-
জর্জ ফ্লয়েড অথবা “ Freedom Road”: মুক্তি কত দূর?
গণতন্ত্রের স্বঘোষিত রক্ষাকর্তা মার্কিনমুলুকে নিগ্রো হত্যা করা খুবই সাধারণ ঘটনা। নিগ্রোদের বঞ্চনার ইতিহাস সেদেশে বহু পুরানো। লিঞ্চ সেখানে নৈমিত্তিক ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার ঘটনা। এই হত্যার পর পুরো মার্কিন মুলুকে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিবাদের ঝড়। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ বঞ্চনার ইতিহাসের সাথে এর প্রতিবাদের ইতিহাসও পুরানো। কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তির জন্য সংগ্রামের অতীত ইতিহাসকে হাওয়ার্ড ফাস্ট “ Freedom Road“ উপন্যাসে দরদী বয়ানে তুলে ধরেছেন।
এই উপন্যাসের ব্যপ্তি ১৮৬৭ হতে পরবর্তী কয়েকবছর । সময়টি আমেরিকার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। লিঙ্কন ক্ষমতায় আসার পর ১৮৬০ সালে দাসপ্রত্থা বিলোপের আইন পাশ করেন। আমেরিকার উত্তরের শিল্পে অগ্রসরমান অঞ্চলের মানুষ এবং মানবতাবাদীরা এই আইনকে সমর্থন জানালেও দক্ষিণের শিল্পে অনগ্রসর অঞ্চল যার অর্থনৈতিক মূলভিত্তিই ছিল দাসবৃত্তি, সে অঞ্চলের দাস মালিকরা এটির বিরোধীতা করে। তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে কনফেডারেশন গঠন করে। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে সরকার দক্ষিণের অঞ্চলে সৈন্য পাঠালে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ দাসেরা এই যুদ্ধে কেন্দ্রীয় ফেডারেল বাহিনীতে যোগ দেয় দাসত্ব হতে মুক্তির আশায়। এই যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চল ছিল দক্ষিণ ক্যারোলিনা । উপন্যাসের স্থানও দক্ষিণ ক্যারোলিনার একটি অঞ্চল কারওয়েল। অবশেষে কনফেডারেশন বাহিনীর পরাজয়ের মধ্যদিয়ে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। কৃষ্ণাঙ্গ দাস এবং মানবতাবাদীরা স্বপ্ন দেখতে থাকেন দাসপ্রথা- বর্ণপ্রথা মুক্ত সমমর্যাদা দানকারী এক নতুন মানবিক আমেরিকার। কিন্তু সে স্বপ্ন কি আদৌ বাস্তবায়িত হয়েছিল?
উপন্যাসের শুরু হয় দক্ষিণ ক্যারোলিনা অঞ্চলের কারওয়েল নামক আপাত শান্ত এক জনপদে। এই দক্ষিন ক্যারোলিনা গৃহযুদ্ধের সময় ছিল ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গিডিওন কারওয়েল থেকে জনগণের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় রাষ্ট্রীয় গঠনতন্ত্র মূলক অধিবেশনের জন্য। এই অধিবেশনে এমন এক গঠনতন্ত্র রচনা করতে চায়- যেখানে কালো- সাদা নির্বিশেষে সবাই সমান মর্যাদা লাভ করবে, মুক্ত মানুষের মর্যদা। এই প্রত্যাশাও ছিল গৃহযুদ্ধে লড়াই করা দাসপ্রথা বিরোধী মানুষদের। গিডিওন নিজেও এই যুদ্ধের একজন সৈনিক যে যুদ্ধের পূর্বে ছিল একজন দাস। অন্যান্য দাসদের মত তার জীবনও ছিল বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সকল মানবিক অধিকার বঞ্চিত। শিক্ষার স্পর্শ পায়নি ইতিপূর্বে। স্বভাবতই এমন গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে যোগ দেয়ার পূর্বে সে ভীত ছিল, তবুও প্রতিদিন নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে থাকে, নিজ প্রচেষ্টায় হয়ে উঠে