-
এক ফোঁটা জল
এ কে সরকার শাওনপাড়ার ছেলেমেয়েদের কাছে জগলু মামার ঘরটা ছিল একটি জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। তবে সেই এনসাইক্লোপিডিয়ার পাতাগুলো চুপচাপ থাকত না; কখনো আলো জ্বালত, কখনো শোঁ শোঁ শব্দ করত, আবার কখনো আচমকা ধোঁয়া ছেড়ে সবাইকে চমকে দিত।
নবীনগর সরকারি কলেজপড়ুয়া ভাগনে তানভীর সরকার, টেকনিক্যাল জ্ঞান থাকার জন্য তাকে বন্ধুরা টেক তানভীর বলে ডাকে, তার অনবরত প্রশ্ন করা বন্ধু নিশাত আর মধ্যম মানের ছাত্র হলেও দারুণ উপস্থিত বুদ্ধির অধিকারী রনি ছুটি পেলেই ছুটত জগলু মামার ল্যাবরেটরিতে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডক্টর জগলু জোশীকে পাড়ার সবাই জগলু মামা বলে ডাকত। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই হলেও মনটা ছিল একেবারে শিশুর মতো। তিনি সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। তবে বিজ্ঞানের কোনো সমস্যা নিয়ে ভাবতে বসলে খাওয়া, ঘুম, এমনকি নিজের জন্মদিন পর্যন্ত ভুলে যেতেন।
গত সপ্তাহেই মাস্টার্স পরীক্ষার খাতা দেখতে বসে একটি সঠিক উত্তরের নিচে লিখেছিলেন,
-“রাসায়নিক বিক্রিয়াটি ঠিক আছে, কিন্তু নিউটনের তৃতীয় সূত্র কোথায়?”ছাত্রটি ভয়ে ভয়ে জানিয়েছিল, সেটি রসায়নের নয়, পদার্থবিজ্ঞানেরই খাতা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর কাণ্ডে মাথায় হাত দিলেও পাড়ার ছেলেমেয়েদের কাছে জগলু মামাই ছিলেন পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানী।
তবে জগলু মামার জীবনে বিজ্ঞানের বাইরেও একটি অধ্যায় ছিল, যার কোনো সূত্র তিনি আজও আবিষ্কার করতে পারেননি।
পাশের বাড়ির শীলার সঙ্গে যৌবনে তাঁর গভীর প্রণয় ছিল। তাঁদের বিয়েও প্রায় ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের মধ্যে ডুবে থাকা ভুলো মনের জগলুকে ছেড়ে একদিন শীলা অন্যত্র বিয়ে করে চলে যায় জীবনের অংক মেলাতে। জগলু মামা নিউটনের গতিসূত্র ও মহাকর্ষ বল নিয়ে আজও তথৈবচ।
শীলা স্বামী-সন্তান নিয়ে কুমিল্লা শহরে থাকে। বাবার বাড়িতে মানে গোপালপুরে বেড়াতে এলেও জগলু মামার সঙ্গে তার দেখা হয় না। দেখা না হওয়ার এই অলিখিত ব্যবস্থাটা দু’জনেই যেন নিঃশব্দে মেনে নিয়েছে।
সেদিন বিকেলে তানভীররা ল্যাবরেটরিতে ঢুকেই থমকে দাঁড়াল।
ঘরের ছাদ থেকে নানা রঙের তার ঝুলছে। দেয়ালে সৌরজগতের বিশাল মানচিত্র। এক পাশে ছোট রকেটের মডেল, অন্য পাশে রোবটের কাটা হাত। ঘরের মাঝখানে রাখা কাঁচের গোলকের ভেতর নীল-বেগুনি আলোর শাখাগুলো ছটফট করছে।
রনি গোলকটির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,-“মামা, এর ভেতরে কি ভূত আটকে রেখেছ?”
জগলু মামা চমকে উঠে বললেন,
-“খবরদার! বিজ্ঞানের ল্যাবে কোনো কিছুতে না জেনে স্পর্শ করা নিষেধ।”তিনি সবাইকে সুরক্ষা-চশমা পরিয়ে বললেন,
-“এটা প্লাজমা গ্লোব। প্লাজমা হলো পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। কঠিন, তরল ও গ্যাসের পর আসে প্লাজমা। সূর্য এবং নক্ষত্রগুলো মূলত প্লাজমা দিয়ে তৈরি।”
রনি চোখ বড় বড় করে বলল,
-“তার মানে, তুমি একটা ছোট সূর্য কাঁচের জারে বন্দী করেছ?”
