-
চিন্তার মৃত্যু
———————————————————
আমাদের সবার জীবনেই এমন কিছু কিছু ঘটনা ঘটে যা অলৌকিক না হলেও অদ্ভুত তো বটেই, চিন্তা করেও যার কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তখন চিন্তা করাটাও অর্থহীন বলে প্রতীয়মান হয়। অবশ্য অর্থহীন না বলে নিরর্থক বলাই ভালো।সেদিন রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে কোথাও যাচ্ছিলাম। কোন রাস্তা আর যাচ্ছিলামই বা কোথায় সেটা ঠিক বলতে পারবো না। কেন বলতে পারব না সেটা পরে বলছি। পকেটের মোবাইল ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে একটা কান্না ভেজা নারী কন্ঠ শুনতে পেলাম। মহিলা পরিচয় দিলেন তিনি আমার এক বন্ধুর স্ত্রী। জানালেন আমার সেই বন্ধুটি হঠাৎ মারা গেছে। আমি জানতাম আমার সেই বন্ধুটি লন্ডন প্রবাসী। অর্থাৎ খুব সম্ভব মহিলাটি লন্ডন থেকে আমাকে ফোন করেছে। কলেজ জীবনের আমার সেই বন্ধুটির সাথে আমার তেমন কোন ঘনিষ্ঠতা বা যোগাযোগ ছিল না কখনোই। অনেক বছর আগে হঠাৎ একদিন ঢাকার উত্তরায় তার সাথে দেখা এবং কথা হয়, তখন জানতে পারি যে সে পরিবারের সাথে লন্ডনে থাকে। সে সময় আমার ঘনিষ্ঠ আরেকজন কলেজ জীবনের বন্ধুর অকাল মৃত্যু নিয়ে তার সাথে কথা হয়েছিল। আমরা দুজনেই তাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ এবং দুঃখ প্রকাশ করেছিলাম। কি আশ্চর্য আমার সেই স্বল্প পরিচিত লন্ডন প্রবাসী বন্ধুটিও মারা গেল? আর তার স্ত্রী যাকে কিনা আমি আদৌ চিনি না সে আমাকে ফোন করে এই মৃত্যু সংবাদ দিল? মহিলা আরও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল কোন সূত্রে তার স্বামীর সাথে আমার বন্ধুত্ব। ব্যাপারটা চিন্তা করে দেখেন, কলেজ জীবনের আমার সেই বন্ধুটির সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই, তার স্ত্রীকেও আমি চিনি না, সে কেন বিশেষ করে আমাকেই ফোন করে এই মৃত্যু সংবাদ দিবে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল আমি কিন্তু ঘটনাটা বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিলাম। মহিলার সাথে আমার কথোপকথনটা নৈমিত্তিক ঘটনার মতনই মনে হচ্ছিল। বিষয়টা নিয়ে যখন ভাবছিলাম তখন কানে এলো মৃদু বাজনার শব্দ। প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝতে পারলাম যে সেটা মোবাইলের অ্যালার্মের শব্দ, আর স্বপ্ন ভেঙ্গে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম।
হ্যাঁ, পুরো ব্যাপারটাই ছিল স্বপ্ন! কোন কারণ ছাড়াই এমন অদ্ভুত একটা স্বপ্ন কেন দেখলাম সেটা কিছুতেই মাথায় আসলো না। অনেক কথাই মনে আসছিল। লন্ডনে আমার আরো দুই একজন বন্ধু আছে, আমার এক বোনই বহু বছর ধরে লন্ডন প্রবাসী। একবার ভাবলাম তাদের কাছ থেকে কোন খবর নিব কিনা। পরে চিন্তা করে দেখলাম যে ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাবে। হয়তো সে মারা গেছে অথবা যায়নি, এটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন অর্থ খুঁজে পেলাম না। চিন্তা কিন্তু থেমে থাকল না, অবচেতন মনে সে ঘটনার কার্যকারণ বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করতেই থাকলো। ভেবে দেখলে মানুষের জীবনটা সত্যি বড় অদ্ভুত। আমার সেই প্রয়াত ঘনিষ্ঠ বন্ধুটির কথাও নতুন করে আবার ভাবতে থাকলাম, মধ্য তিরিশেই যে আমাদের ছেড়ে আকস্মিকভাবে চলে গেল। স্কুল জীবনেও ক্লাস এইটে পড়ার সময় এক সহপাঠী বন্ধুর মৃত্যু দেখতে হয়েছিল। পরিবারের সাথে বেড়াতে গিয়ে সে কাপ্তাই লেকে ডুবে যায়। পৃথিবীতে মানুষের আসা-যাওয়া অর্থাৎ জন্ম মৃত্যু সম্পর্কে তখন থেকেই আমার এই অর্থহীন চিন্তাভাবনা, যে চিন্তার কোন শেষ নেই। অবশ্য অর্থহীন না বলে নিরর্থক বলাই ভালো, যেহেতু এর কোন কারণ জানা নেই। এইরকম কতশত বিয়োগান্ত ঘটনা প্রতিদিন ঘটে চলেছে। আমার এই পঞ্চাশোর্ধ জীবনেই নিজেদের পরিবারের কতজনকে চলে যেতে দেখলাম।
