Profile Photo

Shah KamalOffline

  • kuriparahs112384
  • Profile picture of Shah Kamal

    Shah Kamal

    4 years, 6 months ago

    ছোট গল্প
    ======
    বুবি
    —— শাহ্ কামাল

    তোতা ফকির উঠোনের একপাশে একটা ভাঙাচোরা চেয়ারে ছোট্ট আয়না রেখে বাবরি চুলে সরষের তেল মাখাচ্ছে। গড়ন হালকা পাতলা নয়; রোগাও নয়। কপালে ভাজ পড়েছে। চেহারাটা শ্যামলা। তেলতেলে ভাবটা সবসময় লেগে থাকে তোতা ফকিরের।কোন বড়দুস্তর কেরামতি দেখানোর ফকির সে নয়; মাজারে মাজারে ঘুরে ঘুরে “বাবার” ছবক পাওয়া ফকির। ঘর সংসারের কোন খোঁজ খবর তাঁর কাছে নেই। জমিদারী হালতের চালচলন দেখে কেউ তাকে এ পাড়ার ফকির মনে না করলেও পাতিলের তলায় ফকিরেরই আলামত।

    তাঁর বড় মেয়ে মোমেলা এ বাড়িতেই থাকে। ভিনদেশী ছেলের হাতে তোতা তাকে তুলে দিয়ে বড় মছিবতে আছে। বিয়ের পর থেকেই ঘর জামাই মোমেলার স্বামী সলিমুল্লা। ঠাটেবাটে সে নবাব সলিমুল্লা না হলেও রসে বসে শরীরের মেদ বলে জগতের সবচেয়ে সুখী মানুষ সে। সকাল বিকাল রুটিন করে সাহেবালী’র বাড়ি দু’বেলা গাঁজার কল্কিতে টান না দিলে তাঁর নাকি ঘুম আসে না। এ জগতে বিচিত্র মানুষের জ্ঞান গরিমা। মাথার জ্ঞান বিবেকের ঘরে দরজা না খুললেও চোখের শাসনে সবাই নবাবী বংশধর।

    উনিশ বছর ধরে তোতার বাড়িতে ঘর জামাই সলিমুল্লা। কাজের বেলা ঠনঠনা ঠন তবে জ্ঞান বিতরণের সময় মোল্লা নাসিরও তার কাছে পাত্তা পাবে না। মোমেলার রোজগারে চলে সংসার। বড় রাস্তার মোড়ে সাদা খোরশেদের তুলার মেশিনে তুলা ভাঙানোর কাজ করে সে। সপ্তাহ গেলে সাতশো, কখনো আটশো টাকা তাঁর মাইনে। সে টাকায় টেনেটুনে সংসার চলতে চায় না তাঁর। দু ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁর সংসারে মোটমাট চারটে মুখ। মেয়েটা বড়। আঠারো বছর বয়স হলেও বিয়ের কোন কূল কিনারা করতে পারছে না মোমেলা। দেখতে শুনতে খারাপ না মোমেলার মেয়ে শিল্পী।তাকে দেখলে কেউ আঠারো বছর বলবে না, ওকে দেখতে একটু বয়স্ক বয়স্ক লাগে। ঘরের মেঝেতে সামনে একটা বালিশে সে কোরআন শরীফ নিয়ে দুলে দুলে তিলোয়াত করছে। তোতা উঠোন থেকে মাঝে মাঝে শিল্পীর দিকে তাকায়। অবশ্য বাইরে থেকে পুরোপুরি দেখা যায় না ওড়নার ঘোমটার জন্য। তোতা বারবার শিল্পীর দিকে তাকালেও তাঁর মতিগতি বোঝা যাচ্ছে না। সে জানে শিল্পীর তিলোয়াত সে শুনবে না। জন্মগতভাবেই শিল্পী কথা বলতে পারে না; সে বোবা। স্বার্থের দুনিয়ায় কতো প্রকৃতই বদলে যায় লোকের মুখে মুখে। তেমনি শিল্পীর নামটাও বদলে গেছে। সবাই তাকে বুবি বলেই ডাকে।

