-
*সময়
“তারপরে আসুন!”
গলা হেঁকে রাসেল সাহেব পরের রোগীকে ডাকলেন। রাসেল সাহেব অবসরপ্রাপ্ত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, শহরের পাট চুকিয়ে এবার শেষ বয়সে নিজের বাড়িতেই সামনের একটা রুমকে চেম্বার বানিয়ে রোগী দেখেন।সামনে এসে রোগী বসলেন। রাসেল সাহেব না তাকিয়েই হাতে কলম নিয়ে প্রেস্ক্রিপশন ঠিক করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন, “নাম?”
– জালাল উদ্দীন
– বয়স?
– জ্বি, সত্তর চলছে।
রাসেল সাহেব তাকিয়ে বললেন, আপনি দেখছি আমার মতোই বুড়ো হয়ে-
কথা শেষ হয়না রাসেল সাহেবের, তার আগেই বলেন, ” এ কি জালাল, তুমি?”জালাল সাহেব একটু কেশে বললেন, “ভালো আছো, রাসেল?”
রাসেল সাহেব জবাব দিলেন না। বেশ কতক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকলেন জালাল সাহেবের দিকে। তারপর উঠে গিয়ে বাইরের কিছু রোগীর সাথে কথা বলে দরজাটা ভিরিয়ে দিলেন।
তারপর রুমের সাথে লাগানো একটা ছোট জানালায় মুখ বাড়িয়ে বললেন, ” দু কাপ চা দিও তো!”রাসেল সাহেব সিটে এসে বসলেন। ভালো করে তাকালেন জালাল সাহেবের দিকে। বুড়ো দুর্বল অশীতিপরায়ণ লাগছে তাকে। চুলগুলো উশকো খুশকো, মুখে দাড়ি খোচা খোচা।
রাসেল সাহেব আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলেন, ” এ কিরকম দশা হয়েছে তোমার জালাল?”একটা মলিন রেখা দেখা গেল জালাল সাহেবের মুখে, “বুড়ো তো তুমিও হয়েছো রাসেল!” তারপর হঠাৎ কিছু একটা বলবার প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় জালাল উদ্দীনকে। দুবার ঘন ঘন শ্বাস নিয়ে জালাল সাহেব জিজ্ঞেস করেন, “রেহানা…রেহানা কেমন আছে, রাসেল? ”
রাসেল সাহেব বোধহয় এই প্রশ্নের অপেক্ষা করছিলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।
চা এসে যায়, রাসেল সাহেব বাড়িয়ে দেন চায়ের কাপ। দুজনেই চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকেন।
পঁচিশ ত্রিশ বছর আগের কথা, একটা বিশাল বিয়ের অনুষ্ঠান। চারদিকে হুল্লোড়। কাজী সাহেব সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ছেলেকে বললেন, বাবা, বল কবুল! আপাদমস্তক ঘোমটায় মোড়ানো সামনের যুবতীর দিকে একবার তাকিয়ে স্পষ্ট করে তরুণ বলল, “কবুল”!
খানিকপরে কন্যার মুখ থেকেও শোনা গেল সম্মতির চিরচেনা শব্দ, ” কবুল!” হাসি ফুটল দুই পরিবারের মুখে, জালাল আর রেহানার মুখেও!জালাল রেহানার প্রথম সাক্ষাৎ হয় একটা নৃত্যানুষ্ঠানে। নৃত্যের কোন কিছু না বুঝলেও রেহানার নৃত্যকৌশলে মুগ্ধ হয়ে তরুণ জালাল, অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে প্রথম কথা বলেন রেহানার সাথে। প্রথম কথা, তারপর প্রণয়, অতঃপর পরিবারের সম্মতিতে বিবাহ!
সুখ যেন কুঁড়ি হয়ে ফুটল জালাল রেহানার জীবনে। সম্মান শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় তাদের শুরু হল পথচলা। আশেপাশের মানুষ তাদের দেখলেই বলতো, আহা! কি জোড়, তোমাদের দেখলেই যে চোখ জুড়িয়ে যায়।
বছর ঘুরে একটা সন্তান আসে তাদের জীবনে, সুখের কুঁড়ি যেন ফুল হয়ে চারদিকে মেলে ধরে।কিন্তু সেই সুখের ফুলে একদিন পোকা ধরল। জালাল সাহেবের পরিবারের রেহানার নৃত্যতে আপত্তি ছিল বরাবরের মতো। জালালের ওপর প্রচন্ড চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন তারা, জালাল একপর্যায়ে রেহানার নাচের ক্লাস বন্ধ করে দিতে বলেন। আঁতকে ওঠেন রেহানা, তাঁর বাবা একসময়ের নামকরা নাচের শিক্ষক ছিলেন। রেহানার ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন সে বাবার মতো একদিন নাচের শিক্ষক হয়ে ওঠবেন, দিনের পর দিন তিনি শ্রম দিয়েছেন এই নাচের জন্য। এখন এভাবে শেষ করে দিলে- তার এতদিনের শ্রম স্বপ্ন সবই যে ধুলোয় মিশে যাবে।
কিন্তু কোথাও একটা গন্ডগোল হয়ে যায়। জালালের নাচের সম্পর্কে কোন আগ্রহ ছিল না, তিনি কোন কিছু বুঝতেনও না৷ তার কাছে স্রেফ “একপ্রকারের দৌড়াদোড়ি” ছাড়া আর কিছু মনে হত না।তিনি তার কথায় অনেক সময় অসতর্কভাবে অপমান করতে থাকেন রেহানাকে। সুখের ফুলে পোকার মাত্রা বাড়তে থাকে। ভুল বুঝাবুঝি থেকে একসময় ঝগড়াঝাটি, তারপর একসময় রাগের বশে গায়ে হাত দেন জালাল।
