-
সহযাত্রী
এন. এ. স্বপন– আই লাভ ইউ, মায়া।
– আমাকে বলছো?
– তুমি ছাড়া যেহেতু এখানে আর কেউ নেই। তাছাড়া তুমিই তো মায়া, তাই না? সো তোমাকেই বলছি।
– তুমি জান না আমি প্রেগন্যান্ট? এই অবস্থায় এমন কথা কেউ বলে? তাছাড়া, তুমিতো এখনো কুমার।
– তাতে কি? মৌসুম বিচার করে কখনো ভালবাসা হয় না। তুমি এও জান, সবাই যা বলে আমি তা বলি না, সবাই যা করে আমি তা করি না।
– তোমার সাথে কথায় পারব না আমি। আচ্ছা, বন্ধন। তুমি কুমার হয়ে আমাকে ভালবাস কেন?
– জানি না। শুধু ভাল লাগে- এইটুকুই জানি।
– আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি এখন উঠব। একটা জরুরি ফাইলের কাজ করতে হবে।
– ওকে, আমিও বেশ আগে শাখা থেকে বের হয়েছি।অন্য একজন কলিগের শাখায় আড্ডা দিচ্ছিল বন্ধন ও মায়া। তারা দেশের নামকরা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তাদের সম্পর্কটা অন্যান্য কলিগ থেকে আলাদা। ব্যক্তিগত জীবনের ছোট ছোট বিষয় থেকে শুরু করে এমনকি পারিবারিক জীবনের সকল বিষয় একে অপরের সাথে শেয়ার করে। একটা স্রেফ বন্ধুত্ব। তবে বন্ধন তার বিবাহিতা কলিগের প্রেমে পড়ে যায়। যদিও মায়া এ ব্যাপারে বরাবরই বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, এ সম্পর্কের কোন ভবিষ্যত নেই-এমনটিই মনে করে মায়া।
প্রায় মাস কেটে যায়। গত তিন দিন ধরে অফিসে অনুপস্থিত মায়া। সাধারণত ঈদের ছুটি ছাড়া একটানা তিন দিন ছুটি কাটানোর নজির নেই তার। বন্ধন অন্য একজন কলিগের মাধ্যমে জানতে পারে, মায়ার গর্ভের সন্তানটি নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে অ্যাবরশন করাতে হয়েছে। তাকে সান্তনা দেয়ার ভাষা জানা নেই বন্ধনের। তাই একটা ফোনও করেনি সে। বন্ধনের ফোনে রিং বাজছে।
– হ্যালো, মায়া তুমি?
– হ্যাঁ, এত অবাক হচ্ছ কেন?
– এই অবস্থায় তোমার ফোন আশা করিনি বলে।
– ও, জান তাহলে?
– হুম, শুনেছি। তোমার রেস্ট দরকার।
– এখন আগের চেয়ে একটু বেটার। কাল অফিস করব।
– ওকে, দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ।
মায়া নিয়মিত অফিস করছে। বন্ধন আগের চেয়ে একটু বেশিই টেক কেয়ার করছে মায়ার প্রতি। সে এখন পুরোপুরি সুস্থ। বেশ ফুরফুরে মেজাজ ওর। মনেই হচ্ছে না কিছুদিন আগেই তার উপর দিয়ে একটা ঝড় বয়ে গেছে। অফিস বন্ধুদের সাথে আড্ডা, চা সেলিব্রেশন ও অফিস ডিউটি করেই তার প্রতিদিনকার সময় কাটে। অন্যদিকে মায়ার রুমে প্রতিদিন একবার ঢু না মারলে বন্ধনের পেটের ভাত হজম হয় না। তাছাড়া অফিসের কাজের ব্যস্ততায় একটু ফুসরত পেলেই দু’জনের মধ্যে মেসেঞ্জারে চ্যাটিং জমে ওঠে।বেশ কয়েকমাস এভাবেই কেটে যায়। শুধু বন্ধনকে মুখ ফুটে ভালবাসার কথাটা জানানো হয়নি মায়ার। পাশাপাশি কিছু ওয়ার্নিং বাক্যও বন্ধনকে মাঝেমধ্যে শুনতে হয়। যেমন- তুমি ভুল করছো, কষ্ট পাবে, মরিচিকার পিছনে ছুটছ, এই সম্পর্কের কোন ফিউচার নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কথা এক কান দিয়ে ঢুকায় আর অন্য কান দিয়ে বের করে দেয় বন্ধন। সে তার মতো করেই এগিয়ে যাচ্ছে। বরং নিষেধাজ্ঞার উপর তার ভালবাসা যেন বহুগুণ বেড়ে যায়।
– বন্ধন, তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে।
– হুম, বলে ফেল।
– ‘জরুরি’ শব্দটা শুনেও তোমার ভয় করছে না?
