Profile Photo

আনিস কবিরOffline

  • aniskabir
  • Profile picture of আনিস কবির

    আনিস কবির

    2 days, 17 hours ago

    প্রসঙ্গ – ক্ষুধা ও খাদ্য
    ————————————
    বাংলাদেশ, চার হাজার বছরের বেশি সময়ের দালিলিক ইতিহাস যার, পেরিয়ে এসেছে মৌর্য ও গুপ্ত সভ্যতা, আর্য সভ্যতা, পাল ও সেন বংশের শাসন, মোগল ও ব্রিটিশ শাসন, অতঃপর পাকিস্তান এবং শেষে স্বাধীন বাংলাদেশ, সেই স্বাধীন বাংলাদেশেরও অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে এসে আজো যা অর্জন করতে পারেনি তা হল ক্ষুধামুক্তি। পরিসংখ্যান কিংবা জিডিপি দেখে কোনো লাভ নেই। বাংলাদেশ যে ক্ষুধামুক্ত হতে পারেনি তা বোঝার জন্য আমাদেরকে রকেট সাইন্টিস্ট হতে হবে না। একটু চোখ-কান খুলে শহরের রাস্তায় বের হলেই হবে। আজকের এই আধুনিক বাংলাদেশের পথে ঘাটে হাটে বন্দরে যে পরিমাণ ক্ষুধার্ত মানুষ ঘুরে বেড়ায়, তাতে জাতি হিসেবে আর যাই হোক, আমরা অন্তত গর্ব করতে পারি না। কেউ যদি লজ্জা বোধ না করেন তবে সেটা নিতান্তই তার নিজস্ব বিষয়। অন্তত মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি হিসেবে আমাদের এই অর্জন বেদনাদায়ক। ইসলামে যখন বলা হয়েছে- তোমার কোনো প্রতিবেশিকে ক্ষুধার্ত রেখে তুমি যদি ভরা পেটে ঘুমাতে যাও, তবে তুমি মুসলমান নও। সেই প্রতিবেশি যেই হোক না কেন, যে ধর্ম, বর্ণ বা জাতেরই হোক না কেন। ক্ষুধা নিয়ে বহুমুখী আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে, তবে আজ আমি শুধু একজন মানুষকে স্মরণ করে তার লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সমাপ্তি টানতে চাই। তিনি চারন সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন (১৮ জানুয়ারি ১৯৪৫ – ২৯ ডিসেম্বর ১৯৯৫)। আজকের দিনের লেখক, কবি, সাহিত্যিক কিংবা পাঠকের প্রতি আমার অনুরোধ, যারা কখনো পড়েননি, তারা সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনের লেখা পড়ে দেখবেন। তার লেখা পড়লে আর কিছু না হোক, এই দেশের মাটির গন্ধ পাবেন, বঞ্চনার শব্দ শুনতে পাবেন, কষ্টের রঙ দেখতে পাবেন।

    “নিজস্ব রিপোর্ট”
    প্রয়াত চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন

    “পথের ধারে ধুলোয় লুটিয়ে কাতরাচ্ছে একজন বৃদ্ধ। তার অসংখ্য ভাজ পড়া পেটে ক্ষুধার হা। থিরথির করে কাপছে দেহ। আমি তখন বিভিন্ন এংগেলে তার ছবি তুলছি। প্রচন্ড টেনশন। প্রসেস করে এখনি পাঠাতে হবে ঢাকায়। কাল কিংবা পরশু এই ছবি সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ছাপা হয়ে যাবে।
    লোকটা ভিক্ষুক নয়। মজুর। চিলমারী থেকে এসেছে একদার রংগরসে ভরপুর রংপুর শহরে। আশা ছিল কাজ পাবে, খাবার পাবে। পায়নি। শেষে হাত পেতেছে, ভিক্ষে মেলেনি।
    ছবি তোলা শেষ করে বৃদ্ধের কাছাকাছি যাই। হাতে নোটবুক। নামধাম জানতে হবে। পাঠক বস্তুনিষ্ঠ খবর চায়। সেক্ষেত্রে শুধু ছবি নয়, ছবির সাথে তথ্য উপাত্ত চাই। বসে পড়ি ওর মাথার কাছে। কথা নেই, শুধু গোংগায়।
    -কি নাম আপনার?
    -মোক একনা ভাত দ্যাও…
    -কোথায় বাড়ি? গ্রামের নাম কি?
    -মুই মরি যাইতেচো, মোক একনা ভাত দ্যাও…
    -কতদিন ধরে আপনি অনাহারে?
    -মোক বাচান বাহে…
    লোকটি কোনোভাবেই প্রশ্নের জবাব দেয় না। কিন্তু আমি তথ্য জানতে চাই। আমাকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে হবে।
    তবু কি সন্তুষ্ট তারা?
    অনেকে তর্ক জুড়ে দেবে, এ হয়তো কোনো ভিক্ষুকের ছবি। পেশাদার ভিক্ষুক। সরকারি মহল বলবে, এ ছবি সাজানো। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পয়সা দিয়ে লোকটাকে পথের ধারে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে কেউ অনাহারে নেই। বাংলাদেশে কেউ অনাহারে মরে না। এরকম ছবি ছাপিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে।
    বৃদ্ধের ছবি তোলার যে দৃশ্য বর্ণনা, তা চুয়াত্তর সালের। কিন্তু ভোলা যায় না। কেননা এতো বছর পর এখনো সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।”