-“পুরো সূর্য নয়। সূর্যের অতি ক্ষুদ্র এক আত্মীয় বলতে পারিস।”
নিশাতের মাথায় ততক্ষণে আরেকটি প্রশ্ন এসেছে।
-“মামা, আজ কলেজে রণজিৎ স্যার বলেছেন, বাতাস আমাদের চারপাশ থেকে চাপ দেয়। কিন্তু আমরা সেই চাপ টের পাই না কেন?”জগলু মামার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-“চমৎকার প্রশ্ন! শরীরের ভেতরের চাপ বাইরের বায়ুচাপের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখে বলেই আমরা তা টের পাই না। দাঁড়া, একটা পরীক্ষা করে দেখাই।”মামা একটি তাপসহনশীল প্লাস্টিকের বোতল নিলেন। দস্তানা পরে তার ভেতর সামান্য গরম পানি ঢেলে ভালোভাবে ঘুরিয়ে নিলেন। গরম পানির বাষ্প বোতলের ভেতরের কিছু বাতাস বাইরে ঠেলে দিল। তারপর পানি ফেলে দিয়ে তিনি দ্রুত বোতলটির মুখ শক্ত করে বন্ধ করলেন।
-“এবার ভালো করে দেখ।”
কয়েক মুহূর্ত পর
খড়মড়! খড়মড়!
বোতলটি চারদিক থেকে দুমড়ে যেতে লাগল। দেখতে দেখতে সেটি প্রায় চ্যাপ্টা হয়ে গেল।রনি দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বলল
-“বোতলটাকে কে চাপ দিল, মামা?”
জগলু মামা হেসে বললেন,
-“বাইরের বাতাস। বোতলের ভেতরের গরম বাষ্প ঠান্ডা হয়ে আবার পানিতে পরিণত হয়েছে। ফলে ভেতরের চাপ কমে গেছে। তখন বাইরের বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বোতলটাকে দুমড়ে দিয়েছে।”নিশাত মুগ্ধ হয়ে বলল,
-“অর্থাৎ বাতাস দেখা যায় না, কিন্তু তার অনেক শক্তি!”
-“ঠিক তাই। অদৃশ্য মানেই শক্তিহীন নয়।”ঠিক তখনই ল্যাবরেটরির দরজায় দ্রুত কয়েকবার আঘাত পড়ল।
ঠক! ঠক! ঠক!
দরজা খুলতেই জগলু মামা ফ্রিজ হয়ে গেলেন।
বাইরে শীলা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ বিবর্ণ, চুল এলোমেলো, চোখে আতঙ্ক। বহু বছর পর মুখোমুখি হয়ে দুজনের কেউই কয়েক মুহূর্ত কথা বলতে পারল না।
শীলা কাঁপা গলায় বলল,
-“জগলু, আমার ছেলে শিন্টু বাবার পুরোনো গুদামঘরে আটকে গেছে। দরজাটা কিছুতেই খুলছে না। তুমি একটু চলো প্লিজ!”জগলু মামা কোনো প্রশ্ন করলেন না। শুধু যন্ত্রপাতির বাক্সটি হাতে তুলে নিলেন।
-“চলুন।”
একটি মাত্র শব্দ। কিন্তু তার আড়ালে চাপা পড়ে রইল বহু বছরের দূরত্ব, অভিমান আর না-বলা কথা।
তানভীর, নিশাত ও রনিও তাঁর পিছু নিল।শীলাদের পুরোনো গুদামঘরে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও দামি জিনিস রাখা হতো। নিরাপত্তার জন্য কয়েক বছর আগে সেখানে একটি স্বয়ংক্রিয় লোহার দরজা লাগানো হয়েছিল।
দরজাটি খোলা দেখে শিন্টু কৌতূহলবশত ভেতরে ঢুকেছিল। কিছুক্ষণ পর সেটি আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় বাইরের নিয়ন্ত্রণযন্ত্রটি নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সঠিক কোড দেওয়ার পরও দরজা খুলছে না।
ভেতর থেকে শিন্টুর কান্না শোনা গেল।
-“মা! আমাকে বের করো!”
