Profile Photo

মিথিলা কনকOffline

  • Methila06
  • Profile picture of মিথিলা কনক

    মিথিলা কনক

    4 years, 6 months ago

    *হিমির ডায়েরী
    ______________

    নেনু মিঞার জবানবন্দি থেকেই জানা যায় হিমির চাচা চাচি কোথায় আছে এখন আর হিমির বাচ্চাটাই বা কোথায় থাকতে পারে ।
    হিমির সাথে যে ভয়াবহতা হয়েছে তা এর বেশী শুনবার মতো মনোবল ছিলোনা আমার , গতকাল নেনুর জবানবন্দি শুনতে শুনতে অসুস্থ হয়ে পরি আর তাই আজ বাবা এবং মা গেছেন থানায় ।
    হিমির চাচীকে ধরে আনা হয়েছে , কিন্তু হিমির চাচা সব ধরা ছোয়ার বাইরে চলে গেছে ।
    ওরা পালিয়ে বস্তিতে থাকতে শুরু করার কিছুদিনের মাথায় হিমির চাচা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয় , চলা বলা সব ধরনের শক্তি হারায় । এরপর একদিন কি দেখে নাকি খুব গোঙ্গাতে থাকে এর পরেই জোরে একটা চিৎকার দিয়ে ওখানেই শেষ হয়ে যায় ।
    আসলে মানুষের পাপের শাস্তির সূত্রপাত বুঝি এভাবেই হয় ।
    অনেক এলোমেলো চিন্তার জাল বুনতে বুনতে দু’চোখের পাতা লেগে এসেছিলো ,বারান্দার দোলনাতে কতক্ষণ এভাবে ছিলাম ঠিক বলতে পারবোনা ডোরবেল এর আওয়াজে তন্দ্রা ভাঙ্গলো ।
    মা বাবা ফিরে এসেছে কিন্তু বাবাকে খুব গম্ভীর মনে হলো কেউ কোন কথা বললেন না ।

