<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?>
<rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>তুলট | অনুপম হাসান | Activity</title>
	<link>https://toulot.com/n_members/anupam-hasan/activity/</link>
	<atom:link href="https://toulot.com/n_members/anupam-hasan/activity/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<description>Activity feed for অনুপম হাসান.</description>
	<lastBuildDate>Fri, 19 Jun 2026 05:24:24 +0600</lastBuildDate>
	<generator>https://buddypress.org/?v=</generator>
	<language>en-US</language>
	<ttl>30</ttl>
	<sy:updatePeriod>hourly</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>2</sy:updateFrequency>
	
						<item>
				<guid isPermaLink="false">42d89d5c78e1febb0b35eaba636592f4</guid>
				<title>সবাই কেমন আছেন। দীর্ঘদিন ছিলাম না আপনাদের সাথে। জানি না, আমার লেখার কোনো পাঠক আছে কিনা। আশাকরি সবাই ভালো আছেন, লেখালেখি করছেন।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/232836/</link>
				<pubDate>Mon, 08 Sep 2025 03:09:34 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>সবাই কেমন আছেন। দীর্ঘদিন ছিলাম না আপনাদের সাথে। জানি না, আমার লেখার কোনো পাঠক আছে কিনা। আশাকরি সবাই ভালো আছেন, লেখালেখি করছেন।</p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>2</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">fad401a6af9cde80bdf2cd17cbfe5235</guid>
				<title>শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে&#062;&#062;&#062;&#062;
যেতে পারেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিন্তু কেন যাবেন
================================
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় [১৯৩৩-&#039;৯৫] ইহলোকে কিংবা বলা যায়, বস্তুগত এ জগতে আমাদের মাঝে আর নেই, একথা নিশ্চিতভাবেই আমরা বলতে পারি; কিন্তু তিনি কোথায় আছেন? মৃত্যুর পর তিনি কোথায় আছেন, একথা আমরা কেউ জানি না। শক্তির মতো অন্য যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তাদের ঠিকানাও আমাদের অজানা। অতএব একইভাবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ঠিকানাও আমরা জানি না। কেননা অদ্যাবধি মানুষের চর্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে বলা যায়, মৃত্যুর পর মানুষ হয়তো স্বর্গে নয়তো নরকে যায়। অথচ সেই স্বর্গ কিংবা নরক সম্বন্ধে মানুষের নিকট স্পষ্ট কোনও ধারণা পর্যন্ত নেই; যা আছে তা শুধুই কল্পনার এক জগৎ। প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বর্গ-নরক আদৌ আছে কিনা, এখন অবধি মানুষ সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। মৃত মানুষের ঠিকানা জানা যায় না, তবে একথাও সত্য যে, শক্তির মতো অনেকেই দৈহিকভাবে মৃত্যুবরণ করেও আমাদের আত্মার খুব কাছাকাছি বসবাস করেন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে প্রাণের ক্ষয় অনিবার্য হলেও প্রতিভা এবং সেই প্রতিভা-বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মির কোনও ক্ষয় নেই! ফলে নিশ্চিত বলা যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় বস্তুজগৎ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগেই স্বীয় সৃজন-প্রতিভার যে আলো ছড়িয়েছিলেন তা কোনোদিনই ম্লান হবে না এবং তাঁর প্রতিভার এই আলো আমাদের ছেড়েও যাবে না! যেমন আমাদের জীবন থেকে এখনও হারিয়ে যাননি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দসহ অসংখ্য কবি ও লেখক। তেমনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও থেকে যাবে স্বীয় রচনার বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মির অদৃশ্য এক শক্তির মধ্যে নিহিত থাকবেন, বহুদিন বহুকাল বহু শতাব্দী। মানুষের মৃত্যু তাকে দৈহিকভাবে জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়; কিন্তু মৃত্যুর আগে মানুষ যদি স্বীয় প্রতিভা বলে এমন কোনও কীর্তি বস্তুজগতে রেখে যেতে পারেন, যা জগতের কিংবা মানুষের কোনও উপকারে অথবা কোনওভাবে কাজে লাগে; তাহলে তিনি দৈহিকভাবে মৃত্যুবরণ করলেও বিদ্যমান বস্তুজগতেই বেঁচে থাকে অন্য মানুষের মনে। আর সেই মানুষের বেঁচে থাকার এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে বছরের পর বছর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় পঞ্চাশের দশকে কাব্যযাত্রা শুরু করলেও প্রথম গ্রন্থিত হয়েছিলেন ষাটের দশকে। ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ [১৯৬২] প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় এক রহস্যময়তার অবভাস সৃষ্টি করেন, যা অনেকটাই তিরিশের কবি জীবনানন্দ দাশের [১৮৯৯-১৯৫৪] কবিতার মতো। শক্তির কবিতায় জীবনানন্দীয় অবভাস থাকলেও তিনি কিন্তু সচেতনভাবে তিরিশের সম্প্রসারিত মানসিকতার পরিবর্তে নিজস্ব কাব্যপথ বেছে নিয়েছিলেন এবং ক্রমাগত উত্তরণের দিকে হেঁটেছেন। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ একসময় দেখা গেল শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পূর্ণ নিজস্ব এক কাব্যভাষা নির্মাণ করতে সক্ষম হলেন, যা আপাত-অর্থে সহজ-সরল; কিন্তু সেই সারল্যের মোড়কে তিনি চিন্তাসূত্রের রহস্য লুকিয়ে ফেললেন অবলীলায়। প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, ভাববাদ প্রভাবিত দর্শনচেতনা শক্তি চট্টোপাধ্যায় পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। সেই ভাববাদকে তিনি আণবিক যুগের বস্তুবাদের সাথে সংমিশ্রণের অবিচ্ছেদ্যসূত্রে সমন্বিত করে নবতর এক চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন কবিতায়। এরফলে মনে হয়, তাঁর কাব্যভাষা সহজ-সরল, প্রকৃতপ্রস্তাবে তা নয়; যেমনটি জীবনানন্দ দাশের কবিতার কোনও শব্দ পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য না হলেও প্রকৃত অর্থ বা কাব্যার্থ অত্যন্ত দুরূহ। একই ঘটনা শক্তির কবিতার ক্ষেত্রেও ঘটতে দেখা যায়। অর্থাৎ তাঁর কবিতার সরল শব্দ অতিক্রম করে পাঠকের নিকট কাব্যার্থ বা কাব্যচেতনা অপার রহস্যময়তায় আবৃত থাকে। একথা ঠিক প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের পর থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ক্রমাগত সামনের দিকে এগিয়েছেন এবং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছেন; এ যাত্রায় তাঁকে ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত সময় অতিক্রম করতে হয়েছে ধৈর্য সহকারে।

আশির দশকে প্রকাশিত হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতাগ্রন্থ ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ [১৯৮২]। তাঁর এ কবিতাগ্রন্থটি যে মহার্ঘ্য রচনা, তা বোঝা যায় পরের বছর ১৯৮৩ সালে যখন গ্রন্থটি ‘পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কার লাভ করে। সামগ্রিক অর্থে বাংলা কবিতায় [পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশ] শক্তি চট্টোপাধ্যায় রবীন্দ্র-জীবনানন্দ উত্তরকালে সত্যিকার অর্থে শক্তিমান কবি। এক্ষেত্রে তাঁর নামের সাথে বাংলাদেশের শামসুর রহমান [১৯২৯-২০০৬] এবং আল মাহমুদের [১৯৩৬-২০১৯] কথা যেমন স্মরণ রাখতে হয়, তেমনি ওপার বাংলার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় [১৯৩৪-২০১২] কিংবা শঙ্খ ঘোষের [জ.১৯৩২] নামও অস্বীকার করার উপায় থাকে না; এঁদের কবিত্ব শক্তিও কোনও অর্থে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের চেয়ে কম নয়! এসব নামের ভিড়েও শক্তি চট্টোপাধ্যায় যে খানিকটা আলাদা ছিলেন, তা বলা বাহুল্য; তাঁর কবিতার বিষয়-বিন্যাস, প্রকরণ বৈচিত্র্য এবং কাব্যগুণের দক্ষতা অসাধারণ অথবা বলা যায় প্রাতিস্বিক।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ কবিতাগ্রন্থটির নামকরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য ও দ্যোতনার ইঙ্গিত। কবিতার বইয়ের এ জাতীয় নামকরণে আমাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয় কবি কি এ সময় খুব বেশি এলিয়েনেটেড হয়ে পড়েছিলেন?

এলিয়েনেশনের কারণে কি কবি আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিতে চেয়েছিলেন? এসব প্রশ্নের সঠিক জবাব আজ আর আমাদের জানা সম্ভব না হলেও, কবির টেক্সট থেকে আমাদের বুঝে নিতে হবে— আসলে সে সময় কবির অন্তর্গত চিন্তা-চেতনা কী ছিল? ‘আত্মহত্যার’ প্রকল্পটি যদি সত্যি হয় সেক্ষেত্রে একটি বিষয় কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না যে, কবি তো পরিণামে আত্মহত্যা করেন নি। বিচ্ছিন্নতা বা একাকীত্বের দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তিনি যদি আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও পরিণামে সেই এলিয়েনেশনের যন্ত্রণাবৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে সদম্ভে ঘোষণা করেছেন : ‘কিন্তু কেন যাবো’। আমাদের ‘আত্মঘাতী’ প্রকল্পিত ধারণার অনেক কারণ তাঁর ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ কবিতাগ্রন্থের পর্যালোচনায় হয়তো পাওয়া যাবে অথবা উন্মোচিত হবে। এবারে আমরা শক্তির এলিয়েনেশন কিংবা আত্মঘাতী হওয়ার মতো কোনও অবস্থা তিনি টেক্সটে বয়ান করেছেন, সেটা দেখা যাক। যেমন তিনি ‘এখন আমার কোনও অভিমান নেই’ কবিতায় অক্ষরবৃত্তের অসাধারণ গাঁথুনিতে তুলে ধরেছেন নিজের অভিমানহীনতার কথা :

মাটির কলস কেন অভিমান করে?
গা-ভরা জলের ফোঁটা নামে এঁকেবেঁকে—
নিচে যেন নদী পাবে, প্রিয় মুখ পাবে,
বুকের দীঘিটি নোনা জলেই ভাসাবে
আজ। কেন? সুযোগ মিলেছে?
[এখন আমার কোনও অভিমান নেই]

‘মাটির কলস’ অর্থে তো প্রকান্তরারে মাটির তৈরি মানবশরীরকেই বুঝিয়েছেন শক্তি; যে দেহ থেকে নানা কারণে অশ্রুবিন্দু ঝরে, যন্ত্রণায় কাতর হয় এবং সর্বোপরি অভিমান পেয়ে বসে তাকে চরম প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য; মানব মননের এই অভিমানাহত বৃত্তায়িত খাঁচা থেকে যদি ব্যক্তি বের হতে না পারে, তখন সেই বন্দি মানুষের পক্ষে আত্মঘাতী হওয়াটাও অসম্ভব কিছু না! কবির অভিমান সংসারের আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো নয়, কবির থাকে এক নিজস্ব ভুবন; যে ভুবনের অধীশ্বর তিনি নিজেই। কবির নির্মিত সেই কাব্যভুবনে মাত্র দশ বছরে কতটা বদল ঘটেছে তা শক্তির বয়ানে এরকম: ‘মানুষের মুখচোখ মাত্র দশবছরে বদলে গেছে।’—[দশবছর আগে-পরে] কেন এ পরিবর্তন? সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন অবধারিত; জাগতিক প্রক্রিয়ায় সময়প্রবাহের মানবদেহের পরিবর্তন অনস্বীকার্য; একথা কী কবির অজানা! তথাপি এরূপান্তর কিংবা পরিবর্তন কি শক্তির কাম্য ছিল না? হয়তো সে কারণেই তিনি যন্ত্রণাবিদ্ধ ও বেদনাহত হয়েছেন; কিন্তু নিজেকে তাৎক্ষণিক সামলেও নিয়েছেন:
তবে হবে পরে হবে, সবকিছু যখন ছাড়ের
আওতায় এসেছে, একে সবিশেষ ছাড় দিতে হবে।
[সবিশেষ ছাড়]

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় উত্তর-আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের বিতর্কের মধ্যে বসে কবিতা লিখেছেন। সাহিত্য-সমালোচকদের মধ্যে যখন তর্ক-বিতর্ক ওরিয়েন্টালিজম, পোস্ট-কলোনিয়ালিজম কিংবা উত্তরাধুনিক বিষয়ক তত্ত্ব নিয়ে, তখন শক্তি চট্টোপাধ্যায় কবিতায় অবলীলায় ভারতীয় অধ্যাত্মবাদী বা ভাববাদী দর্শনের প্রকাশ করেছেন নিরন্তর নির্বিকারভাবে। কবি তখন মৃত্যুচিন্তায় ডুবে যেতে যেতে কিছু একটা আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছেন; কিন্তু আধুনিক বিশ্বের মানুষ বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে কাজে লাগিয়ে মৃত্যুর সামনে বাঁধ দেয়ার শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে চলেছে। এক পর্যায়ে বিজ্ঞানও মেনে নিয়েছে মৃত্যু অনিবার্য এবং অবশ্যম্ভাবী সত্য। যদিও সম্প্রতি মানবশরীরের সমগ্র জিন-সিকোয়েন্স আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন যে, শরীরের যে কোষটি মানুষকে বুড়ো করে দেয়, সেটাকে তাঁরা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন। বুড়িয়ে যাওয়া কোষটিকে বিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজছেন, সেটি পেয়ে গেলে মানুষ হয়তো বুড়ো হবে না, কিন্তু মরবে না— এমন কথা বিজ্ঞানীর ঘোষণা দিতে পারেন নি। পরিণামে বলতেই হবে মৃত্যুকে প্রতিরোধের কোনও উপায় নেই। একথা জানার পরও শক্তি চট্টোপাধ্যায় এতটা শক্তি [বল অর্থে] কোথায় পান যে, তিনি যাবেন না বলে দৃপ্ত ঘোষণা করেন? কিন্তু যেতে তো হবেই! রবীন্দ্রনাথও [১৮৬১-১৯৪১] স্বীকার করেছেন : ‘যেতে নাহি দিব হায়!/ তবু যেতে দিতে হয়।’ অথচ এই রবীন্দ্রনাথও একসময় দম্ভোক্তি করে লিখেছিলেন : ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে।’ কিন্তু চরম ভাববাদী রবীন্দ্রনাথকেও মৃত্যুর হেমলক পান করতে হয়েছে, তিনিও মৃত্যুবরণ করেছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায় এই আপ্ত বাক্যের ঊর্ধ্বে কেউ নন; যখন তিনি রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ। যতোই দম্ভ করুন না কেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর অনিবার্যতা স্বীকার করে নিতেই হয়েছে এবং তিনি জীবনের পরিণাম সম্পর্কে লিখেছেন ‘এপিটাফ’ কবিতা। বলা বাহুল্য, এই এপিটাফ আর কারো জন্য নয়, একান্তভাবে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নিজের জন্যই রচনা করেছেন তিনি। আট পঙ্ক্তির ‘এপিটাফ’ কবিতায় তিনি নিজের যাপিত জীবনকথা লিখে রাখতে চেয়েছেন এভাবে :
কিছুকাল সুখ ভোগ করে হল মানুষের মতো
মৃত্যু ওর, কবি ছিল, লোকটা কাঙালও ছির খুব।
মারা গেলে মহোৎসব করেছিল প্রকাশকগণ,
কেননা, লোকটা গেছে, বাঁচা গেছে, বিরক্ত করবে না।
[এপিটাফ]