    বুবি ছোট বেলায় মক্তবে যেতো আর সবার মতোই। হুজুর যখন আলিফ, বা, তা, ছা পড়াতেন তখন সে তাঁর মতো বোঝার চেষ্টা করেছে; তবে তা গন্তব্যের কতটা কাছাকাছি তা কেউ জানে না। সে পড়ে। পড়তে পড়তে সে কুরআন শরীফও নিয়েছে। হুজুরের সামনেও সে বহুবার পড়া দিয়েছে ঝুঁকে ঝুঁকে। শিল্পীর বর্ণহীন ভাষা আর চোখের নেশা তাকে শিক্ষিত বানিয়ে তুলেছে পুরোদমে। তাঁর পড়ায় বিরতি হয়নি। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত সে হাই স্কুলেও পড়েছে। হাতে বই পেলেই সে আঙ্গুল টেনে পুরো বই পড়ে ফেলে। বইয়ের নির্বাক বর্ণমালা আর তাঁর নির্বাক ভাষা একাকার হয়ে মিশে যায় দূরের আকাশে, দখিনা বাতাসে। সাদা কাগজ কলম দিয়ে ইশারা ভঙ্গিতে কেউ তাঁর লিখতে বললে সে নিজের নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম লিখতে পারে। জীবনের খাতায় তাঁর অঙ্কে গড়বড় থাকলেও, গণিতের খাতায় সে যোগ-বিয়োগ করতেও জানে।

    সলিমুল্লা প্রায়ই মোমেলাকে বকাবকি করে। মোমেলার পাপের জন্য আজ শিল্পী বোবা। কথা বলতে পারে না। মোমেলা কাঁদে; তাঁর চোখের জল চোখ থেকে বুক পর্যন্তও গড়ায়। কিন্তু কিছু বলে না। কাকে বলবে? কিইবা বলবে। ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম। সলিমুল্লার এত বকাবকিকে তোয়াক্কা করে না মোমেলা। জন্মের পর থেকে শিল্পীর দুধের খরচা দিতে পারেনি যে তাঁর মুখে বড় বড় কথা। মেয়ের ভবিষ্যৎ মাথায় রেখে মোমেলা টাকা জমাচ্ছে। ভাল একটা ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারলেই রক্ষে।

    বাহাদুর। শিল্পীর বিড়াল।পোষ মানা বিড়াল। সারাক্ষণ ওর সঙ্গী। দু’ বছর হয় বাহাদুরের সাথে ভাব অনেক গভীরের। বাহাদুরকে ও ডাকে না। পাশেই থাকে। শিল্পী খেতে বসলে পাশে বসে থাকে। একটা মাটির খোড়া বাহাদুরের সামনে দেওয়া হয়। শিল্পীর আবদার মেটানোর পাশাপাশি বাহাদুরের বায়না মেটাতে মোমেলা বাজার হতে আধ-পঁচা মাছ কিনে লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে দেয়। বাহাদুর এ ঘরেরই একজন। শিল্পীর কাছের সঙ্গী। ও মাথায় হাত বুলালে সোহাগ পেয়ে চোখ বন্ধ করে দেয় বাহাদুর। সমবয়সী বান্ধবীদের সাথে শিল্পীর খাতির নাই, কারো কারো বিয়ে হয়ে গেছে। শিল্পীর মুখে রা নাই তাই কারো সাথেই তাঁর খুব একটা ভাব জন্মে না। সলিমুল্লা’র চোখের বিষ সে। মা আর বাহাদুর শিল্পীর আপন জন। শিল্পীর না বলা অনেক কথা বোঝে বাহাদুর। ম্যাও ম্যাও করে সে শুধু নিজের ভাষাই জাহির করে না; শিল্পীর সাথে ওর সখ্যতার প্রমাণও দেয়। ও বলতে চায়, তোমার সঙ্গী লাগবে না; আমি মরন পর্যন্ত তোমার কাছেই থাকব। শিল্পীও ওর ভাষা বুঝে ওকে কাছে টেনে নেয়।