    রাতে খাবার টেবিলেও সবাই চুপ চাপ থাকলো , বাবা খাওয়া শেষ করে উঠে ঘরে চলে গেলেন । অনেক প্রশ্ন মনে ঘোরাফেরা করছে ,মাথায় শান্তি দিচ্ছেনা তাই মাকে প্রশ্ন করেই ফেললাম ,
    মা কেমন টলটলে চোখে তাকিয়ে থাকলেন । উঠে আমার কাছে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন ।
    চোখের পানি মুছে আমার সামনে মুখোমুখি বসে বলতে শুরু করলেন ।
    ” হিমি র চাচী কিছুদিনে এতোটা শাস্তি ভোগ করেছে যে , তাকে আর জবানবন্দি দেবার জন্য কোন চাপ দিতে হয়নি । কিন্তু যে কথা সে স্বীকারোক্তি দিলো তা কি ভাষায় বলবো তোকে !
    হিমির বাবা যখন খুব ছোট তখন হিমির দাদী মারা যায় ,হিমির দাদা শিশু সন্তান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পরেন । পরে মোরুব্বিদের চাপে বিয়ে করেন । সৎ মা হলেও উনি হিমর বাবাকে আপন মায়ের চাইতে কোন অংশে কম আগলে রাখেননি ।
    কিন্তু উনার নিজের গর্ভজাত সন্তান অর্থাৎ হিমির চাচা কোন ভাবেই মানুষ হলোনা । হেন অকাজ কুকাজ নেই যা সে করে বেড়াতো না । হিমির দাদা মারা গেলে ওর বাবা শহরে চলে আসে , এবং এখানেই টিউশন করিয়ে নিজে পড়াশোনা করতে থাকে । হিমির বাবা সব সময় তার মায়ের খোঁজ নিতো টাকা পাঠাতো, কিন্তু হিমির চাচা একেবারেই তার উল্টো । কোন কারণ ছাড়াই সে সারাজীবন হিমির বাবাকে হিংসা করে গেছে ।
    হিমির জন্মের পর ওর দাদী কে ওর বাবা নিয়ে আসে এবং হিমির যেন এই বৃদ্ধার দিনরাত সব কিছু জুড়ে ছিলো । হিমির সব দ্বায়িত্ব ছিলো ওর দাদীর উপর আর হিমির বাবা মা তাতে নিশ্চিন্ত হয়ে তাদের কাজ করতে পারতো । এরপর এলো সেই ভয়াবহ দিন যেদিন হিমি ওর মা বাবাকে হারালো ।
    দাদী নাতিতে কেটে যাচ্ছিলো দিন , কিন্তু উড়ে এসে জুড়ে বসলো হিমির চাচা চাচী ।
    উকিল যেদিন উইল পড়ে শোনালো , সেদিন থেকেই শয়তানের জুটিতে মিলে নানান ফন্দি আটতে থাকলো । উইল এ বলা ছিলো , যেদিন হিমি সন্তানের মা হবে সেদিন সে সমস্ত সম্পত্তি র অধিকার পেয়ে যাবে এবং সেদিন সেই সিদ্ধান্ত নেবে এই বিশাল সম্পত্তি সে কি ভাবে বন্ঠন দান অথবা ভোগ করবে অর্থাৎ সব ধরনের সিদ্ধান্ত সে তখন নিতে পারবে ।
    এই উইল টা হয়ে গেল কাল
    হিমির এস এস সি পরীক্ষার পর থেকেই বদলে যেতে থাকে ওর জীবন । ওকে নিয়ে কুমতলব আটছে এই ব্যাপার বোঝা মাত্রই ওর দাদী যখনই প্রতিবাদ করে এবং পুলিশে খবর দিতে চায় সেদিনই তাকে গুপ্ত ঘরে বন্ধ করে ফেলা হয় । রোজ নানান নির্যাতন চলতে থাকে হিমির উপর , ও যখনই ওর দাদীর খোঁজ জানতে চাইতো তখনি ওকে ওর দাদীর করুণ চিৎকারের রেকর্ড শোনানো হতো ।
    একদিন তো এই দুই শয়তান শয়তান এর চেয়েও বেশী শয়তানি করে বসলো ,
    হিমির চাচী হিমির খাবারে ঔষধ মিশিয়ে ওকে মাতাল করে দিতো এরপর যখন ওর প্রতিরোধ করার মতো শক্তি থাকতোনা তখন হিমির চাচা হিমিকে ধর্ষণ করতো , আর এভাবেই চলছিলো দিনের পর দিন ।”
    আমার শরীর কাঁটা দিয়ে উঠছিলো এসব শুনে ।
    মা আবার বলতে শুরু করলেন
    ” হিমি যখনই একটু বুঝতে পারলো তখন খাবার খেতে চাইতোনা কারণ এর পর কি হবে তা ও বুঝতে শুরু করেছিলো , আর যখনই কথা না শুনতো তখনি ওকে ওর দাদীর কাছে নিয়ে তার উপর অত্যাচার করা হতো । কিন্তু একসময় তারা বুঝতে পারলো হিমির চাচা সন্তান দিতে অক্ষম । সেদিন শুরু করলো এমন একজন মানুষের খোঁজ যে ওদের হয়ে ওদের ইচ্ছা পূরণে টাকার বিনিময়ে কাজ করবে ।
    একদিন ওরা এমন একজনকে জোগাড় করেও ফেললো , যাকে বাড়ির কাজের লোকজন এবং হিমি চিনলো ওদের ড্রাইভার হিসাবে কিন্তু ওর আসল কাজ ছিলো হিমির সাথে অভিনয় করে ওকে ,রাজি করা এবং ওর সাথে শারীরিক সম্পর্ক করে ওকে গর্ভবতী করা রুমন শিক্ষিত হওয়া স্বত্ত্বেও দীর্ঘ্য বেকারত্ব ওর স্বাভাবিক চেতনা কে নষ্ট করে দিয়েছিলো ওর দরকার ছিলো টাকার আর তাই টাকার বিনিময়ে এমন একটা ঘৃণ্য কাজ করতে সে রাজি হয়ে গিয়েছিলো ।
    হিমির ওপর নজরদারীও ওর কাজ ছিলো । আর তাই কলেজ গেলেও রুমন বাইরে থাকতো পাহারায় । এসব হিমি জানতো না কিন্তু ওর মনে হতো রুমন ওর জন্য অনেক কেয়ার করছে আর এভাবেই রুমনের প্রতি দূর্বল হয়ে পরে হিমি ।
    আর আল্লাহ্ র ইশারা দেখো , রুমন এর দারিদ্র্য যেখানে ওর বিবেক নষ্ট করে দিয়েছিলো সেখানে হিমির সরলতা ওকে আবার মানুষ করে তুলেছিলো এরপর হিমিকে নিয়ে পালায় রুমন , চেয়েছিলো সব কিছু থেকে দূরে গিয়ে দুজনে সংসার পাতবে ।
    ওরা বিয়ে করে একটা মসজিদে এরপর এমন এক গ্রামে গিয়ে দুজনে থাকতে শুরু করে যেখানে ওদের কেউ চেনেনা ।
    হিমির চাচা চাচী এখানেই থামতে পারতো যদি এমনিতেই সম্পত্তি পেয়ে যেতো কিন্তু তা তো হিমিকে ছাড়া সম্ভব ছিলোনা ,আর তাই আবার তারা নেনু সহ পুরো গ্যাং কে হায়ার করে মোটা টাকায় ।
    হিমি পালানোর পরে একদিন নিজের মাকে হিমির পাষন্ড চাচা চাচী মেরে ফেলে এবং তার শরীর ওই গুপ্ত ঘরের মেঝেতে পুতে ফেলে ।
    এর পাঁচ মাস পর ধরা পরে যায় রুমন আর হিমি । নেনু আর তার বিশাল বাহিনী তাদের শয়তানি নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে ধরে ফেলে ওদের । আবার হিমি আগের অবস্থায় ফিরে যায় আর রুমনকে গুপ্ত ঘরে বন্ধ করে সেদিনই মেরে ফেলা হয় ওই হতভাগা র লাশটাকেও ওই ঘরের মেঝেতে পুতে ফেলা হয় , হিমিকে বাঁচায় রাখা হয় কারণ ওর পেটের বাচ্চাটা তো হিমির চাচা চাচীর জন্য লটারির টিকিট ছিলো । হিমি প্রথমে রুমন কে ছেড়ে দিতে বলে তার বদলে ও ওদের সব কথা মেনে চলবে কথা দেয় ।
    ও বেচারা ভাবে ওর রুমন বেঁচে আছে এদিকে কবেই বেচারাকে মেরে ফেলা হয়েছে ।
    আর বাচ্চা জন্ম দেবার পর কিছুদিন বাদে যখন বাচ্চা টাকে ওর কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হয় তখন ও দিতে না চাওয়াতে ওর জায়গা ও হয় সেই মাটির নিচের ঘরে ।
    পরে একদিন আবার ওকে উপরে নিয়ে আসা হয়
    আর আবার কাগজে দস্তখত করতে বাধ্য করা হয় কিন্তু না শোনাতে সেদিন ওর অবস্থা হয় রুমন আর ওর দাদীর মতো , কিন্তু এই খুনটা তারা লুকায় ফেলতে পারবেনা তাই আত্মহত্যার নাটক সাজায় আর তাতেও যখন শেষ রক্ষা না হয় তখন পালিয়ে যায় । ”
    মাগো এতো কাছে হিমির উপর এমন পৌশাচিকতা হচ্ছিলো আর আমি কিছুই বুঝলাম না , আল্প দূরত্ব সব শেষ করে দিলো । আমি কেন ওর সাথে নিজ থেকে কথা বললাম না কে জানে !
    ” এখন আর ভেবে কি হবে মা যা হবার তা তো হয়েই গেছে ”
    হ্যাঁ মা আর ভেবে কি হবে কিন্তু হিমির কান্না সারাজীবন আমাকে তাড়া করবে ।
    সারারাত চোখের পাতা বন্ধ করতে পারলাম না । রাত একসময় ভোর হলো এরপর দুপুর এলো , মায়ের পিড়াপিড়িতে খাবার টেবিলে বসবো তখন আবার ফোন এলো ,
    হিমির ছেলেটাকে উদ্ধার করা হয়েছে , ওকে শিশুসদনে দিয়ে দেয়া হবে ,
    থানায় পৌঁছে বাচ্চাটাকে যখন কোলে নিলাম ওর নিঃস্পাপ চেহারা আমার মনটাকে ভরে দিলো ওইটুকুনি হাত দিয়ে আমার ওড়নাটা ধরে রেখেছে ,মনে হলো হিমি তাকিয়ে হাঁসছে ।
    সিদ্ধান্ত নিলাম হিমির সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে আমিই লালন পালন করবো ।
    এতে ইন্সপেক্টর খুশী হয়েই সম্মতি দিলেন । বাবা মা ও আপত্তি করলেন না । তুষার কে সব জানালাম ও আমার পদক্ষেপ কে সম্মতি জানালো ।
    মন থেকে অনেক কষ্ট যেন কমে গেল যখনই এই ফেরেশতা টাকে বুকে জড়িয়ে শান্তির নিঃশ্বাস নিলাম ।

