-
পোস্ট মডার্নিজম>>>>
উত্তরাধুনিকবাদী তত্ত্ব : আশাবাদী অভিযাত্রা
===============================
মানুষ আগুন আর হাতিয়ারের ব্যবহার শেখার মধ্য দিয়ে আধুনিকতার পথে যাত্রা শুরু করেছিল। সেই যাত্রা পথ এতটাই দীর্ঘ যে, শুরুর কথা বলতে গেলে মনে হয়, তা প্রচণ্ড অতীত আধুনিক তো নয় বটেই। কিন্তু প্রকৃত সত্যটা হচ্ছে সমকালে সেই শুরুটাই ছিল অগ্রগামী চিন্তা, ফলে সমকালের নিরিখে তা ছিল অবশ্যই আধুনিক। এ কথার মধ্য দিয়ে অনুমান করা যায় যে, অতীত মানে পুরাতন তবে তা অনাধুনিক এমন ভাবার অবকাশ নেই। যে কথা রবীন্দ্রনাথ চমৎকার কাব্যিকতায় প্রকাশ করেছেন : ‘আধুনিকতা আসলে সময় নিয়ে নয়, মর্জি নিয়ে।’ সুতরাং সমকালের অগ্রগামী ভাবনা সব সময়ই আধুনিক। তবে এ কালে কথা উঠেছে মানব সভ্যতা আধুনিকতাকে অতিক্রম করেছে। এখন আমাদের যাত্রা উত্তরাধুনিক। অর্থাৎ এ কালের অগ্রগামী ভাবনাকে আর আধুনিক বলার অবকাশ নেই; আধুনিকতার যাত্রা পথের সমাপ্তি ঘটেছে।যন্ত্র নির্ভর বিকশিত মানবসভ্যতার চূড়ান্ত প্রগতি ভাবনার ইতি ঘটেছে; এখন যা চলছে, তা সেই আধুনিক ভাবনার নির্যাসকেই নানা প্যাটার্নে ব্যবহার। অতএব মানবসভ্যতার এই ব্যবহারিক বা উপযোগ সৃষ্টিকারী ভাবনা আধুনিক বলার বদলে আধুনিকোত্তর বা উত্তরাধুনিক বলাই উত্তম। যদি এই যুক্তি পরম্পরায় উত্তরাধুনিকতাকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে বোধ হয় আধুনিকোত্তরবাদ নিয়ে যেসব জটিলতা ও তত্ত্বের কচকচানি জটিলতা ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে কিংবা প্রচার প্রসার লাভ করেছে, তার অবসান ঘটবে।
মানবিক চিন্তারাজ্যের গুণগত পরিবর্তনের উপরোক্ত পরম্পরা স্বীকার করে শিল্প-সাহিত্যের জগতে আধুনিকোত্তরবাদ বা উত্তরাধুনিকতার তত্ত্ব নিয়ে হাজির হলে সেখানেও দেখা যায় রয়েছে অন্তহীন সমস্যার জট-জটিলতা। কারণ, সাহিত্যে ‘উত্তরাধুনিকতা’ বিষয়ক তত্ত্বের মূল কথাটিই হচ্ছে আধুনিকতার বিপরীতে এর অবস্থান; যা কিনা আধুনিকতা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন। এ কথার মধ্য দিয়ে এই তত্ত্ববিশ্বের জটিলতার সূচনা। কারণ, আধুনিকবাদের মূলে আছে প্রগতিবাদ, যুক্তি নির্ভরতা ও বিজ্ঞানের প্রমাণপত্রে বিশ্বাস ও আস্থা স্থাপন। যদি উত্তর আধুনিকবাদের অবস্থান আধুনিকবাদের বিপরীতে হয়, তাহলে বলতে হয় :
১. প্রগতির পরিবর্তে পশ্চাৎপদ ভাবনাকে মেনে নেওয়া।
২. যুক্তির বদলে বিশ্বাস স্থাপন করা।
৩. সর্বোপরি বিজ্ঞানকে অস্বীকার করা।উত্তর আধুনিকতার অবস্থান এভাবে বিন্যস্ত হলে, সেই মতাদর্শ মেনে নেওয়াটা যে বোকামি হবে তা একবাক্যে বলতে অসুবিধা নেই। তবে শিল্পে-সাহিত্যে উত্তর আধুনিকবাদের তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা-সমালোচনা হওয়ার পর মোটামুটিভাবে মেনে নেয়া হয়েছে :
১. উত্তর আধুনিকবাদ বাস্তবতার পরিবর্তে অবাস্তবতা ও ঐতিহ্যহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়।
২. নিরীক্ষামূলক শিল্প-সাহিত্যকে গুরুত্ব দেয়।
৩. বিশ শতকের প্রথমার্ধ্বের পরে পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিকাশে সামগ্রিক মানবতাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে- উত্তর-আধুনিকতা।
