-
ছোট গল্প
———
বুবি(শেষপর্ব)
— শাহ্ কামালশামীমের সংসারে বুবি’র দিন খারাপ কাটার সুযোগ নেই। জবেদা সারাদিন বকবক করে। ‘দুনিয়া বড় সেয়ানা। সবাই নিজেরডা ভালাই বোঝে। এই দিন দিন না। উপরে একজন আছে। মানুষরে ঠকায়া কেউ বড় হয় না। আল্লা বিচার করব। আমি আল্লার কাছে কই। আমি সই, আল্লা যে সয় না।’ এই রেকর্ড করা বয়ানটা সে সারাদিনই ঝেরে যায়। বাবার জমি জিরাত ভাগের সময় তাকে ঠকানো হয়েছে। সে জ্বালা মনে পড়লেই এ রেকর্ড বাজতে শুরু করে। বুবিকে সংসারের টুকিটাটি শেখায় জবেদা। এসব সে মায়ের কাছ থেকে বহু আগে শিখলেও খাবার শিষ্টাচার বুবি’র ভাল লাগে না। বুবি সবাইকে খাওয়ায় কিন্তু সে পরে খায়। জবেদা ওকে একত্রে খেতে নিষেধ করেছে। সংসারের ধর্ম এটাই। শামীমের ভাল লাগে না। সে মাঝে মাঝে অল্প খেয়ে উঠে যায়। বুবি’র শ্বশুর আব্দুল খালেক বিষয়টা লক্ষ্য করেছে কয়েকবার কিন্তু কিছু বলে না সে। এ বাড়িতে কুঁড়ি বছর ধরে ঘর জামাই খালেক। তাঁর কথা বলা বারণ। জবেদার হাক ডাক বহু শুনেছে এ পাড়ার মানুষ; খালেকের টু শব্দটাও কেউ শোনেনি কোন দিন। ইদানীং ছেলের না খেয়ে উঠে যাওয়াটা তাঁর ভাল লাগছে না। সে জবেদাকে জানিয়ে দেয়, শিল্পীরে কইয়ো ওরা যেন অগো খাওন নিজের ঘরে নিয়া যায়। দুই জনে মিল্লা খাইবো।’ কথাগুলো শামীমের কানে যেতেই তাঁর চেহারায় একটা তৃপ্তির রোশনাই দেখা যায়। জবেদা তো রেগে আগুন।’আমার ঘরে ভাগাভাগি চলব না।’ বলে সে রাগ দেখায়। খালেক তাঁরে বোঝায়,’ দিনকাল বদলাইছে। বুঝতে হইবো, জবেদা। এইডা ভাগ না; স্বাধীনতা। দেইখো তুমি, অরা খুশি হইবো। আরো সংসারী হইবো। আমাগো একটা পোলা। ভাগাভাগি হইতে দিমু না।’ খালেকের মুখের কথাগুলো জবেদার দিলে লাগে। সে বুঝতে পারে। বাবার কথা শুনে শামীম কতো যে খুশি হয় তা ভাষার বর্ণনায় অনন্ত; চোখের দেখায় বুক জুড়ানো।
বাড়ির উত্তর দিকের কাঁঠাল গাছের তলায় বিকেলে বসে আছে শামীম। বন্ধু-বান্ধব কেউ এলে লুডুর আড্ডা বেশ জমে এখানে। আজ কেউ আসেনি।শামীম একা বসে আছে খেজুর পাতার চাটাইয়ের উপর। বুবি শ্বাশুড়ির কথা মতো বাড়ির পাশ হতে শাক-পাতা তুলতে পা বাড়াতেই শামীমকে দেখে চুপি চুপি তাঁর পিছনে গিয়ে চোখ দুটো ঝাপটে ধরে। শামীম প্রথমে বুঝতে না পারলেও বুবির ঘোমটা তাঁর কপালে ঠেকলে সে আঁচ করে এটা শিল্পীর কাজ। পিছন দিকে হাত বাড়াতেই চুড়ি স্পর্শ করে সে নিশ্চিত হয়, ও শিল্পীই। ক’ দিন পাশে থেকে বুবি’র একটা ঘ্রাণও বুঝেছে নীরবে। চোখ হতে হাতটা সড়াতে ওর হাত বাড়াতেই বুবি তাকে ঝাপটে ধরে। ঝাপটে ধরার সুযোগে শামীম বুবিকে কাঁধে তুলে দাঁড়িয়ে যায়। বুবি খুশিতে আটখানা। বিপত্তি হলো বাহাদুরের। বুবিকে শামীমের কাঁধে দেখে বাহাদুর লেজ নাড়তে নাড়তে জোর গলায় ডাক দেয়, মিউ, মিউ।