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ কাব্যগ্রন্থের প্রায় প্রতিটি কবিতায় কবির মৃত্যুবোধ প্রবলভাবে ক্রিয়াশীল। প্রতিনিয়ত মৃত্যুচিন্তা তাঁকে তাড়িতে করেছে ‘সুন্দর ভুবন’ ছেড়ে যাওয়ার বেদনায় আহত হয়েছেন। মৃত্যুভাবনায় কবির অন্তর্জগত ভেঙে তছনছ হয়ে না গেলে তিনি কী বলতে পারতেন:
পুড়তে আমি ভালোবাসি, ভালোই বাসি।
পুড়তে আমি চাচ্ছি কোনও নদীর ধারে।
কারণ একটা সময় আসে, আসতে পারে
যখন আগুন অসহ্য হয় নদীর নদীর ধরে।
[মৃত্যু]

অর্থাৎ এখানে শ্মশানের কথা স্পষ্টভাবেই উঠে এসেছে; কবি শক্তি যেন মৃত্যুকে ধীরে ধীরে সহনীয় করে তুলছেন নিজের কাছে অথবা নিজেকে প্রস্তুত করছেন মৃত্যুর কাছে সমর্পণের জন্য। অথচ কী আশ্চর্য কাব্যগ্রন্থের নামকরণের সময় তিনি বড্ড অহংকার করেছিলেন, তিনি যাবেন না! তিনি তো জানতেন রবীন্দ্রনাথের কথা: ‘তবু যেতে দিতে হয়।’ অবশ্য সময় বয়ে যাওয়ার সাথে সাথে কবি যেন স্থিত হয়েছেন, মেনে নিয়েছেন জাগতিক বাস্তবতাকে। সম্ভবত কবির সহনীয় চেতনা অহংকারের ফাঁপা বেলুন ফুটো করে দিয়েছে, তখন তিনি লিখেছেন:
পশমের অন্তর্গত হয়ে আছে অসুস্থ বিড়াল
খুব কাছে বসে আছে হিতব্রতী অসুস্থ বিড়াল
কাছে বসে আছে কিছু পাবে বলে, অমরতা পাবে। 
[বিড়াল] 

আমরা জানি জাগতিক রঙ্গমঞ্চে অনেক মানুষ আছেন যারা জেনেও না জানা কিংবা দেখেও না দেখার ভাব করেন ব্যক্তিগত স্বভাবের কারণে। পরিণামে কবি শক্তি নিজের জানাকে কিংবা বোঝাকে আর অস্বীকার করেন নি, বরং স্পষ্ট করেই বলেছেন: ‘সুখের অত্যন্ত কাছে বসে আছে অসুখী বিড়াল।’ — [বিড়াল] আসলে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় আজীবন প্রাণপণে এই ‘অসুস্থ’ এবং ‘অসুখী’ বিড়ালটাকে তাড়াতে চেয়েছিলেন; কী ব্যর্থ প্রয়াস! জীবনের সমগ্র অভিজ্ঞতার সাড়ৎসার যখন লিখতে হয়েছে, তখন নিজেকে উপস্থাপন করেছেন ‘এপিটাফ’-এর সামনে। মৃত্যুকে পরিণামে মেনে নিতে হলেও কবি শক্তি লড়াই করেছেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনকে টিকিয়ে রাখতে; দু’হাতে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন মৃত্যুভয়কে। অর্থাৎ একটা জেদ ঠিকই ছিল শক্তির মনে-মননে। তাই তিনি লিখেছেন:
সমুদ্র জীবিত আছে, মৌনের উপরে আছে মেঘ,
মেঘের মতন এলোমেলো ঢেউ আছড়ে পড়ে তীরে,
আবার গুটিয়ে যায়, কেন্নোর মতন, ছোঁয়া লেগে।
ফুঁসে ফিরে আসে ফের, ঘা-খাওয়া জন্তুর মতো, তীরে।
[নিচ থেকে আমি ঐ রূপবান]

এখানে কবি ‘সমুদ্র’ প্রতীককে মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের লড়াই এবং অহংকার চিত্রিত করেছেন। এখানে কবি সরাসরি নিজের কথাই বলেছেন যেন; কেননা একসময় মানুষ নিজের চিন্তার বিরুদ্ধেও গিয়ে প্রেরণা খোঁজে:
[...] পরিত্রাণ
চাই, বাঁচতে চাই, বেঁচে থাকতে চাই
শুধু বাঁচা, অহরহ মৃত্যুর ওলোটপালোটের
মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই, শুধু বাঁচতে চাই। 
[শুধু বাঁচতে চাই]

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় এই যে এলোমেলো পঙ্ক্তি, যার অর্থ খুঁজে খুঁজে হন্যে হয় পাঠক, তার পেছনে ক্রিয়াশীল কবির অন্তর্জগতের অপার রহস্যময়তার আবরণ।

পঞ্চাশের দশকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় যে যাত্রা শুরু করেছিলেন বাংলা কবিতাঙ্গনে ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ [১৯৬২] কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে, তারপর আর পিছনে ফিরে তাকান নি। তিনি ক্রমাগত নিজেকে ভেঙেগড়ে বাংলা কবিতার চূড়াদেশে পৌঁছে গিয়েছিলেন আশির দশকেই। আর্কিবন্ড ম্যাকলিন-এর ভাষায় ‘কবিতা শুধু হয়ে উঠতে থাকবে।’ আমাদের কাছে মনে হয়েছে, শক্তির কবিতাও এই সূত্রানুসারে হয়ে উঠেছে আর প্রতিনিয়ত জড়িয়ে পড়েছে এক অপার রহস্যময়তার আড়ালে, আবরণের অতল গহ্বরে। কবিতার এই রহস্যময়তা এবং দৃশ্যমান অবচেতনার জগতে প্রবেশ করা সম্বন্ধে সমালোচক মন্তব্য করেছেন :
“জীবনানন্দের কিছু কিছু কবিতা যেমন ‘ঘোড়া’ ‘বিড়াল’ ইত্যাদিতে যে-রহস্যময় অবচেতনার ইশারা স্ফুরিত হয়ে উঠেছিল, শক্তি সেই রহস্যময়তাকেই ষাটের সময়পর্বে আবার গভীরভাবে ফিরিয়ে আনলেন কবিতায়।” [মাসুদুজ্জামান, বাংলাদেশ ও পশ্চিমবাংলার কবিতা: তুলনামূলক ধারা, ১ম-প্র, ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩] 

কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় সবটুকু অর্থ উন্মোচন করেন দেন নি; টুকরো টুকরো অথবা বিচ্ছিন্নভাবে এক প্রতীকী প্রতিকল্প নির্মাণ করেছেন, যেখানে পাঠক কখনও কখনও রহস্যের অতল তলে ডুবে যায়। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাবো’ কাব্যগ্রন্থটিতেও ঠিক অনুরূপ অবভাস রয়েছে মৃত্যুভাবনা সম্বন্ধে। একদিকে তিনি অহংকার করেছেন, অন্যদিকে তিনি ‘এপিটাফ’ রচনা করে অবলীলায় মৃত্যুকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। জীবনানন্দীয় রহস্য তাঁর সহজ-সরল কাব্যভাষার আড়ালে গভীর অর্থের দ্যোতনাবাহী হয়ে উঠেছে; বলা যায় পরিণামে সাধারণ অর্থের বাইরে গিয়ে শক্তির কবিতা সুদূরের ইঙ্গিতবাহী। ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ কাব্যগ্রন্থে শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেই রহস্যের মায়াজাল বিস্তার করেছেন অপার কল্পনার সাহায্যে। শক্তির সেই রহস্যের অতলে ডুব দিয়ে খুঁজে নিতে হয় তিনি কতটা মৃত্যুভয়ে ভীত কিংবা মৃত্যু-বিলাসী ছিলেন। এ গ্রন্থের কোনও কোনও কবিতায় মৃত্যু-বিলাস থাকলেও সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় কবির অন্তর জুড়ে ক্রিয়াশীল ছিল বিভীষিকাময় মৃত্যুভীতি কিংবা মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবল বাসনা।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’ কাব্যগ্রন্থের নাম-কবিতায় কবি মৃত্যুর কথা তুলে ধরেন এবং একইসময় মৃত্যুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও নিজের অহংকার প্রকাশ করেন। এ কবিতায় স্পষ্টতই মৃত্যুর বিরুদ্ধে শক্তির শাণিত উচ্চারণ শোনা যায়। কবিকে মৃত্যু কিভাবে ডাকে, সেকথা কবি লেখেন এভাবে:
চাঁদ ডাকে: আয় আয় আয়
কবিকে মৃত্যু তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে
চিতাকাঠ ডাকে: আয় আয়। 
[যতে পারি কিন্তু কেন যাবো?]

মৃত্যু কবি ডেকে কাছে নিতে চায়, অথচ কবি মৃত্যু নামক অমোঘ নিয়তিকে চ্যালেঞ্জ করেন, তিনি বলেন যাবেন না! এক অবিশ্বাস্য অন্তর্গত শক্তির জোরেই হয়তো কবি বলেন: 
যাবো
কিন্তু এখনি যাবো না
তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাব
একাকী যাবো না অসময়ে। 
[যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো?]

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হৃদয়ের কোমলতা জুড়ে প্রেম-প্রকৃতির প্রতি অবিশ্বাস্য রকমের আকর্ষণ ও ভালোবাসা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েছেন, কিন্তু মনের ভেতরে তিনি আজও চির তরুণ, চির সবুজ। তিনি এখনও চিরকাঙাল ভালোবাসা আর প্রেমের: 
কোলের কাঙাল আমি, পিপাসার্ত আমি,
কেবলই চন্দন-চিতা আমন্ত্রণ করে:
[তুমি একা থেকো]

মৃত্যুর এই আমন্ত্রণকে কবি সব-সময়ই উপেক্ষা করতে চেয়েছেন; জাগতিক জীবনের মোহ ত্যাগ করে তিনি কোথাও যেতে প্রস্তুত নন। এজন্য মৃত্যুর পরোয়ানা উপেক্ষা করেছেন আর বলেছেন:
জল দাও শিকড়ে আমার
জল দাও হৃদয় ভাসায়ে
শ্রাবণের বৃষ্টিতে ভাসাও
আমার শিকড় দেহখানি। 
[ফিরে আসে] 

অক্টোপাসের মতো মৃত্যু কবিকে টেনে ধরে, তারপর তিনি ‘শিকড়ে’ জল ঢালতে বলেন, শুধু বেঁচে থাকবেন বলে; কোনওভাবে মৃত্যুকে স্বীকার করে নিতে চান না। কিন্তু কবি কী দেখেননি, মৃত্যুর অনিবার্য অথবা প্রাণীর মৃত্যু এক চিরন্তন সত্য? এ সত্য কোনওভাবেই কারো অস্বীকার করার উপায় নেই। সম্ভবত এ কারণেই কবির মনে হয়েছে:
জলে ভেজা, ভাঙা চোরা গুঁড়ো--
জঙ্গলও কিছুটা উড়ো পুড়ো
কী যেন কী হবে মনে হয়। 
[কী যেন কী হবে]

রবীন্দ্রনাথ এক মৃত্যুকে অস্বীকার করে ‘সুন্দর ভুবন’ ছাড়তে চান নি; আবার নিজের বিরুদ্ধে গিয়েই লিখেছেন: ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান।’ এসব সমীকরণ পরিণামে ব্যর্থ হয়ে গেছে এবং তাঁকেও পৃথিবী ছেড়ে যেতে হয়েছে, মৃত্যুর অনিবার্য সত্যকে মেনে নিতেই হয়েছে। এই বাস্তব অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছিল না, তা নয়; অবশ্যই তাঁর ছিল এসব বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান। তিনিও জানতেন মৃত্যু অনিবার্য, অনস্বীকার্য এক সত্য। ‘আগুন লেগেছে’ কবির চারপাশে আর তিনি সেই আগুনে পুড়তে পুড়তে লিখছেন:
লেগেছে অসহ্য টান বুকে ও পাথরে।
পুড়েছে কমল, যার প্রান্ত নেই, শুধু ওড়ে ছাই ...। 
[আগুন লেগেছে]

এজন্যই সম্ভবত শক্তি চট্টোপাধ্যায় চিন্তাভাবনা শেষে এবং জীবনের পরিণাম সম্পর্কে সম্যক অবহিত হওয়ার পর নিজেরই মৃত্যুর আয়োজন করেছেন এবং লিখেছেন ‘এপিটাফ’। আর প্রিয়-মানুষ এবং বিরহ-দুঃখে যে প্রিয়তমা তাঁকে বারবার ক্লান্ত করেছে, তার জন্য বিদায়ী প্রার্থনায় কবি লিখেছেন:
যা হয় তা হোক
কিন্তু, তুমি ভালো থেকো
তুমি ভালো থেকো। 
[ভালো থেকো]