৪ শিল্পের সামগ্রিক ভাবনা থেকে সরে এসে উত্তরাধুনিকবাদ বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তিকে গুরুত্ব দেয়।উত্তরাধুনিক শিল্পে-সাহিত্যে এমন এক বিশ্বব্যবস্থার কথা ভাবা হয়েছে, যেখানে কোনো কিছুই পূর্বনির্ধারিত বা সুনির্দিষ্ট নয়, বরং বিশৃঙ্খল। এমনকি এখানে মানুষ ঐতিহ্যগগত কারণেও বাধাপ্রাপ্ত হয় না। কাল্পনিক বা হাইপোথেটিক্যাল এই তত্ত্ববিশ্বের পরিবর্তন ঘটে দ্রুত। কেননা জাগতিক অস্থির অস্থিতিশীলতায় প্রতিমুহূর্তে মানুষের জ্ঞানের ধারণাগত ক্রমপরিবর্তন ঘটছেই অবিরাম। ফলে উত্তরাধুনিক তত্ত্বানুসারে একক বা অভিন্ন কোনো জ্ঞানের বিকাশ ঘটে না, বরং তা বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত তথা স্বতন্ত্র জ্ঞান পরিচর্যার অভীপ্সা তৈরি করে; যা সহজে সামষ্টিক স্বীকৃতি লাভ করে না।
উত্তরাধুনিকবাদ বা আধুনিকোত্তর শব্দটির প্রথম ব্যবহার লক্ষ করা যায় ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়। অর্থাৎ কালের বিবেচনায় বিশ শতকের শেষার্ধ্বে ‘পোস্ট মডার্নিজম’ [উত্তরাধুনিকতা] শব্দটির ব্যবহার শিল্প-সাহিত্যকলায় শুরু হয়। আধুনিকতাবাদ সাহিত্যে উঁচু ও নিচু যে বিভাজন তৈরি করে রেখেছে, উত্তরাধুনিকতাবাদ তা অস্বীকার করে শ্রেণীবিভেদ লুপ্ত করে দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। বিষয়টিকে রেহনুমা আহমেদের ভাষায় বুঝিয়ে বলা যায় এভাবে :
[…] যে ব্যবস্থায় সাহিত্যকে উঁচু-নিচুতে ভাগ করা হয়, উঁচু সাহিত্য স্বীকৃতি পায়, সার্টিফিকেট পায়, যেটি পায় না সেটিই হচ্ছে জনসংস্কৃতি। সেটি বিবেচিত হয় নিম্নমানের ও ছোটলোকের সংস্কৃতি হিসেবে। […] এ ধরনের সাহিত্য থেকে দূরত্ব রচনা করাটাই জরুরী, যুক্তিবাদী প্রগতিশীল সাহিত্যকর্ম রচনা করা জরুরী, এমন ধরনের সাহিত্য যা কিনা যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে। যেটি অতিক্রমকারী একটি স্বর তৈরী করতে পারবে, সেটিই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য। সেটিই হচ্ছে আধুনিক সাহিত্য।১
রেহনুমা আহমেদের কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আধুনিকতা চায় উঁচু মানের শিল্প-সংস্কৃতি আর সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করতে এবং নিম্নশ্রেণীর সাহিত্য-সংস্কৃতি অস্বীকার করতে। অতএব উত্তর-আধুনিকতায় আধুনিকবাদের সব বৈশিষ্ট্য ধারণ করেও নিচু মানের বা জনসংস্কৃতি ও সাহিত্যকে পৃষ্ঠপোষকতা করে। এজন্য বলা হয়, উত্তর-আধুনিকতাবাদ এক অর্থে ‘গ্রাসরুট লেভেলে’ অবস্থিত মানুষের সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে বা প্রত্যাবর্তন করতে চায়। এটা প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য। নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি আপাত অর্থে সহজ মনে হলেও তা নয়; বরং এটি একটি কঠিন কাজ। এ প্রসঙ্গে মিশেল ফুকো ‘রচয়িতা বলতে কী বোঝায়’ শীর্ষক এক আলোচনায় মন্তব্য করেছেন :