– হা হা হা, ভয় করবে কেন? বরং তোমার সেই জরুরি বার্তা শোনার জন্য আমি রীতিমত এক্সাইটেড।
– তুমি আমাকে ভুলে যাও। আর মাথা থেকে ভালবাসার ভূতটি তাড়াও।
– ও, এই কথা! এর আগে বহুবার শুনেছি। এটাই তোমার জরুরি কথা! হা হা হা।
– একদম হাসবে না। আমি সিরিয়াস। আমি একজনকে ভালবাসি। বাবু, আমি বাবুকে ভালবাসি। যদি কখনো তাকে হারাতে হয়, তাহলে কেঁদেকুটে গোসল করে অন্যরকম মানুষ হয়ে যাব আমি।মায়া বিবাহিতা- এ বিষয়টি কখনোই বন্ধনের মনে প্রভাব ফেলতে পারেনি। আজ তার মুখে বাবুর কথা শুনে ভিতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠলো। তবে মায়াকে একথা কোনভাবেই বুঝতে দেয়নি সে। নিজেকে কোনরকম সামলে নেয়।
– হা হা হা, তাতে কি হয়েছে? আমার ভালবাসা কি এতই ঠুনকো যে, অন্য কারো ভালবাসার জন্য পালিয়ে যাব?
– আমার যা বলার বলে দিয়েছি। এখন বিশ্বাস করা না করা তোমার ব্যাপার।
– আমার বিশ্বাস বা আস্থার অপর নাম মায়া। সুতরাং অবিশ্বাস করার কিছু নেই।
– এখন রাখছি তাহলে। ওর আসার সময় হয়ে গেছে।মায়ার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সাধারণত রাত আটটা সাড়ে আটটার দিকে উনি বাসায় ফেরেন। এজন্য ফোন রেখে দেওয়ার জন্য তাড়া করছে।
– হুম, রাখ। তবে মনে রেখ, তুমি চাইলেই কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না।
অন্য একটা ছেলের সাথে সম্পর্কের কথা জানার পরেও বন্ধন মায়ার সাথে আগের মতোই যোগাযোগ অক্ষুন্ন রাখছে। মাঝেমধ্যে অবাক হয় মায়া। ‘পাগল’ সম্বোধন করে। দেখা হয়, কথা হয়, চ্যাটিং হয়-সবই সমালতালে চলছে।
– মায়া, আজ দেশের ব্রেকিং নিউজ জান?
– হুম, বাংলাদেশের দু’জন করোনা শনাক্ত। তারা দু’জনই বিদেশ ফেরত, ইতালি প্রবাসী। আমাকে যদি করোনায় ধরে, বাঁচবোই না। কারণ, আমার আগে থেকেই সাইনোসাইটিস ও শ্বাসকষ্ট সমস্যা রয়েছে।
– এমন অলুক্ষণে কথা বলো নাতো, প্লিজ। কিচ্ছু হবে না তোমার। শুধু সাবধানে থেকো।
চীনের উহান শহরে সর্বপ্রথম কোভিড-১৯ তথা করোনার সূত্রপাত হয়। তারপর চীনের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এটি অত্যধিক ছোঁয়াচে রোগ। ফলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে দ্রুত সংক্রমন ঘটে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও করোনার সংক্রমন রয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশও করোনা ঝুঁকিতে রয়েছে।বাংলাদেশেও দিন দিন করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র এর মতো মহামারী রূপ ধারন করেনি এখনো। তবে সেসব দেশের মতো ৪র্থ স্টেজ অতিক্রম করলে বাংলাদেশও মহামারীতে পড়তে পারে। ভাইরাস বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা এমনই। তাছাড়া বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এদেশে প্রায় অসম্ভব।
– হ্যালো, তুমি ছুটিতে, মায়া?