সুতরাং ‘যেতে পারি, কিন্তু কেন যাবো’ কাব্যগ্রন্থের শেষের দিকের কবিতাগুলোতে কবি শক্তির মানস-প্রবণতা মৃত্যুকে অনেকটা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে চেয়েছে। অর্থাৎ কবি যে অহংকার দেখিয়ে বলেছিলেন, তিনি কেন যাবেন? সেই অহংকারের জায়গাটা ক্রমশ ছেড়ে দিয়ে নীরবে নিজের ‘এপিটাফ’ রচনা করেছেন। বিজ্ঞান-মনস্ক শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও জানেন কোনও বস্তুই অবিনশ্বর নয়; বস্তু যেমন একদিকে নশ্বর, অন্যদিকে তেমনি পরিবর্তন ও রূপান্তরশীলও বটে। তাই শক্তির কণ্ঠে উচ্চারিত হয় : ‘আগুনে পুড়ে গেল লোকটা— কবি ও কাঙাল।’ সুতরাং কাব্যগ্রন্থের শেষ চরণে মৃত্যুভয়ে ভীত কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিজেকে যে মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছেন, তা স্পষ্টত ব্যক্ত করেছেন। তিনি মৃত্যুকে যেন আর ভয় পান না, তবে বস্তু জাগতিক নিয়মকে অস্বীকার করেন না। শক্তি চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুর এই ভয়কে জয় করতে পেরেছেন বলেই দৈহিকভাবে মৃত্যুর পরও যথার্থ মর্যাদায় পৃথিবীতে তাঁর পাঠকবৃন্দের হৃদয়ের পদ্মাসনে অধিষ্ঠিত আছেন এবং থাকবেন চিরকাল।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/180145/</link>
				<pubDate>Tue, 29 Nov 2022 05:49:02 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p> শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা নিয়ে&gt;&gt;&gt;&gt;<br />
যেতে পারেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিন্তু কেন যাবেন<br />
================================<br />
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় [১৯৩৩-&#8216;৯৫] ইহলোকে কিংবা বলা যায়, বস্তুগত এ জগতে আমাদের মাঝে আর নেই, একথা নিশ্চিতভাবেই আমরা বলতে পারি; কিন্তু তিনি কোথায় আছেন? মৃত্যুর পর তিনি কোথায় আছেন, একথা আমরা কেউ জানি না। শক্তির মতো অন্য যারা&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-180145"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/180145/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>9</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">360ddf0cf0a21e9279cc1bd770e3a565</guid>
				<title>পোস্ট মডার্নিজম&#062;&#062;&#062;&#062;

উত্তরাধুনিকবাদী তত্ত্ব : আশাবাদী অভিযাত্রা
===============================
মানুষ আগুন আর হাতিয়ারের ব্যবহার শেখার মধ্য দিয়ে আধুনিকতার পথে যাত্রা শুরু করেছিল। সেই যাত্রা পথ এতটাই দীর্ঘ যে, শুরুর কথা বলতে গেলে মনে হয়, তা প্রচণ্ড অতীত আধুনিক তো নয় বটেই। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা হচ্ছে সমকালে সেই শুরুটাই ছিল অগ্রগামী চিন্তা, ফলে সমকালের নিরিখে তা ছিল অবশ্যই আধুনিক। এ কথার মধ্য দিয়ে অনুমান করা যায় যে, অতীত মানে পুরাতন তবে তা অনাধুনিক এমন ভাবার অবকাশ নেই। যে কথা রবীন্দ্রনাথ চমৎকার কাব্যিকতায় প্রকাশ করেছেন : ‘আধুনিকতা আসলে সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।’ সুতরাং সমকালের অগ্রগামী ভাবনা সব সময়ই আধুনিক। তবে এ কালে কথা উঠেছে মানব সভ্যতা আধুনিকতাকে অতিক্রম করেছে। এখন আমাদের যাত্রা উত্তরাধুনিক। অর্থাৎ এ কালের অগ্রগামী ভাবনাকে আর আধুনিক বলার অবকাশ নেই; আধুনিকতার যাত্রা পথের সমাপ্তি ঘটেছে।

যন্ত্র নির্ভর বিকশিত মানবসভ্যতার চূড়ান্ত প্রগতি ভাবনার ইতি ঘটেছে; এখন যা চলছে, তা সেই আধুনিক ভাবনার নির্যাসকেই নানা প্যাটার্নে ব্যবহার। অতএব মানবসভ্যতার এই ব্যবহারিক বা উপযোগ সৃষ্টিকারী ভাবনা আধুনিক বলার বদলে আধুনিকোত্তর বা উত্তরাধুনিক বলাই উত্তম। যদি এই যুক্তি পরম্পরায় উত্তরাধুনিকতাকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে বোধ হয় আধুনিকোত্তরবাদ নিয়ে যেসব জটিলতা ও তত্ত্বের কচকচানি জটিলতা ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে কিংবা প্রচার প্রসার লাভ করেছে, তার অবসান ঘটবে।

মানবিক চিন্তারাজ্যের গুণগত পরিবর্তনের উপরোক্ত পরম্পরা স্বীকার করে শিল্প-সাহিত্যের জগতে আধুনিকোত্তরবাদ বা উত্তরাধুনিকতার তত্ত্ব নিয়ে হাজির হলে সেখানেও দেখা যায় রয়েছে অন্তহীন সমস্যার জট-জটিলতা। কারণ, সাহিত্যে ‘উত্তরাধুনিকতা’ বিষয়ক তত্ত্বের মূল কথাটিই হচ্ছে আধুনিকতার বিপরীতে এর অবস্থান; যা কিনা আধুনিকতা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন। এ কথার মধ্য দিয়ে এই তত্ত্ববিশ্বের জটিলতার সূচনা। কারণ, আধুনিকবাদের মূলে আছে প্রগতিবাদ, যুক্তি নির্ভরতা ও বিজ্ঞানের প্রমাণপত্রে বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন। যদি উত্তর আধুনিকবাদের অবস্থান আধুনিকবাদের বিপরীতে হয়, তাহলে বলতে হয় :

১. প্রগতির পরিবর্তে পশ্চাৎপদ ভাবনাকে মেনে নেওয়া।
২. যুক্তির বদলে বিশ্বাস স্থাপন করা।
৩. সর্বোপরি বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা।

উত্তর আধুনিকতার অবস্থান এভাবে বিন্যস্ত হলে, সেই মতাদর্শ মেনে নেওয়াটা যে বোকামি হবে তা একবাক্যে বলতে অসুবিধা নেই। তবে শিল্পে-সাহিত্যে উত্তর আধুনিকবাদের তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা-সমালোচনা হওয়ার পর মোটামুটিভাবে মেনে নেয়া হয়েছে :

১. উত্তর আধুনিকবাদ বাস্তবতার পরিবর্তে অবাস্তবতা ও ঐতিহ্যহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়।
২. নিরীক্ষামূলক শিল্প-সাহিত্যকে গুরুত্ব দেয়।
৩. বিশ শতকের প্রথমার্ধ্বের পরে পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিকাশে সামগ্রিক মানবতাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে- উত্তর-আধুনিকতা।
৪ শিল্পের সামগ্রিক ভাবনা থেকে সরে এসে উত্তরাধুনিকবাদ বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তিকে গুরুত্ব দেয়।

উত্তরাধুনিক শিল্পে-সাহিত্যে এমন এক বিশ্বব্যবস্থার কথা ভাবা হয়েছে, যেখানে কোনো কিছুই পূর্বনির্ধারিত বা সুনির্দিষ্ট নয়, বরং বিশৃঙ্খল। এমনকি এখানে মানুষ ঐতিহ্যগগত কারণেও বাধাপ্রাপ্ত হয় না। কাল্পনিক বা হাইপোথেটিক্যাল এই তত্ত্ববিশ্বের পরিবর্তন ঘটে দ্রুত। কেননা জাগতিক অস্থির অস্থিতিশীলতায় প্রতিমুহূর্তে মানুষের জ্ঞানের ধারণাগত ক্রমপরিবর্তন ঘটছেই অবিরাম। ফলে উত্তরাধুনিক তত্ত্বানুসারে একক বা অভিন্ন কোনো জ্ঞানের বিকাশ ঘটে না, বরং তা বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত তথা স্বতন্ত্র জ্ঞান পরিচর্যার অভীপ্সা তৈরি করে; যা সহজে সামষ্টিক স্বীকৃতি লাভ করে না।

উত্তরাধুনিকবাদ বা আধুনিকোত্তর শব্দটির প্রথম ব্যবহার লক্ষ করা যায় ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়। অর্থাৎ কালের বিবেচনায় বিশ শতকের শেষার্ধ্বে ‘পোস্ট মডার্নিজম’ [উত্তরাধুনিকতা] শব্দটির ব্যবহার শিল্প-সাহিত্যকলায় শুরু হয়। আধুনিকতাবাদ সাহিত্যে উঁচু ও নিচু যে বিভাজন তৈরি করে রেখেছে, উত্তরাধুনিকতাবাদ তা অস্বীকার করে শ্রেণীবিভেদ লুপ্ত করে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। বিষয়টিকে রেহনুমা আহমেদের ভাষায় বুঝিয়ে বলা যায় এভাবে :

[…] যে ব্যবস্থায় সাহিত্যকে উঁচু-নিচুতে ভাগ করা হয়, উঁচু সাহিত্য স্বীকৃতি পায়, সার্টিফিকেট পায়, যেটি পায় না সেটিই হচ্ছে জনসংস্কৃতি। সেটি বিবেচিত হয় নিম্নমানের ও ছোটলোকের সংস্কৃতি হিসেবে। […] এ ধরনের সাহিত্য থেকে দূরত্ব রচনা করাটাই জরুরী, যুক্তিবাদী প্রগতিশীল সাহিত্যকর্ম রচনা করা জরুরী, এমন ধরনের সাহিত্য যা কিনা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে। যেটি অতিক্রমকারী একটি স্বর তৈরী করতে পারবে, সেটিই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য। সেটিই হচ্ছে আধুনিক সাহিত্য।১

রেহনুমা আহমেদের কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আধুনিকতা চায় উঁচু মানের শিল্প-সংস্কৃতি আর সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতে এবং নিম্নশ্রেণীর সাহিত্য-সংস্কৃতি অস্বীকার করতে। অতএব উত্তর-আধুনিকতায় আধুনিকবাদের সব বৈশিষ্ট্য ধারণ করেও নিচু মানের বা জনসংস্কৃতি ও সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। এজন্য বলা হয়, উত্তর-আধুনিকতাবাদ এক অর্থে ‘গ্রাসরুট লেভেলে’ অবস্থিত মানুষের সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে বা প্রত্যাবর্তন করতে চায়। এটা প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি আপাত অর্থে সহজ মনে হলেও তা নয়; বরং এটি একটি কঠিন কাজ। এ প্রসঙ্গে মিশেল ফুকো ‘রচয়িতা বলতে কী বোঝায়’ শীর্ষক এক আলোচনায় মন্তব্য করেছেন :

আমি নিজে যদিও ঐতিহ্যের একজন অত্যন্ত গুণমুগ্ধ প্রবক্তা, তার গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন বলে দাবিদার, তবু আমি বলতে চাই যে, একই সাথে আমি সংস্কারমুক্ত মতবাদের ক্ষেত্রে গোঁড়া-মতবাদী (orthodox) : আমি মনে করি, গোঁড়া-মতবাদ হলো জ্ঞানের মৃত্যু; কারণ, জ্ঞানের বিকাশ পুরোপুরিভাবে নির্ভর করে মতপার্থক্যের অস্তিত্বের ওপর। স্বীকার্য যে, মতপার্থক্য ঝগড়া-ফ্যাসাদ, এমনকি সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। আমি মনে করি তা সত্যিকার অর্থেই অত্যন্ত গর্হিত কাজ; আমি সহিংসতাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। তৎসত্ত্বেও বলা চলে মতপার্থক্যের অস্তিত্বের কারণে আলোচনা শুরু হতে পারে; শুরু হতে পারে যুক্তি উপস্থাপন, তার খণ্ডন এবং পারস্পারিক সমালোচনা।২

সর্বদাই নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি সংরক্ষণে প্রয়াসী হলেও এক্ষেত্রে সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গোঁড়ামির অভিযোগে তাদের মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই। ফুকো ইউরোপ আমেরিকা কিংবা পশ্চিমা সাহিত্যের কদর না করার কথা বলেন নি, বরং তিনি নিজের সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে পশ্চিমাদের শেখানো বুলি আওরাতে নারাজ।

উত্তরাধুনিকতার আলোচনা প্রসঙ্গে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- কালগত সুস্পষ্ট ধারণা থাকা; যেভাবে আধুনিকবাদের কালগত ধারণাটির সংযুক্তি আছে উত্তরাধুনিকতার ক্ষেত্রে কালগত ধারণার কোনো সম্পর্কই নেই। অর্থাৎ মধ্যযুগের পর যেমন আধুনিক যুগ তদ্রূপ আধুনিক যুগের পর উত্তরাধুনিক যুগের আবির্ভাব ঘটেছে, এ জাতীয় ভাবনা বা ধারণার কোনো সুযোগ নেই। এর দ্বারা একটা বিষয় স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, আধুনিকবাদ ও উত্তরাধুনিকবাদের মধ্যে প্রকৃত সমস্য কালগত নয়, উভয় মতবাদের বিরোধ মূলত দৃষ্টিভঙ্গি বা বিষয়গত ব্যাপার। উত্তরাধুনিকতা মূলত একটি বিশেষ চিন্তা অথবা দৃষ্টিভঙ্গি; ফলে এখানে কাল বা সময়ের বিষয়টি যুক্ত নয়, একথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে। সমালোচকের বক্তব্য প্রসঙ্গত এরকম :

উত্তর-আধুনিকবাদের মানে আধুনিক যুগের পরবর্তী যুগ নয়, এটি কোনো ঐতিহাসিক যুগ না… যেভাবে ঐতিহাসিক যুগকে দেখা হয়, ক্লাসিকাল যুগ, তার পরবর্তী পর্যায়ে মধ্যযুগ, তারপরে আধুনিক যুগ… এটি এ ধরনের কোনো যুগ না।৩

উত্তরাধুনিকাত বিষয়ক আলোচনায় কালগত এ জটিলতার আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াও উত্তরাধুনিকবাদ খণ্ডিতকরণ এবং স্থানীয়করণের উপর জোর দিয়ে চিরকালীনতা স্বীকার করে নেয়। কিংবা ধ্রুব সত্যের ধারণাকেও অস্বীকার করে পোস্ট মডার্নিজিম বিষয়ক তত্ত্ব।