    খালপাড়ের মেয়ে নুন্না। নুন্না ডাকনাম। বাপমা আকীকা করে নাম রেখেছিল নুরুন্নাহার। কেটেছেঁটে নুরুন্নাহার হয়ে গেছে নুন্না। ঘটকালি করে। মহিলা ঘটক। রোজগার খারাপ না। এক বিয়েতে কমছে কম পাঁচ হাজার তাঁর চাহিদা। বেশিও ইনকাম হয়। এ পর্যন্ত কুড়ি জোড়া বর কনের হাত এক করেছে। একুশ জোড়া হতো। একুশ নম্বর বিয়েতে ঝামেলা হয়ে গেছে। খাওয়া দাওয়া শেষে ইজাব-কবুলের সময় দেখা গেল কনে নেই। পছন্দের ছেলের সাথে ভেগে গেছে। কনে ছাড়া তো বিয়ে হবে না। কেউ নুন্নার দোষ না দিলেও এমন ঘটনা নুন্নার সুনাম নষ্ট করেছে। তাই সে ঘটকালি ছেড়েই দিয়েছে বলা যায়। হাসমত শিকদারের মেঝো মেয়ে জবেদা তাঁর একমাত্র ছেলে শামীমের জন্য কনে খুঁজছে। ভাল বংশ খুঁজতে খুঁজতে এক বছর কেটে গেল। কনে আর পাওয়া গেল না। জবেদা তাই নুন্নার কাছে এসেছে। নুন্না জবেদার পীড়াপীড়িতে রাজি হয়। তবে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে।’ বিয়া করাবি ভাল তয় তর পোলা কি লায়েক হইছে? অয় না ছোড?’
    ‘ কী যে কছ না বইন; পোলা কী আজকা ডাঙর হইছে!’
    ‘ কত বস তর পোলার?’
    ‘ এত জানি না। আমারে একডা মাইয়া বাও কইরা দে বইন। তরে পোষাইয়া দিমু।’
    নুন্নার মাথায় শিল্পীর কথা বারবার ঘুরপাক খায়। শিল্পীর কথা মনে মনে ভেবে সে জবেদাকে বলে,’ মাইয়া বোবা হইলে সমস্যা আছে তর?’
    বোবা শুনে জবেদার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। তাঁর ছেলের জন্য মেয়ে চাই। অনেক দেখেছে; মেলে না। নুন্নার কথায় সে সোজাসুজি জবাব দেয়,
    ‘বোবা! নাহ সমস্যা না। বোবা তো আল্লায় বানাইছে। সমস্যা নাই। তয় কিছু না দিলে চলত না। পোলারে বিদেশ পাডাইতে হইব।’
    নুন্না স্বস্তি পায় জবেদার কথায়। জবেদা তাঁর কথা চালিয়ে যায়, ‘মাইয়াডা কেডা?’
    ‘ মোমেলার মাইয়া শিল্পী।’
    ‘ অ। চিনছি। দেখতে খারাপ না। কথা কন।’
    নুন্নার ভাবনায় মোমেলার চিন্তা কমল। তোতাও রাজি, সলিমুল্লাও খুশি। মোমেলার মনে নতুন চিন্তা। শামীম কম করে হলেও শিল্পীর দুই বছরের ছোট।

    বয়সের নিকেশ চোখে পড়ে না কারোই। মোমেলার মাথায় থাকলেও সে চিন্তা মিলিয়ে যায়; মেয়ের হিল্লে হবে এই বা কম কিসে? দেখাদেখির পালা চুকিয়ে অনেকদূর এগিয়েছে নুন্না। লেনদেনের হিসেবটা বরাবর মোমেলার দিকে। শামীমকে বিদেশ পাঠিয়ে দিবে। দেড় ভরি সোনার গহনা দিতে হবে। মোমেলার জমানো টাকায় এসব কুলোবে না। আপাতত কোন সমস্যা না। সমস্যা হবে বিদেশ পাঠানোর সময়। সে হিসেবটাই মোমেলাকে ভাবায়। তবে সে দমবার নয়। ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। জগতে কারো বিপদ আটকে থাকে না, মনে থাকে কিছু মানুষের ব্যবহার শুধু। মেয়ের বিবাহ নিয়ে সলিমুল্লা’র কোন ভাবনা নেই। সে জন্মেছে নির্ভাবনার বর্ষা দিনে। টিপটিপ বর্ষার জলে সবকিছু যেমন কাদায় মাখো মাখো তেমনি মোমেলার কামাইয়ে তাঁর জীবনও সুখে মাখো মাখো। জগতে সবার সুখ এক রকম নয়; কারও সুখ অঢেল টাকার বান্ডেলের ভাজে ভাজে। কারও সুখ কাজ-কর্ম না করে উদোরপূর্তিতে। কাঁচা মরিচের কামড়ে কামড়ে পান্তা ভাতের জলে কারও সুখ টলমল করে। কারোই তেমন কোন চাহিদা নাই; দু’বেলা পেট পুরে খেয়ে শান্তিতে ঘুমুতে পারলেই তার সুখ। সলিমুল্লা সে সুখেই কোন টেনশনে নাই।

