-
তনয়া
আবু নাঈম
পার্ট:-১
খুব সাবধানে দরজা ফাঁক করে কক্ষে উঁকি দিলাম, নিমিষেই নজর স্থির হলো খাটে গিয়ে। তনয়া ঘুাচ্ছে ওপাশ ফিরে। মুখটা ঠিক দেখা যাচ্ছেনা, চুলটা অগোছালো। মশারা গান শুনাচ্ছে যেন ওকে, মশারী কখনো টানায় না মেয়েটা। এতে নাকি নিজেকে বন্ধী বন্ধী মনে হয়, দম বন্ধ হয়ে আসে নাকি…
টেবিলের কাছে গেলাম চুপিসারে আলতো পায়ে। যাতে তনয়া জেগে না উঠে। কয়েল রাখাই ছিলো কিন্তু ম্যাচ পাচ্ছি না। দুটো কয়েল হাতে নিয়ে কিচেনে গেলাম।মাথা এবং পায়ের দিকটায় দুটো কয়েল খাটের নিচে করে রেখে,কাঁথাটা ভাঁজ ভেঙ্গে পাশে রেখে তনয়ার পাশে রাখলাম, ফ্যানের স্প্রীড একটু বাড়িয়ে দিলাম। লাইট অফ করে বেরুতে যাবো ঠিক তখনই তনয়া ডাকলো, বাবা……
মেয়েটা প্রথম যেদিন আমায় ডেকছিলো সেদিনই বাবা শব্দটাই উচ্চারণ করেছিলো। অনেক চেয়েছি তবে পাল্টাতে পারিনি, আর এখন তো ওর মুখের বাবা শব্দটাই আমার কাছে পৃথিবীর সেরা শব্দ।
আবার লাইট অন করে বললাম, ঘুমাসনি মা???
হুম বাবা ঘুমেই তো ছিলামম, তোমার ঘ্রাণ পেয়েই ঘুম ভাঙ্গলো।
বলিস কি! ঘুমের মাঝে ও?
হুম বাবা তুমি এত সহজে নিজেকে আমার থেকে লুকোতে পারবেনা বাবা।
আচ্ছা ঠিকাছে লুকাবোনা, খেয়েছিস তুই??
হ্যাঁ বাবা খেয়েছি, তুমি ইদানিং বেশী রাত করে ফিরছো, আমি তোমাকে খুব মিস করি বাবা। তাছাড়া তুমি ভুলে যাচ্ছো আমি রাতে এককি ভয় পাই খুব।
নারে মা আমি ভুলে যাচ্ছি না একটুও, কটাদিন অফিসে একটু সমস্যা তাই। কাল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে চেষ্টা করবো। এখন তুই ঘুমা, আমি লাইট আর অফ করলাম না। ঠিক আছে??
আচ্ছা বাবা, তুমি খেয়ে নাও বাবা। আমি আসবো তোমার সাথে??
না থাক তুই ঘুমা, আমি খেয়ে নিবো।
বাবা তুমি না খেয়ে একদম ঘুমাবে না কিন্তু।
ডাইনিংটা খুব অগোছালো অবস্থা, ভাতের বোলটায় ঢাকনা দেয়া নেই, জগে পানি নেই হয়তো সিদ্ধ করা পানি শেষ। টেবিলটা একটু গুছিয়ে ফিরে এলাম শোওয়ার ঘরে, খাওয়ার আর ইচ্ছে নেই আমার। মাথাটা ও টনটন করছে ঘুমানো দরকার খুব।
রাত বারোটা বেজে গেছে অনেক আগেই, চারিদিকে কবরের নিরবতা বিরাজ করছে। সেকেন্ডর কাঁটা টিক টিক শব্দ লাফিয়ে যাচ্ছে দেয়াল ঘড়িটায়। ইদানিং ঘড়ির কাঁটার শব্দ শুনাটাও আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
ভাবনা আমাকে উল্টো পথে ঘুরিয়ে আট বছর আগের সময়ে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলো।
সেদিন অফিস থেকে বের হয়ে মাত্র একটা কফিশপে ঢুকলাম, হাতে থাকা মুঠোফোন সংকেত দিতে শুরু করলো, একটা মেসেজ ছিলো আমার স্ত্রীর নম্বর থেকে।
রোহান কোথায় তুমি??? তাড়াতাড়ি বাসায় এসো, তাড়াতাড়ি প্লীজ।
আমি বের হয়ে পার্কিং এ থাকা গাড়ীতে বসলাম।
গাড়ী এসে রাস্তায় পড়লো, মনের গতির মতো গাড়ীর গতি থাকলে এতক্ষণে বাসায় পৌঁছে যেতাম হয়তো। জ্যামে আটকে আছি অনকটা সময় ধরে।
আবার মেসেজ, কই তুমি?? আমি আর পারছি না। কই তুমি???