শীলা দরজার কাছে গিয়ে বলল,
-“ভয় পেয়ো না, বাবা। তোমার জগলু মামা এসে গেছেন।”‘জগলু মামা’ সম্বোধনটি শুনে তিনি মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। তারপর দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে দরজাটি পরীক্ষা করতে শুরু করলেন।
একজন প্রতিবেশী শাবল হাতে এগিয়ে এসে বললেন,
-“দরজা ভেঙে ফেলি মামা?”
জগলু মামা তাঁকে বাধা দিলেন।
-“লোহার দরজা ভাঙতে অনেক সময় লাগবে। তা ছাড়া আঘাতে ভেতরের ছেলেটি আহত হতে পারে বা ভয়ও পেতে পারে। আগে সমস্যাটা বুঝতে হবে।”তিনি পরীক্ষাযন্ত্র দিয়ে দরজার বাইরের নিয়ন্ত্রণপ্যানেলটি পরীক্ষা করলেন। তারপর স্ক্রু খুলে প্যানেলের ঢাকনা সরিয়ে ফেললেন।
তানভীর আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“কী হয়েছে, মামা?”
-“দরজার লক ঠিক আছে, কিন্তু লককে নির্দেশ দেওয়া কন্ট্রোল সার্কিটটি নষ্ট হয়ে গেছে। মস্তিষ্ক নির্দেশ না দিলে হাত যেমন কাজ করে না, তেমনি কন্ট্রোল সার্কিটের সংকেত না পেয়ে লকটিও খুলছে না।”নিশাত জিজ্ঞেস করল,
-“তাহলে কি পুরো যন্ত্রটি বদলাতে হবে?”
-“পরে বদলাতে হবে। কিন্তু শিন্টুকে দ্রুত বের করার জন্য এখনই নষ্ট সার্কিটটাকে পাশ কাটিয়ে এগোতে হবে। বাইপাস রোডের মত।”জগলু মামা নকশাটি পরীক্ষা করে বুঝলেন, এটি এমন ধরনের সোলেনয়েড লক, যার কুণ্ডলীতে নির্দিষ্ট মাত্রার বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে লোহার ল্যাচটি সরে গিয়ে দরজা খুলে যায়।
তিনি প্রথমে দরজার মূল বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেন। পরীক্ষাযন্ত্র দিয়ে নিশ্চিত হলেন, কোথাও বিপজ্জনক বিদ্যুৎপ্রবাহ নেই। তারপর বাক্স থেকে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি, দুটি তার ও একটি ছোট সুইচ বের করলেন। মিটার দিয়ে প্রয়োজনীয় ভোল্টেজ মেপে তার দুটি সোলেনয়েডের নির্দিষ্ট সংযোগস্থলে লাগালেন।
রনি খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে বলল,
-“মামা, দরজাটা যদি বিগড়ে যায়?”
জগলু মামা মৃদু হেসে বললেন,
-“বিজ্ঞান রাগের ভাষা বোঝে না, রনি। সে কারণ আর ফলাফলের ভাষা বোঝে।”তারপর তানভীরকে বললেন
-“সুইচটা অন কর।”
তানভীর সুইচ চাপতেই সোলেনয়েডের তারের কুণ্ডলীর ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলো। সঙ্গে সঙ্গে সেটি তড়িৎ-চুম্বকে পরিণত হয়ে লোহার ল্যাচটিকে ভেতরে টেনে নিল।খট!
জগলু মামা হাতল ঘোরাতেই ভারী দরজাটি খুলে গেল।
-“মা!”
শিন্টু দৌড়ে বেরিয়ে এসে শীলাকে জড়িয়ে ধরল। উপস্থিত সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
রনি আনন্দে বলে উঠল,
-“বিজ্ঞানের কাছে লোহার দরজাও হার মানল!”
জগলু মামা মৃদু হেসে বললেন,
-“দরজাকে হারাইনি। শুধু তার ভাষাটা বুঝেছি।”শীলা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ছলছল চোখে জগলু মামার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তোমাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব?”