বুবির সাথে সাথে শামীমও যায় শাক তোলতে। বিকেলের বিদায়-সূয্যি’র মিঠে আলো বুবির চোখে পড়ে। শামীমকে পাশে পেয়ে তাঁর আনন্দের কোন সীমান্ত থাকে না। বাতাস ওকে ছুঁয়ে যায়। প্রজাপতি উড়তে উড়তে ওর হাতে বসে। মাথার উপর গঙ্গাফড়িং বসে আর ওঠে। পুকুর হতে সাঁতরে আসা হাঁসগুলো ডানা ঝাপটে দেয় ওর কাছে এসে। সুপারী গাছ থেকে কাঠ বিড়ালী দাঁত দেখায়। নিজ এলাকায় ভাগের গাছের ফলের খোঁজে বেড়িয়ে পড়া বাঁদুড়গুলোও ওকে দেখে যায়। বাহাদুর সব কিছু লক্ষ্য করলেও তাঁর বলবার ভাষা নেই বুবি’র মতো; ওর স্বাধীন ভাষায় নিজ মনে ডেকে যায়। মিউ মিউ।মোমেলা রোজ বিকেলে কাজ শেষে শামীমদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেতো। মেয়ের বিয়ের পর এ রাস্তা দিয়ে আর যায় না।মানুষের ভাবনার কোন ঠিকঠিকানা নেই। কখন কে কী বলে বসে। আজ হাতে সময় কম বলে এ রাস্তা দিয়েই এসেছে। ঘোমটা বড় করে সামনের দিকে টেনে জোর কদমে হাঁটলেও তাঁর চোখ পড়ে বুবি-শামীমের দিকে। মেয়ের মুখের হাসি দেখে বুকটা ভরে যায় তাঁর। দু’জনে মানিয়েছেও ভাল। বিধাতার গড়া ঝুটি সব সময়ই অনিন্দ্য সুন্দর। বুবি’র শাক তোলা শেষ হয়।
এশার পর এ তল্লাটে গভীর রাত। সবাই খেয়ে ঘুম দেয়। অবশ্য পরিবর্তনের ছোঁয়াও লেগেছে। অনেক বাড়িতে টেলিভিশন চলে মেলা রাত পর্যন্ত। বৌ-ঝিয়েরা ভারতীয় সিরিয়ালের জন্য বেতালা পাগল। কত ঝগড়া হয় ঘরে ঘরে। ঘর সংসারে বিভাজন সৃষ্টির ভিনদেশী সিরিয়াল জবেদার ঘরে চলে না। টিভি দেখলে জাহান্নামে যেতে হবে। এ বাড়ি এশার পর তাই বেশি রাত জাগা হয় না কারোই। শামীম আর বুবি খেতে বসেছে চাটাইয়ের উপর। বাহাদুরও তাঁর জায়গা নিয়ে বসে গেছে। বুবি শামীমকে একটা থালা দেয়; নিজে একটা নেয়। শামীম বুবির থালাটা সরিয়ে বুবিকে ইশারায় কাছে ডাকে। বুবি এগিয়ে পাশে বসে। শামীম শাক দিয়ে ভাত মেখে বুবির মুখে তুলে দেয়। বুবির চোখে মুখে ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঠিকরে পরে যেন। ওর বুকের সকল অপূর্ণতা শামীমের কাছে এসে ঘুচে গেছে। স্বয়ং বিধাতা তাকে সুখের সাগরে নিজ হাতে পাঠিয়েছেন। বাহাদুর চেয়ে চেয়ে দেখে ওদের। ঘরের দরজাটা পুরোপুরি আটকানো ছিল না। ভিতর