আমি নিজে যদিও ঐতিহ্যের একজন অত্যন্ত গুণমুগ্ধ প্রবক্তা, তার গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন বলে দাবিদার, তবু আমি বলতে চাই যে, একই সাথে আমি সংস্কারমুক্ত মতবাদের ক্ষেত্রে গোঁড়া-মতবাদী (orthodox) : আমি মনে করি, গোঁড়া-মতবাদ হলো জ্ঞানের মৃত্যু; কারণ, জ্ঞানের বিকাশ পুরোপুরিভাবে নির্ভর করে মতপার্থক্যের অস্তিত্বের ওপর। স্বীকার্য যে, মতপার্থক্য ঝগড়া-ফ্যাসাদ, এমনকি সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। আমি মনে করি তা সত্যিকার অর্থেই অত্যন্ত গর্হিত কাজ; আমি সহিংসতাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। তৎসত্ত্বেও বলা চলে মতপার্থক্যের অস্তিত্বের কারণে আলোচনা শুরু হতে পারে; শুরু হতে পারে যুক্তি উপস্থাপন, তার খণ্ডন এবং পারস্পারিক সমালোচনা।২
সর্বদাই নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি সংরক্ষণে প্রয়াসী হলেও এক্ষেত্রে সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গোঁড়ামির অভিযোগে তাদের মৌলবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করার সুযোগ নেই। ফুকো ইউরোপ আমেরিকা কিংবা পশ্চিমা সাহিত্যের কদর না করার কথা বলেন নি, বরং তিনি নিজের সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে পশ্চিমাদের শেখানো বুলি আওরাতে নারাজ।
উত্তরাধুনিকতার আলোচনা প্রসঙ্গে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- কালগত সুস্পষ্ট ধারণা থাকা; যেভাবে আধুনিকবাদের কালগত ধারণাটির সংযুক্তি আছে উত্তরাধুনিকতার ক্ষেত্রে কালগত ধারণার কোনো সম্পর্কই নেই। অর্থাৎ মধ্যযুগের পর যেমন আধুনিক যুগ তদ্রূপ আধুনিক যুগের পর উত্তরাধুনিক যুগের আবির্ভাব ঘটেছে, এ জাতীয় ভাবনা বা ধারণার কোনো সুযোগ নেই। এর দ্বারা একটা বিষয় স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, আধুনিকবাদ ও উত্তরাধুনিকবাদের মধ্যে প্রকৃত সমস্য কালগত নয়, উভয় মতবাদের বিরোধ মূলত দৃষ্টিভঙ্গি বা বিষয়গত ব্যাপার। উত্তরাধুনিকতা মূলত একটি বিশেষ চিন্তা অথবা দৃষ্টিভঙ্গি; ফলে এখানে কাল বা সময়ের বিষয়টি যুক্ত নয়, একথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে। সমালোচকের বক্তব্য প্রসঙ্গত এরকম :
উত্তর-আধুনিকবাদের মানে আধুনিক যুগের পরবর্তী যুগ নয়, এটি কোনো ঐতিহাসিক যুগ না… যেভাবে ঐতিহাসিক যুগকে দেখা হয়, ক্লাসিকাল যুগ, তার পরবর্তী পর্যায়ে মধ্যযুগ, তারপরে আধুনিক যুগ… এটি এ ধরনের কোনো যুগ না।৩
উত্তরাধুনিকাত বিষয়ক আলোচনায় কালগত এ জটিলতার আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াও উত্তরাধুনিকবাদ খণ্ডিতকরণ এবং স্থানীয়করণের উপর জোর দিয়ে চিরকালীনতা স্বীকার করে নেয়। কিংবা ধ্রুব সত্যের ধারণাকেও অস্বীকার করে পোস্ট মডার্নিজিম বিষয়ক তত্ত্ব।
পোস্ট মডার্নিজমকে ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক জ্যাঁ বদরিলা, যিনি ‘মিডিয়া ইনটেলেকচুয়াল’ হিসেবে বিশেষ পরিচিত, তিনি পোস্ট-মডার্নিটিকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন এভাবে : ‘আই অ্যাম হোয়াট আই বাই’। জ্যাঁ বদরিলার এ বক্তব্যটি উত্তরাধুনিকতাবাদকে খুব সংক্ষেপে এবং সহজভাবে ধারণ করে। কেননা ‘বলা হয়, আধুনিতাবাদ উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছিল, পক্ষান্তরে, উত্তর-আধুনিকতাবাদ গুরুত্ব দেয় ভোগের উপর।’৪ বদরিলার বক্তব্যের মধ্যে ভোগবাদের ব্যাপারটি গুরুত্ব পেলেও মনে রাখা দরকার যে, উত্তরাধুনিকতা ভোগবাদ সর্বস্ব কোনো শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক তত্ত্ব বা মতবাদ নয়।