সুখের ফুলে তখন পোকাদের জয়জয়কার চলে, নেতিয়ে যায় চির সৌন্দর্যের ফুলখানি। রেহানা আর জালালেরও বিচ্ছেদ হয়ে যায়। মামলা করে একমাত্র ছেলেকে নিজের কাছে রেখে দেন জালাল। রেহানাকে একপ্রকার নিঃস্ব অবস্থায় ছেড়ে দেন তিনি।
রাসেল সাহেবের চা শেষ হয়ে যায়, তিনি শব্দ করে কাপটা টেবিলে রাখেন।
“রেহানা ভালো আছে জালাল!” ছোট্ট করে উত্তর দিলেন রাসেল সাহেব। ” তুমি তাকে ছেড়ে দেওয়ার পর রীতিমতো নিঃস্ব অবস্থায় তাকে পাই আমি। দুজোড়া নুপুর ছাড়া আর কিছু ছিল না তার কাছে। তারপরের টুকু তুমি জানো হয়তো, তাকে বিয়ে করলাম। তোমাদের গ্রাম ছেড়ে বহুদূর শহরে পাড়ি জমালাম। রেহানা গানের ক্লাস খুলল, ধীরে ধীরে ছাত্র বাড়তে লাগল, একটা সময় পুরো স্কুল হয়ে গেল তার। এখন দুজনেই বুড়ো হয়েছি, তাই আর সব শেষ করে গ্রামে এসে জুড়লাম…”
“আমি একটা অপদার্থ, রাসেল,” জালাল সাহেবের চোখে অশ্রু চলে আসে, ‘ আমি আমার স্ত্রীর স্বপ্নগুলোকে দাম দেইনি, সেগুলোকে মূল্যায়ন করিনি, ছেলেটাকেও মানুষ করতে পারিনি। ছেলেটা আজ যখন পুলিশের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বেড়ায়, তখন বালিশ চেপে শুধু কান্না করি, কত সুন্দর ছিল আমার সময়টা- নিজের দোষেই সবকিছুকে নষ্ট করেছি আমি… ”
চোখ দুটো মুছে জালাল উদ্দীন বলতে থাকেন, ” যৌবনকালে আমরা অনেককিছুকে গুরুত্ব দেই না রাসেল, বুড়ো বয়সে সেই বিষয়গুলোই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে! ”
তারপর একটু থেমে বললেন, ” বিগত দুই বছর যাবত তোমাদের খুঁজছিলাম রাসেল। গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর তোমাদের খুজিয়ে বেরিয়েছি, কোথাও পাইনি! আমার আল্লাহর কাছে শেষ ইচ্ছে ছিল, রেহানাকে একটাবার শেষ দেখা দেখে মরতে চাই! রাসেল, আমি একবার রেহানাকে দেখতে পারি?”রাসেল সাহেব শান্তভাবে চায়ের কাপটা পাশে সরিয়ে রাখলেন। তারপর গম্ভীরভাবে বললেন, “দেখ জালাল, এত বছরের পুরনো বিষয়কে আর সামনে আনতে চাই না-”
জালাল সাহেব আকুতি জানান, “রাসেল, রাসেল… এভাবে বোলো না, আমি কেবল শেষবারের দেখা দেখতে চাই, গত দুই বছর কত জায়গায় তোমাদের খুজে বেরিয়েছি, এভাবে বোলো না ভাই…”
রাসেল সাহেব গাঢ় কন্ঠে বললেন, ” যেদিন রেহানাকে নিঃস্ব অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিলে, সেদিন তোমার আকুতি মিনতি কোথায় ছিল জালাল! জালাল, রেহানা এখন আমার স্ত্রী- তাকে যে কারো সামনে আমি দেখাতে পারি না!”
জালাল সাহেব চুপসে গেলেন, তার কিছুই বলার নেই। শুকনো ওষ্ঠে কতকবার ঢোক গিললেন জালাল সাহেব। তারপর দিকবিদিক তাকিয়ে ম্লান কন্ঠে বললেন, আচ্ছা ঠিকাছে…আমি তাহলে আসি…
উঠে পড়েন জালাল উদ্দীন। দুকদম সামনে এগুলে রাসেল সাহেব ফোস করে শ্বাস ফেলেন, “বোসো জালাল!”
“আমাদের ছেলেপেলে নেই জালাল, বড় ভাইয়ের ছেলেটাকেই মানুষ করেছি “,তারপর রুমের সাথে লাগানো ছোট জানালাটা খুলে বললেন, “এই খিড়কি দিয়ে দেখতে পারো এক ঝলক। এসো এদিকে। ”
জালাল সাহেব লাঠিতে ভর করে রীতিমতো ছুটে এলেন। এসে জানালায় মুখ বাড়ালেন।বারান্দায় বসে তিন চারজন নারী কাজ করছেন আর কথা বলছেন। তাদের মধ্যে একজন সবচেয়ে বয়স্ক। জালাল উদ্দীনের চিনতে অসুবিধা হয়না, বয়স্ক নারীই হলেন রেহানা। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, “রেহানা অনেক… বদলে গেছে রাসেল…”
রাসেল সাহেব বলেন, ” তুমি বদলেছো, আমি বদলেছি, সময়টাও যে বদলে গেছে জালাল!”
জালাল সাহেব অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে দুফোঁটা জল তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে, টেরই পান না তিনি….
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 10 December 2021 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 12 April 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 28 August 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 02 June 2023 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
-
তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 12 December 2024 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!
Friends
পৌষী পাল
@poushee-paul
Farhana Hossain
@farhana-hossain
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor
তুলট ডেস্ক
@toulot


সুন্দর গল্প। জিবনের অলি-গলি ছোঁয়া। ভাল লাগলো। অভিনন্দন।