Profile Photo

অনুপম হাসানOffline

  • Anupam-Hasan
  • Profile picture of অনুপম হাসান

    অনুপম হাসান

    3 years, 8 months ago

    মঞ্চায়নের সীমাবদ্ধতা : প্রসঙ্গ কাব্যনাটক
    ===========================
    সাহিত্য ভূঁইফোড় কোনো বিষয় নয়; সমাজ উদ্ভূত ঊর্বর চিন্তাচেতনাজাত ভাবগত সৃষ্টি। অর্থাৎ সৃষ্টিশীল বা প্রতিভাবান মানুষের মননসৃষ্ট সামাজিক উপরিকাঠামো (সুপার স্ট্রাকচার) হচ্ছে সাহিত্য। সমাজে বসবাসরত মানবগোষ্ঠীর আচরিত জীবনযাপন, বিশ্বাস, কর্ম-প্রয়াস ইত্যাদি সাহিত্যের উপাদান। সাহিত্য উন্নত-পরিশীলিত জীবনযাপন প্রণালী এবং রুচিসম্পন্ন জীবনদর্শনের ইঙ্গিত দেয়।

    উপরন্তু প্রতিনিয়ত জীবনজিজ্ঞাসার মুখোমুখি মানবগোষ্ঠী সাহিত্যে জীবন সহায়ক দিকনির্দেশনা পায়। এছাড়াও মানবজীবনের রুচি সংস্কৃতি ঐতিহ্য পরিবর্তন-পরিশীলনে সাহিত্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করলেও, সে কখনই তার প্রতিবেশ পৃথিবীর সাথে সম্পর্কহীন অথবা স্বজন-প্রিয়জন, বন্ধু-বান্ধব, জাতি, প্রাকৃতিক পরিবেশবিহীন একাকী অসামাজিক জীবনযাপন করতে পারে না। কিন্তু বস্তুজগতের সংস্পর্শে থেকেও মানবমননে কল্পনার এক মায়াবীজগত রয়েছে।

    ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি বস্তুবিশ্বের রূপে রসে গন্ধে শব্দে স্পর্শে অনুরণিত হয়ে জাগতিক জীবনযাপন, পরিবেশ-প্রতিবেশের প্রভাবে সৃষ্টিশীল মানুষের হৃদয় উৎসারিত বক্তব্যবিষয় যে সুরে প্রকাশিত হয়, তাই সাহিত্য। মানুষের জীবন-যাপনের রীতি-নীতি-পদ্ধতি, সামাজিক ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি রুচিবোধ প্রভৃতি এক রকম, নয় বৈচিত্র্যপূর্ণ। বিচিত্র মানবজীবনের প্রকাশক সাহিত্যও নানান শাখা-উপশাখা এবং শ্রেণী-উপশ্রেণীতে বিভক্ত। উপমহাদেশীয় বা সংস্কৃত আলংকারিকগণ ‘সাহিত্য’ অর্থে শুধুমাত্র ‘কাব্য’ শব্দটি গ্রহণ করে, তাঁরা কাব্যকে (সাহিত্য অর্থে) দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করেছেন। তাঁদের মতে, কাব্য বা সাহিত্য দুই প্রকার- দৃশ্যকাব্য এবং শ্রব্যকাব্য। ‘শ্রব্যকাব্য’ অর্থে সংস্কৃত আলংকারিকগণ সমস্ত পাঠ্যসাহিত্যকে বোঝাতে চেয়েছেন। নাট্যশাস্ত্রবিদ ভরত বলেন, ‘নাটক ছাড়া কবিতা নেই।’ সংস্কৃত পণ্ডিতগণের বিভাগ অনুযায়ী নাট্যসাহিত্য দৃশ্য ও শ্রব্যকাব্যের সমন্বয়ে রচিত। আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেন:

    আধুনিক বাংলা সাহিত্য কোন বিষয়েই সংস্কৃত অলঙ্কার শাস্ত্রের সংজ্ঞাকে গ্রহণ করে নাই, করিবার কথাও নহে; আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সকল বিভাগই প্রত্যক্ষভাবে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবজাত, সংস্কৃতের ভাব-জাত নহে। অতএব নাটককেও সংস্কৃতের অনুযায়ী দৃশ্যকাব্য বলিয়া নির্দেশ না করিয়া ইংরেজি সাহিত্যের অনুরূপ drama বা নাটক বলিয়া নির্দেশ করা সঙ্গত।