উত্তরাধুনিকতা যখন প্রান্তিক জনগণের সংস্কৃতির সামনে দাঁড় করিয়ে আধুনিক বিত্তবানকে প্রশ্ন করে- আপনি কী পড়েন? উত্তরে আমরা শুনি, রবীন্দ্রনাথ। কারণ, রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন ‘হাই বা এলিট সোসাইটি’র সংস্কৃতির প্রতিনিধি বা প্রতীক। তিনি কোনোভাবেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সিম্বল নন। বিত্তবান কিংবা এজন্যই এলিট শ্রেণীর নিকট কখনোই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা সুকান্তের সাহিত্য খুব একটা মর্যাদা পায় নি; কিংবা আধুনিকতায় বিশ্বাসী এলিট শ্রেণী ম্যাক্সিম গোর্কি পড়ার কথাও বলেন না। কারণ, এঁরা শিল্প-সাহিত্য চর্চা করেছেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের এড়িয়ে। ফলে উত্তরাধুনিকাবদীদের সম্বন্ধে অন্যভাবে বলা যায়, এক অর্থে যাঁরা শিল্প-সাহিত্যে প্রান্তিক জনগণের কথা বলেছেন, তাঁরা তো অন্য বিচারে বিত্তবান এলিট শ্রেণীর এবং প্রথাগত আধুনিকতার বিপক্ষেই বলেছেন। অতএব অনুমান করতে অসুবিধা হয় না, উত্তরাধুনিকবাদীরা স্বাভাবিকভাবেই আধুনিকতাসৃষ্ট পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
উত্তরাধুনিকতাবাদের আরেক জটিলতা হচ্ছে বাস্তবতা সম্বন্ধে তাদের অবস্থান কী, তা নিয়ে। এ সম্বন্ধে জ্যাঁ বদরিলা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, উত্তরাধুনিকতাবাদে আসল-নকল, বহির্ভাগ কিংবা অন্তর্ভাগের ব্যবধান ক্রমশ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে ‘হাইপার-রিয়েল’ সংস্কৃতি; যেখানে বাস্তব এবং অবাস্তবের সীমানা ধ্বসে পড়ছে। ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছেন বদরিলা এভাবে :
[…] সকলে জানেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিজনিল্যান্ড হচ্ছে ফ্যান্টাসি। সেটি বাস্তব না। […] আসলে ডিজনিল্যান্ডকে ফ্যান্টাসি হিসেবে পরিবেশন করা হচ্ছে যাতে আমাদের মনে হয়, বাদবাকি সব কিছু, অর্থাৎ ডিজনিল্যান্ডের বাইরের জগৎ হচ্ছে বাস্তব। কিন্তু আসলে ‘বাস্তব’ আমেরিকা হচ্ছে ডিজনিল্যান্ড। বাস্তব যে আর বাস্তব না, এ সত্যটি লুকানোর জন্য ডিজনিল্যান্ড জরুরি।৫
বাস্তব এবং অবাস্তবের পার্থক্য ঘুচে যাওয়ার এ ঘটনাকে সুজান বোর্দোর ব্যাখ্যায় স্পষ্ট হয়। তিনি জানিয়েছেন, আমেরিকায় এখন পঁচিশ পেরোন প্রায় সকল নারীই প্লাস্টিক সার্জনের কাছে নিয়মিত যাতায়াত করেন; কেউবা শরীর থেকে মেদ কমাচ্ছেন আর কেউবা মুখের কোচকানো চামড়া সার্জারির মাধ্যমে টাইট করছেন। বিজ্ঞানের এই সুবিধা নেয়ার পর বাস্তব এবং অবাস্তবের পার্থক্যটা যে লীন হয়ে যাচ্ছে তা নিশ্চয় আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না। কারণ, সার্জারির সহায়তায় এই যে পরিবর্তন সংঘটিত হচ্ছে, তা কী অবাস্তব, না বাস্তব- এ বিষয়ে খুব সহজে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব না! আমরা জানি যে, জন্মগতভাবে যা কিছু মানুষ পেয়েছে, তাই হচ্ছে বাস্তব। কিন্তু সার্জারির মাধ্যমে ব্যক্তির পুনগর্ঠিত চেহারা তাহলে কি অবাস্তব? এসব মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে যে, বাস্তবতা আর অবাস্তবতার ব্যাপারটিও সমকালে অনেকটাই অবান্তর হয়ে পড়েছে। সুতরাং ‘বাস্তব এবং পরিবেশন, এই দুইয়ের যে সুস্পষ্ট বিভাজন ছিল, সেটি বর্তমানের উত্তর-আধুনিক সংস্কৃতিতে, বিজ্ঞাপন, সিনেমা, এসবের কল্যাণে হাওয়া হয়ে গেছে।’