-
পোস্টাপিস
@jahangirliton‘আর কি খবর জানতে রে চাস বাবা ? তোর বন্ধুর ঠিকানা তো আর এখানে নেই। ওর পোস্টাপিস এখন অন্যখানে। দেখ, ভুল ঠিকানায় চিঠি লিখলে কি আর উত্তর পাওয়া যায় রে’? বলেই হাপাতে লাগলেন, নগেন স্যার। বয়সের বলিরেখা কাটাকুটি করে গেছে শীর্ণ অবয়ব জুড়ে। শরীরের মতই একমাথা ঝাকড়া চুল ওজন হারিয়ে বাতাসে উড়ছে তোষা পাটের আঁশের মতো। ধনুকের মতোন বাকা হয়ে দেহপল্লব যেন নেমে আসছে মাধ্যাকর্ষনের আমন্ত্রনে। শুধু গলার আওয়াজটার বাজখাই মেজাজটা পাল্টায়নি এখনো।
আমাদের ছেলেবেলার আতঙ্কের নাম বাবু নগেন্দ্রনাথ ভৌমিক, বি.এস.সি। কালনী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ডাকসাইটে গণিতের শিক্ষক। সকালবেলায় প্রাইভেট পড়তে উনার বাসায় যেতাম, যতটা ভয় উনার জালিবেতের ছিল, তারচে লোভ কিছু বেশি ছিলো অন্যখানে। তার কিছুটা উনার ছোটমেয়ে অনন্যা ওরফে অনুর চোরা চোখের চাহনি, ও আমাদের দু’ক্লাস নিচে পড়তো, আর কিছুটা উনার স্ত্রী উমা মাসির নাড়ু, আচার। তবে অনেকটা জুড়েই ছিলো বন্ধু কমল। আমার স্কুলবেলার জুটি, যাকে বলে সার্বক্ষণিক বন্ধু। তখন অবশ্য মনে হতো, বন্ধু কিছুটা কম হলেই ভালো হতো। তাহলে অন্তত অনুর অমন চোরা চাহনি জোর করে উপেক্ষা করতে হতো না। আর যাই হোক, ভেতরে যতই ধুকপুকানি থাকুক, বন্ধুনং ধর্মং সদানং পালনং তপঃ। সকল শব্দ শেষে বাড়তি একটি অনুস্বার যোগে সংস্কৃতচর্চার অভ্যাস টা আবার একটু ঝালাই করে নিলাম আর কি।
চোরা চাহনির এই ভালো লাগাটা এক নওল কিশোরের উপেক্ষা করাটা খুব কঠিন কিছু ছিল না। তার জগত জুড়ে তখন কৌতুহলের বান ডেকেছে। মানব, মানবী, সহপাঠী, নদী, জল, ফুল, রাস্তা, রেল, আউট বই, আড্ডা তার কৌতুহলের কাছে ফেলনা নয় কিছুই। কমলের সাথে কতশত স্মৃতি আমাদের সেই ছেলেবেলার। কালনির জলে ডুবসাঁতার। সারা সারা দিন একসাথে ঘুরে বেড়ানো। ঘন্টা হিসেবে ভাড়ায় নেয়া সাইকেল। নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলতাম। শুধু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলে ঘরে ফেরার তাড়া। আর সারাদিন খুব একটা খোঁজ পড়ত না আমাদের। এখন নিজের বাচ্চাদের দেখি আর ভাবি কতটা স্বাধীন আমরা ছিলাম। আর আমার বাচ্চারা সব ইউটিউব এ দুনিয়া দেখে। জীবনের ট্র্যাকে দৌড়াতে গিয়ে আমরাও জীবন হারিয়েছি আর বাচ্চারাও স্বাধীনতার সংজ্ঞা নিজেদের মতো জুড়ে নিয়েছে।
হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট ধরেছি তখন, আমরা বলতাম ইংলিশ প্যান্ট। বাবা সরকারী চাকরীর কারনে একের পর এক স্কুল বদলে কিছুটা থিতু হয়েছিলাম এসে কুলিয়ারচর। কাজেই, কৈশোরের স্মৃতি পুরোটাই প্রায় জুড়ে আছে কালনি নদী তীরের এই ছোট্ট শহর। অষ্টম শ্রেণীর শেষদিকে এসে বেশ ভাবনাহীন চলতে থাকা কৈশোরে খানিকটা ছেদ পড়ে। আব্বা হঠাৎ করে বদলি হয়ে যান। আমাদের পরিযায়ী পরিবারটি খুব স্বল্প সময়ের নোটিশেই তল্পিতল্পা বেঁধে ট্রাকের পিছনে উঠে পড়ে, নতুন কোন ছোট শহরের ঠিকানায়। ফি বছর প্রাপকের ঠিকানায় এই পোস্টাপিস পরিবর্তনেই আমরা অভ্যস্ত ছিলাম, বরং বেশিদিন এক ঠিকানায় থিতু হলেই অস্বস্তি লাগতো। তাই কিনা, মন আজীবন পরিযায়ীই রয়ে গেলো।
এবার একটু ব্যতিক্রম ঘটলো। সামনে বৃত্তি পরীক্ষা, আমাদের সময়ে মফস্বলের স্কুলগুলোতে বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। এখন কি অবস্থা, আমার ঠিক জানা নেই। স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষকের অনুরোধে বৃত্তি পরীক্ষা পর্যন্ত আব্বা আমাকে স্কুল হোস্টেলে রেখে আসতে রাজী হলেন। প্রথম বারের মতো পরিবারের বাইরে এক নতুন জীবন। পরবর্তী পুরো জীবন জুড়ে আমার এ হোস্টেল জীবনের প্রভাব ছিলো সুদূর প্রসারী। সে গল্প আজ তোলা থাক। খুব বেশিদিন ছিলাম না, তবে জীবনের এবড়ো থেবড়ো বন্ধুর পথে চলার ওখানেই শুরু।
হোস্টেলে আসার পর কমলের সাথে ঘোরাঘুরি কমে এলো। স্কুলে দেখা হতো, আমরা আলাদা সেকশনে ছিলাম। ওদের বাসা নন্দীপাড়া, অতদুর যাওয়া হতো না। সামনে বৃত্তি পরীক্ষা, সারাদিন স্কুল, বিকালে কোচিং। সন্ধ্যায় প্রধান শিক্ষকের বাসায় পড়তে যেতাম, উনি আব্বাকে কথা দিয়েছিলেন, ছেলে হোস্টেল থাকতে অসুবিধা হলে তিনি প্রয়োজনে নিজের বাসায় নিয়ে রাখবেন। স্যার তার কথা রেখেছিলেন। আজো পুরনো গল্প উপন্যাসে আমরা যেমন আদর্শবান শিক্ষকের বর্ননা পড়ি, উনি ছিলেন অনেকটা সেরকম। সন্ধ্যা থেকে রাত নয়টা দশটা পর্যন্ত পড়িয়ে রাতের খাবার খাইয়ে তবেই ছাড়তেন।
বৃত্তি পরীক্ষার পর আমি কুলিয়ারচর ছেড়ে চলে আসি, সাথে একঝুড়ি রহস্যময় কৈশোর যার প্রতিটি ছোটগল্পই একেকটি উপন্যাস হতে পারতো। কারো সাথেই আর তেমন কোন যোগাযোগ ছিল না। অনেক পরে জানতে পেরেছি, কালনীর জল ও আগের মতো নেই, নেই জল, জাল আর নৌকা ঘেরা জেলেপল্লীর সহজিয়া জীবন, সকল ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সামাজিক উৎসব পালন। আমাদের স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক উৎসব হতো নিয়মিত। ওটা বন্ধ, শুনেছি ওখানে এখন নিয়মিত মাহফিল হয়। আগেও হতো, তাই বলে কখনো অন্য কোন উৎসব বন্ধ করে করতে হয়নি। থানার মাঠে কি যে জনপ্রিয় ছিলো স্থানীয় ফুটবল লীগ! পুরো শহর জুড়ে উৎসব শুরু হয়ে যেতো, আশে পাশের থানা শহর থেকে ট্রেন ভরে লোকজন ছুটে আসতো এই উৎসবে। থানার মাঠে এখন বানিজ্য মেলার আড়ালে হাউজি খেলার আসর বসে। গোল! গোল! বলে চিৎকারে গলা ফাটায় না কেউ, হাতে এক টুকরো কাগজ নিয়ে কান পেতে অপেক্ষা করে, লাকি হ্যাভেন! ফাইভ এন্ড সেভেন, ফিফটি সেভেন।