কল দিলাম, আনরিসিভেবল দেখালো। ভাবছি কি করা যায়, আমি বাসায় পৌঁছানোর আগে অনেক কিছু ঘটে যাওয়া সম্ভব। মোবাইল স্ক্রীনে দ্রুত আঙ্গুল চালাচ্ছি, হুম পেয়েছি। ড. কামাল, অনেকবার মিট করার কারণে বন্ধুর মত এখন।
ফোন করে জানালাম সব, বলে দিলাম এ্যম্বুলেন্সর সাথে দুজন নার্স দিতে। আমি ক্লিনিকেই আসছি।
সন্ধা ৭টায় আমি ক্লিনিকের গেইটে নামলাম। একটু পর আনিতাকে নিয়ে এ্যম্বুলেন্স এসে থামলো, নমানো হলো স্ট্রেচার। আনিতা কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে স্ট্রেচারে মিশে আছে। এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমি কিন্তু তা হলোনা।
ড.কামাল বললেন, মিঃ রোহান আপনি আমার সাথে আসুন। বলেই দ্রুত পা বাড়ালেন অফিসের দিকে।
আমও ছুটছি তার পিছুপিছু….
চেয়ারে বসলেন ড.কামাল, আমি বসলাম মুখোমুখি।
রোহান সাহেব, আপনার স্ত্রীর অবস্থা ক্রিটিক্যাল মনে হচ্ছে, ইমার্জেন্সী অপারেশন প্রয়োজন।
রক্তক্ষরণ এবং অপারেশনের জন্য রক্তের প্রয়োজন। আপনি রক্তের ব্যবস্থা করুন আর আমি আমাদের করণীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।
বিস্পোরিত চোখে তাকিয়ে আছি ড.কামাল সাহেবের দিকে। ঠান্ডা স্বরে বললেন চিন্তা করবেন না, ইন্ শা আল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।
আনিতাকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হলো সাড়ে আটটার দিকে। আমি অপেক্ষারত অবস্থায় আনিতার অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগের মুহুর্তটাই ভাবছি। আমার হাতের মুঠোয় আনিতার ডান হাত, ঠোট কাঁপছে, খুব ধীরে চোখ মেলে তাকালো আমার দিকে। মুখে একটা কথাও বলেনি আমায়, অশ্রুভেজা দুচোখ আকুতি করে বলছে, আমি বাঁচতে চাই রোহান, আমি তোমার সাথে আরো অনেকটা পথ চলতে চাই। বাঁচবো তো আমি রোহান??
কিছুই বলতে পারিনি আমি আনিতাকে,শুধু আলতো করে মুছে দিয়েছিলাম ওর দুচোখের অশ্রুধারা। তাকিয়ে ছিলাম অপলকে ওর পথপানে।
দুচোখ আমার কঠিন ওই দরজা থেকে সরছেনা একদম, মনে হাজার প্রশ্ন কি হচ্ছে দরজার ওপাশে, ভয় পাচ্ছে না তো আনিতা??
এত সময় কেন লাগছে??
অবশেষে অপেক্ষার অবসান হলো, খুলে গেলো ওটির দরজা বেরিয়ে এলেন ড.কামাল সাহেব। ছুটে গেলাম তার কাছে, মুখে নয় চোখই প্রশ্ন করছিল হাজারটা।
কিছুটা গম্ভীর মনে হলো তাকে, বললেন আপনার একটা মেয়ে….
আনিতা..? আনিতা কেমন আছে ড.???
ধৈর্য ধরুন মিঃ রোহান, আপনার স্ত্রীর অবস্থা জানাতে আমাদের একটু সময় লাগবে। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করুন প্লীজ। আর হ্যাঁ বাচ্চা চাইলে এখন দেখতে পারেন, আমি একজ নার্স ডেকে দেই আপনাকে।
না থাক ড. আগে আনিতা, তারপর বাচ্চা।
ক্লিনিকেই রাতে থেকে গেলাম, ড.কামাল থাকার ব্যবস্থা করে গেলেন।
আমি রাত জেগে ভাবছি কখন সকাল হবে?? কখন আমরা দুজন থেকে তিনজন হয়ে তিন জায়গায় আলাদা থাকা সবাই এক হবো…..4 Comments
Friends
বাহার উদ্দিন আহমেদ (শ্রাবণ)
@bahar3244
আব্দুল্লাহ
@g-m-abdulah
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou
ভাস্কর
@vaskarchou



সুন্দর গদ্য। ভালো লিখতে পারা একটা অভিযান।