    মোমেলার ব্যস্ততা বুবি’র চোখে পড়ে। দু’বার তাকে দেখতে এসেছে জবেদা। শামীমও এসেছে একদিন। সেদিনের কথা বারবার মনে পড়ে তাঁর। শামীম নিরীহ গোছের সাদাসিধে ছেলে। বুবি’র মতো সেও নানার বাড়ি থাকে। সবাই তাকে ভাল ছেলে বলেই জানে। এলাকায় দু এক জন এমন ছেলে থাকে; যাদের নাম করে বাপমায়েরা নিজের ছেলেপুলেকে শাসায়। বুবি’র চোখে শামীমের চোখ পড়তেই ওর মনে শামীমের জন্য একটা আলাদা খুপরি তৈরি হয়েছে। সেখানে অন্য কারো স্থান নাই, তা মৌলিক। সে তাঁর এই কথাটুকু কাউকে বলতে পারে না, তাঁর মনের কথা চেহারায় ফুটে ওঠে। মোমেলা বুঝতে পারে। ও মা। মায়েরা সব বোঝে। বাহাদুরও বুঝতে পারে তার কদর বেড়েছে বুবি’র কাছে। মাথায় হাত বুলানোর ধরন বদলেছে সে। আগে হাত বুলালে বাহাদুর মিউ মিউ করত; এখন ঘুমিয়ে যায়। বুবি’র কাজে একটা উদাস উদাস ভাব লক্ষ্য করে মোমেলা। কিন্তু কিছু বলেল না। বলে লাভ নাই, বলার দরকারও নাই। যাকে নিয়ে এতো এতো ভাবনা ছিল চিন্তা নগরে দু’দিন পর তাঁর বিয়ে। মেয়ের চোখে যে তৃপ্তির রেখার আঁকিবুকি তা মোমেলাকে নতুন প্রাণ দিয়েছে। আজন্মের কষ্ট বুঝি ঘুচল এবার।

    বুবি’র বিয়েতে মোমলা আর তোতা মিলে সত্তর জনকে দাওয়াত করেছে। বর যাত্রী আসবে বিশ জনের মতো। বাবুর্চির ফর্দ ধরে কেনা কাটাও শেষ। দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে এলো। লোকে গমগম তোতার বাড়ি। বুবি’র বিয়ে। দাওয়াত না পেলেও অনেকে এসে দেখে যাচ্ছে। ছোট খাটো একটা গেটও করা হয়েছে তোতার বাড়ি। যে কেউ দেখলেই বুঝবে এটা বিয়ে বাড়ি। সবকিছু ঠিকঠাক মতোই এগুলো।
    বুবিকে সুন্দর করে সাজিয়েছে মাতবর বাড়ির ছোট মেয়ে জরিনা। জরিনার সাথে বুবি’র ভাবের খাতির না থাকলেও চোখের মায়ার একটা টান আছে। সেই টানেই বুবি’র পাশে জরিনা।
    কাজী সাহেব বিবাহের এন্তেজামে ব্যতি-ব্যস্ত। নীল রঙের নিবন্ধন বইতে নাম-ধাম লেখা শেষ। সমস্যা হলো বুবি’র ইজাব কবুল নিয়ে। কাজী সাহেব যা যা বলবে তা তো বুবি শুনবে না; ও কবুল বলবে কিভাবে?

