Profile Photo

আবুল হাসনাতOffline

  • Abul.Hasnat
  • Profile picture of আবুল হাসনাত

    আবুল হাসনাত

    4 years, 5 months ago

    নাহারের নিরর্থক কয়েকটি টুকরা গল্প

    নাহার, বয়েস কত আর তের-চোদ্দ। তবে রোগাপটকা হওয়ায় মনে হয় দশ-এগারো। দুরন্ত নাহার সারাদিন এর গাছের ওর গাছের ফল চুরি করে দিন কাটায়, কখনো ভাত-তরকারিও। পড়শীদের অভিযোগ শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ মায়ের হাতে মার খাওয়া নাহারের গা-সওয়া। প্রতিদিন মার দেবার পর মায়ের মনটাও নরম হয়ে আসে। আহারে মেয়েটা আমার বড় ভাত ভালোবাসে। কিন্তু অভাবের সংসারে যা কখনোই দুবেলা তো দূরে থাক একবেলাও জোটে না। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে বেলকা গ্রামের রহিমুদ্দির বড় মেয়ে আমাদের গল্পের নাহার। রাক্ষুসী তিস্তা তিন তিন বার তাদের বাড়ি গ্রাস করেছে, সাথে জমিজিরাতও। তাই তিন ছেলে আর সবার বড় নাহারকে নিয়ে ভূমিহীন জুলেখা-রহিমুদ্দির অভাবের সংসার।

    এখন অগ্রাহণ মাস, পুরো দমে ধান কাটা হচ্ছে। চৌধুরী বাড়িতে তাই নবান্নের উৎসব। পিঠাপুলিও তৈরী হচ্ছে সমান তালে। উৎসবে যোগ দিতে ঢাকা শহর থেকে সপরিবারে বেড়াতে এসেছে চৌধুরীর দুই ছেলে। এই চৌধুরীদের চিরস্থায়ী কামলা জুলেখা-রহিমুদ্দি। ধান লাগানো থেকে ধান কাটা, মাড়াই এমনকি বাজার হাট রান্নাবান্না সব কাজেই তারা আছে। অভাবের সময় এই চৌধুরীদের কাছেই তাদের হাত পাততে হয়। যদিও চৌধুরীদের সাহায্য মানে অগ্রিম শ্রম বিক্রি। অন্যের জমিতে কাজ করার আর তখন কোন সুযোগই থাকেনা।

    ছয়তলার বারান্দার গ্রীলে গাল ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে নাহার। এখন তার নাম আর নাহার নয় ‘ভেতো’। এ বাড়িতে এসে এদের পোষা কুকুরগুলোর মত তারও একটা নাম হয়েছে। পার্থক্য একটাই কুকুরগুলোর আগে নাম ছিলো না এখন নাম হয়েছে। আর তার একটা নাম ছিলো তারপরও নতুন নামকরন করা হয়েছে। সে নাকি বেশী ভাত খায় এজন্যই তার এই নাম। পিছনের কারন অবশ্য অন্য। গৃহকর্তীর নামও নাহার, শুধু নাহার নয় মোসাম্মৎ কামরুন্নাহার।

    চৌধুরীদের ছোট ছেলের বউ কামরুন্নাহার যখন জুলেখাকে ঢাকা নিয়ে যেতে চাইলেন তখন তার মা-বাবার পক্ষে না বলার কোন সুযোগই ছিলো না। ঢাকায় তার ভাত-কাপড়ের কোন অভাব হবেনা। তার উপর আবার মাসে মাসে বেতনও পাবে। উপরি হিসাবে বিয়েশাদিও দিয়ে দিবেন। এতো বড়ই লোভনীয় প্রস্তাব।

    ভেতো নামের কারনেই কিনা নাহারকে শুধু ভাত, ডাল আর সব্জিই দেয়া হয়। মাছ-মাংশ কদাচিত তার কপালে জোটে, তাও বাসি পচা। অথচ কুকুরগুলো তার চোখের সামনেই মুরগীর কচি কচি রান চিবায়। আর সে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। প্রায় সে স্বপ্ন দেখে ডাইনিং টেবিলে বসে সে বড় বড় মুরগীর রান চিবাচ্ছে। অথচ কোন স্বাদই পাচ্ছে না। আহারে মুরগীর রানের স্বাদ জানি কেমন!

    গত বছর দূর্গা পুজোর সময় সে সারাদিন পূজা মন্ডপে পড়েছিলো। ওখানে মাঝে মধ্যে মুফতে প্রসাদ পাওয়া যায়। ওখানেই শুনেছিলো এ জীবনে পাপ করলে পরের জন্মে নাকি পশুপাখি হয়ে জন্মাতে হবে। সেও তো অনেক পাপ করেছে। কত মানুষের গাছের ফল আর রান্না করা ভাত চুরি করে খেয়েছে। তাহলে কি পরের জন্মে সেও পশুপাখি হয়ে জন্মাবে! যদি তাই হয় তাহলে আল্লাহ যেন তাকে পরজন্মে চৌধুরীদের কুকুর করেন।

    যদিও গরীব মানুষের দোয়া সচরাচর কবুল হয়না তবে এবার বোধহয় খোদা তার মনের আশা পুরন করতে যাচ্ছেন। তার সারা শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাকার জ্বলুনি আস্তে আস্তে কমে আসছে। সে বুঝতে পারছে মৃত্যুর শীতল অনুভুতি। আহারে সামনেই বহুল আকাংখিত পরজন্ম। আশ্চর্য! নাহার ভাবতেও পারেনি কুকুরে জন্য সিদ্ধ করা একটুকরো মাংস চুরিই এত সহজে তাকে পরজন্মে নিয়ে যাবে।

    কামরুন্নাহারের বাসার সামনে এখন পুলিশের গাড়ি নয় এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে সাদা চাদরে ঢাকা ভেতো ওরফে নাহার। এবার সে সত্যিকার কুকুর হয়ে জন্মানোর আশা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে সুন্দরগঞ্জে বেলকা গ্রামে।

    5
    3 Comments
Skip to toolbar