কত লক্ষ কোটি মানুষ এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করছে, কিছু মানুষের সাথে কিছু মানুষের পরিচয় ঘটছে, ভাবের আদান প্রদান হচ্ছে, ঘনিষ্ঠতা হচ্ছে, নারী-পুরুষের মিলন এবং বংশবিস্তার ঘটছে, আবার একটা সময় তারা সবাইকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। শুধু মানুষ কেন সমগ্র জীবজগৎ সম্পর্কেই এই চিন্তা খাটে। মানুষের মতন তারাও পৃথিবীতে আসছে, বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য গ্রহণ করছে, বংশবিস্তারের জন্য বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে। অবশ্য মানুষের সাথে অন্যান্য জীবের মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে যৌনাকাঙ্খার জন্য কাম তাড়িত হয়ে তারা যা ইচ্ছা তাই করছে না, যেটা মানুষ করে। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা এ ব্যাপারে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা হয়তো দেবেন, আমরাও তাদের সাথে সুর মিলিয়ে বলবো একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের জন্ম ও মৃত্যুর জন্য তিনিই দায়ী। কিন্তু কেন? তার কোন সার্বজনীন ব্যাখ্যা কি কেউ দিতে পারবে? ইসলাম ধর্মের অনুসারী হওয়ায় আমরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করি তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা এবং পালনকর্তা। মানবতার শিক্ষা এবং সৎ জীবন যাপনের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য আল্লাহ প্রেরিত যেসব নবী-রসূল এসেছেন তাঁদের উপরও বিশ্বাস রাখি। ইসলামী অনুশাসন মেনে জীবনকে পরিচালিত করতে হবে সেটাও বিশ্বাস করি। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ লোকইতো ইসলাম ধর্মের অনুসারী নয়। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এবং আরো অন্যান্য ধর্মে জীবন দর্শন সম্পর্ক আছে ভিন্ন ভিন্ন মত। আবার সৃষ্টিকর্তার উপরই যাদের বিশ্বাস নেই তারা কি বলবে? এক পশ্চিমা গায়ক তার গানে বলেছেন If there’s a God or any kind of justice under the sky. If there’s a point, if there’s a reason to live or die. HIV আক্রান্ত সেই গায়ক এমন সময় এই গানটা লিখেছে যখন সে জানে কিছুদিন পরে তার মৃত্যু হবে।
আবার স্বপ্নের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। স্বপ্ন কমবেশি সবাই দেখে। স্বপ্ন নিয়ে বিস্তর গবেষণাও হয়েছে। অনেকে বলেন পশুপাখিরাও নাকি দেখে, যদিও তার কোন যুক্তিযুক্ত কারণ বা ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেন না। আমরা অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা স্বপ্ন ব্যাপারটাকে স্বাভাবিক বলেই ধরে নেই, এর গভীরে যাওয়ার কোন চেষ্টাই করি না। আবার সেই একই কথা – ব্যাপারটা নিয়ে যখন পরিষ্কার ধারণা নেই তখন নিরর্থক গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেই বা লাভ কি? যখন কোন খারাপ স্বপ্ন দেখি তখন মনে ভীতির সঞ্চার হয়, অশুভ কিছুর আশঙ্কায় মন কু-ডাকতে থাকে। তখন সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি বাস্তব জীবনে এমন বিপদের সম্মুখীন যেন হতে না হয়। আবার সুন্দর কোন স্বপ্ন দেখলে মনটা খুশি হয়ে ওঠে। আমার এক খালা ছিলেন যিনি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতেন। অনেকেই নাকি স্বপ্নকে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিভাবে পারে, সেটাও একটা রহস্য। অনেকেই বলেন স্বপ্ন ব্যাপারটা হচ্ছে কোন ঘটনা বা চিন্তার উপর ভিত্তি করে সুপ্ত অবচেতন মনের দর্শন। কিন্তু আমি গতরাতে অত্যন্ত স্বাভাবিক বাস্তবধর্মী যে ঘটনাটা স্বপ্নে দেখলাম সেরকম কিছু