থেকে বাল্বের সামান্য আলো বাইরে যায়। বাইরে থেকে সেই আলোতে তোতা শামীম আর বুবির ভাত খাওয়া দেখছিল একমনে। নাত জামাই’র সোহাগ দেখে তোতার চোখে জল আসে। বয়স কম হলেও বউয়ের কদর বোঝে ভালোই। সে একটা শুকনো কাশি দেয় বাইরে থেকে। শামীম দরজা খুলে তোতাকে দেখে ঘরে বসতে বলে। তখনো ওদের খাওয়া শেষ হয়নি। নানাকে দেখে বুবির খুশি ধরে না যেন। তোতা বুবিকে ইশারায় বলে, ‘তোর লাইগা তোর মা রাতা মোরগের ঝাল কষা পাঠাইছে। তোরা খা।’ বুবি তোতার কথা বুঝতে পারে। সে জবেদাকে ডেকে আনে। জবেদা তোতাকে জোর করে খেতে বসায়। তোতা না খেয়ে পারে না। বুবি একটা বাটিতে কয়েক টুকরা মাংস দেয় শামীমকে। রাতা মোরগের ঝাল কষা বুবির খুব পছন্দের। ওকে ছাড়া মোমেলার গলায় নামবে না বলেই পাঠিয়ে দিয়েছে। মেয়ের প্রতি জামাই’র ভালবাসা মোমেলাকে এতোই মুগ্ধ করেছে যে সে পারে না নিজের কলজেটাই দিয়ে দেয়; রাতা মোরগ তার জন্যই জবাই দিয়েছে সে।
তোতা খাওয়া শেষে চলে যায়। জবেদারও বড্ডো ঘুম চোখে। দরজা আটকে বুবি মাংস খায় চেটে পুটে। শামীম চেয়ে চেয়ে দেখে। বাহাদুর রাতা মোরগের হাড়ের আশায় ঠায় বসে থাকে বুবির সামনা সামনি।দেখতে দেখতে চার মাস চলে গেল। সলিমুল্লা’র মনটা ছটফট করে। অনেক দিন মেয়েকে দেখে না। মেয়ে বোবা হবার কারণে সে কতো কথা বলতো মোমেলাকে। আজ সে বোবা মেয়ে অন্যের ঘরে। সে কথা বলতে পারে না; সকলকে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা তীব্র। রোজ দুপুরে সলিমুল্লাকে ভাত বেড়ে দিতো সে। ভাত খাবার সবকিছু সামনে দিয়ে বাবার সামনে বসে থাকতো । বাবার দিকে তাঁর একটা টান বরাবরই কাজ করতো। বাবার সাথে মেয়ের হৃদ্যতা যুগ যুগান্তরের। সেই মেয়েটা আজ অন্যের ঘরে। তাঁর জন্য মনটা কেমন হু হু করে উঠে। মোমেলা ক’দিন লক্ষ করছে ব্যাপারটা। তাই সে তোতাকে পাঠায় বুবিকে আনতে।
হাজী সাহেবের মিষ্টান্ন ভান্ডার হতে এক কিলো রসগোল্লা নিয়ে তোতা এসেছে বুবিকে নিয়ে যেতে। কিন্তু সমস্যা বেঁধে গেছে মহা একটা। পুকুর ঘাট হতে এসেই বুবি কাঁধতে শুরু করেছে। জবেদা সে কান্নার রহস্য উদঘাটন করতে পুকুর ঘাটে গেছে। শামীমও বাড়ি নাই; কাজে গেছে। বুবি কেঁদেই চলেছে। তোতা কাছে যেতেই তাঁর কান্নার রোল বেড়ে যায়। মুখ ফুটে সে বলতে চায়, মানুষগুলো এমন ক্যান নানা ভাই? আমি তো কারও ক্ষতি করি নাই। আমাকে এতো কথা শুনতে হয় ক্যান অন্য মানুষের? মানুষের কি খেয়ে কোন কাজ নাই? আমার সুখের সংসার কি ওদের সহ্য হয় না?