    কাজী সাহেব আসলে মূল কাজী নন। তাঁর শাখা প্রশাখা থাকে এলাকা ভিত্তিক। সরকারি হিসাব-কিতাবের ধার ধারে না তাঁরা।এলাকা ভিত্তিক আত্মীয় পরিজন নিয়োগ দেওয়া থাকে বিবাহ নিবন্ধনের জন্য।অনেকে অনেক বিষয়ে অভিজ্ঞ থাকে না; কেউ কেউ দিনকে দিন সমস্যায় পড়তে পড়তে অভিজ্ঞ হয়। তবে এ অভিজ্ঞতা অরজনের কথা কাউকে তেমন বলতে চায় না কেউ। বুবি’র বিবাহে আসা কাজী বোবা মেয়ে বা ছেলের বিয়ে দেয়নি আগে কখনো।বিষয়টা নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে কাজী সাহেব পাঞ্জাবির পকেট হতে মোবাইল ফোন বের বড় মসজিদের খতীব মাওলানা রশিদ সাহেবকে ফোন দিয়ে জেনে নিলেন। বুবি’র মুখে কবুল বলতে হবে না। ইশারা করলেই হবে। তাছাড়া সে তো গন্ড মূর্খ নয়। স্কুলে যেতে যেতে সে নাম দস্তখত শিখেছে।

    বুবি’র বিবাহ সম্পন্ন হলো। মোমেলার চিন্তা ঘুচলো। শামীমের হাতে বুবিকে সঁপে দিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সে। তাঁর কা্ন্না দেখে স্থির থাকতে পারে না তোতা, সলিমুল্লা। বুবি সলিমুল্লাকে কখনো কাঁদতে দেখেনি। মেয়ের প্রতি সলিমুল্লা কখনো তেমন দায়িত্ব পালন না করলেও বাপ-মেয়ের সম্পর্কে একটা পোক্ত ভাঁজ ছিল। সলিমুল্লা বাড়ি ফিরলে রোজ রোজ তাঁর হাতের মুঠো হতে কিছু না কিছু বের করে বুবিকে দিতো। কখনো দু’টাকা দামের চকলেট, কখনো কটকটি, কখনো বা নারকেল ভাজা। বুবি’র কাছে বাবার এই সামান্য উপহার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি মনে হতো। মায়ের চোখের আড়ালে বাবার এই ভালবাসা পৃথিবীর কোন কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না। নীরবে নিভৃতে যে বাবা তাকে ভালবাসতো আজ সে কান্নায় ম্রিয়মান। বাবার সাথে কাটানো সময়গুলো তাঁর চোখে বারবার ভেসে ওঠে। একবার বুবির খুব জ্বর হয়ে ছিল। কাঁপতে কাঁপতে দাঁতে খিল পড়ে যেতো। মোমেলার সাথে ডাক্তারখানা যাবার সময় সলিমুল্লার অস্থিরতার ছবি চোখে ভাসে তাঁর। সে পুকুর জলে সাঁতার কাটা বাবার কাছেই শিখেছে। আজ সে বাবা’র চোখে জল তাঁর সয় না। বাবা মাকে জড়িয়ে সে অঝোরে কাঁদতে থাকে। তোতা দূরে দাঁড়িয়ে ফোঁপাতে থাকে।

    জগৎ ভালবাসার স্থান । এখানে ভালবাসায় সব হয়।মানুষে মানুষে যত হানাহানি তাঁর পাছে এই ভালবাসাই দোষী। পরস্পরের ভালবাসায় সম্মান না থাকলে তা আর ভালবাসা থাকে না।তখনই নানা অনাচারের কথা শোনা যায়। ভালবাসার বন্ধন না থাকলে এতকাল এ জগৎ টিকতো না। তবে সব ভালবাসা মধুর হয় না। কিছু কিছু বিয়োগের ভালবাসা বর্ণনার বাইরে, ছলনার ঊর্ধ্বে। সবার কান্নার রোল বাহাদুর বোঝে না। তবে বুবি যে কোথাও চলে যাচ্ছে তা সে ঠিক বুঝতে পেরেছে। পিছন দিক হতে বুবির শাড়ির আঁচল মুখ দিয়ে টানছে সে। বুবির চোখে পড়ে বাহাদুরের টানাটানি। কত দিনের সর্ম্পক যেন তাদের এক করে রেখেছিল। আজ কি তা মিটে যাবে? বাহাদুরের জন্য বুবির ভেতরটা ফেটে যায়। এই বাহাদুর তাঁর একাকীত্ব দিনের সঙ্গী; নীরব রাতের সহচর। বুবি বাহাদুরকে কোলে তুলে নেয় সাথে নিয়ে যাবে বলে। মোমেলা বাহাদুরকে রেখে দেয়। বুবি যাত্রা করে শ্বশুরবাড়ি।

