফাঁকে ফাঁকে গোলাপজাম নজর দিচ্ছে ওদিকে। তিলোয়াত শেষ করে সে জমু’র সামনে এসে দাঁড়ায়। জমু কোন দিকে খেয়াল করে না। ফতুয়ার পকেট হতে ছোট একটা কাগজের পুটলি সে চম্পার হাতে দেয়। শিমের বীজ ভাজা। বালু দিয়ে ভাজা। পাকা শিমের বীজকে ওরা শিমের বিচি বলে। চম্পার খুব পছন্দ। জমু হাটে গেলেই নিয়ে আসে চম্পার জন্য। শিমের বিচি হাতে পেলে চম্পার মুখে কী যে হাসি ফুটে উঠে! পুটলিটা হাতে নিয়েই সে দুএকটা মুখে দেয়। আওয়াজ পাওয়া যায়। গোলাপজামেরও পছন্দ। তাই বলে সে রাত-বিরেতে এসব খায় না।
    জমু’র হাতে একটা হাঁস দেখে অবাক হয় না গোলাপজাম। টাকা যেমন সদাই তো তেমনই হবে। এতা মানুষ বিদেয় করাটা মসিবতের হলেও কোন কিছু বলে না সে। বলে কোন ফায়দা হবে না। আর সব মহিলার মতো যে কোন চাহিদা গলা বাড়িয়ে খুব কমই বলে সে। সাত ঘরের লোকে শুনলে নিজের প্রয়োজন মিটবে না। তাই তাঁর বাড়-বাড়ন্ত গলার আওয়াজ অনেকটা নিচু থাকে। সে বুঝদার গরীব। জীবনের দরকার গলাবাজিতে পোষায় না। জমুর হাত থেকে হাঁসটা নিয়ে সে তৃপ্ত হয়। ওজন ভালো। দেখতেও সুন্দর। মন জুড়িয়ে যায় অন্ধকারেই। দিনের বেলা কতো সুন্দর না লাগবে। জমুকে হাত-পা ধুয়ে আসতে বলে গোলাপজাম। রাতে পুকুরে যায় না ওরা। বারান্দায় মাটির ঘটিতে পানি রাখা। উঠনের একপাশে গিয়ে জমু হাত-পা ধুয়ে আসে। গামছা দিয়ে হাত-মুখ মুছতে মুছতে গোলাপজামকে বলে,
    – চম্পার মা, একটা কাজ খারাপ হইছে। কপালে নাই। অলক্ষ্মী লাইগা গেল।
    জমু’র কথার মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারে না গোলাপজাম। তবে সমস্যা যে বড়োসড়ো একটা হয়েছে তা আন্দাজ করতে পারে। কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে জমু’র কথার জবাব দেয় সে,
    – কী হইছে! কী অলক্ষ্মী!
    – শুইনা আর করবা কী। সবোই আমার কপাল..
    – হইছে কী?
    – দুইডা হাঁস আনতাছিলাম। বড়ো একটা কিনছি দেইখা বেপারী আমারে খুশি হইয়া ছোড একটা হাঁস হাদিয়া দিছিলো। গাড়ি ওডার সময় ছোডটা ছুইটা গেছে। ধরতে পারি নাই। আন্ধারে কই যে গেল।
    – আলহামদুলিল্লা। আল্লাপাকের হাজারো শোকর। বড়টা তো আছে। কিন্তু কেমনে খাওয়াইবেন এইডা দিয়া মাথায় ধরে না।
    – টেনশন কইরো না। আল্লা যা করে ভালাই করে। টুকরা একডু ছোড ছোড করবা। খোদার ইচ্ছায় হইয়া যাইবো।
    – হইলে ভালাই। কিছু তো খান নাই মনেহয়। বসেন খাওন আনি।
    গোলাপজাম খাবার আনতে চলে যায়।
    চম্পা শিমের বিচি খাচ্ছে।

    (চলবে)

    9
    8 Comments
Skip to toolbar