    I come among the peoples like a shadow.
    I sit down by each man’s side.
    None sees me, but they look on one another,
    And know that I am there.
    My silence is like the silence of the tide
    That buries the playground of children;
    Like the deepening of frost in the slow night,
    When birds are dead in the morning.
    Armies trample, invade, destroy,
    With guns roaring from earth and air.
    I am more terrible than armies,
    I am more feared than the cannon.
    Kings and chancellors give commands;
    I give no command to any;
    But I am listened to more than kings
    And more than passionate orators.
    I unswear words, and undo deeds.
    Naked things know me.
    I am first and last to be felt of the living.
    I am Hunger

    [Robert Laurence Binyon]

    4
    6 Comments
    • উন্নয়নের এত গল্পের মাঝেও ক্ষুধার এই বাস্তবতা আমরা এড়িয়েই যাই। জরুরি একটা প্রশ্ন তুললেন। চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনকে স্মরণ করার এই প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়।

    • আপনার ভাবনার গভীরতা এবং সমাজের এক রূঢ় বাস্তবতাকে এমন সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরার ধরণটি আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে, আর মোনাজাত উদ্দিনের উদ্ধৃতিটি যোগ করার সিদ্ধান্তটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী ও হৃদয়স্পর্শী যা লেখাটির আবেদনকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

    • খুব সুন্দর করে লিখেছেন। বেশ ভালো লাগল। হ্যাঁ, মোনাজাত উদ্দিনের উপরে সেই ১৯৯৪-৯৬-এর দিকে দৈনিক সংবাদ-এ নানা লেখা পড়েছি। এমনকি উনার রিপোর্টগুলাও সম্ভবত সংবাদ-এ প্রকাশিত হতো। দৈনিক সংবাদ ছিল তখন প্রচারের দিক থেকে প্রথম সারির পত্রিকা। সংবাদ আর ইত্তেফাক (ডি টি পি নির্ভর নতুন পত্রিকাগুউলি তখনও আসেনি)। আমার মনে আছে যে, উনার লেখালেখির প্রসঙ্গে এত আগ্রহী হয়েছিলাম যে একুশে বইমেলায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে মোনাজাতউদ্দিনের লেখা রিপোর্ট আর গদ্যগুলার একটা সংকলন কিনেছিলাম। আপনাকে ধন্যবাদ উনার প্রসঙ্গটা এমন সুন্দর আবহে তুলে ধরার জন্যে।

    • ক্ষুধা কোনো পরিসংখ্যান মানে না
      রাস্তার সেই কাতরানোই আসল সত্যের সাক্ষী…..🤍🖤

    • আনিস কবির, “মুই মরি যাইতেচো, মোক একনা ভাত দ্যাও” – এই লাইনগুলো পড়ার সময় সত্যি বুকটা কেঁপে উঠল। আপনার এই লেখাটি আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

    • শেষের ইংরেজি কবিতাটাও দারুণ মিলাইছেন
      “I am Hunger” নামটাই সব বলে দেয়
      লেখাটা শুধু লেখা না বাস্তবতার আয়না যেন

Skip to toolbar