পোস্ট মডার্নিজমকে ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক জ্যাঁ বদরিলা, যিনি ‘মিডিয়া ইনটেলেকচুয়াল’ হিসেবে বিশেষ পরিচিত, তিনি পোস্ট-মডার্নিটিকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন এভাবে : ‘আই অ্যাম হোয়াট আই বাই’। জ্যাঁ বদরিলার এ বক্তব্যটি উত্তরাধুনিকতাবাদকে খুব সংক্ষেপে এবং সহজভাবে ধারণ করে। কেননা ‘বলা হয়, আধুনিতাবাদ উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছিল, পক্ষান্তরে, উত্তর-আধুনিকতাবাদ গুরুত্ব দেয় ভোগের উপর।’৪ বদরিলার বক্তব্যের মধ্যে ভোগবাদের ব্যাপারটি গুরুত্ব পেলেও মনে রাখা দরকার যে, উত্তরাধুনিকতা ভোগবাদ সর্বস্ব কোনো শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক তত্ত্ব বা মতবাদ নয়।

উত্তরাধুনিকতা যখন প্রান্তিক জনগণের সংস্কৃতির সামনে দাঁড় করিয়ে আধুনিক বিত্তবানকে প্রশ্ন করে- আপনি কী পড়েন? উত্তরে আমরা শুনি, রবীন্দ্রনাথ। কারণ, রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন ‘হাই বা এলিট সোসাইটি’র সংস্কৃতির প্রতিনিধি বা প্রতীক। তিনি কোনোভাবেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সিম্বল নন। বিত্তবান কিংবা এজন্যই এলিট শ্রেণীর নিকট কখনোই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা সুকান্তের সাহিত্য খুব একটা মর্যাদা পায় নি; কিংবা আধুনিকতায় বিশ্বাসী এলিট শ্রেণী ম্যাক্সিম গোর্কি পড়ার কথাও বলেন না। কারণ, এঁরা শিল্প-সাহিত্য চর্চা করেছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের এড়িয়ে। ফলে উত্তরাধুনিকাবদীদের সম্বন্ধে অন্যভাবে বলা যায়, এক অর্থে যাঁরা শিল্প-সাহিত্যে প্রান্তিক জনগণের কথা বলেছেন, তাঁরা তো অন্য বিচারে বিত্তবান এলিট শ্রেণীর এবং প্রথাগত আধুনিকতার বিপক্ষেই বলেছেন। অতএব অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, উত্তরাধুনিকবাদীরা স্বাভাবিকভাবেই আধুনিকতাসৃষ্ট পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

উত্তরাধুনিকতাবাদের আরেক জটিলতা হচ্ছে বাস্তবতা সম্বন্ধে তাদের অবস্থান কী, তা নিয়ে। এ সম্বন্ধে জ্যাঁ বদরিলা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, উত্তরাধুনিকতাবাদে আসল-নকল, বহির্ভাগ কিংবা অন্তর্ভাগের ব্যবধান ক্রমশ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে ‘হাইপার-রিয়েল’ সংস্কৃতি; যেখানে বাস্তব এবং অবাস্তবের সীমানা ধ্বসে পড়ছে। ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছেন বদরিলা এভাবে :

[…] সকলে জানেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিজনিল্যান্ড হচ্ছে ফ্যান্টাসি। সেটি বাস্তব না। […] আসলে ডিজনিল্যান্ডকে ফ্যান্টাসি হিসেবে পরিবেশন করা হচ্ছে যাতে আমাদের মনে হয়, বাদবাকি সব কিছু, অর্থাৎ ডিজনিল্যান্ডের বাইরের জগৎ হচ্ছে বাস্তব। কিন্তু আসলে ‘বাস্তব’ আমেরিকা হচ্ছে ডিজনিল্যান্ড। বাস্তব যে আর বাস্তব না, এ সত্যটি লুকানোর জন্য ডিজনিল্যান্ড জরুরি।৫

বাস্তব এবং অবাস্তবের পার্থক্য ঘুচে যাওয়ার এ ঘটনাকে সুজান বোর্দোর ব্যাখ্যায় স্পষ্ট হয়। তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকায় এখন পঁচিশ পেরোন প্রায় সকল নারীই প্লাস্টিক সার্জনের কাছে নিয়মিত যাতায়াত করেন; কেউবা শরীর থেকে মেদ কমাচ্ছেন আর কেউবা মুখের কোচকানো চামড়া সার্জারির মাধ্যমে টাইট করছেন। বিজ্ঞানের এই সুবিধা নেয়ার পর বাস্তব এবং অবাস্তবের পার্থক্যটা যে লীন হয়ে যাচ্ছে তা নিশ্চয় আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না। কারণ, সার্জারির সহায়তায় এই যে পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে, তা কী অবাস্তব, না বাস্তব- এ বিষয়ে খুব সহজে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না! আমরা জানি যে, জন্মগতভাবে যা কিছু মানুষ পেয়েছে, তাই হচ্ছে বাস্তব। কিন্তু সার্জারির মাধ্যমে ব্যক্তির পুনগর্ঠিত চেহারা তাহলে কি অবাস্তব? এসব মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে যে, বাস্তবতা আর অবাস্তবতার ব্যাপারটিও সমকালে অনেকটাই অবান্তর হয়ে পড়েছে। সুতরাং ‘বাস্তব এবং পরিবেশন, এই দুইয়ের যে সুস্পষ্ট বিভাজন ছিল, সেটি বর্তমানের উত্তর-আধুনিক সংস্কৃতিতে, বিজ্ঞাপন, সিনেমা, এসবের কল্যাণে হাওয়া হয়ে গেছে।’৬ অতএব পার্থিব জাগতিক রিয়ালিটির বা বাস্তবতার বিদ্যমান হ-য-ব-র-ল অবস্থায় খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- তাহলে প্রকৃত বাস্তবতা কী? এ প্রসঙ্গে সমালোচকের কথা নিম্নরূপ :

এতকাল রিয়্যালিটির ভিত্তি ছিল প্রকৃতি, প্রকৃতি-প্রদত্ত, জন্মসূত্রে পাওয়া নাক… বয়সবৃদ্ধি প্রাকৃতিক, সে সাথে শারীরিক পরিবর্তন, পরিবর্ধনও প্রাকৃতিক… কিন্তু বর্তমানে, যখন কিনা কল্পিত নাকটি বাস্তবে পেতে চাই, কল্পিত মেদহীন দেহ, ফ্যান্টসি দেহে বাস্তব জীবন যাপন করতে চাই তখন? তখন, কোনটা রিয়েল? যদি রক্ত-মাংসের মানুষ সারাক্ষণ অবাস্তব সৌন্দর্য আকাঙ্ক্ষা করে… তাহলে বাস্তব এবং অবাস্তবের পূর্বতন সীমানাগুলো আর কার্যকরী থাকে না। যিনি নিজে সৌন্দর্যের প্রতীক, তাঁর সৌন্দর্যও কিন্তু নির্মিত।৭

সত্য-মিথ্যা, আসল-নকল, বাস্তব-অবাস্তব-কল্পনা এসব বিষয়ের সাংঘর্ষিক ও সীমারেখাহীন বর্তমান এই অবস্থা প্রকৃতপক্ষে আধুনিকতা তথা পুঁজিবাদের চরম বা চূড়ান্ত বিকাশেরই ফলাফল বা সৃষ্ট-সংকট। আধুনিকবাদের এই সংকটময় অবস্থাটাই উত্তরাধুনিকতা হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে।

আধুনিকতা যেসব যুক্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল, সেসব যুক্তি যখন বিজ্ঞানের ক্রমোন্নয়নে ভেঙে যাচ্ছে, সেটি একটি জটিলতা, তা নিঃসন্দেহে অস্বীকার করা যায় না। উত্তরাধুনিকবাদ মানুষকে ভোগসর্বস্ব নীতির দিকে ঠেলে দিলেও আধুনিকবাদের নাক-উঁচু স্বভাব পরিত্যাগ করে, তা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে স্বীকার করে শ্রেণীহীন যে অবস্থার দিকে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে, সেই অবস্থাটার প্রাপ্তি অনিবার্য ও অনস্বীকার্য। অর্থাৎ আধুনিকবাদে উপেক্ষিত মানবতা নবতর উত্তরাধুনিকবাদে স্বীকৃতি পাচ্ছে। শুধু যুক্তি নয়, এর সাথে উত্তরাধুনিকবাদ স্বীকার করে নেয় সত্যের ভিন্নতাকে বা বিবিধ অবস্থাকে। একই কাল ও স্থানগত ভিন্নতার বিবেচনা করা হলেও যে সত্য ভিন্ন হতে পারে, আধুনিকতার মহাবয়ান এ কথা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু উত্তরাধুনিকবাদ এটাকে স্বীকার করে নিলেও মহা বয়ান খণ্ডিতকরণের মাধ্যমে আধুনিকতার চিরকালীনত্ব বা ধ্রুপদী তত্ত্বকে অস্বীকার করে ক্ষুদ্র বয়ানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

উত্তরাধুনিকবাদে ব্যক্তির মন-মানসিকতায় কিংবা সাংস্কৃতিক চেতনায় জাতি, গোষ্ঠী কিংবা ভৌগোলিক সীমার মাঝেও আটকে রাখা সম্ভবপর নয়। কারণ, ব্যক্তিমানুষ এখন সম্পৃক্ত হয়েছে বিশ্বসংস্কৃতির সাথে টিভি ইন্টারনেট স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। ফলে জাতিগত ঐতিহ্য ও প্রথার ব্যাপারটিও উত্তরাধুনিক সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে ভেঙে পড়েছে; ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা প্রথার স্থানে গ্লোবালাইজেশন সক্রিয় হয়ে উঠেছে ক্রমশ। অর্থাৎ উত্তরাধুনিকতা ব্যক্তিকে ভৌগোলিক সীমা ও জাতিগত বৈষম্যের ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করছে। হয়তো এমন দিনও খুব দূরে নয় যে, উত্তরাধুনিকবাদীদের মাধ্যমে এক মানবগোষ্ঠী ও এক বিশ্বসংস্কৃতি গড়ে তোলার পক্ষেই জোর দাবি উঠবে।

বলাবাহুল্য, এটাও আধুনিক পুঁজিবাদের এক ধরনের সংকট। এ সংকট চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছালে আধুনিকতার ভয়াবহ দানব পুঁজিবাদের মুনাফা অর্জনের ধারণাও ধ্বসে পড়বে। যেদিন সত্যিকার অর্থেই সেই অবস্থা তৈরি হবে, সেদিন বিশ্বসংস্কৃতির সার্বিক মিলন মহোৎসবকে আর পুঁজিবাদের নির্দিষ্ট সীমায় সংজ্ঞায়িত করাও সম্ভব হবে না। এ প্রসঙ্গে উত্তরাধুনিকাবাদকে সাদামাটাভাবে বোঝার ক্ষেত্রে রাশিদ আসকারীর মন্তব্য খানিকটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে, তিনি বলেন :

সাধারণত উত্তরাধুনিকতাবাদ বলতে ভাবনার জগতের সেই সকল পরিবর্তন, উন্নয়ন ও প্রবণতাকে বোঝায় যেগুলো সাহিত্য, শিল্পকলা, সংগীত, স্থাপত্য, দর্শন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিশ শতকের চল্লিশ অথবা পঞ্চাশের দশকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং এখনো হচ্ছে।৮

এ বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে, আধুনিকবাদে যেসব বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল তার বিরোধিতা বা পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রত্যাশাই উত্তরাধুনিকবাদের মূল প্রকল্প। অন্যভাবে বলা যায়, আধুনিকবাদের বিপরীত প্রকল্পই হচ্ছে উত্তরাধুনিকবাদ। কথাটিকে এতটা সহজভাবে গ্রহণ করলে সম্ভবত ভুল করা হবে। কারণ, উত্তরাধুনিকবাদ কখনোই আধুনকিবাদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক কোনো তত্ত্ব নয়। তবে আধুনিকতা যেসব যুক্তি শৃঙ্খলা অনুসরণ করে এবং অতীতের ভিত্তিতে ক্রমাগত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়, তা উত্তরাধুনিকতা অস্বীকার করে। পূর্বেই বলা হয়েছে, উত্তরাধুনিকবাদ যুক্তির শৃঙ্খলা অস্বীকার করে ঐতিহ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণের স্বার্থে। ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা প্রান্তিক মানুষের সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা উত্তরাধুনিক তত্ত্বের অন্যতম প্রকল্প। ফলে আধুনিকতার মহা-আখ্যান বা মহাবয়ান উত্তরাধুনিকতায় এসে খণ্ড বয়ানে পরিণত হয়েছে। ধ্রুব সত্য কিংবা চিরকালীনত্ব বিষয়ক ধারণা অস্বীকার করে উত্তরাধুনিকবাদ জানাচ্ছে, স্থানিক ও আপেক্ষিক সত্য; যা অবশ্য খণ্ডকালীনও বটে। অর্থাৎ মহাবয়ান ক্ষুদ্র বয়ানের দিকে ধাবিত হচ্ছে উত্তরাধুনিক প্রকল্পে।

উত্তরাধুনিকতা পুরোপুরি আধুনিকতার সাথে সাংঘর্ষিক না হলেও অনেকটাই যে সংঘাতপূর্ণ তা আধুনিকতার প্রপঞ্চ পরিত্যাগের মধ্য দিয়ে উত্তরাধুনিকবাদে মনোনিবেশ কলে প্রতীয়মান হয়। এ কথা আমরা পূর্বেই বলেছি যে, উত্তরাধুনিকবাদের জন্ম আধুনিকতার পেটের ভেতর পুঁজিবাদী সংস্কৃতির চরমতম যান্ত্রিক বিকাশের মধ্যে নিহিত। আধুনিকতা মানুষকে শিখিয়েছে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত সবকিছুই বাস্তব। অথচ একালে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নয়ন এবং আবিষ্কারের ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃতি প্রদত্ত মোটা নাকটি আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার এক সার্জারির দ্বারা পরিবর্তন করে ফেলা সম্ভব। এ ঘটনার ফলে এক ঘণ্টা আগের বাস্তবতার সাথে পরবর্তী সময়ের বাস্তবতার বিরোধ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে ঘণ্টাখানের মধ্যে সত্য পরিবর্তিত হয়েছে, অন্যদিকে পরবর্তী পর্যায়ের কৃত্রিমতাকেই বাস্তব হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ।

পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিকাশ এবং বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে এ কালের মানুষকেও এক ধরনের ধাঁধাঁর মধ্যে ফেলে দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং বলা ভুল হবে না, পুঁজিবাদের চরম বিকাশের একালে মূলত এই ধন্ধ বা বিস্ময়ই উত্তরাধুনিকতাবাদ। এই বিবেচনায় সরলীকরণের মাধ্যমে বলা যায়, উত্তরাধুনিকতাবাদ হচ্ছে আধুনিকতার অনিবার্য উন্নতির ফলাফল। আধুনিকবাদে উৎপাদনকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সাফল্যে যে পরিবর্তন অকল্পনীয় ছিল, তা বর্তমানে একেবারেই মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। হাতের নাগালের সুবিধাকে ইচ্ছে করলেও আজকের মানুষ অস্বীকার করতে পারছে না। কেউ বাধ্য হয়ে আর কেউ শখের বশে গ্রহণ করছে সেই সুবিধাকে। এদিক থেকে বলা যায়, উত্তর-আধুনিকবাদ শেষাবধি ভোগবাদকেই সমর্থন করে।

উত্তরাধুনিকতা বিষয়ক তাত্ত্বিক প্রপঞ্চের ভোগবাদের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, সেলফোনের বিস্ময়কর আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ মুহূর্তেই কয়েকটি বোতাম টিপলেই অন্য প্রান্তের মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে, এ কথা আধুনিকবাদ শুরুর দিকে যৌক্তিক শৃঙ্খলায় ভাবতেও পারে নি। ফলে উত্তরাধুনিকতায় অনিবার্যভাবে ভেঙে পড়েছে যুক্তির প্রথানুগ শৃঙ্খলা। একই সাথে প্রাপ্ত সুবিধা কিংবা নবোদ্ভাবিত আবিষ্কারের সুযোগ একালের মানুষ গ্রহণ করবে ও করছে এটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি মানুষের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আবিষ্কৃত কৃত্রিম হৃদযন্ত্রের সাহায্যে সে ক্রিয়াটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। অতি সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, কৃত্রিম উপায়ে রক্ত উৎপাদনেও সাফল্য লাভ করেছেন তাঁরা। বিজ্ঞানীদের এসব আবিষ্কার নিঃসন্দেহে একালের মানুষের যাপিত জীবনকে কল্পনাতীতভাবে সহজতর করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও সহজ করে দেবে। এই কল্পজগতের চাওয়াই যখন বাস্তব পাওয়ার ঘটনায় সংবাহিত হচ্ছে হরহামেশা; আর এসব কল্পলোকের ঘটনাবলি আত্মীকরণের মাধ্যমেই গড়ে উঠছে উত্তরাধুনিকতার তত্ত্ব ও সংস্কৃতি।

উত্তরাধুনিকবাদের এই সর্বগ্রাসী আক্রমণ থেকে চাইলেও একালের মানুষ বাঁচতে পারবে না; কিংবা একালের মানুষ এই ভোগবাদী মানসিকতা ছাড়তে পারবে না অথবা এই অনিবার্য ভোগবাদকে অস্বীকার করার উপায় বা দ্বিতীয় কোনো বিকল্পও নেই মানুষের নিকট। বরং মানুষ উত্তরাধুনিক এই ভোগবাদকে পেতে চায় জীবনকে আরও আয়াশসাধ্য করতে। যে আয়াশের কথা হয়তো বর্তমানে কল্পনাও করা সম্ভবপর হয়নি। বাস্তব-অবাস্তব এবং কল্পনার সীমারেখাহীন চিহ্ন নির্দিষ্ট করা হলে আধুনিকবাদের প্রকল্প আর টিকে থাকতে পারে না; কিংবা চাইলেও একালের মানুষ কল্পসত্যের বাস্তবতা অস্বীকার করবে না। কারণ, তার সামনেই সেই বাস্তবতার সুযোগ-সুবিধা পরিবেশিত হচ্ছে। এই সার্বিক দিকের কথা বিবেচনা করে, উত্তরাধুনিকতাবাদকে এক অর্থে পরিবেশনবাদ হিসেবেও আখ্যায়িত করা যেতে পারে।

শিল্পে-সাহিত্যে উত্তরাধুনিকতাবাদ কিভাবে ক্রিয়াশীল, এখন সে প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সাহিত্য যেভাবে ধর্মীয় খোলস থেকে বেরিয়ে যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানমনস্ক হয়েছিল, উত্তর-আধুনিকবাদীগণ আধুনিকতাবাদের সেই যুক্তিনির্ভরতার সীমা থেকে বেরিয়ে এসে প্রান্তিক মানুষের সংস্কৃতি ও আচার বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে চাইছে। উত্তরাধুনিকবাদী শিল্পী-সাহিত্যিকগণ মূলত বলতে চাইছেন, শিল্প-সাহিত্য শুধু এলিটদের জন্য সৃষ্ট এলিটদের সংস্কৃতি চর্চাই নয়; এখানে সমানভাবে অধিকার আছে সমাজের প্রান্তিক তথা সাধারণ মানুষেরও সংস্কৃতি চর্চার অধিকার থাকতে হবে।

অথচ পোস্ট মডার্ন শব্দটি শিল্পে-সাহিত্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছে, সেখানে অখণ্ড চেতনার ধারণা অস্বীকার করে খণ্ড খণ্ড ধারণা জন্ম দিয়েছে। সমগ্র নয়, বিচ্ছিন্ন; অর্থাৎ অখণ্ড নয়, খণ্ড। সমষ্টি নয়, ব্যক্তি। চিরকালীন নয়, সাময়িক বা স্বল্পকালীন। বিশেষত স্থানিক এবং কালিক ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন উত্তরাধুনিকবাদীরা। আধুনিকবাদে যে মহাবয়ান বা মহা-আখ্যানের কথা বলা হয়েছিল, তা উত্তরাধুনিকতায় এসে তা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বয়ান বা আখ্যানে পরিণত হয়েছে। আধুনিকতা যেভাবে মানুষকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার ব্যাপারে উস্কানি দিয়েছিল, তা সম্প্রসারিত হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদকেই সার্থক হিসেবে মেনে নেয়ার কথা বলেছে।

আধুনিকতার এই বিবেচনা থেকে বলা যায়, উত্তরাধুনিকবাদে চূড়ান্তভাবে ব্যক্তির ভোগের কথা বলে। তবে এই ভোগবাদেরও চূড়ান্ত পরিণাম হতাশা। অর্থাৎ পরিণামে যখন উত্তরাধুনিকবাদী মানুষ ভোগের চূড়ান্ত সীমাকে স্পর্শ করে বা করবে তখন তার কাছে কল্পনা আর বাস্তবের সীমারেখা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বা যাবে। আর সেই অবস্থায় তার সামনে আশা বলে কিংবা স্বপ্ন বলে কোনো কথা বা বিষয় থাকবে না। যে মানুষের সামনে স্বপ্ন কিংবা ভবিষ্যতের কল্পনা বা আশা থাকে না চূড়ান্ত বিবেচনায় দেখা যায়, সে মানুষ ব্যক্তিজীবনের প্রতি আসক্তি হারিয়ে ফেলে। এই আকর্ষণহীন জীবনই হচ্ছে উত্তরাধুনিকবাদের চূড়ান্ত রূপ ও সংকট। এভাবে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, আধুনিকতার নৈঃসঙ্গ্য যে অর্থে মানুষেকে সংকটের মুখোমুখি ত্যাগ করেছিল এবং সেই ত্যাগজনিত সংকট ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় বর্তমানে তা উত্তরাধুনিকতাবাদ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আধুনিকবাদের সংকটে নিপতিত মানুষ এজন্য যুক্তির শৃঙ্খলা ছিঁড়ে ফেলে গণ-মানুষের আচার বিশ্বাস ও সংস্কৃতির উপর আস্থাশীল হতে চাইছে। আমরা প্রত্যাশা করি, চরম ভোগবাদী মানসিকতাজনিত সংকটের চোরাগলি অতিক্রম করে উত্তরাধুনিকবাদের অভিযাত্রা আশাবাদের দিকে অগ্রসর হবে।