    আধুনিকতার নামে ইউরোপীয় সাহিত্যের অন্ধ-অনুকরণ প্রবণতা বাংলা সাহিত্যের পায় দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়ে দিয়েছে; যা সর্বার্থে গ্রহণীয় হতে পারে না। পাঠ্যসাহিত্য গীতিকবিতা, কাহিনীকবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত। বিষয়গত ও প্রকরণগত নিরিখে নাট্যসাহিত্যেরও নানান শ্রেণী-উপশ্রেণী রয়েছে। নাট্যকার দৃশ্যগুণ এবং শ্রব্যগুণের সমন্বয়ে রঙ্গমঞ্চে গতিশীল মানবজীবনের কাহিনী কুশীলবগণ অভিনয় নৈপুণ্যে নাট্যসাহিত্যে ফুটিয়ে তোলেন। নাট্যসাহিত্যের অভিনয় প্রসঙ্গে বিরূপ সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও নাটক সাধারণত দর্শকের সামনে মঞ্চায়নের উদ্দেশ্যে রচিত হয়। তবে লিখিত নাটকটির সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই পাঠ্যমূল্য বর্তমান। এজন্যই শুধুমাত্র পাঠেও নাটকের সাহিত্যরসোপলব্ধি ঘটতে পারে। কিন্তু নট-নটীর সহায়তায় রঙ্গমঞ্চে নাটক অভিনীত হলে নাট্যকার একই সময় অনেক সংখ্যক দর্শক-শ্রোতার মনে সাহিত্যরস সঞ্চার করতে পারেন। প্রসঙ্গত একথাও সত্য :

    অভিনয় নাটকের একটি প্রধান লক্ষ্য হইলেও, ইহা যে একমাত্র লক্ষ্য তাহা বলিতে পারা যায় না। সংস্কৃত নাটক কোনদিন কোথাও অভিনীত হইয়াছিল কি না, তাহা জানিতে পারা যায় না; সম্ভবত অধিকাংশ নাটকই অভিনীত হয় নাই,- পাঠ্যরূপেই শিক্ষিত সমাজের মনোরঞ্জন করিয়াছে। অথচ সংস্কৃত নাটক শত শত বৎসর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে। বাংলা নাটকের সম্পর্কে সংস্কৃত নাটকের কথা বাদ দিলেও দেখিতে পাওয়া যায় যে, আধুনিক ইউরোপীয় নাটকে দৃশ্যগুণ অপেক্ষা পাঠ্যগুণই অধিকতর বর্ধিত হইয়াছে। … অতএব যথার্থ শিল্পগুণ নাটকের ভিতর দিয়া প্রকাশ পাইলে কেবলমাত্র পাঠ্যরূপেও তাহা রসিকমনকে আনন্দ দিতে পারে। সুতরাং রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ব্যতীত কেহই নাটক রচনার প্রেরণা অনুভব করিতে পারেন না- এরূপ ধারণার কোন সঙ্গত কারণ দেখিতে পাওয়া যায় না। বিশেষত আধুনিক Reading Drama বা Literary Drama-র সঙ্গে রঙ্গমঞ্চের কোন সম্পর্ক নাই।

    নাট্যসাহিত্য পাঠক-দর্শক-শ্রোতার সাথে যোগাযোগের (কম্যুনিউকেশন) মাধ্যম হিসেবে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে অধিকতর সফল ও কার্যকরী। পাঠ্যসাহিত্য সাধারণত পাঠক একা পাঠ করেন এবং এককালীন প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক পাঠকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না। কিন্তু যেকোনো নাটকের একেকটি মঞ্চায়নেই ততোধিক দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সাহিত্যের অন্যান্য শাখার চেয়ে নাট্যকলা (পারফর্মিং আর্ট) অগ্রবর্তী, কেননা নাট্যসাহিত্য পাঠ্যসাহিত্যেরও অন্তর্গত। উপরন্তু রঙ্গমঞ্চের অভিনয়ে নাট্যসাহিত্য পাঠক-দর্শক-শ্রোতার নিকট জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং সাহিত্যরস সঞ্চার করে।

    এক.