তোতা মাথায় হাত বুলিয়ে বুবিকে শান্ত করতে চেষ্টা করে। ও কাঁদতেই থাকে। জবেদা বকবক করতে করতে বাড়ি ফিরে। মহিলারা পথে ঘাটে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এমন বকবক প্রায়শই করে থাকে। তোতার কানে জবেদার বকাকানি এসে পৌঁছায়। আমার পোলার বউ দামড়া না ক্যাচরা তা দিয়া তোর কী দরকার, খ্যাপার বউ? গেরামের সবার পিছনে লাইগা থাকে মাগী। আমার পোলা ছোড, বউ বড়— তাতে তগো কী সমস্যা? বোবা মাইয়া। ঘাটে একলা পাইয়া অপমান করস। ভাবছোস আমার বউ কিছু বোঝে না? আবার পাইয়া লই, হারামজাদী।
কথাগুলো শুনে তোতার চোখ বেয়ে জল গড়ায়। তাঁর বুঝতে বাকি থাকে না কিছুই। ঝুড়িতে মাছ নিয়ে মেম্বারে পুকুরে ধুতে গিয়েছিল বুবি। তাকে দেখে এ তল্লাটের খ্যাপার বউ অনেক কথা বলেছে। বুবি কানে শোনে না, বুঝতে পারে সবকিছুই। তাই তাঁর বুক ফাটা আর্তনাদ চোখের জল হয়ে অঝোরে ঝরছে।
তোতাকে দেখে শান্ত হয়ে যায় জবেদা। ধীরে ধীরে শান্ত হয় বুবি। ফোঁপানো বন্ধ হয় নি। তোতা’র কাছে বুবিকে দিতে চায় না জবেদা। দু’দিন বাদে এসে নিয়ে যেতে বলে। তোতাকে দেখে আশে পাশে ঘুর ঘুর করে বাহাদুর। নিরীহ প্রাণী চতুর মানুষের স্নেহ সহজে ভুলে না। বাহাদুরও ভোলে নি। জবেদা তোতার খাওয়ার ব্যবস্থা করে। তোতার খাওয়া দাওয়া শেষ না হতেই বুবি তাঁর সাথে যাওয়ার জন্য রেডি হতে থাকে। জবেদা’র বারণ শোনে না। তাঁর মনটা ভাল নাই। বার বার মায়ের কথা মনে পড়ছে তাঁর। শেষমেষ বাঁধা দেয় না জবেদা। ঘর হতে বেড়িয়ে উঠোন মাড়াতেই রোদে শুকোতে দেওয়া শামীমের লুঙ্গির একটা কানির স্পর্শ লাগে বুবির মাথায়। ঘোমটাটা মাথা থেকে পড়ে যায় তাঁর। স্পর্শটা যেন লুঙ্গির ছিল না, শামীমের। আচমকাই থেমে যায় সে। শামীমের মুখ তাঁর চোখে বারবার ভেসে ওঠে। স্বামীর প্রতি তাঁর অবিচার হচ্ছে। তাকে বলে যাওয়া দরকার। নাহয় সে কষ্ট পাবে। ইশারায় সে তোতাকে বোঝায়, শামীম কাজ থেকে ফিরলে তাকে বলে যাবে। ওর আসার সময় হয়ে গেছে। একটু পর শামীম এসে বুবি আর তোতাকে এগিয়ে দেয়।
আদম ব্যবসায়ী সুরত আলী জবেদার আত্মীয় হয়।খাতির খুব পোক্ত নয়, ফেলনাও নয়। এ অঞ্চলে তাঁর খেতাব ডেলিকেটার। সুরত আলী বললে কেউ চিনবে না। পুঁচকে হতে বুড়ো পর্যন্ত সবাই এক নামেই চিনে; ডেলিকেটার। এ পর্যন্ত কত মানুষজন যে বিদেশ পাঠিয়েছে তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। শামীমকে ভাল ভিসার জন্য এখনো পাঠায় নি। এবার একটা ভাল ভিসা পাওয়া গেছে। এক বছর আগে শামীম পাসপোর্ট বানিয়ে রেখেছে। পাসপোর্ট বানাতে গিয়ে দাঁড়ি-গোঁফ মা উঠতেই কত বার খুর-কাঁচি চালাতে হয়েছে। দাঁড়ি-গোঁফ ছাড়া পুরুষকে পুরুষ লাগে না। বিদেশ তো আর ছোট বাচ্চা কাজের জন্য পাঠানো যায় না। পাসপোর্টের ছবিতে বয়স বেশি দেখাতে ডেলিকেটার সুরত আলীর পরামর্শে আগে ভাগেই দাঁড়ি-গোঁফ গজাতে খুর-কাঁচি চালাতে হয়েছে শামীমকে। সুরতকে দেখে জবেদা খুশি। মনেহয় ভাল ভিসা পেয়েছে। তাই তাঁর খুশি আর ধরে না। আগামী দু’মাসের মধ্যে চার লাখ টাকা দরকার শামীমকে বিদেশ পাঠাতে। জবেদা তেমন কোন টেনশন করে না। বিয়ের সময় শামীমের শ্বাশুড়ি মোমেলা বলেছে একটা ব্যবস্থা করবে।