    এখন একটাই আশা ওকে যেন মানুষ করে গড়ে তুলতে পারি ।
    (শেষ)।

    10
    8 Comments
    • বেশ অন্যরকম আপনার লেখা। সামাজিক ঘটনা পরম্পরায় নানারূপ টেনশন। খুব ঠাস-বুনটে লেখা। এমন কিন্তু দেখিনি কোথাও সম্ভবত আগে। কাহিনীর সুন্দর পরিণতি।

    • অসাধারণ লাগল গল্পটি। অবশেষে জট খুলেছে কাহিনীর, সুন্দর ইতি পড়েছে গল্পে। গল্পের শেষে উপলব্ধি হল,
      আমরা সবাই সবার কত কাছে থাকি তবুও কতটুকুই আর বুঝতে পারি অপরকে। তাই হয়ত নিজেকে উজার করে দিতে হয় সবার মাঝে। যাতে হাসলে সবাই এক সাথে হাসি, বাচলে সবাই এক সাথে বাঁচি।
      শুভেচ্ছা নেবেন গল্পকার। নতুন গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।

    • ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই সব বন্ধু স্বতীর্থদের, আমার লেখা পড়বার এবং আমাকে আরো লিখতে উৎসাহ দেবার জন্য ।ধন্যবাদ পূণরায় এবং ❤

    • শুভেচ্ছা !

Skip to toolbar