-
এক দুঃখী বাবা….
সময়টা অনেক আগে… বলতে পারেন কয়েক যুগ আগের… এক গ্রামে বাস করত একজন কবিরাজ।কবিরাজ বললে ভুল হবে! কারন তিনি সকল বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন! সে গ্রামের ১০ আনা জমি ছিল তার পিতার. কিন্তু এ জন্য তার মাঝে কোন অহংকার ছিল না।কাউকে ভূমিহীন দেখলে এক বিঘা জমি দিতে পিছপা হতেন না তিনি!এভাবে তার অনেক সম্পত্তি মানুষের দখলে চলে যায়!!
সময় যায়.. বিয়ে করেন একজন রুপসী, গুনী আর অত্যন্ত নম্র,ভদ্র এক মহিয়সীকে।দুজনের পরিচর্চায় সংসার বাড়তে থাকে।৭ সন্তানের জননী হয়ে যান তিনি।অবশ্য ছোটবেলায় প্রচন্ড জ্বরে তাদের ৪মেয়ের এক মেয়ে মারা যান!! ৩ মেয়ে আর ৩ ছেলেকে নিয়ে তাদের সংসার শুরু হয়।
কিন্তু তাদের এ সুখ বেশি দিন স্থায়ী ছিল না!! স্বাধীনতা যুদ্ধে এক বিরাট মামলায় আসামি হয়ে যান.. শর্ত ছিল ১লাখ টাকা দিলে জিতে যাবেন মামলা!! করলেনও তাই.. নিজের সমস্ত জায়গা- জমি বেছে দেন.. ভিটে মাটি বলতে আর কিছুই রইল না! কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় ছিল না! টাকা দিলেও পারেন নি মামলা জিততে!!
মামলা হারায় পরিবরকে নিয়ে আত্মগোপন করতে হয়.. চলে যান ময়মনসিংহ। এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে ঠাঁই নেন তারা.. শুরু হয় অভাবের সাথে যুদ্ধ!! তাদের এমন ও দিন যায় যেদিন আলু সিদ্ধই শুধু কপালে জুটে!!
এভাবে কয়েকদিন যাবার পর আলী সাহেব খেয়াল করলেন তারা যে বাড়িতে থাকে তার পাশে একটা স্কুল আছে,আছে না ঠিক ছিল বললে ভালো! ভগ্নপ্রায় পড়ে আছে.. এদিকে আলী সাহেবের ভালো ব্যবহারের কারনে খুব অল্প দিনে তিনি সে গ্রামে সম্মানিত হয়ে যান! আরবি বিষয়ে জ্ঞান তার যথেষ্ট ছিল যার কারনে তিনি কয়েকদিন গ্রামের মসজিদে ইমামতিও করেন। এজন্য গ্রামের প্রায় সকলের কাছে তিনি প্রিয়পাত্র হয়ে যান!
একদিন আলী সাহেব সে গ্রামের চেয়ারম্যানের সাথে দেখা করলেন।কুশল বিনিময়ের পর তিনি সেই ভগ্নপ্রায় স্কুলের কথা জানতে চাইলেন! কেনো বন্ধ সেই স্কুল? স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরাই বা কি করছে এখন?? আরো অনেক প্রশ্ন!!!গ্রামের সবার মুখে তিনি আলী সাহেবের সুনাম শুনেছেন,তাই তিনিও আলী সাহেবকে শ্রদ্ধার চোখেই দেখেন!!
“দেশেরতো অবস্থা ভালো না!! যখন তখন যেখানে-সেখানে মিলিটারি হামলা করে!! এ ভয়ে স্কুল বন্ধ!!! এমনিতে স্কুল যখন খোলা ছিল তখনও অনেকটা ভগ্নপ্রায় ছিল,আর এখনতো এক বছরের মতো স্কুল বন্ধ!! তাই এ অবস্থা আরকি!”-চেয়ারম্যান সাহেব জবাব দিলেন.. কিছুক্ষন ভেবে আলী বললেন, ” তাহলে আমরা আবার নতুন করে স্কুল চালু করি??? সকালে স্কুলে মকতব পড়ানো হবে এরপর থেকে স্কুলের পড়া!”.. ” আইডিয়া টা মন্দ না!!! কিন্তু এখন কোন বাপ- মা নিজের সন্তানকে স্কুলে দিবে? কেউ মিলিটারিরে ভয় পায় আবার কারো টাকার অভাব!!” জবাবে বললেন চেয়ারম্যান সাহেব!!!…
” আমরা বাড়ি বাড়িতে গিয়ে চাল- ডাল তুলব!! যে শিক্ষার্থী স্কুলে আসবে তাকে প্রতিদিন কিছু খাবার দিবো!! খাওয়ার লোভে হলেও আসবে স্কুলে!””আলী সাহেবের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন চেয়ারম্যান.. কিছুক্ষন পর বললেন -” ঠিক আছে,আপনি যেটা ভালো মনে করেন! তবে কোন সাহায্য লাগলে আমাকে বলিয়েন “!চেয়ারম্যান সাহেবের এ জবাবে যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেয়েছেন আলী!!