চোখের পলক না পড়তেই সপ্তাহ চলে গেল। বুবি’র শ্বশুর বাড়ি যাওয়া হয়নি। রোজ বিকেলে শামীম আসে। জীবনের গত বসন্তগুলো পানসে কাটলেও বুবি’র এখন প্রভাতী ফাগুন। আজ চলে যাবে বলে নিজ থেকেই জানিয়েছে মোমেলাকে। ডিম দেওয়া বুড়ো হাঁসের গোশত আর আতপ চালের সেমাই পিঠা বুবি’র পছন্দ। মোমেলার চারটে হাঁস ডিম দেয়। বেছে বেছে ওজনদার একটা হাঁস জবাই করেছে মোমেলা। বিকেলে শামীমের আসার কথা থাকলেও জবেদা মধ্য দুপুরে হাজির হয়েছে। ওর ভাবগতিক আন্দাজ করতে পারে মোমেলা। হয়তো কিছু বলবে। কিন্তু মোমেলা জিগ্যেস করে না। দুপুরে তোতা, সলিমুল্লা আর জবেদা এক সাথে খেতে বসে। বুবিকে ডাকলেও সে আসে না। ও ভাত খাবে না। শামীমের সাথে সেমাই পিঠা খাবে। সে পাশে বসে সবাইকে এটা ওটা এগিয়ে দিচ্ছে। বাহাদুর তাঁর সাথেই। খাওয়া শেষ করে পান চিবুতে চিবুতে জবেদা মনের কথা প্রকাশ করে- আপনেগো জামাইর বিদেশের বাও হইছে।চাইল্লাক টেকা লাগবো। সময় নাই বেশি দিন। বিয়াইন কইছিলেন ব্যবস্থা করবেন।
তোতার মাথায় বাজ পড়লো যেন। মোমেলা মুষড়ে না পড়লেও গভীর একটা ভাবনার ছাপ তাঁর চোখে স্পষ্ট। বর্ষাকালে বজ্রপাত আর বিজলীর মিশেল আবহাওয়া তাঁর মনের। এতগুলো টাকা ব্যবস্থা করা ওর জন্য সহজ কাজ না। মোমেলা কিছু না বলতেই সলিমুল্লা জিগ্যেস করে, ‘বিয়াইন আপনে কিছু দিবেন না?’
– হ দিমু। আপনেরা তিন লাখ দ্যান। বাকীটা আমরা যোগার করি।
মোমেলা কিছু বলে না। কী বলবে? বোবা মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মেয়ের সুখ তাঁর চোখে উঁকি দেয় বার বার। গরীবের সুখ বেশি দিন সয় না। তাঁর মাথায় অনেক হিসেব চক্কর খায়। সলিমুল্লা বাবার ওয়ারিসে পাওয়া সহায় সম্পদ আনেনি। ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে বছর তিনেক আগে। ওসব বিক্রি বাট্টা করলে লাখ তিনেক যোগার হবে। ইচ্ছা করলে বসত ভিটা বেচে তোতাও দিতে পারবে। নিজে তোড়জোড় করলে লাখ টাকা ব্যবস্থা হবে। নানান চিন্তা ভর করে মোমেলার মাথায়।
জবেদা’র কাজ শেষ। জোহরের পর শামীমের আসার কথা থাকলেও সে আসতে পারেনি। আসরের আজানের আগে আসে সে। হাঁসের গোশত দিয়ে আতপ চালের সেমাই পিঠা খায় বুবি-শামীম। বাহাদুর চেটেপুটে ঝুটা হাড্ডি খাচ্ছে চোখ বন্ধ করে। মোমেলা’র বিমর্ষ চেহারায় বুবি চৈতালী খরতাপ দেখে বলতে চায়— মা, কী হইছে তোমার? শরীর খারাপ? নাকি অন্যকিছু?
কিন্তু সে প্রকাশ করতে পারে না। মায়ের চিন্তার কারণ তাঁর এখনো অজানা।
টাকার যোগার হলো। সুরত আলীর মুখে হাসি। জবেদাও স্বপ্ন পূরণের আশায় খুশির সওদা করে সফল হলো। মোমেলা-সলিমুল্লা সবকিছু খোয়ালো যে মেয়ের জন্য তাঁর শরীরটা ভাল নাই। শামীম তাকে বলতে না চাইলেও চারদিকের রাখডাকে তাঁর বুঝতে বাকি রইলো না। মাথার উপর দিয়ে জন্মের পর হতে উড়োজাহাজ বহু উড়তে দেখেছে সে। নিজের আপন জনও যে এভাবে হাওয়ায় উড়ে দূর দেশে যাবে তা সে কখনোই ভাবে নি। তাঁর মনে বার বার উড়োজাহজ গোত্তা খায়; মনের ভাবনা চোখের দর্শনে বারবার খাবি খায়। হৃদয়ের তলানিতে জমা শামীমের স্পর্শ চোখের কোণে জল হয়ে জমে। শামীম দেখে।মাথায় হাত বুলিয়ে বুবিকে সান্ত্বনা দেয়—কি অত ভাবো? আমি তোমায় ছাইড়া কই যামু?
