Profile Photo

আবির হাসান সায়েমOffline

  • Abir-Hassan-Sayem
  • #ধারাবাহিক
    একমুঠো জোনাকি (পর্ব-১২)
    ~আবির হাসান সায়েম

    আমি চোখ মেললাম। ফরিদ বসে আছে সোফায়। ঘুমুচ্ছে নাকি কে জানে।চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আমি ডাকলাম,
    “ফরিদ, এই ফরিদ। ”
    ধড়ফড় করে উঠে বলল,
    “জ্বি ভাই বলেন। ”
    “মেয়েটাকে কি চকলেট দিসিলা? ”
    ” হ ভাই দিসি। আপনেরটা টেবিলে রাইখা দিসি। ”
    “ওহ। ওই চকলেট তুমি খায়া ফালাও। ”
    “ভাই আপনের কি শরীরডা খারাপ লাগতেসে? ”
    “না তো।কেনো?”
    ” আমার বাপজান যখন অসুস্থ হইতো তখন আমারে ‘তুমি’ কইরা ডাকত। ”
    আমি হাসতে হাসতে বললাম,
    ” না আমার শরীর ভালো। এখন থেকে তোকে ‘তুমি ‘বলেই ডাকব। ”
    ফরিদ হেসে বলল,
    “আইচ্ছা। ”
    আমি ইয়াসমিন সুলতানা’র দেয়া চিঠিটি খুকে পড়তে শুরু করলাম।
    প্রিয় আবীর,
    আশা করছি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে। আমি কিভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না। আমি সাধারণত খুব গুছিয়ে কথা বলি। যারা খুব গুছিয়ে করা বলে তারা গুছিয়ে লিখতে পারে না। আমিও পারি না।
    আমি তোমার কাছে এসেছিলাম, কারণ আমি ভেবেছিলাম, তুমি শিলাকে বিয়ে করতে চাও কিন্তু কাওকে বলতে পারছো না। তোমার চোখ দেখে যে কেও বলে দিতে পারবে, তুমি শিলাকে ভালোবাসো। কিন্তু কেনো বারবার মানা করছো তা আমি জানি না।
    মূল কথায় আসি – তুমি শুনে খুব অবাক হবে, আমার আর তোমার খালুর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। কিন্তু এই ব্যাপারে কেও কিছুই জানে না৷ আমরা কাওকে জানাইনি, এই কথা জানলে শিলার ভালো জায়গায় বিয়ে দেয়া দূরুহ হয়ে পরবে। শিলার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরপরই আমরা সবাইকে ব্যাপারটা বলব৷
    তোমার খুব অবাক লাগছে না? যে মানুষদের কখনো রাগারাগিও করতে দেখলাম না, তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যাচ্ছে? কিন্তু কোনো কিছুই এই পৃথিবীতে পরিপূর্ণ হতে পারে না। সংসার যেহেতু আছে তাহলে অবশ্যই ঝগড়া বিবাদ থাকবে৷ যে সংসারে দেখবে আমাদের মতো কোনো ঝগড়া -বিবাদ নেই তখনই ভেবে নিবে তারা নাটকে অভিনয় করছে৷ ‘ট্রেজেডি’র নাটক৷ একটা বিশেষ সময় পর তারা নাটক বন্ধ করে দিবে৷ দর্শকরা হতভম্ব হয়ে যাবেন। “এ কি হলো, এ কি হলো।”
    আচ্ছা ওইসব বাদ থাকুক যেহেতু তুমি শিলাকে বিয়ে করবে না সেহেতু তুমি এমন কিছু কর যাতে নিলয়ের সাথে বিয়েটা হয়ে যায়। নিলয় ভালো ছেলে।
    আর আরেকটা কথা, তোমার খালুর কোম্পানির ৪৯% শেয়ার আমার। আমার এই শেয়ারের যে দেখভাল করতেন – ফজলুল কাদির,উনি চারমাস পর রিটায়ার্ড করবে৷ আমি তোমাকে সেই দায়িত্বটা দিতে চাই। দিতে চাই না, তোমাকে দিচ্ছি। আগামীকাল ফজলুল সাহেব অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিয়ে তোমার কাছে আসবেন। তুমি সাইন করে দিও।
    তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠো। আমি তোমাকে কতটা স্নেহ করি তা তোমাকে বোঝাতে পারব না।
    ইতি,
    তোমার খালা -ইয়াসমিন সুলতানা