বহুরকম ছোটগল্প আর ছোট ছোট কিছু রোমাঞ্চকর থ্রিলারের সাঁকো পেরিয়ে কমল এখন কানাডায় সেটল। বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু উড়ো খবর পেলেও ব্যস্তজীবনে আর দেখা হয়নি এত বছর। একটা কনফারেন্স এ পেপার প্রেজেন্ট করতে টরেন্টো গিয়েছিলাম। ওখানেই হঠাৎ দেখা, একটা নায়াগ্রা ফসল ট্যুর অপারেটর কোম্পানিতে কাজ করছে ও। প্রচন্ড মান, অভিমান আর আত্মাভিমানের ফেনিল বাষ্পটা আমরা সেদিন নায়াগ্রা ফলসের বাষ্পে মিশিয়ে দিতে পেরেছিলাম। ওর কাছেই শুনলাম, অনু এখন কলকাতায়। অনেক বছর হলো ওখানেই, বিয়ের পর আর ফিরে আসেনি কুলিয়ারচর। কমল ও যায় না, ফিরে যেতে চায়না। নগেন স্যার বহু অনুরোধ উপরোধ উপেক্ষা করে আকড়ে আছেন মার্তৃভূমি। এমনকি কলকাতায়ও যেতে চান না।
আমার জন্য আরও চমক অপেক্ষা করছিলো। কনফারেন্সে আমার প্রেজেন্টেশন শেষ। চলে আসার আগের দিন কমল এসে আমার হোটেলে হাজির। একরকম জোড় করেই ওর বাসায় নিয়ে গেলো। এটুকু জোর ও না করলে অবশ্য আমার নিজের কাছেও খারাপ লাগতো। চমক অপেক্ষা করছিল আমার জন্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কমলকে খুঁজে পেলেও ওর কোনো পারিবারিক ছবি ছিলোনা। নিপা মোনালিসা, কমলের বৌ। কৈশোরের সহপাঠি মেয়েদের মধ্যে সবচে আলো ছড়ানো মেয়েটা। পুরো স্কুলের ক্রাশ ছিলো নিপা। নিমাইয়ের ঘন্টা বাজার সাথে সাথেই হা হয়ে চেয়ে থাকতাম মেয়েদের কমনরুম থেকে সমীর স্যারের পিছু পিছু কখন বেরিয়ে আসবে অপ্সরার দল। তারপর, বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ হাতুড়ি পিটিয়ে পুরো ক্লাশ পেছনের বেঞ্চে বসে একমনে তাকিয়ে থাকা। সাদা ইউনিফর্মের এই মিষ্টি কিশোরীকুলের দুষ্টু হাসি, বাকা চোখের চাহনি আর খুনসুটি ভরা কৈশোরই তো আমাদের স্কুলকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। স্বপ্নের এ অপ্সরাদের সামনে কোন না কোন অজুহাতে নিজেকে নতুন নতুন রূপে উপস্থাপন করাই তো তখন সবচে বড় ফ্যান্টাসী।
আমাদের ছেলেদের মধ্যে তো মাঝে মাঝে নিলাম উঠতো, কে কার ভাগে। নিপাকে নিজের ভাগে ফেলার কত চেষ্টাই না ছিলো তখন। শুধু কমল কে দেখতাম গম্ভীরভাবে উপেক্ষা করত সে নিলাম, তবে বোঝা যেতো ওর টানটা আসলে কোথায়। কৈশোরের উচ্ছলতা আমাদের সমস্ত জাত পাত, ধর্ম, সংস্কার, বাস্তবতা সব ভুলিয়ে দিতে পারতো, কিন্তু সবক্ষেত্রে হয়তো বা পারতো না। তাইতো, এখানেও ধর্ম এসে দাঁড়াত একসময়, নিপার প্রতি গোপন ভালোবাসা বুকের আড়ালেই লুকিয়ে রাখতো কমল।