ওই যে আসমান দ্যাহো তুমি আমি তাঁর নিচেই থাকমু। আমাগো একটা জমি লাগবো, বাড়ি লাগবো। আমাগো পোলাপানের ভবিষ্যৎ আছে না? ওইসব আমাগোই দ্যাহোন লাগবো। তোমার লগে আমি সব সময় কথা কমু। মন খারাপের কিছু নাই।
শামীমের কথা বুবি বোঝে না; অনুভবে ভিতরে গাঁথে। শামীমকে জড়িয়ে কান্না জুড়ে দেয় সে। সামনের রবিবার সন্ধ্যা সাতটায় শামীমের ফ্লাইট। কেনা কাটা শেষ হয়েছে। কাগজপত্রও হাতে পেয়েছে সে। বুবি ভাল নেই। শরীর ভাল না তাঁর। শুয়ে থাকে আর ফুঁপিয়ে কাঁদে। সবাই সান্ত্বনা দেয়। পুরো জীবনের না বলা কথা বুক চাপটে সে বলতে চায়। আমার জীবনটা এমন ক্যান? কেউ আমারে ধইরা রাখে না ক্যান? সবাই একলা কইরা দেয়।
বাহাদুর বুবি’র ভাবসাব দেখে এদিক ওদিক পায়চারী করে। শামীমের গোছগাছ শেষ। কাল রবিবার। মোমেলা, সলিমুল্লা, তোতা বুবির শ্বশুর বাড়ি। শামীমকে বিদায় দিতে হবে। ও সকাল সকাল রওনা দিবে। কাছে থাকার দরকার আছে। ফজরের আযানের আগে উঠে রান্না করছে জবেদা-মোমেলা। বুবি চুপচাপ। শামীমের বন্ধু শফি এসেছে ওর সাথে যাবে বলে। শফির সাথেই শামীমের সম্পর্ক একটু ভাল। নাস্তা সেড়ে সব কিছু গুছিয়ে শামীম বের হতে চায়। উঠোনে সবার থেকে সে বিদায় নেয়। বাড়ি ভরা মানুষজন। আশে পাশের অনেকেও এসেছে। বুবি একপাশে চুপচাপ দাঁড়ানো। শামীম তাঁর কাছে যেতেই সে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। ওকে সে বিদায় দিতে চাইছে না। ওর দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। শামীমও চেয়ে থাকে। আজ সেও নির্বাক। নীরবতার ভাষা এখানে স্পষ্ট হলেও দু’জনের ভাবনা এক চিন্তায় সরব। বুবি ফিট হয়ে পড়ে যাবার উপক্রম হলো। শামীম তাকে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরে। চোখের কান্না নিমিষেই মিলিয়ে যায়। শামীম বুবিকে ঘরে শুইয়ে পাশে বসে। শফি দৌঁড়ে গিয়ে বাজার হতে ডাক্তার নিয়ে আসে। মোমেলা মেয়ের জন্য অস্থির হলেও জবেদার ভিতরে ভিতরে রাগ বাড়ে। সে মনে মনে বলে, শুভকামে কুফা লাগায়া দিলো বউডা। আল্লায় জানে পোলাডার কপালে কি আছে!’