    প্রকৃতি আমাকে নির্মমভাবে আমাকে ডাকছে। দেয়াল ঘড়িতে বাজে -৮ঃ৫০ p.m। আমি উঠে বাথরুমে গেলাম। মিনিট বারো পর বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখি, ডাক্তার সাহেব বসে আছেন।
    “আসসালামুয়ালাইকুম স্যার। এই অবেলায় এলেন। ”
    ” আপনাকে দেখতে এলাম। ”
    ” রাউন্ডে এসেছেন? ”
    ” না শুধু আপনাকে দেখতে এসেছি৷ রাউন্ডে এলে তো আমার সাথে কিছু ডাক্তার, কিছু নার্স থাকত। আমি তো এসেছি একা। ”
    ” আমাকে বিশেষভাবে দেখতে আসার কারণটা কি? আমার বড় কোনো রোগ হয়েছে নাকি? ক্যান্সার টাইপের কিছু ?”
    ডাক্তার সাহেব হাসতে হাসতে বললেন,
    “না না তেমন কিছুই না৷ আজকে হাসপাতালের মসজিদে আপনার জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়েছে তা কি আপনি জানেন?”
    আমি অবাক চোখে বললাম,
    “মানে? আমাকে নিয়ে বিশেষ দোয়া কেনো হবে? ”
    “তা জানতেই তো আপনার কাছে এসেছি। দোয়ার ব্যাবস্থা করেছে – আইনুল্লাহ। আইনুল্লাহ বলল, আপনি নাকি মহাপুরুষ কাতারের লোক। আইনল্লাহ’র সাথে একজন নার্সও তাকে সমর্থন করল। তাই ভাবলাম আপনার সাথে একটু দেখা করে যাই। ”
    “ওহ আচ্ছা। আমি মহাপুরুষ-টুরুষ কিচ্ছু নই। তারা কেনো এমন ভাবল জানি না। ”
    কিছুক্ষণ দু’জনই চুপ করে রইলাম। ডাক্তার সাহেব বললেন,
    “উঠি তাহলে। ”
    আমি তার কথার ধার না ধেরে বললাম,
    “স্যার আপনি কি গান গাইতে পারেন? ”
    “গান?”
    “হ্যা গান। সঙ্গীত। ”
    “হালকা পাতলা রবিন্দ্রসংগীত গাওয়ার চেষ্টা করি মাঝে মাঝে। ”
    ” স্যার, ‘ আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে ‘-গানটা ধরুন তো স্যার। ”
    ডাক্তার সাহেব ইতস্তত করে বললেন,
    ” এই সময়ে এইখানে? আমি ডাক্তার মানুষ। হাসপাতালের স্টাফরা কি ভাববেন? ”
    আমি দৃঢ় স্বরে বললাম,
    ” হ্যা তা জনি, ডাক্তাররা রোগীর চিকিৎসা করবেন। গান শুনাবে না। না শুনাতে চাইলে সমস্যা নেই। কিন্তু শুনাতে চাইলে, কে কি বলল তাতে তো কিছু যায় আসে না। ”
    ডাক্তার একটু গলা খাকরানি দিয়ে গান ধরলেন। কি ভরাট গলা। গানের শব্দ শুনে দরজা খুলে কয়েকজন নার্স, ওয়ার্ড বয় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ডাক্তার চোখ বন্ধ করে গান গাচ্ছেন৷
    ||আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাই নি।
    তোমায় দেখতে আমি পাই নি।
    বাহির-পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয়-পানে চাই নি||

    চলবে..

    8
    5 Comments
Skip to toolbar