    বিশুদ্ধ নাটক এবং কাব্যনাটকের মধ্যে পার্থক্য আছে- একথা আজ আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না; টিএস এলিয়টের ‘দ্য রক’ [১৯৩৪] রচনার পর প্রায় শতাব্দী গত হতে চলেছে। ফলে নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক, নাট্যাভিনেতা সকলেই নাটক আর কাব্যনাটকের মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, তা মেনে নিয়েছেন এবং এ বিভিন্নতা মেনে নিয়েই তা মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে। সাহিত্যের প্রায় সব শাখারই প্রাচীন ও মধ্যযুগে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির মধ্য দিয়ে চর্চার সূত্রপাত, বিকাশ ঘটেছে। নাটকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নি। প্রাচীনকালে গ্রীসে ডাইয়োনিসিস দেবতার পূজা উপলক্ষে এক ধরনের গান-বাজনার আয়োজন করা হতো, এখান থেকেই গ্রীক ট্র্যাজেডির উদ্ভব ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রেও দেখা যায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের ভেতর থেকেই এর উদ্ভব; ভারত উপমহাদেশের লোকাচারে ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য এখনো বিদ্যমান। এ থেকেও বোঝা যায়, নাট্যশাস্ত্রের জন্ম-ইতিহাসও ধর্মীয় জীবনাচরণের সঙ্গে প্রযুক্ত। প্রাচীন কাল থেকে নাটকে বর্তমান পর্যন্ত বিকাশের ধারাপরম্পরায় এর গঠন এবং বিষয়গত দিক বিচিত্র ধরনের। সেকালের নাটক সাধারণত পঞ্চাঙ্ক বিশিষ্ট ছিল; একালে চার-তিন অঙ্ক বিশিষ্ট নাটকের পাশাপাশি একাঙ্কিকাও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

    নাটকে মূলত নাট্যকার তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা ও জীবনবোধকে সংলাপের দ্বারা দর্শকের সাথে [পাঠকও হতে পারে] সংযোগ স্থাপন করেন। এজন্য তিনি নট-নটীর সহায়তা নিয়ে ঘটনাকে মঞ্চে উপস্থাপন করেন। দ্য নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকায় বলা হয়েছে : ‘প্লে রাইট ক্যান এক্সারসাইজ বেটার কনট্রোল বোথ ওভার স্পিচ এ্যান্ড মুভমেন্ট অব হিজ এ্যাক্টোর্স এ্যান্ড ওভার দ্য রেসপন্স অব হিজ অডিয়েন্স বাই ইউজিং দ্য মোর সাবটেল এ্যান্ড রাইমস গুড প্রেটি।’ এনসাইক্লোপেডিয়ার এ বক্তব্য থেকে স্পষ্টই বোধগম্য হয় যে, নাটক মঞ্চায়নযোগ্য শিল্প। যেকোনো পাঠ্যসাহিত্যের তুলনায় নাটক দর্শক তথা পাঠকের মনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম তার প্রকরণগত কারণে। ফলে নাটকে মঞ্চায়নের ব্যাপারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচক এজন্যই বলেন :

    ‘সাহিত্যশিল্পের অন্যসব শাখায় স্রষ্টা ও উপভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক সরাসরি। উপন্যাস, ছোটগল্প, কাব্য, প্রবন্ধ ইত্যাদি যাই-হোক-না কেন, তার সঙ্গে পাঠকের রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয়ে দর্শকের সামনে হাজির হয়। দর্শক অভিনয়ের মাধ্যমে সেই নাটকের রস উপভোগ করেন, আনন্দ লাভ করেন। নাটকের এই ‘থিয়েট্রিক্যাল ভ্যালু’ তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। অবশ্য নাটকের ‘লিটারারি ভ্যালু’ নির্ণয়ের জন্য ‘রিডিং ড্রামা’ বলে নাটকের বিচার করা হয়। সাহিত্যের শিল্পগত বিচারে সেখানে নাটকের পাঠ্যরূপের বিচার চলে।’

