-
শৈশব ও ১৯৭১ ☝️☝️
শৈশব জানালা দিয়ে উকি মেরে বলে “খুব না বড় হতে চেয়েছ এখন বুঝ কেমন লাগে।”
সব মানুষই শৈশবে বড় হবার প্রবল আকাঙ্ক্ষা থাকে, আমারও ছিল। তাই আমরা ভাই-বোনেরা ঘরের দরজা, খুটি, আলমারি ইত্যাদিতে নিজেদের উচ্চতা মাপ দিয়ে রাখতে এবং প্রতি দিন চেক করতাম কতোটুকু বড় হয়েছি। কারনে অকারনে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে গোপনে বাবার দেহের সাথে মাপ দিতাম। কোন ভাবেই বাবার কোমরের উপর উঠতে পারতাম না। মাঝে মাঝে পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের উপর দাঁড়িয়ে নিজেকে সান্তনা দিতাম। এমনই এক দিন সন্ধ্যার কিছু পরে, মেঘলা আকাশ চারিদিকে অন্ধকার রাস্তার মাঝে বাবা দাঁড়িয়ে আছে। আমি বাবার ডানে দিকে দাঁড়িয়ে নিজেকে মাপছিলাম, বাবা ভীষণ অস্বস্তির মাঝেও আমাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না। অন্য সময় হলে এই অবস্থায় বাবার পাশে দাড়ানোর সুজোগই দিত না। আজ কেন জানি মাপা মাপিটা বাবা পছন্দ করছে। হঠাৎ বিনা বিজলিতে বজ্র শব্দে তা-রা-ম করে বাবার বায় গালে এক থাপ্পড়!!, আমি দু হাত দিয়ে বাবাকে আঁকড়ে ধরলাম। বাবাও আমাকে এক হাতে চেপে ধরল। আবার থাপ্পড় দেয়ার আগেই বাবা উচ্চ স্বরে বলল, “হু ইজ ইউর ক্যাপন্টেন, আই এম এ গর্ভারমেন্ট অফিসার।” ১৯৭১।। ১৯৭১ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসের কোন এক সময় আমাদের এলাকার চারদিকে বর্ষার পানি। এলাকায় হাতে গোনা কয়েকটা স্থানীয় বাড়ী, বিদেশীদের মধ্যে আমরা আর আমার ফুবুরা।
আমি সে দিন সন্ধ্যার সময় রাস্তার পার্শে মামাদের জায়গায় খেলছিলাম। মামাদের জায়গায় মামারা থাকেন না, সেখানে দুইটা বড়োই গাছ, অনেক কলাগাছ এবং জায়গা সীমানা মান্ধার (কাটা যুক্ত) গাছ দ্বারা বেড়া দেওয়া ছিল। নূপুর (আমার বোন) আমাকে ডাকতে এসে আমার সাথে দৌরা দৌরি খেলায় মেতেছে। হঠাৎ করে ঠাস ঠাস গুলির আওয়াজ। যুদ্ধের এত দিনে বুঝতে সক্ষম হয়েছি কোনটা গুলীর শব্দ আর কোনটা পটকার শব্দ। গুলীর শব্দের ভঁয়ে আমি আর নূপুর দৌড়ে বাসায় চলে আসি। আম্মা আমাকে দ্যাখেই চেচিয়ে বলল, “কোথায় ছিলি হা-রা— , চারিদিকে মিলিটারি ভরে গেছে।” তখন লোক মূখ ছাড়া যোগাযোগের কোন মাধ্যম ছিলনা তবুও সবাই জেনেগেছে “হবুদের বাড়ী” ঝাকে ঝাকে মিলিটারি অবস্থান করছে। কিছুক্ষনের মধ্যে এলাকার সব বাড়ী তল্লাশি চালাবে, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধানে।
বাসায় সবার মাঝে ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। আব্বা বলল, ফেরিকেন জ্বালিয়ে সবাই কোরআন, আমপারা, কায়দা নিয়ে বসো। আমরা সবাই পাকিস্তানি ধর্মিও চেতনায় জাগ্রত হয়ে কোরআন, আমপারা, সেপারা, কায়দা নিয়ে বসেছে। আমার জুটল একটা সবুজ সাথী। কিছুক্ষণ পর ফুপু কোরআন শরীফ ও ছেলে মেয়ে নিয়ে হাজির এবং বলল ফুপাকে (বাচ্চু ভাইর বাবা) মিলিটারি ধরে নিয়েগেছে। বাদল ভাই দৌড়ে এসে আমাদের খাটের নিচে লুকিয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পরই ঘরে প্রবেশ করল মিলিটারি। পাকিস্তানী মিলিটারি সম্পর্কে সবার ভয় ছিল, আমারও ছিল। কিন্তু মিলিটারি ঘরে প্রবেশের পর তাদের সুদর্শন চেহারা দ্যাখে আমার ভয় কেটে গেছে। মেলেটারি ঘরে ডুকে দেখল ইসলামি পরিবেশ। পাশের রুমগুলো দেখল। সবার উদ্দেশ্যে কিছু প্রশ্ন করল। আম্মা ও ফুবু প্রশ্নের উত্তর দিল। এর পর আব্বাকে নিয়ে বের হয়ে গেল। আমি গেলাম তাদের পিছু পিছু। রাস্তায় গিয়ে দেখলাম আনেক মিলিটারির ও এলাকার কয়েক জন লোক। আলাদা ভাবে কয়েকজন মিলিটারির মাঝে ফুপা (বাচ্চু ভাইর বাবা) দাঁড়ান। আব্বাকে নিয়ে