টীকা ও তথ্যসূত্র :
-----------------------
১. রেহনুমা আহমেদ, ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গে’, বক্তৃতা : জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা : প্রতিরুদ্ধের প্রকাশনা (শ্রুতিলিপি), ২৮ মে, ২০০২; পৃ.৫
২. মিশেল ফুকো, ‘রচয়িতা বলতে কি বোঝায়’, অনুবাদ : আফজালুল বাসার, শেখ সালাহউদ্দিন সম্পাদিত, প্রতিপদ, ৩য় সংখ্যা, ঢকা : মার্চ ২০০৬; পৃ.১৬১
৩. রেহনুমা আহমেদ, ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গ’, পূর্বোক্ত, পৃ.১৮
৪. তদেব, পৃ.১০
৫. তদেব, পৃ.১১
৬. তদেব, পৃ.১২
৭. তদেব
৮. রাশিদ আসকারী, ‘উত্তরাধুনিকতাবাদ : মহান আখ্যান থেকে ক্ষুদ্র উপাখ্যান’, আবুল হাসনাত সম্পাদিত, কালি ও কলম, ৩য় বর্ষ : ১২শ সংখ্যা, ঢাকা : জানুয়ারি ২০০৭; পৃ.২৪</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/179358/</link>
				<pubDate>Sat, 26 Nov 2022 17:36:38 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>পোস্ট মডার্নিজম&gt;&gt;&gt;&gt;</p>
<p>উত্তরাধুনিকবাদী তত্ত্ব : আশাবাদী অভিযাত্রা<br />
===============================<br />
মানুষ আগুন আর হাতিয়ারের ব্যবহার শেখার মধ্য দিয়ে আধুনিকতার পথে যাত্রা শুরু করেছিল। সেই যাত্রা পথ এতটাই দীর্ঘ যে, শুরুর কথা বলতে গেলে মনে হয়, তা প্রচণ্ড অতীত আধুনিক তো নয় বটেই। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা হচ্ছে সমকালে সেই শুরুটাই ছিল অগ্র&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-179358"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/179358/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>8</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">fd5a5167769a73875f42f4bbfee4c3fd</guid>
				<title>তত্ত্বটা শুরু করা গেল।। ফেমিনিজম&#062;&#062;&#062; আজকের লেখা</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/178244/</link>
				<pubDate>Wed, 23 Nov 2022 19:45:01 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>তত্ত্বটা শুরু করা গেল।। ফেমিনিজম&gt;&gt;&gt; আজকের লেখা</p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">addcada890663b86611b3477f8e85ef2</guid>
				<title>ফেমিনিজম&#062;&#062;&#062;&#062;
========================
নারীবাদী তত্ত্ব : পুরুষতান্ত্রিক সমাজ
 ========================
নারীবাদ শব্দটি ইংরেজি ফেমিনিজম শব্দের বাংলা পরিভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অক্সফোর্ড অভিধানে ফেমিনিজম শব্দটির অর্থ করা হয়েছে : ‘বিলিফ ইন দ্য প্রিন্সিপল দ্যাট ওম্যান শ্যুড হ্যাভ দ্য সেম রাইটস অ্যান্ড অপরচ্যুনিটিস (লিগ্যাল, পলিটিক্যাল, সোশ্যাল, ইকোনমিক ইটিসি) অ্যাজ মেন।’১ অর্থাৎ মানুষ (পুরুষের সমান) হিসেবে নারীও রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার ভাগীদার। ফেমিনিজমের ব্যাখ্যায় এনসইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে : নারীবাদ এমন একটি ধারণা যা ঊনিশ শতকের শেষের দিকে শুরু হয়ে আধুনিকতার দিকে যাত্রা করে এবং নারীর অধিকার নিয়ে কথা তোলে। একইসাথে এ ধারাণায় আত্মীকৃত হয় ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদিও; সামগ্রিকভাবে এটি এমন একটি আন্দোলনে রূপ নেয় যা মানুষ হিসেবে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দাবি উত্থাপন করে।২
সুতরাং, আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য পুরুষের সমকক্ষতা লাভের যে আন্দোলন, তাই নারীমুক্তির আন্দোলন। নারীমুক্তির এ আন্দোলন থেকেই পরবর্তীকালে নারীবাদী তত্ত্ব বা ধারণার জন্ম। অর্থাৎ নারীসমাজ নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে অনিবার্যভাবেই একটি তাত্ত্বিক ধারণার জন্ম দিয়েছে, যা নারীবাদ বা ফেমিনিজম হিসেবে পরিচিত।
ঊনিশ শতকের গোঁড়ার দিকে ইউরোপে নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নারীমুক্তির আন্দোলন শুরু হয়।৩ ইউরোপে এ সময় জন স্টুয়ার্ট মিল নারীর ভোটাধিকার প্রসঙ্গে পার্লামেন্টে দাবি উত্থাপনের পাশাপাশি তিনি লেখেন : ‘আমি নিশ্চিত যে-সামাজিক ব্যবস্থা আইনের দ্বারা এক লিঙ্গকে অধীন করে আরেক লিঙ্গের, সেটা সহজাতভাবেই খারাপ এবং সেটা মানুষের প্রগতির বিরুদ্ধে একটা বড় বাধা; আমি নিশ্চিত যে ওগুলো স্থান ছেড়ে দেবে বিশুদ্ধ সাম্যের জন্যে।’৪ মিল কর্তৃক উত্থাপিত নারীর ভোটাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিসেস ফসেটের নেতৃত্বে ইংরেজ নারীসমাজ রাজনীতিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সংগঠিত হয়। একই সময়ে ফ্রান্সের নারীরা সংগঠিত হয় মারিয়া দারাইসেঁর নেতৃত্বে; তিনি ১৮৬৮ সাল থেকে ১৮৭১ সালের মধ্যে অনেকগুলো সম্মেলনে বক্তব্য-বিবৃতির দ্বারা নারীসমাজের প্রকৃত সামাজিক অবস্থা জনসমক্ষে বিশেষভাবে নারীর সামনে তুলে ধরেন। নারীবাদের আরেক প্রতিষ্ঠাতা লিয়োঁ রিশিয়ে ‘নারীর অধিকার’ বিষয়ে ১৮৬৯ সালে গ্রন্থ রচনা করেন এবং ১৮৭৮ সালে এ বিষয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। এসব আন্দোলন ও সম্মেলনের মাধ্যমে ক্রমেই নারীর ভোটাধিকারের পাশাপাশি তাদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়। ফরাসি নারীসমাজকে ভোটাধিকার পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত; অবশ্য নিউজিল্যাণ্ডের নারীরা ১৮৯৩ সালে এবং অস্ট্রেলিায়ায় ১৯০৮ সালে ভোটাধিকার পায়। অন্যদিকে ইংরেজ নারীরা ১৯১৮ সালে নিয়ন্ত্রিত এবং ১৯২৮ সালে অনিয়ন্ত্রিত ভোটাধিকার লাভ করে। ফরাসি নারীদের ভোটাধিকার লাভে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের কারণ অনুসন্ধান করে সিমোন দ্য বুভ্যুয়ার জানিয়েছেন :
তিরিশ বছর ধ’রে ফ্রান্সে ও ইংল্যাণ্ডে এ আন্দোলন থেকেছে খুবই ভীরু। স্থাপিত হয়েছে অসংখ্য সংঘ, কিন্তু অর্জন হয়েছে সামান্যই, কেননা লিঙ্গ হিসেবে নারীদের ছিলো সংহতির অভাব।৫
সময় থেমে থাকে নি, নারীসমাজও তাদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে একের পর এক আন্দোলন, সম্মেলন, বক্তব্য-বিবৃতি দিতে থাকে; পরবর্তী সময় এ আন্দোলন ক্রমান্বয়ে বৃহত্তর পরিসরে তার কার্যক্রম শুরু করেছে। অন্যদিকে আমেরিকাতেও ঊনিশ শতকের শুরুতে নারীসমাজকে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছিল বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ নির্মাণের সময়, ফলে তারা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে পুরুষশাসিত সমাজে তখনো তাদের অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয় নি। এ সময় আমেরিকায় নারীদের ভক্তি-শ্রদ্ধা করা হলেও পরিবারের বাইরে সমাজজীবনে তাদের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না; কিন্তু ১৮৩০ সালের দিকে কতিপয় নারী রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে নিগ্রোদের পক্ষে সংগ্রাম শুরু করে। কুয়েকার নেত্রী লুক্রেশিয়া মোট এ সময় আমেরিকার নারীদের মুক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে ‘নারী-মুক্তি সংঘ’ গঠন করেন। ১৮৪০ সালের এক সম্মেলনে লুক্রেসিয়া মোট এবং এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন যৌথভাবে নারী-অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘সেনেকা ফলস-ডিক্লেয়ারেশন অব সেন্টিমেন্ট’ শীর্ষক যে ইশতেহার প্রকাশ করে, তার মধ্যে আমেরিকার নারীসমাজের মুক্তির সব বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। ইশতেহারে উল্লেখ করা হয় :
পুরুষ ও নারীকে সমানভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, স্রষ্টা তাদের ভূষিত করেছে কতিপয় হস্তান্তর অযোগ্য অধিকারে […] সরকার স্থাপিত হয়েছে শুধু এসব অধিকার রক্ষা করার জন্য […] পুরুষ বিবাহিত নারীকে এক নাগরিক শবে পরিণত করেছে […] সে জোর করে নিজে অধিকার করেছে জিহোভার সমস্ত অধিকার, দাবি করেছে যে নারীর জন্যে এক পৃথক এলাকা বরাদ্দ করা তার অধিকার।৬
মূলত এ সময় নিগ্রোদের পক্ষ নিয়ে আমেরিকার নারীসমাজ রাষ্ট্রের নিকট তাদের ভোটাধিকার দাবি করতে থাকে। নারীসমাজের এই মুক্তি আন্দোলনের পক্ষে র্যালফ এমার্সন এবং প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনও সমর্থন দেন। এরপর আমেরিকার গৃহযুদ্ধের অবসান হলে নারীসমাজ দাবি উত্থাপন করে যে সংশোধনীর মাধ্যমে নিগ্রোদের ভোটাধিকার প্রদান করা হয়েছে, সেই সংশোধনীতে যেন সমগ্র নারীসমাজেরও ভোটাধিকার সংযুক্ত করা হয়। নিগ্রোদের ভোটাধিকার প্রদান বিষয়ক সংশোধনীর দ্ব্যর্থকতার সুযোগে এ সময় ১৪ জন নারীকে সঙ্গে নিয়ে সুজ্যান বি এ্যান্থনি রস্টারে ভোট প্রাদন করেন; এজন্য তাকে ১০০ ডলার জরিমানাও করা হয়। এতেও সুজ্যান বি এ্যান্থনি থেমে থাকেন নি; তিনি ১৮৬৯ সালে আমেরকিার নারীদের ভোটাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জাতীয় সংঘ গড়ে তোলেন। এ বছর উইমিংগে নারীসমাজের ভোটাধিকার প্রদান করা হয় এবং ১৮৯৩ সালে কোলোরাডোতে, ১৮৯৬ সালে আডাহো এবং ইউটাতে নারীর ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ধীর গতিতে হলেও নারীসমাজের মুক্তির লক্ষ্যে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত থাকে এবং পরিণতিতে ১৯২০ সালে আমেরিকায় নারীদের ভোটাধিকার আইনের স্বীকৃতি লাভ করে। সুতরাং আমরা বলতে পারি, নারীবাদ প্রাথমিক পর্যায়ে নারীসমাজের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে নারীমুক্তির নানামাত্রিক আন্দোলন, বাধা-বিপত্তির মাধ্যমে নারীসমাজের নাগরিক অধিকার এবং ভোটাধিকার প্রভৃতি ধারণা আরও পরিমার্জিত পরিশোধিত পরিবর্ধিত হয়ে তত্ত্বীয়ভাবে একটি দার্শনিক ভাষ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যা পরবর্তীতে নারীবাদী তত্ত্ব বা ফেমিনিজম হিসেবে শিল্পে-সাহিত্যে-দর্শনে স্থান করে নিয়েছে।
প্রাথমিকভাবে নারীবাদী ধারণা বা তত্ত্ব যাই থাকুক না কেন [ভোটাধিকার, নাগরিক অধিকার, সামাজিক অধিকার প্রভৃতি] বর্তমানে নারীবাদী তত্ত্ব এমন একটি অবস্থায় উপনীত হয়েছে যার সাথে শিল্প-সাহিত্য-দর্শন এমনকি রাজনীতি কিংবা সামাজিক মূল্যবোধ নির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীবাদী তত্ত্বের বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। ফলে নারীবাদী চিন্তাচেতনার উদ্ভব, ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে অধ্যয়ন ও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা একালের শিল্প-সাহিত্যে অনস্বীকার্য এবং অনিবার্য হয়ে উঠেছে। একজন নারী-লেখক যেভাবে তার চোখ দিয়ে সমাজবাস্তবতার মধ্যে নারী-জীবনকে দেখেছেন, তা হয়তো কোনো পুরুষ লেখক কখনোই দেখেন নি। সাহিত্য মানবজীবনকে ঘিরেই বিকশিত বিবর্তিত এবং পল্লবিত হয় বলে এতে নরনারী উভয়ের-ই জীবন চিত্রিত হয়। আমরা জানি, কোনো কোনো নারী-লেখক যেমন নারীকে পুরুষায়িত দৃষ্টিতে দেখেছেন তেমনি কোনো কোনো পুরুষ লেখকও নারীকে মানুষের মর্যাদায় কিংবা নারীবাদী দৃষ্টিতে শিল্পে-সাহিত্যে উপস্থাপন করেছেন। এ প্রসঙ্গে সমালোচকের মন্তব্য স্মরণীয় :
নারীর জৈবিক অস্তিত্ব যেমন তার তথাকথিত ‘হীনতা’র নির্ধারক হতে পারে না, তেমনি কেবলমাত্র পুরুষ হওয়ার সুবাদে কাউকে পীড়নযন্ত্রের প্রতিনিধি ভেবে নেওয়া যায় না। এটা ঠিক যে পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক হয়ে ওঠার সুযোগ পুরুষের পক্ষেই সহজাত ও স্বাভাবিক; কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে আমরা তো জেনেছি, পুরুষতন্ত্র দ্বারা উপনিবেশীকৃত মন নিয়ে নারীসমাজের গরিষ্ঠ অংশ এখনো অক্লান্তভাবে নারীর যাবতীয় শৃঙ্খলাকে অটুট রাখতে সচেষ্ট। সুতরাং প্রতিটি নারী যেমন নারীচেতনাবাদী নয়, তেমনি প্রতিটি পুরুষও নয় পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি।৭
জীবনকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বলা হয়, সংগ্রামই জীবন; আর এই সংগ্রামে সমাজের নারী-পুরুষ উভয়ই সমানভাবে ক্রিয়াশীল। অনস্বীকার্য, সমাজে নারীর অস্তিত্ব অপরিহার্য। অথচ পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বীয় অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। এক্ষেত্রে নারীর জীবনসংগ্রাম এবং পুরুষের জীবনসংগ্রাম সমান্তরাল ভাবার অবকাশ নেই নারীকে শুধুমাত্র সমাজে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হয়; সেখানে পুরুষের জীবনসংগ্রামের লক্ষ্য নিজেকে মেধা-মননে প্রজ্ঞায় এবং শিক্ষা-দীক্ষায় বিকশিত করে তোলার। সুতরাং নারীর জীবনসংগ্রামের অর্থ পুরুষের থেকে আলাদা। ফলে তার জীবনচেতনা, জীবনবোধ ইত্যাদি প্রকাশের ভাষাও ভিন্নতর। পুরুষের চোখে নারী কখনো প্রোজ্জ্বল ক্লেদ, কখনো কামকলার আকর, আর কখনো অর্ধেক মানুষ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার নারীসমাজের চমৎকার তথ্য দিয়েছেন এভাবে :
ঘরে কাজ করি শান্ত হয়ে
সবাই বলে ‘ভালো’।
তারা দেখে আমার ইচ্ছার নেই জোর।
সাড়া নেই লোভের
ঝাপ্টা লাগে মাথার উপর,
ধুলোয় লুটাই মাথা।
দুরন্ত ঠেলায় নিষেধের পাহারা কাত করে ফেলি
নেই এমন বুকের পাটা;
কঠিন করে জানি নে ভালোবাসতে
কাঁদতে শুধু জানি,
জানি এলিয়ে পড়তে পায়ে।৮
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নারীর যে জীবনচিত্র এখানে অঙ্কন করেছেন, তা সেকালে কতটা সত্য ছিল সে প্রশ্ন না তোলা হলেও সমকালে এ চিত্র যে বাস্তবানুগ নয়, তা কথাবাহুল্য। কেননা নারী শুধুই ‘কাঁদতে’ জানে, সমকালীন সমাজ প্রেক্ষাপটে একথা মেনে নেওয়া যায় না। কেননা আমরা দেখছি, একালে নারীও যুদ্ধক্ষেত্রে পুরুষ সৈনিকের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার মতো সাহসী কাজেও লিপ্ত হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায়ও পুরুষের সমকক্ষ অবদান রাখতে সক্ষম নারীসমাজ। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক চিত্রিত বাঙালি নারীর ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা পুরোপুরি অস্বীকার করার খুব একটা সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হয়, রবীন্দ্রনাথের কাল, বাংলার সমাজবাস্তবতা। সেকালের সমাজে বাংলা জনপদে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক বর্ণিত নারীজীবনের এ চিত্রই সম্ভবত স্বাভাবিক ছিল। একাধারে এ বর্ণনায় সমাজবাস্তবতা এবং পুরুষবাদী দৃষ্টিতে নারীর সামাজিক পরিচয় বিধৃত হয়েছে। অন্যদিকে আরেক পুরুষ লেখক কাজী নজরুল ইসলামের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় :
জগতের যত বড় বড় জয়, বড় বড় অভিযান,
মাতা ভগ্নি ও বধূদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান।৯
এখানে কবি নজরুল একজন পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও মানবসভ্যতার বিবর্তন ইতিহাসে নারীসমাজের অবদান অবলীলায় স্বীকার করে নিয়েছেন। তাদেরকে প্রাপ্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতেও তিনি কুণ্ঠিত নন। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় নারীজীবন কী শুধুই ত্যাগের মহিমায় কীর্তিত হবে? নাকি নারীকেও তার স্বীয় অস্তিত্বের স্বীকৃতি প্রদান করে পুরুষের মতো দোষ-ত্রুটি, ভালো-মন্দ, আশা-নিরাশার অধীন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে মানবীয় সাধারণ প্রবণতার স্বীকৃতি দেওয়া হবে? ফলে এরকম ভাবলে অন্যায় হবে না যে, নজরুল কর্তৃক নারীসমাজের ত্যাগমহিমা কীর্তনের মাধ্যমে কৌশলে নারীকে পুরুষের তথা পুরুষতন্ত্রের অধীনে রাখার ইঙ্গিত বহন করে। নারীকে নানা কৌশলে পুরুষসমাজ শৃঙ্খলিত করে রাখতে চায়, সম্ভবত এ কারণেই পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি কাজী নজরুল ইসলাম নারীজীবনের ত্যাগের মহিমা কীর্তনের মাধ্যমে নারীকে মানুষের মর্যাদায় সমাজে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ দিতে চান নি।
মানুষ (পুরুষের সমান) হিসেবে সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনই নারীবাদের মূল কথা। নারীবাদী ধারণা অনেক কণ্টকাকীর্ণ পথ-পরিক্রমার মধ্য দিয়ে দর্শনে শিল্প-সাহিত্যে, সমাজে-রাজনীতিতে একটি প্রতিষ্ঠিত মতবাদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। শিল্প-সাহিত্যে তত্ত্বগতভাবে বর্তমানে নারীবাদ স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক মতবাদ। কিন্তু বাস্তব সমাজজীবনে প্রকৃত অর্থে নারীসমাজ মানুষ হিসেবে পুরুষের সমকক্ষ মর্যাদা অদ্যাবধি সর্বত্র লাভ করতে পারে নি। নারীর এই সামাজিক পরিচয় প্রসঙ্গে সিমোন দ্য বুভ্যুয়ার তাঁর ‘দ্য সেকেণ্ড সেক্স’ গ্রন্থে লিখেছেন :
আর্থিক জীবন, তাদের সামাজিক উপযোগিতা, বিয়ের মর্যাদা প্রভৃতিতে পুরুষ অধিকার ক’রে আছে যে-সুবিধাজনক স্থান, তাতে নারীরা উৎসাহ বোধ করে পুরুষদের খুশি করতে। নারীরা এখনো, অধিক অংশে, আছে অধীন অবস্থায়। তাই নারী নিজেকে দেখে না এবং তার পছন্দগুলোও করে না তার প্রকৃত স্বভাব অনুসারে, বরং করে যেভাবে পুরুষ তাকে সংজ্ঞায়িত করে।১০
বিশ শতকের মধ্য ভাগে রচিত ‘দ্য লাজিয়াম সেক্স’ গ্রন্থে নারী-সমাজ সর্ম্পকে ব্যুভুয়ার যে উচ্চারণ করেছিলেন, তা একুশ শতকের পুঁজিবাদী বিশ্বে আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। কারণ, এখনো নারীরা পুরুষশাসিত সমাজের অধীন এবং তাদের পছন্দ অনুযায়ী নিজেদের নির্মাণ বা তৈরি করে চলেছে; সেই অর্থে নারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থানের খুব একটা পরিবর্তন হয় নি। অর্থাৎ তত্ত্বগতভাবে নারীবাদী চিন্তাচেতনার ব্যাপক বিকাশ ও প্রচার প্রসার ঘটলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তথা বাস্তব সমাজজীবনে মানুষ হিসেবে নারীর অধিকার কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে!
তথ্যপঞ্জি ও টীকা :
Sally wehmeier (ed.), Oxford Advanced Learner Dictionary, 6th edition, Newyork : Oxford University Press, 2002, P. 466
2 Encyclopaedia Britannica, By Encyclopaedia Britannica Inc. [Vol-9], Publisher : William Benton, Chicago, London, Toronto; 1959, P. 154 [ভাবানুবাদ]
৩ ‘[…] ফ্রান্স, ইংল্যাণ্ড, ও যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতিক অধিকার সহজে অর্জিত হয়নি। ১৮৬৭ অব্দে জন স্টুয়ার্ট মিল ইংরেজি সংসদে নারীদের ভোটাধিকারের পক্ষে প্রথম বক্তৃতা করেন, এটাই নারীর ভোটাধিকারের প্রথম সরকারিভাবে প্রদত্ত বক্তৃতা। তাঁর লেখায় তিনি পরিবারে ও সমাজে নারীপুরুষের সাম্যের জন্যে প্রবলভাবে দাবি জানান।’ Ñসিমোন দ্য বোভোয়ার, দ্বিতীয় লিঙ্গ, [অনুবাদ : হুমায়ুন আজাদ], ১ম প্র, ঢাকা : আগামী প্রকাশনী, ২০০১, পৃ.১০৪
৪ সিমোন দ্য বোভোয়ার, দ্বিতীয় লিঙ্গ, পূর্বোক্ত; পৃ.১০৪
৫ তদেব
৬ তদেব, পৃ.১০৫
৭ তপোধীর ভট্টাচার্য, বাখতিন : তত্ত্ব ও প্রয়োগ, ১ম প্র, কলকাতা : পুস্তক বিপণি, ১৯৯৬, পৃ.৩৪
৮ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘বাঁশিওআলা’ (শ্যামলী), রবীন্দ্র-রচনাবলী [১০ম খণ্ড], ঐতিহ্য সং, ২য় মু, ঢাকা : ঐতিহ্য, ২০০৪; পৃ.১৭০
৯ কাজী নজরুল ইসলাম, ‘নারী’ (সাম্যবাদী), আবদুল কাদির সম্পাদিত, নজরুল-রচনাবলী (১ম খণ্ড), ১ম পুনর্মু [নতুন সংস্করণের], ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬; পৃ.২৪২
১০ সিমোন দ্য বোভোয়ার, পূর্বোক্ত; পৃ.১১২</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/178243/</link>
				<pubDate>Wed, 23 Nov 2022 19:42:50 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>ফেমিনিজম&gt;&gt;&gt;&gt;<br />
========================<br />
নারীবাদী তত্ত্ব : পুরুষতান্ত্রিক সমাজ<br />
 ========================<br />
নারীবাদ শব্দটি ইংরেজি ফেমিনিজম শব্দের বাংলা পরিভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। অক্সফোর্ড অভিধানে ফেমিনিজম শব্দটির অর্থ করা হয়েছে : ‘বিলিফ ইন দ্য প্রিন্সিপল দ্যাট ওম্যান শ্যুড হ্যাভ দ্য সেম রাইটস অ্যান্ড অপরচ্যুনিটিস (লিগ্যাল&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-178243"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/178243/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>7</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">0ed2274ace6a9e9e0ef3921f1b30010d</guid>
				<title>মঞ্চায়নের সীমাবদ্ধতা : প্রসঙ্গ কাব্যনাটক
===========================
সাহিত্য ভূঁইফোড় কোনো বিষয় নয়; সমাজ উদ্ভূত ঊর্বর চিন্তাচেতনাজাত ভাবগত সৃষ্টি। অর্থাৎ সৃষ্টিশীল বা প্রতিভাবান মানুষের মননসৃষ্ট সামাজিক উপরিকাঠামো (সুপার স্ট্রাকচার) হচ্ছে সাহিত্য। সমাজে বসবাসরত মানবগোষ্ঠীর আচরিত জীবনযাপন, বিশ্বাস, কর্ম-প্রয়াস ইত্যাদি সাহিত্যের উপাদান। সাহিত্য উন্নত-পরিশীলিত জীবনযাপন প্রণালী এবং রুচিসম্পন্ন জীবনদর্শনের ইঙ্গিত দেয়।