নাড়ীর গতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ তল্লাটের নামীদামী পল্লী চিকিৎসক হোসেন আলীর মুখে হাসি। বুবি চোখ মেলে তাকায়।’জবেদা, সুসংবাদ। তুমি দাদী হইবা। শামীম বাবা, তুমি আব্বা হইবা।’ ডাক্তারের মুখে এ কথা শুনে হাসতে হাসতে কেঁদে দেয় শামীম। তাঁর এ কান্না আনন্দ-বেদনার বিরহ আমোদ। তোতা উপরের দিকে দু’হাত তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘খোদা, এইডা কেমন বিচার তোমার! ‘ তোতার চোখে জল গড়ায়। তাঁর কোন অভিযোগ নাই, নাতনি একা হয়ে যাবে এ সময়। এটা সে মেনে নিতে পারছে না। ডাক্তার চলে যাবার পর বুবি উঠে দাঁড়াতে চায়। শামীম তাকে উঠতে দেয় না। জবেদা’র মুখে হাসির রেখা। ছেলে থাকবে না তাতে কী। ক’দিন গেলেই নতুন মেহমান আসবে ঘরে।
শামীমের দেরী হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু তাঁর মনটা ছটফট করছে। বুবি তাঁর হাত ছাড়ে না। বুবির হাত সরিয়ে চলে যাবে তা হয় না। ঘর হতে সবাই বাইরে যায়। বুবিকে শামীম ইশারা দিয়ে বোঝায়—‘তোমার নতুন আসবো। আমাগো মেহমান। তাঁর খেয়াল রাইখো। নিজের যত্ন নিও’। বুবি শক্ত করে শামীমের হাত ধরে। কী একটা ভয় তাকে তাড়া করে। খাটের কোণায় বসে বাহাদুর ডাকছে। মিউ…মিউ। বুবি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাঁর মনের ক্ষুধা চোখের ধারায় ঝরতে চাইলেও সে আটকাতে চায়; পারে না। শামীমকে বিদায় দেয় চোখের জলে। শামীমও সামনে এগোয় চোখ মুছতে মুছতে। মোমেলার বুকটা ফেটে যায়। চীৎকার করে তাঁর কাঁদতে ইচ্ছা করলেও সে কাঁদে না; নীরবে চোখের জল মোছে। প্রাপ্তি আর বিয়োগের অধ্যায় শেষে কেটে যায় মাসের পর মাস।
জবেদা বুবিকে ডাক্তার দেখায় না। এ সময় ডাক্তার না দেখালে সমস্যা। আল্লার মাল আল্লায় রক্ষা করবো। ডাক্তার দেখায়া কী লাভ। আগের দিনে কী পোলাপান হয় নাই? ডাক্তারের কাছে নিলেই সিজার করো, পেট কাটো। নিমু না ডাক্তারের কাছে, আল্লা ভরসা। কিছু হইব না, ইনশাল্লাহ। আল্লাহর উপর ভরসা করে জবেদা ডাক্তার না দেখিয়ে টাকার থলে বড় করে। মাসে মাসে শামীম টাকা পাঠায়। ও চায় ধীরে ধীরে শ্বশুর বাড়ির টাকা ফিরিয়ে দিতে। জবেদা সায় দেয় না তাতে। বোবা মেয়ে বিয়া করা চারটেখানি কথা নয়। টাকা ফেরতের কি আছে। নানান যুক্তিতে জবেদা শামীমকে বোঝায়।
বিদেশের চাকচিক্যে শামীম বদলায় না। কাজের পরে বিশ্রামে এলেই তাঁর বুবির কথা মনেপড়ে। অনাগত সন্তানের হাসিমাখা মুখ তাঁর চোখে ভাসে। বুবি সবকিছু সামাল দিতে পারবে কিনা সে চিন্তাও করে সে। বিদেশ থেকে মন খুলে সে বুবির সাথে কথা বলতে পারে না। বহুবার চেয়েছে একটা স্মার্টফোন দেশে পাঠাতে। জবেদাকে কোনভাবেই রাজি করানো যায়নি। ফোন পাইলে মাইয়া-বেটি নষ্ট হইয়া যাইবো-এই যুক্তিতে ফোন দিতে না করে জবেদা। তাই আর ফোন পাঠানো হয়নি। জবেদা কথা বলে শফির ফোন দিয়ে। শামীমের শখ ছিল ভিডিয়ো কলে বুবির সাথে কথা বলার। শফি অনেকবার চেষ্টা করেছে বুবির সাথে ভিডিয়ো কলে শামীমকে কথা বলাতে। পারে নি।