    শৈল্পিক বিচারের মানদণ্ডে কোনো নাটকের নান্দনিকতা সম্পূর্ণভাবে মঞ্চসাফল্যের ওপর নির্ভরশীল- এমন কথা একবাক্যে বলা না গেলেও তা অনেকখানিই নির্ভরশীল। কারণ, একটি নাটক মঞ্চে ভালো নট-নটীদের দ্বারা মঞ্চস্থ করা না গেলে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে; এক্ষেত্রে দর্শক যদি রঙ্গমঞ্চের অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয়ে সন্তুষ্ট না হয়- সেক্ষেত্রে নাট্যকারের মূল বক্তব্যও হয়তো দর্শকের কাছে নাও পৌঁছাতে পারে। লিখিত একটি ভালো নাটকেরও এক্ষেত্রে মন্দ পরিণাম গুনতে হতে পারে! যদিও মঞ্চায়নই নাটকের একমাত্র শিল্প-বিচারের মানদণ্ড নয়; তথাপি একথা সত্য যে, মঞ্চায়নের দ্বারা নাটক থেকে বাড়তি শিল্পরস পাওয়া যায়। এ বিবেচনায় লিখিত একটি নাটক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এবং তা পূর্ণাঙ্গ শিল্পও বটে! নাট্যকারের মঞ্চজ্ঞান থাকা আবশ্যক না হলেও তাঁর মঞ্চ-ধারণা নাটকটির সর্বাঙ্গ সুন্দর করে তুলতে যে সহায়তা করে তা নিঃসন্দেহ।

    নাট্যকার লিখিত নাটকটির মাধ্যমেই তাঁর বক্তব্যবিষয় ব্যক্ত করেন। কিন্তু কোনো নাটক মঞ্চায়নের জন্য প্রযোজকের অর্থায়নে পরিচালক-নির্দেশক, কুশীলব নিয়োগ এবং পরিশেষে পরিচালক-নির্দেশকের ইচ্ছা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কুশীলবগণ রঙ্গমঞ্চে স্বীয় অভিনয় নৈপুণ্যে নাট্যকাহিনী ফুটিয়ে তোলেন। ‘নাট্যকার নাটক লেখেন, সেই লিখিত নাটক রঙ্গমঞ্চের মাধ্যমে দর্শকের সামনে হাজির হয়। আর নাটক অভিনীত হতে গেলেই, নির্দেশক, রঙ্গমঞ্চ, রঙ্গমঞ্চের নানা উপকরণ ও প্রস্তুতি, অভিনেতা-অভিনেত্রী- এসব কিছুর প্রয়োজন হয়। তাই লিখিত নাটক তার এক-তৃতীয়াংশ মাত্র। দুই-তৃতীয়াংশ রয়েছে নাট্য প্রযোজনার বিবিধ প্রস্তুতি ও সহযোগিতার মধ্যে।’ ফলে মঞ্চস্থ নাটকটির সাথে নাট্যকারের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এজন্য কখনো কখনো মঞ্চস্থ নাটকের সঙ্গে নাট্যকারের মতবিরোধও দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ মঞ্চস্থ নাটক একটি স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে বিচার্য বিষয়। সামগ্রিক বিচারে মঞ্চস্থ নাটক নাট্যকারের একক সৃষ্টি নয়; বরং পরিচালক-নির্দেশক-কুশীলব সকলের যৌথ ও সমন্বিত শিল্প প্রয়াস। কেননা প্রযোজক-পরিচালক-নির্দেশক ও কলা-কুশলীদের সার্বিক সহায়তায় মঞ্চস্থ হয়। তবে পাঠ্যনাটকটি সবসময় স্বাধীন। কেননা লিখিত নাটকটিও সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতোই পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং পাঠক পূর্ণ সাহিত্যরস আস্বাদন করে থাকেন। অতএব বলা যায়, মঞ্চায়ন বাদ দিয়েও নাটক থেকে স্বতন্ত্র শিল্পরূপে সাহিত্যরস আস্বাদন করা সম্ভব। তবে মঞ্চস্থ নাটক [পারফর্মিং আর্ট] সামাগ্রিক বা যৌথ শিল্পপ্রয়াস। এজন্য মঞ্চস্থ নাট্যশিল্পকে [পারফর্মিং আর্ট] সমন্বিত দলীয় কর্মপ্রয়াস বা ‘টিম-ওয়ার্ক’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টিমের কোনো একটি অংশের বিশেষ সফলতায় মঞ্চস্থ নাট্যকলার সামগ্রিক সাফল্য নির্ভর করে না; ‘নাট্যায়ন একটি যৌথশিল্প, নাটকের স্ক্রিপ্ট সেখানে একটি অবলম্বন বা সংকেত মাত্র। অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনয় কুশলতা বাক্য প্রক্ষেপণের ঢঙ্ আবহ ধ্বনির ব্যবহার, মঞ্চ সজ্জা এ সবকিছুর সম্মিলিত ফল হল নাটক।’ কিন্তু নাট্যসাহিত্য একক এবং স্বাধীন শিল্পমাধ্যম। তবে নাট্যসাহিত্যকে মঞ্চস্থ হতে হলে, সুক্ষ্ম এবং নানামুখি সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে পথ চলতে হয়। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার, নাট্যসাহিত্য শুধুমাত্র মঞ্চস্থ হওয়ার সময় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়, অন্যথায় নয়।

