-
শিটসংস্কৃতি_ও_শিক্ষা
রুমে বসে পেপার পড়ছি। কোভিডের পর এবার আসছে ওমিক্রন! দরজা খোলার শব্দে তাকিয়ে দেখি ইয়া বড় এক বান্ডিল নিয়ে ঘরে ঢুকছে নাসরিন।
— কিরে! কি এগুলো?
— নতুন ইয়ারের শিট, সিনিয়র ভাই-আপুদের থেকে জোগাড় করলাম।
টেবিলের উপর শিটের বস্তা রেখে ধপ করে বিছানায় বসলো সে। হাঁপাচ্ছে।— এত শিট দিয়ে কী করবি?
— এত আর কই? তাসনিমা আরো বেশি জোগাড় করেছে।
— বলিস কী! আচ্ছা শোন, স্যাররা যে বইগুলোর নাম বলেছে বিকেলে ওগুলো কিনতে যাবো। তুই কবে কিনবি? চল একসাথে যাই।
— আরে ধুর! এত কষ্ট করে শিট জোগাড় করলাম কি গাদাগাদা বই কেনার জন্য?
— মানে? বই কিনবি না? শুধু শিট পড়লে কমন পড়বে পরীক্ষায়?
— পড়বে, পড়বে। প্রতিবছর এই প্রশ্নগুলোই পরীক্ষায় আসে।
নাসরিনের নিশ্চিন্ত উত্তর।— হুমমম…
— কিরে কী ভাবছিস এতো?
— আচ্ছা একটা জিনিস বল তো, আমরা তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাইনা?
— হ্যা, তবে ছাত্র না ; ছাত্রী।
বলে হেসে উঠলো নাসরিন।— হ্যা, আর এখন আমাদের পড়াশোনার বিষয়টাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে, বুঝে পড়ার কথা। বিভিন্ন টপিক নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করে করে পড়ার কথা, তাইনা? স্কুল, কলেজে তো সব বিষয়েরই সামারি পড়েছি মাত্র৷
— হ্যা, কিন্তু আমি এতো প্যারা নিতে পারবো না। পরীক্ষার আগে স্যাররা যে শর্ট সাজেশন দিবে ওই প্রশ্নগুলো শিট থেকে একদম মুখস্ত, ঠোঁটস্থ, অন্তরস্থ করে নিবো। কমন না পড়ে যাবে কোথায়!
— সবাই কি তোর মতো ভাবে?
— তাই তো মনে হয়। সবাই তো দেখি শিটের জন্য কাড়াকাড়ি শুরু করে দিয়েছে। পরীক্ষায় কমন পড়ার নিঞ্জা টেকনিক হাহাহা…
— কিন্তু আমরা যদি সারাবছর না পড়ে পরীক্ষার আগে শুধু শিট পড়ে আনসার করে আসি তাহলে তো আমাদের কিছুই শেখা হলোনা আদতে!
— হ্যা, তা ঠিক বলেছিস।
— আর দেখ, বছরের পর বছর ধরে সিনিয়রদের থেকে জুনিয়ররা শিট নিয়ে সেটা পড়ে পরীক্ষায় লিখছে। তুই যার থেকে শিট নিলি সে পরীক্ষায় এখান থেকেই লিখেছে, সে যার থেকে নিয়েছে সেও লিখেছে..
স্যাররা প্রতিবছর একই প্রশ্নের একরকম উত্তরই দেখে আসছেন, একদম লাইন বাই লাইন। সবাই খাতায় একই লেখা লিখলে সবাই তো গড়পড়তা নম্বর পাবে, তাই না?— এটা তো ভাবিনি রে।
— গত সেমিস্টারে যারা টপার হয়েছে তারা কি শিট থেকে পড়ে টপার হয়েছে?
— ওদের তো শিটের পিছনে দৌড়াতে দেখলাম না। ওরা কোথা থেকে পড়ে তাহলে?
— শোন, স্যাররা ক্লাসে যে যে টপিক পড়ায় সেগুলো নোট করতে হবে, আর নিজেদেরও সেই টপিকগুলো নিয়ে বিভিন্ন বইয়ে ঘাটাঘটি করতে হবে। তারপর নিজের মতো করে প্রশ্নগুলোর উত্তর নোট করতে হবে। পরীক্ষায় ওই প্রশ্ন আসলে সবাই যখন কোনো একটা শিট থেকে বা বই থেকে গৎবাঁধা লেখা লিখবে তখন তুই তোর এতকিছু ঘেঁটে তৈরি করা নিজের নোট থেকে লিখবি। স্যার অনেকগুলো একরকম লেখা দেখতে দেখতে যখব তোর অন্যরকম লেখা দেখবে, একটু নড়েচড়ে বসে ভালো করে পড়ে দেখবে অবশ্যই। নাম্বার বেশি পাওয়ার আশা করাই যায়।
— কিন্তু তাহলে তো সব ক্লাস মনোযোগ দিয়ে ঠিকমতো করতে হবে, নোট করতে হবে। আমি তো ক্লাসে মোবাইলে কার্টুন দেখি, তার কি হবে?
— তাহলে তুই শিট থেকেই পড় আর কোনোরকমে টেনেটুনে পাশ করে যা। ভালো রেজাল্ট করার দরকার নাই।
— আরে আরে কই যাস? রাগ করিস না। ভালো রেজাল্ট করতে তো সবাই চায়।
— তাহলে যা যা বললাম এগুলো কর। আর সবচেয়ে ভালো হয় কোনো টপিক নিজে মোটামুটি বোঝার পর সেটা নিয়ে গ্রুপ ডিসকাশন করলে। অন্যকে বোঝাতে পারলেই বুঝবি সেই টপিকে তোর আর কোনো সমস্যা নেই।
— হুমমম, সবই বুঝলাম। কিন্তু এত কষ্ট করে যে এই শিটের বস্তা জোগাড় করলাম এগুলো কি করবো।
— চল আমার সাথে। এগুলো নে।
— কোথায়? কি করবি এগুলো দিয়ে?
— ক্যান্টিনে কেজি দরে বিক্রি করবো। এত কষ্ট করে যখন জোগাড় করেছিস, কিছুটা কাজে লাগুক।
গল্পের নাসরিনের মতোই আমাদের অবস্থা। আমরা পরীক্ষার আগে হাজার বছর ধরে চলে আসা কিছু শিট সাপের মন্ত্রের মতো করে পড়ে মুখস্ত করি আর পরীক্ষার খাতায় তা হুবহু লিখে দিয়ে আসি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসেবে আমাদের উচিত পড়ার বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা, বিশ্লেষণ করা, গবেষণা করা। তাহলেই না আমাদের মধ্য থেকে নতুন নতুন লেখক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী তৈরি হবে। তাহলেই শিট-সংস্কৃতি আমাদের সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করবে না। পরীক্ষার খাতা দেখতে গিয়ে স্যাররা সবার আলাদা আলাদা বৈচিত্র্যময় উত্তর পড়ে ভাববেন, “বাহ! এই বিষয়টা তো এভাবে ভেবে দেখিনি। ”
হাবিবুন_নাহার_মিমি
4 Comments
Friends
Diponkor Sharma Partho
@parthodip218
এমরান হাসান
@emranhasan
নুরুন্নবী খোকন
@nurunnabi-khokon
Aeka Asin
@asin
Md. Ariful Islam
@mdarifulislam
A M Bappy
@a-m-bappy
Pranto Sarkar
@pranto-sarkar
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam


আপনার পর্যবেক্ষণ এবন উপ্সথাপন দারুণ হয়েছে।