স্বশিক্ষিত, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র স্টিফেন হমস। পুরো উপন্যাসে এই চরিত্রের উপস্থিতি খুব বেশী নয়, কিন্তু তাৎপর্যবাহী। হফস সাবেক দাস মালিক, গৃহযুদ্ধ তার সাবেকী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে, কমিয়ে দিয়েছে তার প্রতিপত্তি অনেকাংশে। অর্থাৎ গৃহযুদ্ধে আপাতভাবে হেরে যাওয়া দাসমালিকদের স্বার্থরক্ষাকারী অংশের প্রতিনিধি সে। যেমনটি ইতিহাসে আমরা সবসময় দেখি, একটি মহৎ সংগ্রামে জয় লাভের পরপরই আপাত পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীলরা আবার সচেষ্ট হতে থাকে তাদের পুরানো অভিসন্ধি বাস্তবায়ন করতে, এখানেও হফস তার অভিসন্ধি নিয়ে পরকল্পিত ভাবে এগুতে থাকে। সেও গঠনতন্ত্র মূলক অধিবেশনে যোগ দেয়, বলাবাহুল্য কোন মহতী উদ্দেশ্য নিয়ে এই যোগদান নয়, এটি ছিল পরিকল্পনারই একটি অংশ। হফসের পরিকল্পনার কথা আমরা শুনতে পাবো তারই জবানে এক সান্ধ্যকালিন ভোজনে। বাহ্যিকভাবে ভদ্রস্থ মুখোশের নীচে চরম বর্ণবিদ্বেষী এক চরিত্র হফস। এরাই আমেরিকান রাষ্ট্রের কর্ণধার পরবর্তীকালে।
উপন্যাস যত এগুতে থাকে আমরা দেখি গিডিওনকে আরো পরিণত হতে, জনগণের নেতা হয়ে উঠতে। সমান্তরালে হফসরা সংঘবদ্ধ হতে থাকে, কু- ক্ল্যান গঠন করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে থাকে রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিয়ে। যে রিপাবলিকান দল একসময় ছিল দাসপ্রথা বিরোধী, যার পিছনে দাঁড়িয়েছিল প্রগতিশীল মানুষ- নিপীড়িত দাসেরা, সে রিপাবলিকান দল ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রতিক্রিয়াশীল সাবেক দাসমালিকদের সাথে হাত মেলায়। মুক্তির স্বপ্ন ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে। অবাধে চলতে থাকে লিঞ্চিং, ক্লু- ক্ল্যানের তাণ্ডব। উপন্যাসের পরিণতিতে আমরা দেখি গিডিয়ন এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মদদে ক্লু- ক্ল্যানদের আক্রমণে মারা যেতে। এই মৃত্যু দৃশ্য হতে পারতো একটি করুণ পরিণতির আখ্যান। হতে পারতো একটি মহৎ স্বপ্ন অথবা সংগ্রামের পরাজয়ের গ্লানিময় উপস্থাপন। কিন্তু লেখক সে পথে হাটেন নি। লেখক এই সংগ্রামের অন্তর্নিহিত সুরটি ধরতে চেয়েছেন। সাধারণেত চোখে যা অদৃশ্য, শিল্পী তাকেই দৃশ্যমান করে তুলেন। মৃত্যুও মহৎ হয়, পরাজয়ও হতে পাতে বীরত্বের আরেক রূপ যদি তার মূলে থাকে মানবিকবোধের উদ্দীপনা। “ Freedom Road” আমাদের সে বোধটিই জাগিয়ে দেয়। একই সাথে এটিও মনে করিয়ে দেয় পরিপূর্ণ মুক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত সুদূর পরাহত যতক্ষণ পর্যন্ত এর পরিপূরক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সৃষ্টি না হয়। একটি আন্দোলন অনেকদূর এগুনোর পরও থমকে যেতে পারে যখন সামনে দাঁড়ায় প্রতিক্রিয়াশীল – জনবিরোধী রাষ্ট্রীয় কাঠামো। এই ধরণের রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তন ব্যতিরেকে কোন মহৎ স্বপ্নই বাস্তবায়ন হবে না, প্রকৃত মুক্তি আসবে না। বব ডিলানের একটি বিখ্যাত গান “Blowin’ in the wind” একটি প্রশ্ন ছিল-
“Yes, ‘n’ many years can some people exist
Before they’re allowed to be free?”