উপরন্তু প্রতিনিয়ত জীবনজিজ্ঞাসার মুখোমুখি মানবগোষ্ঠী সাহিত্যে জীবন সহায়ক দিকনির্দেশনা পায়। এছাড়াও মানবজীবনের রুচি সংস্কৃতি ঐতিহ্য পরিবর্তন-পরিশীলনে সাহিত্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করলেও, সে কখনই তার প্রতিবেশ পৃথিবীর সাথে সম্পর্কহীন অথবা স্বজন-প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, জাতি, প্রাকৃতিক পরিবেশবিহীন একাকী অসামাজিক জীবনযাপন করতে পারে না। কিন্তু বস্তুজগতের সংস্পর্শে থেকেও মানবমননে কল্পনার এক মায়াবীজগত রয়েছে।

ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি বস্তুবিশ্বের রূপে রসে গন্ধে শব্দে স্পর্শে অনুরণিত হয়ে জাগতিক জীবনযাপন, পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রভাবে সৃষ্টিশীল মানুষের হৃদয় উৎসারিত বক্তব্যবিষয় যে সুরে প্রকাশিত হয়, তাই সাহিত্য। মানুষের জীবন-যাপনের রীতি-নীতি-পদ্ধতি, সামাজিক ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি রুচিবোধ প্রভৃতি এক রকম, নয় বৈচিত্র্যপূর্ণ। বিচিত্র মানবজীবনের প্রকাশক সাহিত্যও নানান শাখা-উপশাখা এবং শ্রেণী-উপশ্রেণীতে বিভক্ত। উপমহাদেশীয় বা সংস্কৃত আলংকারিকগণ ‘সাহিত্য’ অর্থে শুধুমাত্র ‘কাব্য’ শব্দটি গ্রহণ করে, তাঁরা কাব্যকে (সাহিত্য অর্থে) দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, কাব্য বা সাহিত্য দুই প্রকার- দৃশ্যকাব্য এবং শ্রব্যকাব্য। ‘শ্রব্যকাব্য’ অর্থে সংস্কৃত আলংকারিকগণ সমস্ত পাঠ্যসাহিত্যকে বোঝাতে চেয়েছেন। নাট্যশাস্ত্রবিদ ভরত বলেন, ‘নাটক ছাড়া কবিতা নেই।’ সংস্কৃত পণ্ডিতগণের বিভাগ অনুযায়ী নাট্যসাহিত্য দৃশ্য ও শ্রব্যকাব্যের সমন্বয়ে রচিত। আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন:

আধুনিক বাংলা সাহিত্য কোন বিষয়েই সংস্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রের সংজ্ঞাকে গ্রহণ করে নাই, করিবার কথাও নহে; আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সকল বিভাগই প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবজাত, সংস্কৃতের ভাব-জাত নহে। অতএব নাটককেও সংস্কৃতের অনুযায়ী দৃশ্যকাব্য বলিয়া নির্দেশ না করিয়া ইংরেজি সাহিত্যের অনুরূপ drama বা নাটক বলিয়া নির্দেশ করা সঙ্গত।

আধুনিকতার নামে ইউরোপীয় সাহিত্যের অন্ধ-অনুকরণ প্রবণতা বাংলা সাহিত্যের পায় দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়ে দিয়েছে; যা সর্বার্থে গ্রহণীয় হতে পারে না। পাঠ্যসাহিত্য গীতিকবিতা, কাহিনীকবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত। বিষয়গত ও প্রকরণগত নিরিখে নাট্যসাহিত্যেরও নানান শ্রেণী-উপশ্রেণী রয়েছে। নাট্যকার দৃশ্যগুণ এবং শ্রব্যগুণের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চে গতিশীল মানবজীবনের কাহিনী কুশীলবগণ অভিনয় নৈপুণ্যে নাট্যসাহিত্যে ফুটিয়ে তোলেন। নাট্যসাহিত্যের অভিনয় প্রসঙ্গে বিরূপ সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও নাটক সাধারণত দর্শকের সামনে মঞ্চায়নের উদ্দেশ্যে রচিত হয়। তবে লিখিত নাটকটির সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই পাঠ্যমূল্য বর্তমান। এজন্যই শুধুমাত্র পাঠেও নাটকের সাহিত্যরসোপলব্ধি ঘটতে পারে। কিন্তু নট-নটীর সহায়তায় রঙ্গমঞ্চে নাটক অভিনীত হলে নাট্যকার একই সময় অনেক সংখ্যক দর্শক-শ্রোতার মনে সাহিত্যরস সঞ্চার করতে পারেন। প্রসঙ্গত একথাও সত্য :

অভিনয় নাটকের একটি প্রধান লক্ষ্য হইলেও, ইহা যে একমাত্র লক্ষ্য তাহা বলিতে পারা  যায় না। সংস্কৃত নাটক কোনদিন কোথাও অভিনীত হইয়াছিল কি না, তাহা জানিতে পারা যায় না; সম্ভবত অধিকাংশ নাটকই অভিনীত হয় নাই,- পাঠ্যরূপেই শিক্ষিত সমাজের মনোরঞ্জন করিয়াছে। অথচ সংস্কৃত নাটক শত শত বৎসর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। বাংলা নাটকের সম্পর্কে সংস্কৃত নাটকের কথা বাদ দিলেও দেখিতে পাওয়া যায় যে, আধুনিক ইউরোপীয় নাটকে দৃশ্যগুণ অপেক্ষা পাঠ্যগুণই অধিকতর বর্ধিত হইয়াছে। ... অতএব যথার্থ শিল্পগুণ নাটকের ভিতর দিয়া প্রকাশ পাইলে কেবলমাত্র পাঠ্যরূপেও তাহা রসিকমনকে আনন্দ দিতে পারে। সুতরাং রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ব্যতীত কেহই নাটক রচনার প্রেরণা অনুভব করিতে পারেন না- এরূপ ধারণার কোন সঙ্গত কারণ দেখিতে পাওয়া যায় না। বিশেষত আধুনিক Reading Drama বা Literary Drama-র সঙ্গে রঙ্গমঞ্চের কোন সম্পর্ক নাই।

নাট্যসাহিত্য পাঠক-দর্শক-শ্রোতার সাথে যোগাযোগের (কম্যুনিউকেশন) মাধ্যম হিসেবে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে অধিকতর সফল ও কার্যকরী। পাঠ্যসাহিত্য সাধারণত পাঠক একা পাঠ করেন এবং এককালীন প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক পাঠকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না। কিন্তু যেকোনো নাটকের একেকটি মঞ্চায়নেই ততোধিক দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে নাট্যকলা (পারফর্মিং আর্ট) অগ্রবর্তী, কেননা নাট্যসাহিত্য পাঠ্যসাহিত্যেরও অন্তর্গত। উপরন্তু রঙ্গমঞ্চের অভিনয়ে নাট্যসাহিত্য পাঠক-দর্শক-শ্রোতার নিকট জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং সাহিত্যরস সঞ্চার করে।

এক.

বিশুদ্ধ নাটক এবং কাব্যনাটকের মধ্যে পার্থক্য আছে- একথা আজ আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না; টিএস এলিয়টের ‘দ্য রক’ [১৯৩৪] রচনার পর প্রায় শতাব্দী গত হতে চলেছে। ফলে নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, নাট্যাভিনেতা সকলেই নাটক আর কাব্যনাটকের মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, তা মেনে নিয়েছেন এবং এ বিভিন্নতা মেনে নিয়েই তা মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে। সাহিত্যের প্রায় সব শাখারই প্রাচীন ও মধ্যযুগে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির মধ্য দিয়ে চর্চার সূত্রপাত, বিকাশ ঘটেছে। নাটকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি। প্রাচীনকালে গ্রীসে ডাইয়োনিসিস দেবতার পূজা উপলক্ষে এক ধরনের গান-বাজনার আয়োজন করা হতো, এখান থেকেই গ্রীক ট্র্যাজেডির উদ্ভব ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রেও দেখা যায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর থেকেই এর উদ্ভব; ভারত উপমহাদেশের লোকাচারে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য এখনো বিদ্যমান। এ থেকেও বোঝা যায়, নাট্যশাস্ত্রের জন্ম-ইতিহাসও ধর্মীয় জীবনাচরণের সঙ্গে প্রযুক্ত। প্রাচীন কাল থেকে নাটকে বর্তমান পর্যন্ত বিকাশের ধারাপরম্পরায় এর গঠন এবং বিষয়গত দিক বিচিত্র ধরনের। সেকালের নাটক সাধারণত পঞ্চাঙ্ক বিশিষ্ট ছিল; একালে চার-তিন অঙ্ক বিশিষ্ট নাটকের পাশাপাশি একাঙ্কিকাও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

নাটকে মূলত নাট্যকার তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা ও জীবনবোধকে সংলাপের দ্বারা দর্শকের সাথে [পাঠকও হতে পারে] সংযোগ স্থাপন করেন। এজন্য তিনি নট-নটীর সহায়তা নিয়ে ঘটনাকে মঞ্চে উপস্থাপন করেন। দ্য নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে : ‘প্লে রাইট ক্যান এক্সারসাইজ বেটার কনট্রোল বোথ ওভার স্পিচ এ্যান্ড মুভমেন্ট অব হিজ এ্যাক্টোর্স এ্যান্ড ওভার দ্য রেসপন্স অব হিজ অডিয়েন্স বাই ইউজিং দ্য মোর সাবটেল এ্যান্ড রাইমস গুড প্রেটি।’ এনসাইক্লোপেডিয়ার এ বক্তব্য থেকে স্পষ্টই বোধগম্য হয় যে, নাটক মঞ্চায়নযোগ্য শিল্প। যেকোনো পাঠ্যসাহিত্যের তুলনায় নাটক দর্শক তথা পাঠকের মনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম তার প্রকরণগত কারণে। ফলে নাটকে মঞ্চায়নের ব্যাপারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচক এজন্যই বলেন :