দেখতে দেখতে ফুরিয়ে এলো সময়।বুবি সকাল থেকে প্রসব বেদনায় কাতর। বাইরে বসে মাথায় ঘোমটা টেনে তাসবীহ পড়ছে জবেদা। বালা মসিবতে এমন তাসবীহ পড়ার অভ্যাস তাঁর নতুন নয়। মাসুমের মা নামকরা ধাত্রী। মোমেলা তাকে নিয়ে এসেছে বুবির কাছে। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নাগাদ ঘর হতে কান্নার আওয়াজ পাওয়া গেল। মোমেলা বাইরে খবর দিতে যেতে চাইলেও পারেনি। মাসুমের মা তাকে আটকে দেয়,’ একটু সবুর করো বইন। আমি ওর পেটে হাত দিয়া বুঝছি বাচ্চা দুইডা। একটু সবুর কর।’ মোমেলা নিজেকে সামলে বুবির মাথায় হাত বুলিয়ে পাশে বসে আছে। কিছুক্ষণের ব্যবধানে বুবি যমজ শিশুর মা হলো। এক পোলা আর এক মেয়ের মা বুবি। সবার মুখে আনন্দের বন্যা।
জবেদা খুশি হলেও দুই বাচ্চা সামলানোর পেরেশানিতে হা হুতাশ করলো। নির্বাক পৃথিবীতে নির্বাক বুবি অনেক কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারে না। তাঁর চোখের জল কথা বলে— ‘শামীম পাশে থাকলে কী ভাল হতো’। শফি শামীমকে যময শিশু জন্মাবার খবরটা সাথে সাথেই জানিয়েছিল। বিদিশের মাটিতে তাঁর খুশি আর ধরে না। বুবির জন্য সে একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন পাঠায়। মায়ের বারণ তাকে আটকায় না। শফি মোবাইলটা এনে দেয় বুবির হাতে। দুই সন্তানকে দুই পাশে শুইয়ে সে মাঝে বসেছিল। খাটের এক পাশে বুবির নিত্য সঙ্গী বাহাদুর। মোবাইলটা হাতে পেয়ে বুবির বুকটা জুড়ায়। নিশ্চয়ই শামীম এ মোবাইলটা হাতে নিয়ে কিনেছে ওর জন্য।মোবাইলে শামীমের স্পর্শ থাকা বুবির জন্য অনেক পাওয়া। সে বারবার মোবাইলটা ধরে শামীমের কথা মনে করে।বুবির চোখ বেয়ে জল গড়ায়। সে জল বেদনার নয়; প্রশান্তির। বাহাদুর বুবির চোখের যেন ভাষা বোঝে। ডেকে ডেকে সান্ত্বনা দেয়- কেঁদো না, শামীম ভাল আছে। সময় হলে সে ঠিকই ফিরবে।
মোবইলের দেওয়ালে শফি শামীমের ছবি সেঁটে দিয়ে গেছে। বুবি হাতে নিয়ে মোবাইলে শামীমকে দেখছিল। হঠাৎ মোবাইলের পর্দটা নড়ে উঠলো। শামীম কল করেছে। ভিডিয়ো কল। শফির শেখানো কথামতো বুবি শামীমের কলটা ওঠায়। মোবাইলের পর্দায় শামীমকে দেখে উচ্ছ্বসিত বুবি আঁ আঁ করে শামীমকে বলতে চায়- কেমন আছো তুমি? অনেক কাল তোমারে দেহি না। কবে আইবা তুমি? আমারে কি তোমার মনেপড়ে না? তোমারে ছাড়া ভাল্লাগে না আমার।
বুবি কেঁদে দেয়। সে বাচ্চাদের দেখায়। বাচ্চাদের হাতে ধরে দেখতে না পারার কষ্টে শামীম কেঁদে ফেলে। শামীমের কান্না দেখে বুবি ঠিক থাকতে পারে না। তাঁর হৃদয়ে কোটি দিনের আর্তনাদ। জগতে কতো মানুষ আপন হয়, কথা না বলা মানুষের আপন জন সবাই হয় না। ইথারের তরঙ্গে ভালবাসার বিনিময়ে বুবির মন শান্ত হয়। দরজায় দাঁড়িয়ে জবেদা সব দেখে। মোবাইলে সে ছেলের ছবি দেখে কাঁদে। ছেলেকে নিজের চোখে দেখে সেও স্বর্গের শান্তিতে নিজেকে জড়ায়। বুবির মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে বুকে টেনে নেয় সে।
বুবির ছোটবেলার সঙ্গী বাহাদুরের মাথায় হাত বুলায় বুবি। বাহাদুর বুঝতে পারে মনের তৃপ্তিতে অন্তরে যে ভালবাসা সৃষ্টি হয় তার প্রকাশ হাতের করতলে অনেক যত্নের।7 Comments
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim



আরো একটি সুন্দর গল্পের সমাপ্তি। শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন চমৎকার গল্পটির জন্য।