– হুম।
– অফিসের খবর জান?
– নাতো, কোন ব্যাপারে?
– আগামী দশ দিনের জন্য দেশের সকল সরকারি অফিস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এ সাধারণ ছুটি আরো বাড়তে পারে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করতে যাচ্ছে।
– তাই নাকি? তাহলে তো সহসাই তোমার সাথে দেখা হচ্ছে না।
– তাতে কি? বেঁচে থাকলে দেখা হবে।
– ইনশাআল্লাহ। ভাল থেকো, সাবধানে থেকো।
ইতোমধ্যে সাধারণ ছুটির ১ম দফার মেয়াদ শেষ হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি দিনদিন অবনতি হচ্ছে। সেজন্য কয়েক দফা সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর মিরপুর, টোলারবাগ ও বাসাবোকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এসব এলাকা লকডাউন করা হয়েছে।কয়েকদিন ধরে মায়ার জ্বর, সর্দি-কাশি ও গলাব্যথা চলছে। সাধারণ ফ্লু থেকেও এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিন্তু একই লক্ষণ করোনার ক্ষেত্রেও দেখা যায়। এজন্য টেস্ট না করা পর্যন্ত অগ্রিম কিছু বলাও যায় না। তাছাড়া ওর বাসা টোলারবাগে হওয়ায় বন্ধনের দু:চিন্তার অন্ত নেই। মায়ার নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআর এ পাঠানো হয়। পরদিন রিপোর্ট আসে পজেটিভ। তাকে বাসায় আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। বাবুকে এক নজর দেখার জন্য মায়ার মন ব্যাকুল হয়ে আছে।
– হ্যালো, বাবু, তুমি কিছু শুনেছো?
– নাতো, কি হয়েছে?
– আমি করোনা আক্রান্ত। তোমাকে একটিবার দেখতে খুব ইচ্ছে করছে যদি আর দেখার সুযোগ না পাই।
– তুমি কি পাগল হয়ে গেছ, মায়া! জান না করোনা আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে যাওয়া সম্পূর্ণরূপে নিষেধ। বেঁচে থাকলে দেখা করার অনেক সুযোগ আসবে।
– তুমি না আমাকে পাগলের মতো ভালবাস?
– এখনো বাসি। তবে নিজের জীবনের থেকে বেশি নয়।
মায়ার কন্ঠনালী দিয়ে আর আওয়াজ বের হচ্ছে না। গলাটা বেশ ব্যথা করছে। চুপচাপ শুয়ে আছে। বাবুকে নিয়ে নানা স্মৃতিচারণ করছে। দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। বাবুর কি দোষ! করোনা এমন এক ব্যধি যার কাছে নিজের পরিবারের সদস্যরাও আসে না, আসতে পারে না- এসব ভেবেই চলেছে মায়া। এমন সময় দরজায় নক করার আওয়াজ। দরজা খুলেই তার চোখ ছানাবড়া।– বন্ধন, তুমি! কি করে এলে এখানে? এই এলাকায় কেউ ঢুকতে ও বের হতে পারে না। চারদিকে পুলিশের কড়া নজর।
– হুম, ঠিকই বলেছো। এজন্য তালতলা থেকে এখানে আসতে আমাকে কিছু মিথ্যে ও কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছে।
– সে যাই হোক। এটা তুমি মোটেও ঠিক করনি। তুমি এখনি চলে যাও। জাননা করোনায় আক্রান্ত কারো সংস্পর্শে আসলে সেও আক্রান্ত হয়ে পড়ে?