সেই দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মিশে ছিল বহু বছর আগে তাঁকে ছেড়ে চলে যাওয়ার অপরাধবোধ।জগলু মামা যন্ত্রপাতি বাক্সে তোলার অজুহাতে তার চোখের দিকে না তাকিয়ে বললেন,
-“আপনার ধন্যবাদ না পেলেও ক্ষতি নেই। বিপদে পড়লে বিজ্ঞান মানুষকে উদ্ধার করে। সেখানে কে বন্ধু, কে শত্রু; বিজ্ঞান তা ভাবে না। তা ছাড়া প্রতিবেশীর প্রতি কিছু দায়িত্বও থাকে।”শীলা কিছু বলল না। ছলছল চোখে কয়েক মুহূর্ত জগলু মামার দিকে তাকিয়ে থেকে শিন্টুর হাত ধরল। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার থামল। পেছন ফিরে তাকাল।
জগলু মামা তখনও মাথা নিচু করে যন্ত্রপাতি বাক্সে তুলছেন।
শীলা কিছু বলতে চেয়েও বলল না। তারপর ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গুদামঘর থেকে তাদের মূল বাড়ির দিকে চলে গেল।যন্ত্রপাতি গুছিয়ে জগলু মামা নিজের ল্যাবরেটরির দিকে রওনা হলেন। তানভীর, নিশাত ও রনিও নীরবে তাঁর সঙ্গে চলল। অন্য দিন ফেরার পথে তারা প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে মামাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত। কিন্তু আজ কেউ একটি কথাও বলল না।
ল্যাবরেটরির সামনে এসে জগলু মামা ছেলেদের দিকে না তাকিয়েই বললেন,
-“আজকের মতো তোরা এখন যা। আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।”মামার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যে কেউ আর প্রশ্ন করার সাহস পেল না। তানভীর, নিশাত ও রনি একে একে চলে গেল।
তারা চোখের আড়াল হতেই জগলু মামা ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন। যে পথ ধরে শীলা ও শিন্টু চলে গেছে, সেদিকে আরেকবার তাকালেন। দূরে মা ও ছেলের অস্পষ্ট ছায়া মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
জগলু মামা ল্যাবরেটরিতে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন। ঘরটি হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কাঁচের গোলকের ভেতর শুধু নীল-বেগুনি প্লাজমার আলোগুলো ছটফট করছে।
তিনি ধীরে ধীরে চেয়ারে এসে বসলেন। সামনে পড়ে থাকা গবেষণার খাতাটি টেনে নিয়ে কলম হাতে নিলেন। অনেকক্ষণ স্থির থেকে আনমনে লিখলেন,
“শীলা গললেও বিজ্ঞানীর গলা চলে না।”
কলম থেমে গেল।
তিনি চশমাটি খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন।
প্লাজমা গ্লোবের নীল আলোয় দেখা গেল, খাতার পাতার ওপর এক ফোঁটা জল পড়ে অক্ষরগুলোতে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
জগলু মামা জলটুকু মুছে ফেললেন না।
8 Comments-
-
বৈজ্ঞানিক ফিকশন আর রোমানটিকতার মিশেল – অপূর্ব আইডিয়া। মনে হয় এ ধরণের লেখাকে বাড়িয়ে উপন্যাসে রূপ দিলে ভালো হতে পারে …
-
আপনার লেখা গল্পটি পড়ে জগলু মামার জীবনের অগোছালো অনুভূতিগুলো খুব স্পষ্টভাবে চোখের সামনে ভেসে উঠল। আপনি সুন্দরভাবে গুছিয়ে লিখছেন, তাই এই গ্রুপে অন্য সবার লেখাতেও নিয়মিত লাইক ও কমেন্ট করে সক্রিয় থাকার অনুরোধ রইল।
-

এ কে সরকার শাওন
কবি ও সাহিত্যিক
কবি, গীতিকবি ও কথাসাহিত্যিক এ কে সরকার শাওন (দালিলিক নাম মোঃ আবদুল কাদের সরকার) ১৯৬৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোরের সোনালী দিনগুলো ঝালকাঠিতে কাটানোর পর কর্মজীবনের প্রয়োজনে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নাটোরে অবস্থান করেন এবং বর্তমানে ঢাকার উত্তরখানের নিভৃত আলয় ‘কবিকুঞ্জ শাওনাজ ভিলা’য় স্থায়ীভাবে বসবাস করে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্য সাধনা করছেন।
ঝালকাঠি শহরের উদ্বোধন হাইস্কুলে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি এবং সেই বিদ্যালয়ে পাঠকালেই তাঁর ভেতর সৃষ্টিশীল মননের বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে তাঁকে সাহিত্যের আঙিনায় সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। জীবনের পরতে পরতে তিনি জ্ঞানার্জনের স্পৃহাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন; অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্য, আইন ও ইনফরমেশন টেকনোলজির মতো বৈচিত্র্যময় বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন দেশে ও বিদেশে। খাদ্য নিরাপত্তার উপর আইএফসি ও প্রান গ্রুপের যৌথভাবে প্রদেয় তিনটি অভিজ্ঞানপত্র রয়েছে তাঁর।