এই প্রশ্নের উত্তর উপন্যাসটির মধ্যেই লুকায়িত। গিডিয়নের আপাত পরাজয়ই, মুক্তির পথটি দেখিয়ে দেয়। জনবিরোধী রাষ্ট্র কখনোই মুক্তি এনে দিতে পারে না। তার উদাহরণ অসংখ্য,আমেরিকার সাম্প্রতিক ঘটনাই এর প্রমাণ। গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা আমেরিকান সরকারই একদিন পিকস্কিলে পল রবসনকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্র আর জনগণ দুটো ভিন্ন। রাষ্ট্র চেয়েছে হত্যা করতে, আর জনগণ পল রবসনকে রক্ষা করেছে সম্মিলিত ভাবে। লেখকের আরেকটি বই “ Peekskill, USA” বইয়ে এই ঘটনার বর্ণনা আছে যেখানে লেখকও ছিলেন প্রতিরোধকারীদের মাঝে। জনগণের সম্মিলিত শক্তি যা শুভবোধে উদ্দীপ্ত – তার স্বাক্ষর আমরা নিগ্রো হত্যা পরবর্তী সাদা- কালো নির্বিশেষে সবমানুষের মিলিত প্রতিবাদে।
যারা হাওয়ার্ড ফাস্টের “ Spartacus” বইটি পড়েছেন তারা “ Freedom Road” এর গিডিয়নের মাঝে স্পার্টাকাসকেই দেখতে পাবেন। স্পার্টাকাসের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় যেন গিডিয়নের আগমন। স্পার্টাকাসের বিদ্রোহের মতই গিডিয়নের প্রতিরোধ সম্মিলিত, কালো মানুষের সাথে নিপিড়িত সাদা মানুষ কাধে কাধ মিলিয়ে রয়েছে, সৃষ্টি করেছে ইতিহাস। স্পার্টাকাসের মত গিডিয়নের মৃত্যুও লড়াই করতে করতে। মানুষের সৌন্দর্য্য যেন সমস্তটাই আত্মস্থ করে গিডিয়ন আর স্পার্টাকাসের সাথীরা এগিয়ে গেছে সামনের দিকে।জয় বনিক
৯৮৪,পূর্ব নাসিরাবাদ, লিচুবাগান,
চট্রগ্রাম – ৪০০০।
ফোন – ০১৬৮১৬৯১১৪৮-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 11 May 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 10 February 2023 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 20 November 2023 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 22 August 2024 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 03 June 2025 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
তুলট ডেস্ক
@toulot
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
Sayed Mahmud
@sayed-mahmud



সুন্দর বিষয় নিয়ে লিখেছেন। উপন্যাসটি নিয়ে আগ্রহী হলাম। আলোচনায় আশেপাশে থেকে আসা ঐতিহাসিক তথ্যগুলা আরও সমৃদ্ধ করল। আর ব্ল্যাক প্রসঙ্গে মনে পড়ল যে ব্ল্যাকদের লিটারেচার নিয়ে আলাদা একটা ধারাই আছে মার্কিনি সাহিত্যে। আরও আরও লেখা পাব আশা করি আপনার। অন্যদের লেখালেখিতে আপনার মতামত চিন্তাভাবনাও সমৃদ্ধ করবে অনেককে। অনেক ধন্যবাদ।