তো আমি ঘুনাক্ষরেও কখনো চিন্তা করিনি। যার মৃত্যুর খবর আমাকে দেওয়া হলো তার বা তার পরিবারের সম্পর্কে কখনো কোনো চিন্তাই আমি করিনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বপ্নের ব্যাপারটা পরে আর ঠিকভাবে মনে আসে না, কি দেখেছি সেটা স্পষ্ট করে বলা যায় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে স্বপ্নদ্রষ্টা স্পষ্টভাবেই তা মনে করতে পারে এবং অন্য কাউকে সেটা বলতেও পারে। স্কুলে নিচু ক্লাসে পড়ার সময় ভীতিকর একটা স্বপ্ন আমি দেখেছিলাম যেটা আজ পর্যন্ত আমি ভুলিনি। আমার বাবার মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে কিছু স্বপ্ন দেখেছিলাম যেগুলো এখনো আমি স্পষ্ট ভাবে মনে করতে পারি। সেগুলোর কিছু গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও মনে মনে চিন্তা করে দাঁড় করানো যায়। কিন্তু গতরাতে দেখা স্বপ্নটা যদিও খুব স্পষ্ট কিন্তু ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। এর কোন ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। অবশ্য জগতের কতটুকুই বা আমরা জানি? কিছুই জানি না বলতে গেলে। আমাদের প্রয়াত সঙ্গীত শিল্পী নিনা হামিদের গাওয়া সেই গানটাই শেষমেশ সব চিন্তার শেষে কানে বাঁচতে থাকে। আইলাম আর গেলাম পাইলাম আর খাইলাম ভবে, দেখিলাম শুনিলাম কিছুই বুঝলাম না।
আমাদের এই ক্ষুদ্র জীবনটা বোধ হয় এমনই, জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে হয়তো বলব দেখে গেলাম। শুধুই দেখে যাওয়া, কারণ সৃষ্ট জগতের এই রহস্য উপলব্ধি করার মতন শক্তি শুধু মানুষ কেন অন্য কোন প্রাণীরও আছে বলে আমার মনে হয় না। সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে শুরু করে প্রাণের বিকাশ, মানব সভ্যতার সৃষ্টি ও পরিবর্তন, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এই ক্রমবর্ধমান পরিচলন, পরিবর্ধন, মহাকাশের অন্তহীন বিস্তার তার কতটুকুই বা আমরা উপলব্ধি করতে পারি? আমাদের জীবনটা আর কতটুকু? আমার মা বলতেন জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখবে যে ওই মৃত্যু মুহূর্তটাই হচ্ছে শুধুমাত্র তোমার বর্তমান। ফেলে আসা জগৎটাকে মনে হবে কয়েক মুহূর্তেরও নয়। আমার মা খুব শিক্ষিত কেউ ছিলেন না। কিন্তু তার এই কথাটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। মৃত্যুর পর কোথায় যেতে হবে তা কেউ জানে না। স্বর্গ-নরক বা বেহেশত-দোযখ সম্পর্কে একটা বিশ্বাস আমাদের সকলেরই আছে, কিন্তু সেটা যে বাস্তবিক কেমন সে সম্পর্কে কোন ধারণাই আমাদের নেই। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ যে আসছে আবার চলে যাচ্ছে, শুধু মানুষ কেন, ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র অনুজীব থেকে শুরু করে বিশালাকৃতির ডাইনোসর বা তিমি মাছের মতন প্রাণী, তারাও তো এই ধরিত্রীকে ছুঁয়ে এক সময় হারিয়ে যাচ্ছে। তারা সবাই কোথায় যাচ্ছে এ কথা কি আমরা চিন্তা করি? অবশ্য একথা ঠিক যে যার যার মতন চিন্তা আমরা সবাই করি। কারণ চিন্তা এমন একটা জিনিস যেটা কখনো থেমে থাকে না, অবিশ্রান্ত ভাবে সেটা চলতেই থাকে। সেই চিন্তার পরিসমাপ্তি ঘটে আমাদের অবশ্যম্ভাবী বর্তমানে, অর্থাৎ আমাদের অন্তিম কালে। আমাদের সাথে সাথে আমাদের চিন্তাশক্তিও থেমে পড়ে হয়তোবা চিরকালের জন্য। পার্থিব জীবনের পূর্ণচ্ছেদ ঘটে। চিন্তারও মৃত্যু হয় তখনই।
1 Comment
Friends
কবি মোঃ সামিদুল ইসলাম
@samidul
Santo Chowdhury
@santo-chowdhury
নাহিদ হাসান নয়ন
@nahid-hasan-noyon
মিথিলা কনক
@methila06
সৈয়দ তারেক শাহরিয়ার
@shahriar-protik
মোঃ আব্বাস উদ্দীন ধ্রুব।
@dhrubo-abbas
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
Pritam Biswas
@pritam-biswas

অদ্ভুত