মূল শহর থেকে একটু দূরে শহরতলীতে সাজানো গোছানো ছোট্ট সংসার ওদের। গাড়ি বারান্দার পাশে, সামনের লনে রডোডেনড্রন। ছোট ছোট নুড়ি পাথর ছাওয়া ছোট্ট বাগান জুড়ে আরও অনেক বাহারী ফুলের ঝাড়। ছিমছাম শহরতলীতে সুবিন্যস্ত লাল টালির এই কটেজগুলো দেখলেই কেমন যেন একটা সুখ সুখ অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। ঢুকতেই বসার ঘরটা বেশ আরামপ্রদ। ঘরের পর্দা থেকে শুরু করে সোফার কাভার, ঘরের ওয়ালপেপার থেকে মেঝের কার্পেট সবকিছুতেই সুরুচির ছাপ। বইয়ের তাকে পৃথিবীর সেরা কিছু ক্লাসিকের পাশে আমার দু’টি কবিতার বই দেখে ভালো লাগল। এটাও অদ্ভুত এক যোগাযোগ। কমল বললো, ’নিপা তো তোর লেখা খুঁজে খুঁজে পড়ে।’ আমি জ্যাকেট খুলে আরাম করে বসতেই নিপা ঢুকলো ঘরে। স্বপ্নিল সেই কিশোরী দাড়িয়ে সামনে এখন তার পূর্ণাঙ্গ নারী অবয়বে। বয়সের আচড় আমাদের ভারী করলেও নিপাকে অতটা ছুতে পারেনি, বরং পূর্ণতা দিয়েছে। মুখের ঠোঁট টেপা হাসিটা এখনো অমলিন। দীর্ঘদিনের প্রবাসজীবন তার সৌন্দর্যে একটা পেলব ¯িœগ্ধতা এনে দিয়েছে। সফেদ ঘরের পর্দার আবহে সাদা পোশাকের হাস্যোজ্জ্বল নিপা যেন পুরো ঘরজুড়ে মুগ্ধতা ছড়ায়, যথার্থই গৃহল²ী। কত গল্প জমা হয়ে আছে আমাদের, সব লিখতে বসলে তো মহাকাব্য হয়ে যাবে।
কমল আর নিপা একসাথেই ভর্তি হয়েছিলো ভার্সিটিতে। দুইজন দুই বিভাগে ক্লাশ করলেও মাঝে মাঝেই দেখা হয়। কখনো কলাভবনের বারান্দায়, কখনো বটতলায় অথবা কেন্টিনে। বেশ সপ্রতিভ চেহারার কিছু ছেলে যেন সবসময় স্কুল কলেজে কখনো তেমন কোন কথা না হলেও এখন টুকটাক কথা হয়। কমল আগের মতোই লাজুক অথবা জানে তার এ গোপন ভালোবাসার ভালো কোন সমাধান হয়তো নেই। ওদের কাছেই শুনলাম, নিপাকে বিয়ে করে আর দেশে টিকতে পারেনি ও। শহর ছেড়েছিলো আগেই, শেষ পর্যন্ত দেশ। আর তাদের প্রেমের খেসারত দিতেই পালিয়ে বাঁচে অনু।
বিস্ময় আরো বাকী ছিলো, ওদের ছোট্ট ছেলে লিটন। আমার ছেলেবেলার নাম। পুরোটা দিন ওদের সাথেই কাটালাম, আগামী কাল আমার ফ্লাইট। আমার পরিযায়ী ভাগ্য এখনো বর্তমান। পোস্টাপিস পরিবর্তন করেই চলেছি। সবাই শেকড় গাড়তে চায়, পারে ক’জন। অনুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, কোলকাতায় পোস্টাপিস গড়ে, আসলে কি পায়! কমলেরা নিপাদের ভালোবেসে বিদেশ পাড়ি জমায়, নতুন ঠিকানায়। আর অভিমানে বুক ভরে পুরনো পোস্টাপিসের মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকেন নগেন্দ্রনাথ ভৌমিক।4 Comments
Friends
Arif Zaman
@arif
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Humayun Kabir Surjo
@humayunkabir-surjo
মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (সবুজ) সিকদার
@attokendrik
Nipun Chandra
@nipunch
Youngtiger
@youngtiger
Reazul Kabir
@reazul-kabir
Drako Shajib
@drako


দারুণ লাগল গল্পটি। জীবন থেকে নেয়া মনে হল। শুভেচ্ছা নেবেন।