– হুম, জানি। সব জেনেই সজ্ঞানে এসেছি। শুধুমাত্র তোমাকে এক নজর দেখব বলে।
– তাই বলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে?
– হুম। কতদিন দেখিনা তোমায়। শোন, করোনায় মৃত্যুর হার খুবই কম। ১.০৩ থেকে ১.০৫ এর মত। বুঝতেই পারছো ৯৮% এর উপরে রোগী সুস্থ হয়ে যায়। সুতরাং ভয়ের কোন কারণ নেই। তুমি শুধু শুধু টেনশন করছো। তুমিও সুস্থ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
– ঠিক আছে। এখন যাও, প্লিজ।
– হুম, যাচ্ছি। দেখা হয়ে গেছে। এবার যেতে আমারও আপত্তি নেই।
মায়ার বাসা থেকে ফেরার তিন দিন পর বন্ধনেরও করোনার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। পরীক্ষায় তার রিপোর্টও পজেটিভ। মায়ার অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। শ্বাসকষ্ট আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। তাকে হাসপাতালের আইসিইউবিশিষ্ট আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। বন্ধন পরে আক্রান্ত হয়েও তার অবস্থাও খুব বেশি সুবিধের নয়। তাকেও আইসোলেট করা হয়েছে। তারা উভয়ে একই হাসপাতালের বাসিন্দা। এ অবস্থায় প্রায় পনের দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। তাদের অবস্থার তেমন কোন উন্নতি নেই। মায়ার পূর্ব হতেই শ্বাসকষ্ট ছিল। তাকে সময়ে সময়ে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে।এখন অনেক রাত। চারদিকে নি:স্তব্ধতা ঘিরে রেখেছে। প্রকৃতিও ঘুমিয়ে পড়েছে। আইসোলেশন ওয়ার্ডের সিকিউরিটি গার্ডও গভীর ঘুমে দুলছে। শুধু হাসপাতালের বাগানে জোনাকি পোকা ও রাস্তার পাশের ল্যাম্প পোষ্টগুলো এখনো জেগে আছে। পাশের পুরুষ ওয়ার্ড থেকে কোন রকম পালিয়ে এসে মহিলা ওয়ার্ডে ঢুকে যায় বন্ধন। মায়ার রুমে প্রবেশ করে। ভাঙ্গা গলায় ডাকতে থাকে।
– মায়া, মায়া, এই মায়া।
বিড়বিড় করে চোখ খুলে মায়া। কিছু বলার শক্তি নেই তার। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে।
– মায়া, এমনতো হওয়ার কথা ছিল না। বলছিলাম না- চাইলেই আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। তোমার সাহস তো কম নয়। আমাকে ছেড়ে একাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছ। এজন্য চিরতরে তোমার কাছে চলে এসেছি। একা তোমাকে কোথাও যেতে দেব না আমি।
বলতে বলতে বন্ধন ঘুমিয়ে পড়েছে। এ ঘুম আর কোনদিন ভাঙবে না। মায়ার ঠোঁট যুগল কাঁপছে। চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। হয়তো বলার চেষ্টা করছে- হ্যাঁ, বন্ধন, অনেক জল ঘোলা হয়েছে, আর নয়। আমিও কথা দিচ্ছি, তোমাকে ছেড়ে আর কোনদিন কোথাও যাব না। একটু অপেক্ষা কর, প্লিজ। আমি আসছি।
পরদিন সকালে মায়া ও বন্ধনের লাশ একই আইসোলেশন কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রশাসনের ছত্রছায়ায় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে তাদের দাফন-কাফন সম্পন্ন করা হয়।সমাপ্ত
5 Comments
Friends
আমিরুল মোমিন
@a-momin
Taufique Ashraf
@taufiquea22literature2
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
আতিক আহমেদ সুকর্ণ
@aasukorno
নাজমুল হোসেন
@ilovenazmul
Jubayer Al Mahmud
@jubayer
Howlader Muhammad Sakib
@sakib24
Sakib Howlader
@sakib-howlader
Abdullah
@mamun01111


সহজ ভাষায় সরল সমীকরণ গল্প