পরদিন থেকেই শুরু হয় তার কাজ।গ্রামের কিছু ছেলে মেয়েকে দিয়ে প্রথমে স্কুল পরিষ্কার করে ফেলেন,তারপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘোষনা দেন,যার ছেলে মেয়ে স্কুলে যাবে তাকে প্রতিদিন খাবার দেওয়া হবে!! অবিশ্বাস হলেও সত্যি, তার এ আইডি কাজে লেগে যায়! দলে দলে শিক্ষার্থী আসতে থাকে স্কুলে,এমনকি পাশের গ্রাম থেকেও ছেলে মেয়ে আসতো সে স্কুলে!!! আর এভাবে সে ভগ্নপ্রায় স্কুল প্রাণ ফিরে পায়! নিজের ঘরে চাল না থাকলেও আলী শিক্ষার্থীদের ঠিকই মেপে চাল দিতো!! তার এ কর্মে দিন দিন সুনাম বৃদ্ধি পেতে থাকে!!!আর ততোদিনে দেশও স্বাধীন হয়ে যায়।।
একদিন আলী ভাবলেন এভাবে করে আর কতো দিন যাবে!! ছেলেমেয়েদেরতো মাুষ করতে হবে।ঠিকমতো খাবার খাওয়াতে হবে! স্ত্রীর সাথে আলাপ করলেন!! দেখলেন স্ত্রী ও একই কথা ভাবছেন!! অনেক চিন্তা ভাবনা করে ঠিক করলেন পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম চলে যাবে!!!করলেন ও তাই… সবাইকে বিদায় দিয়ে পরিবারকে নিয়ে রওনা দেন এক নতুন শহরে!!
চট্টগ্রামে এসে কিছু দিন খুব কষ্টে দিন যায়. কিন্তু আল্লাহর রহমতে তিনি কিছুদিন পর একটা চাকরি পেয়ে যান! একটা স্কুলের নৈশপ্রহরী পদে! চাকরীর পাশাপাশি কবিরাজিও করতেন তিনি! এতো দিনে বড় মেয়ে বড় হয়ে যায়।সৎ পাত্র দেখে তার বিবাহ সম্পূর্ণ করে।কিন্তু বড় মেয়ের ভাগ্য আর সুখ সইলো না!! বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় মারা যান স্বামী! রেখে যান ২ সন্তান! শত অনুরোধের পরও বিয়ে করেন না তিনি! কুটির কাজ করতে শুরু করেন.. তাই দিয়ে চালাতে থাকে নিজের সংসার।।
আলীর বাকি ৫ ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় ছেলেটা ছিল খুবই খেয়ালি মনমানসিকতার! ঘুরেবেড়ানো তার প্রধান শখ ছিল! করতেন ও তাই! বাংলাদেশের কোন অঞ্চল বাদ যায় নি যেখানে তিনি যান নি, মেঝো ছেলে তখনও ছোট,মেঝো মেয়ে সবে মাত্র বুঝতে শিখেছে। আর বাকি ২ ছেলে মেয়ে এখনও মায়ের কোলে….
আলী বড় মাপের কবিরাজ ছিলেন! নৈশপ্রহরী হওয়ার সত্ত্বেও তার এ কাজে কখনো কোন বাধা আসে নি! কিন্তু যার ভাগ্য যেমন লেখা থাকে!! একদিন কবিরাজি শেষ করে যখন স্কুলে যান তখন শরীরটা অনেক দুর্বল হয়ে যায়! মনে হয় যেন সব কিছু তার উপর পড়ছে!! ক্লান্ত বোধ করতে থাকে!! অনেক কষ্টে ফিরে যায় নিজের বাসায়! ডাক্তার আনা হয় কিন্তু কিছু ই বোঝা গেলো না ঠিক কি হয়েছে আলীর সাথে!! বিছানা থেকে আর উঠা হয়নি তার!! ছোট ছোট ৫ সন্তানকে রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তিনি
3 Comments
Friends
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
অভিমানী মন
@ovimanimon
তুলট ডেস্ক
@toulot
তুলট ডেস্ক
@toulot
তুলট ডেস্ক
@toulot
তুলট ডেস্ক
@toulot



স্বাগতম লেখিকাবন্ধু! শুভেচ্ছা নেবেন।