ফুপার পার্শে দাঁড়া করাল। ফুপা আব্বাকে দ্যাখে একটু সাহস পেল। ফুপা ফিস ফিস করে আব্বাকে বলল, “আমাকে মেরেছে”। এক জন মিলিটারি আব্বাকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সম্বন্ধে জানতে চেয়েছে। আব্বার উত্তরে সন্তুষ্ট হইতে না পারায় আব্বাকে থাপ্পড় দেয়। তখন আব্বা মিলিটারির ক্যাপন্টেনের সাথে কথা বলতে চায়। ক্যাপন্টেন ছিল কিছুটা দূরে। আব্বার কথা শুনে ক্যাপন্টেন আব্বার কাছে আগাইয়া আসল। আব্বা ও ক্যাপন্টেন ইংরেজিতে অনেক কথপ কথনের পর উত্তেজিত পরিস্তিতি স্বাভাবিক হয়। রাস্তার উত্তর পার্শে ছিল ধান খেত। ধান গাছ গুলো দুই আড়াই ফুটের মত লম্বা হবে। সেই ধান খেতের মাঝে লুকিয়ে ছিল আমার বন্ধু মিলন ও রওশনের বাবা (আব্বাস আলী ও আদম আলী)। আব্বাস আলী ও আদম আলী কাকা ধান খেতে লুকীয়ে মিলিটারির সাথে আব্বার কথোপ কথন শুনছিল এবং তারা যখন মণে করল আলম সাহেব (আব্বা) মিলিটারিদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন। তখন তারা দুই জন ধান খেতের মাঝে উঠে দাড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ ওলট পালট হয়ে গেল। ক্যাপন্টেন চিৎকার করে সবাইকে পজিশন নিতে বলল। সব মিলিটারি অস্র হাতে চারিদিকে তাক করে হাটু গেঁড়ে পজিশন নিলো। এবং তাদের দুই জনকে ধরে আনল। সমস্ত ধান খেতের প্রতিটা ধান গাছের গোড়ায় গোড়ায় বুট জুতা দিয়ে খোজা হল আর কেউ আছে কি না। এর পর শুরু করল তাদের দুই জনের উপর অমানুষিক প্রহর, রাইফেলের বাট, বুট জুতা পরে মামাদের সীমানার বেড়া দেওয়া মান্ধার গাছ দিয়ে পিটানো। তাদের সমস্ত শরীরের চামড়া কাটার আগাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। এক পর্যায়ে ক্যাপন্টেন শুট করার কথা ভাবলো এবং একই সাথে আব্বার কাছে তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলো। আব্বা, ক্যাপন্টেনকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, “এরা মুসলমান এবং এলাকার সাধারণ কৃষক। রাষ্ট্র বিরোধী কোন কাজের সাথে জড়িত না। আপনাদের ভঁয়ে ধান খেতে লুকাইছে এবং আব্বা তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার অনুরুধ করে”। ক্যাপন্টেন আব্বার ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাদেরকে ছেড়ে দেন। এবং দূযোগপূর্ন আবহার জন্য ঐ দিনের অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন। কিন্তু আব্বাস আলী ও আদম আলী কাকা সে দিন মুক্তি পেলেও জীবনে যতদিন বেচে ছিল ততদিন পাকিস্তানী মিলিটারির দুঃসহ র্নিযাত্নের যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন। সেই ঘটনার পর এলাকার লোকেরা বলতো, “আল্লাহ্র রহমতে, আলম সাহেবের উসিলায় গ্রামের অনেকের প্রান রক্ষ্যা পেয়েছে।” এর পর আব্বা সিদ্ধান্ত নেয়, আমাদের ঢাকাতে আর রাখবেনা, সুজুগ বুঝে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিবে। পরে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে নৌকা যোগে গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরে যাই। হায় রে শৈশব, তবুও শৈশবে ফিরে যেতে ইচ্ছা হয়। শৈশবই আনন্দ, শৈশবই স্বাধীনতা, শৈশবই ১৯৭১ ।। ✍️ রব্বানী।5 Comments
Friends
Hasina Rahman
@hasina-rahman
Farhana Bristy
@farhana-bristy
মন কলম
@md-faridul-islam
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
Drako Shajib
@drako
মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (সবুজ) সিকদার
@attokendrik
Md Riazul Islam Chad
@md-riazul-islam-chad
Md Ashfak Sayed
@ashfak
Jubayer Al Mahmud
@jubayer


অনবদ্য গল্প। খুব ভালো লাগল।