    এশার পর শ্বশুরবাড়ি পা রাখে বুবি।বুবিকে দেখতে এ বাড়ি, ও বাড়ি হতে বৌ ঝিয়েরা আসতে থাকে। বুবিকে সবাই চিনে। সাধারণ চেনা জানা আর বউ হবার পর চেনা জানায় তেমন তফাৎ না থাকলেও একটা ভাল সুবোধ ছেলের জন্য বোবা মেয়ে পছন্দ করার মধ্যে একটা কিন্তু থাকে। বুবি সবাইকে পা ধরে সালাম করে। জবেদা সালামের আদবটা প্রথমেই শিখিয়ে দিয়েছে ইশারায়।মকবুল বুড়োর বোন ছলেমা একগাল শুনিয়ে গেল জবেদাকে। ‘দুন্নাই ভইরা মাইয়ার কী আহাল লাগছে নি? কী সোনা তোলা পোলাডার লাইগ্গা একটা বুবি ধইরা আনলি। তর এত লোভ ক্যান শুনি? এই বোবা মাইয়া দিয়া করবি ডা কী! সংসারে কত কাম কাইজ। বুঝবি, বুঝবি কয় দিন পরে। আমাগো একবার জিগাইলিও না।’ জবেদা কান পেতে শুনে সহ্য করে। তেমন কিছু বলে না।

    শামীমের দু’বন্ধু মিলে বাসর ঘর সাজিয়েছে জরি আর রজনীগন্ধা দিয়ে।বুবি চারপাশটা ভাল করে দেখছে। তাঁর মনের মধ্যে কী এক সুখভাব বারবার দোলা দেয়। সে ধরে ধরে রজনীগন্ধার কলি দেখে। তাঁর জীবন কলি আজ ফুটেছে; রজনীগন্ধার কলি ফোটার আগেই বাসর ঘরে নিজেকে বিলীন করেছে। বাহাদুরকে দেখে বুবি আতকে ওঠে। বাহাদুর খাটের একপাশে চুপটি করে বসে আছে। সে বুবির উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বসিত। মাঝে মধ্যে মিউ মিউ ডাক দিয়ে জানান দেয় সে এখানেই আছে। মোমেলা তাকে আটকে রাখতে পারেনি। প্রকৃতির নীরব বন্ধন কেউ রুখতে পারে না; কেবল তাঁর ধরন বদলায়। শামীম দরজার খিল এঁটে বুবি’র পাশে বসে। বুবি চুপ হয়ে যায়। ঘোমটা টেনে সে মাথা নুইয়ে থাকে কিছুক্ষণ। ওর আদব কায়দার কমতি নেই। খাট হতে নেমে সে উঠে দাঁড়াতেই শামীমও পাশে দাঁড়ায়। বুবি তাকে পা ধরে সালাম করে। শামীমের বয়স বুবির চেয়ে কম। সে অনেক কিছু কম বুঝলেও দায় নেয়া বউয়ের প্রতি তাঁর করতব্য সে বুঝে নিয়েছে। বুবিকে খাটে বসিয়ে সে জীবনের বিচিত্র পাঁচালি ইশারায় বোঝায় বুবিকে। বুবি শামীমের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বুঝতে পারে তাকে তার দায়িত্ব বোঝানো হচ্ছে। তাঁর দৃষ্টিতে ভেসে ওঠে স্বামী-স্ত্রীব সম্পর্কের মায়াজালের বিচিত্র খসড়ার নকশা। বাহাদুর বুবির কোলে বসতে চাইলেও শামীমের জন্য পারে না। বাহাদুরের প্রতি স্বামীর কিছুটা বিরক্তি সে আঁচ করতে পেরে বোঝায়। স্বামীর ঘরের দায় বোঝার পর বুবি শামীমকে ইশারায় বোঝায় বাহাদুর তাঁর কতটা কাছের। শামীম আর কিছু বলে না। দু’জনের নতুন সংসারে বাহাদুরের ঠিকানা হলো।
    (চলবে)

    13
    7 Comments
Skip to toolbar