    নাট্যকারের নাটক তৎকালীন ‘মঞ্চব্যবস্থার’ মধ্য দিয়ে দর্শকের কাছে উপস্থিত হয়। তাহলে নাটক ও দর্শকের মাঝে থেকে যাচ্ছে মঞ্চব্যবস্থা। ‘মঞ্চব্যবস্থা’ কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। সংক্ষেপে ‘মঞ্চব্যবস্থা’ বলতে বোঝায়, সেই যুগের রঙ্গমঞ্চ স্টেজ (Stage); সেই রঙ্গমঞ্চের মধ্যে দৃশ্যসজ্জার ব্যবস্থা, রূপসজ্জা, সাজপোশাকের ব্যবস্থা, আলো ও তার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, সেট-সেটিংস, উইংস-এর ব্যবস্থা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যোগ্যতা ও প্রতিভা, মঞ্চাধ্যক্ষ তথা পরিচালকের নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, প্রযোজক বা অর্থলগ্নী করেন যে বা যারা তাদের মূলধন বিনিয়োগের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা এবং সমকালীন দর্শক সম্প্রদায়ের নাট্যরস উপভোগের মানসিক অবস্থা- এইসব নিয়েই গড়ে সেই সময়কার ‘মঞ্চব্যবস্থা’।

    নাটক মঞ্চায়নে অনেক সীমাবদ্ধতা-জটিলতা থাকা সত্ত্বেও প্রাচীনকাল থেকে আরম্ভ করে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত মঞ্চস্থ নাটকের তথা সামগ্রিকভাবে নাটকের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বলা যায়, সমকালে নাটক শিখরস্পর্শী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। উপরন্তু আধুনিক কালে নাটক অনন্য শিল্পমাধ্যম হিসেবে সাহিত্যরসিকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

    9
    9 Comments
    • পরিতাপের বিষয় হলো মঞ্চের জায়গাটা থেকে এখন অনেক কলা-কুশলী সরে আসছে। তার কারণ হয়তো দ্রুত জনপ্রিয়তা এবং অনেকাংশে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা।

    • জেগে উঠুক মঞ্চের আলো। অভিনন্দন।

    • কাব্যনাটক বিষয়টি আমার কাছে একেবারেই নতুন। এই প্রবন্ধ পড়েই জানলাম বলা যায়। খুব আগ্রহবোধ করছি মঞ্চে কাব্যনাটক কেমন হতে পারে তা কল্পনা করে।
      শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন লেখকপ্রিয় শিল্প ও সাহিত্যের সমৃদ্ধির পথে আমাদের আরো এক ধাপ এগিয়ে নেয়ার জন্য। জয় হোক!

      • এটা সর্বশেষ সংযোজন সাহিত্যে। কবিতার পথ যখন শেষ হয়, নাটক যখন চলতে পারে না, তখন শুরু হয় কাব্যনাটকের পথচলা। এটা না কবিতা না নাটক, বরং দুটোর সুষম সমন্বয়। কবিতার অন্তর্গত বিষয়কে কাব্যনাটকে মঞ্চায়িত করা হয়।
        শুভেচ্ছা জানবেন।। ভবিষ্যতে হয়তো বিষয়টি নিয়ে আরও লেখা পোস্ট করব।

      • ধন্যবাদ লেখকপ্রিয়! কাব্যনাটক নিয়ে আরো লেখালেখি হোক এই প্রত্যাশায় থাকব! শুভ কামনা রইল!

Skip to toolbar