তাঁর কর্মজীবন অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও গৌরবোজ্জ্বল। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সুদীর্ঘ ১৮ বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি এয়ারম্যান ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (ATI) অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে টানা ১০ বছর সফল প্রশিক্ষক হিসেবে নতুনদের গড়ে তুলেছেন। বিমান বাহিনীর পাট চুকিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীতে প্রশাসনিক ও উচ্চ ব্যবস্থাপনা পদে কাজ করে একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কঠিন পেশাগত জীবনের মাঝেও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগে তিনি কখনো ভাঁটা পড়তে দেননি। তাঁর লেখনীতে রোমান্টিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে, যা পাঠক হৃদয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছে।
সাহিত্য অঙ্গনে তাঁর রয়েছে বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'কথা-কাব্য', 'নীরব কথোপকথন', 'আপন-ছায়া', কাব্যধর্মী উপন্যাস 'অতল জলে জলাঞ্জলি' এবং অটোফিকশন উপন্যাস 'শাওনাজ আইল্যান্ড' সুধী মহলে সমাদৃত হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে কসমিক ফিকশন 'মস্তিষ্কে মহাকাশ' (ও এর ইংরেজি সংস্করণ 'Metacosm Of Mind'), উপন্যাস 'বাঁশফুল', ইংরেজি রোমান্টিক উপন্যাস 'Layla: The Modern Ruth', এবং 'চেয়ার ও চোর', 'প্রণয়-প্রলাপ', 'প্রলয়-প্রলাপ', 'সজনী', 'আলো-ছায়া', 'প্রান্তিক-প্রান্তরে', 'ঋতুরং', শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ 'বাঁকা চাঁদের হাসি', গল্পগ্রন্থ 'মেকাপ-বক্স', ও 'মোমের শেষ শিখা', ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ 'Songs of Insane' সহ বেশ কিছু গ্রন্থ। বর্তমানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে লিখছেন তাঁর ৮০ পর্বের বৃহৎ আত্মজীবনী 'আমার জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে'।
সাহিত্যের পাশাপাশি দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমেও তাঁর অবদান অনুস্বীকার্য। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে তাঁর রচিত জনপ্রিয় টেলিফিল্ম 'শুটিং', 'আদর্শ-লিপি' ও 'পরিবর্তন'। গান রচনায় তাঁর দক্ষতা প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ বেতারে এবং ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে গান সম্প্রচারের মাধ্যমে। শুধু লেখালেখিই নয়, সঙ্গীতচর্চায়ও তিনি শৌখিন শিল্পী হিসেবে বেশ জনপ্রিয় এবং স্টারমেকার প্ল্যাটফর্মে বেশ উপরের সারিতে স্থান করে নিয়েছেন। সাহিত্য ও শিল্পকলায় এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে তিনি কলকাতার মর্যাদাপূর্ণ ‘বাংলা এক্সপ্রেস পুরস্কার’-এ ভূষিত হন।
ব্যক্তিজীবনে ১৯৯১ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক নাজমা আশেকীন শাওনের সাথে, যিনি ষাটের দশকের নন্দিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এ কে এম জহিরুল হক ইব্রাহিমের (চলচ্চিত্রে আশেক জহির) দ্বিতীয় কন্যা। এক সফল ও রত্নগর্ভা দাম্পত্যে তাঁদের ঘর আলো করে এসেছে তিন রাজকন্যা, যাঁরা বর্তমানে নিজ মেধা ও যোগ্যতায় যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও ভারত সরকারের পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ (Full-funded Scholarship) নিয়ে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়ন করছেন।

আপনার লেখা এই চমৎকার গল্পটির প্রতিটি পরতে বিজ্ঞান আর আবেগের যে নিপুণ মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী, বিশেষ করে যখন লিখেছেন— “বিজ্ঞান রাগের ভাষা বোঝে না, রনি; সে কারণ আর ফলাফলের ভাষা বোঝে।”—এই দারুণ দর্শনটি পাঠক হিসেবে আমাকে মুগ্ধ করেছে, তাই ভবিষ্যতে আপনার লেখনী থেকে এমন আরো অনেক গভীর ও মানবিক গল্প পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।