&#039;সাহিত্যশিল্পের অন্যসব শাখায় স্রষ্টা ও উপভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক সরাসরি। উপন্যাস, ছোটগল্প, কাব্য, প্রবন্ধ ইত্যাদি যাই-হোক-না কেন, তার সঙ্গে পাঠকের রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়। দর্শক অভিনয়ের মাধ্যমে সেই নাটকের রস উপভোগ করেন, আনন্দ লাভ করেন। নাটকের এই ‘থিয়েট্রিক্যাল ভ্যালু’ তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। অবশ্য নাটকের ‘লিটারারি ভ্যালু’ নির্ণয়ের জন্য ‘রিডিং ড্রামা’ বলে নাটকের বিচার করা হয়। সাহিত্যের শিল্পগত বিচারে সেখানে নাটকের পাঠ্যরূপের বিচার চলে।&#039;

শৈল্পিক বিচারের মানদণ্ডে কোনো নাটকের নান্দনিকতা সম্পূর্ণভাবে মঞ্চসাফল্যের ওপর নির্ভরশীল- এমন কথা একবাক্যে বলা না গেলেও তা অনেকখানিই নির্ভরশীল। কারণ, একটি নাটক মঞ্চে ভালো নট-নটীদের দ্বারা মঞ্চস্থ করা না গেলে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; এক্ষেত্রে দর্শক যদি রঙ্গমঞ্চের অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয়ে সন্তুষ্ট না হয়- সেক্ষেত্রে নাট্যকারের মূল বক্তব্যও হয়তো দর্শকের কাছে নাও পৌঁছাতে পারে। লিখিত একটি ভালো নাটকেরও এক্ষেত্রে মন্দ পরিণাম গুনতে হতে পারে! যদিও মঞ্চায়নই নাটকের একমাত্র শিল্প-বিচারের মানদণ্ড নয়; তথাপি একথা সত্য যে, মঞ্চায়নের দ্বারা নাটক থেকে বাড়তি শিল্পরস পাওয়া যায়। এ বিবেচনায় লিখিত একটি নাটক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং তা পূর্ণাঙ্গ শিল্পও বটে! নাট্যকারের মঞ্চজ্ঞান থাকা আবশ্যক না হলেও তাঁর মঞ্চ-ধারণা নাটকটির সর্বাঙ্গ সুন্দর করে তুলতে যে সহায়তা করে তা নিঃসন্দেহ।

নাট্যকার লিখিত নাটকটির মাধ্যমেই তাঁর বক্তব্যবিষয় ব্যক্ত করেন। কিন্তু কোনো নাটক মঞ্চায়নের জন্য প্রযোজকের অর্থায়নে পরিচালক-নির্দেশক, কুশীলব নিয়োগ এবং পরিশেষে পরিচালক-নির্দেশকের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কুশীলবগণ রঙ্গমঞ্চে স্বীয় অভিনয় নৈপুণ্যে নাট্যকাহিনী ফুটিয়ে তোলেন। ‘নাট্যকার নাটক লেখেন, সেই লিখিত নাটক রঙ্গমঞ্চের মাধ্যমে দর্শকের সামনে হাজির হয়। আর নাটক অভিনীত হতে গেলেই, নির্দেশক, রঙ্গমঞ্চ, রঙ্গমঞ্চের নানা উপকরণ ও প্রস্তুতি, অভিনেতা-অভিনেত্রী- এসব কিছুর প্রয়োজন হয়। তাই লিখিত নাটক তার এক-তৃতীয়াংশ মাত্র। দুই-তৃতীয়াংশ রয়েছে নাট্য প্রযোজনার বিবিধ প্রস্তুতি ও সহযোগিতার মধ্যে।’ ফলে মঞ্চস্থ নাটকটির সাথে নাট্যকারের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এজন্য কখনো কখনো মঞ্চস্থ নাটকের সঙ্গে নাট্যকারের মতবিরোধও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ মঞ্চস্থ নাটক একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে বিচার্য বিষয়। সামগ্রিক বিচারে মঞ্চস্থ নাটক নাট্যকারের একক সৃষ্টি নয়; বরং পরিচালক-নির্দেশক-কুশীলব সকলের যৌথ ও সমন্বিত শিল্প প্রয়াস। কেননা প্রযোজক-পরিচালক-নির্দেশক ও কলা-কুশলীদের সার্বিক সহায়তায় মঞ্চস্থ হয়। তবে পাঠ্যনাটকটি সবসময় স্বাধীন। কেননা লিখিত নাটকটিও সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং পাঠক পূর্ণ সাহিত্যরস আস্বাদন করে থাকেন। অতএব বলা যায়, মঞ্চায়ন বাদ দিয়েও নাটক থেকে স্বতন্ত্র শিল্পরূপে সাহিত্যরস আস্বাদন করা সম্ভব। তবে মঞ্চস্থ নাটক [পারফর্মিং আর্ট] সামাগ্রিক বা যৌথ শিল্পপ্রয়াস। এজন্য মঞ্চস্থ নাট্যশিল্পকে [পারফর্মিং আর্ট] সমন্বিত দলীয় কর্মপ্রয়াস বা ‘টিম-ওয়ার্ক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টিমের কোনো একটি অংশের বিশেষ সফলতায় মঞ্চস্থ নাট্যকলার সামগ্রিক সাফল্য নির্ভর করে না; ‘নাট্যায়ন একটি যৌথশিল্প, নাটকের স্ক্রিপ্ট সেখানে একটি অবলম্বন বা সংকেত মাত্র। অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনয় কুশলতা বাক্য প্রক্ষেপণের ঢঙ্ আবহ ধ্বনির ব্যবহার, মঞ্চ সজ্জা এ সবকিছুর সম্মিলিত ফল হল নাটক।’ কিন্তু নাট্যসাহিত্য একক এবং স্বাধীন শিল্পমাধ্যম। তবে নাট্যসাহিত্যকে মঞ্চস্থ হতে হলে, সুক্ষ্ম এবং নানামুখি সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে পথ চলতে হয়। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, নাট্যসাহিত্য শুধুমাত্র মঞ্চস্থ হওয়ার সময় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়, অন্যথায় নয়।

নাট্যকারের নাটক তৎকালীন ‘মঞ্চব্যবস্থার’ মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে উপস্থিত হয়। তাহলে নাটক ও দর্শকের মাঝে থেকে যাচ্ছে মঞ্চব্যবস্থা। ‘মঞ্চব্যবস্থা’ কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। সংক্ষেপে ‘মঞ্চব্যবস্থা’ বলতে বোঝায়, সেই যুগের রঙ্গমঞ্চ স্টেজ (Stage); সেই রঙ্গমঞ্চের মধ্যে দৃশ্যসজ্জার ব্যবস্থা, রূপসজ্জা, সাজপোশাকের ব্যবস্থা, আলো ও তার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, সেট-সেটিংস, উইংস-এর ব্যবস্থা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যোগ্যতা ও প্রতিভা, মঞ্চাধ্যক্ষ তথা পরিচালকের নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, প্রযোজক বা অর্থলগ্নী করেন যে বা যারা তাদের মূলধন বিনিয়োগের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা এবং সমকালীন দর্শক সম্প্রদায়ের নাট্যরস উপভোগের মানসিক অবস্থা- এইসব নিয়েই গড়ে সেই সময়কার ‘মঞ্চব্যবস্থা’।

নাটক মঞ্চায়নে অনেক সীমাবদ্ধতা-জটিলতা থাকা সত্ত্বেও প্রাচীনকাল থেকে আরম্ভ করে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত মঞ্চস্থ নাটকের তথা সামগ্রিকভাবে নাটকের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বলা যায়, সমকালে নাটক শিখরস্পর্শী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। উপরন্তু আধুনিক কালে নাটক অনন্য শিল্পমাধ্যম হিসেবে সাহিত্যরসিকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/177835/</link>
				<pubDate>Tue, 22 Nov 2022 16:58:06 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>মঞ্চায়নের সীমাবদ্ধতা : প্রসঙ্গ কাব্যনাটক<br />
===========================<br />
সাহিত্য ভূঁইফোড় কোনো বিষয় নয়; সমাজ উদ্ভূত ঊর্বর চিন্তাচেতনাজাত ভাবগত সৃষ্টি। অর্থাৎ সৃষ্টিশীল বা প্রতিভাবান মানুষের মননসৃষ্ট সামাজিক উপরিকাঠামো (সুপার স্ট্রাকচার) হচ্ছে সাহিত্য। সমাজে বসবাসরত মানবগোষ্ঠীর আচরিত জীবনযাপন, বিশ্বাস, কর্ম-প্রয়াস ইত্যাদি সাহিত্যের উপাদান। সাহিত্য উ&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-177835"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/177835/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>9</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">cdd0f2f0ca1cabf270d9c4d84db608ad</guid>
				<title>কোথা থেকে শুরুটা করব, সেটা ভেবে বেশ দিন কেটে গেল। যাক, লেখা নিয়ে তাড়াহুড়ো করবার মতো লেখক আমি না। এমন কোনো লেখক না যে, একদিন বা এক বছর না লিখলে দেশ জাতির বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি ধীরে চলো নীতিতে বিশ্বাস করি। তাছাড়া লেখাটা হয়ে উঠবার জন্য যতটা সময় দরকার সেটা দিতে চাই।
ভাবাভাবির এ পর্যায় এসে মনে হচ্ছে সাহিত্যের তত্ত্ব নিয়ে লেখাটাই সমীচীন হবে। এতে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে সাময়িকভাবে মুক্ত থাকা যাবে। যারা সৃজনশীল লেখক তারা তো তত্ত্বের কথা ভাবেন না; যারা সমালোচনা সাহিত্যের সাথে যুক্ত তাদের ভাবতে হয় লেখাটির ধরন কী? কিংবা প্রচলিত তত্ত্বের বাইরে দাঁড়িয়ে লিখল কিনা? লেখাটি রোম্যান্টিক নাকি বাস্তববাদী কিংবা স্যুররিয়ালিটি অথবা পোস্ট মডার্ন বিষয়ক কিনা! এসব নিয়েই শুরুটা করা যাক।।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/171595/</link>
				<pubDate>Fri, 04 Nov 2022 15:51:38 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>কোথা থেকে শুরুটা করব, সেটা ভেবে বেশ দিন কেটে গেল। যাক, লেখা নিয়ে তাড়াহুড়ো করবার মতো লেখক আমি না। এমন কোনো লেখক না যে, একদিন বা এক বছর না লিখলে দেশ জাতির বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি ধীরে চলো নীতিতে বিশ্বাস করি। তাছাড়া লেখাটা হয়ে উঠবার জন্য যতটা সময় দরকার সেটা দিতে চাই।<br />
ভাবাভাবির এ পর্যায় এসে মনে হচ্ছে সাহিত্যের তত্ত্ব নিয়ে লেখাটাই সমীচীন হবে। এতে&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-171595"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/171595/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>11</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">59b40ff8fe4a87e2943a3e8e15c2402c</guid>
				<title>অনুপম হাসান changed their profile picture</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/162069/</link>
				<pubDate>Thu, 13 Oct 2022 15:29:36 +0600</pubDate>

				
									<slash:comments>5</slash:comments>
				
							</item>
					<item>
				<guid isPermaLink="false">df41bfd54927965a815e630563bbf3ea</guid>
				<title>গল্প, উপন্যাস, নাটক কিংবা কবিতা নয়-- লিখি নীরস প্রবন্ধ। যাকে বলে সৃজনশীল সাহিত্যের সমালোচনা; কেউ কেউ আলোচনাও বলেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে সমালোচনাই। সৃজনশীল লেখকরা আবার সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না, প্রায়শ ক্ষিপ্ত হন সমালোচকের ওপর। অথচ সৃজনশীল লেখা সমালোচকের হাতে না পড়া পর্যন্ত তার কদর হয় না। লেখক চায়ও তার গল্প উপন্যাস কবিতা বা নাটক নিয়ে কোনো সমালোচক লিখুক; আর সেটা শুধু প্রশংসা। সেটা কো প্রকৃত সমালোচকের কাজ নয়। নির্মোহ না হলে সমালোচক চাটুকারে পরিণত হন।
তারপরও কেন কিভাবে যেন সমালোচনার ধারাটাতেই থেকে গেলাম; কুড়ি বছরের বেশি সময় ধরে সমালোচনা লিখতে লিখতে হাঁপিয়ে না উঠলেও এখন খানিকটা বিরক্তিই লাগে। তুলট প্ল্যাটফর্মে কী কী বিষয় নিয়ে লিখব, সেটা এখনো ভেবে শেষ করতে পারি নি। নিশ্চয় কোনো নতুন বিষয়ে লিখব।।</title>
				<link>https://toulot.com/n_astream/p/161988/</link>
				<pubDate>Thu, 13 Oct 2022 13:41:29 +0600</pubDate>

									<content:encoded><![CDATA[<div class="activity-inner"><p>গল্প, উপন্যাস, নাটক কিংবা কবিতা নয়&#8211; লিখি নীরস প্রবন্ধ। যাকে বলে সৃজনশীল সাহিত্যের সমালোচনা; কেউ কেউ আলোচনাও বলেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে সমালোচনাই। সৃজনশীল লেখকরা আবার সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না, প্রায়শ ক্ষিপ্ত হন সমালোচকের ওপর। অথচ সৃজনশীল লেখা সমালোচকের হাতে না পড়া পর্যন্ত তার কদর হয় না। লেখক চায়ও তার গল্প উপন্যাস কবিতা বা নাটক নিয়ে কোনো সমালোচক&hellip;<span class="activity-read-more" id="activity-read-more-161988"><a target="_blank" href="https://toulot.com/n_astream/p/161988/" rel="nofollow ugc">Read More</a></span></p>
</div>]]></content:encoded>
				
									<slash:comments>6</slash:comments>
				
							</item>
		
	</channel>
</rss>