৬ অতএব পার্থিব জাগতিক রিয়ালিটির বা বাস্তবতার বিদ্যমান হ-য-ব-র-ল অবস্থায় খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- তাহলে প্রকৃত বাস্তবতা কী? এ প্রসঙ্গে সমালোচকের কথা নিম্নরূপ :
এতকাল রিয়্যালিটির ভিত্তি ছিল প্রকৃতি, প্রকৃতি-প্রদত্ত, জন্মসূত্রে পাওয়া নাক… বয়সবৃদ্ধি প্রাকৃতিক, সে সাথে শারীরিক পরিবর্তন, পরিবর্ধনও প্রাকৃতিক… কিন্তু বর্তমানে, যখন কিনা কল্পিত নাকটি বাস্তবে পেতে চাই, কল্পিত মেদহীন দেহ, ফ্যান্টসি দেহে বাস্তব জীবন যাপন করতে চাই তখন? তখন, কোনটা রিয়েল? যদি রক্ত-মাংসের মানুষ সারাক্ষণ অবাস্তব সৌন্দর্য আকাঙ্ক্ষা করে… তাহলে বাস্তব এবং অবাস্তবের পূর্বতন সীমানাগুলো আর কার্যকরী থাকে না। যিনি নিজে সৌন্দর্যের প্রতীক, তাঁর সৌন্দর্যও কিন্তু নির্মিত।৭
সত্য-মিথ্যা, আসল-নকল, বাস্তব-অবাস্তব-কল্পনা এসব বিষয়ের সাংঘর্ষিক ও সীমারেখাহীন বর্তমান এই অবস্থা প্রকৃতপক্ষে আধুনিকতা তথা পুঁজিবাদের চরম বা চূড়ান্ত বিকাশেরই ফলাফল বা সৃষ্ট-সংকট। আধুনিকবাদের এই সংকটময় অবস্থাটাই উত্তরাধুনিকতা হিসেবে আখ্যায়িত হচ্ছে।
আধুনিকতা যেসব যুক্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল, সেসব যুক্তি যখন বিজ্ঞানের ক্রমোন্নয়নে ভেঙে যাচ্ছে, সেটি একটি জটিলতা, তা নিঃসন্দেহে অস্বীকার করা যায় না। উত্তরাধুনিকবাদ মানুষকে ভোগসর্বস্ব নীতির দিকে ঠেলে দিলেও আধুনিকবাদের নাক-উঁচু স্বভাব পরিত্যাগ করে, তা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে স্বীকার করে শ্রেণীহীন যে অবস্থার দিকে আমাদের ঠেলে দিচ্ছে, সেই অবস্থাটার প্রাপ্তি অনিবার্য ও অনস্বীকার্য। অর্থাৎ আধুনিকবাদে উপেক্ষিত মানবতা নবতর উত্তরাধুনিকবাদে স্বীকৃতি পাচ্ছে। শুধু যুক্তি নয়, এর সাথে উত্তরাধুনিকবাদ স্বীকার করে নেয় সত্যের ভিন্নতাকে বা বিবিধ অবস্থাকে। একই কাল ও স্থানগত ভিন্নতার বিবেচনা করা হলেও যে সত্য ভিন্ন হতে পারে, আধুনিকতার মহাবয়ান এ কথা অস্বীকার করেছিল। কিন্তু উত্তরাধুনিকবাদ এটাকে স্বীকার করে নিলেও মহা বয়ান খণ্ডিতকরণের মাধ্যমে আধুনিকতার চিরকালীনত্ব বা ধ্রুপদী তত্ত্বকে অস্বীকার করে ক্ষুদ্র বয়ানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
উত্তরাধুনিকবাদে ব্যক্তির মন-মানসিকতায় কিংবা সাংস্কৃতিক চেতনায় জাতি, গোষ্ঠী কিংবা ভৌগোলিক সীমার মাঝেও আটকে রাখা সম্ভবপর নয়। কারণ, ব্যক্তিমানুষ এখন সম্পৃক্ত হয়েছে বিশ্বসংস্কৃতির সাথে টিভি ইন্টারনেট স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। ফলে জাতিগত ঐতিহ্য ও প্রথার ব্যাপারটিও উত্তরাধুনিক সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে ভেঙে পড়েছে; ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা প্রথার স্থানে গ্লোবালাইজেশন সক্রিয় হয়ে উঠেছে ক্রমশ। অর্থাৎ উত্তরাধুনিকতা ব্যক্তিকে ভৌগোলিক সীমা ও জাতিগত বৈষম্যের ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করছে। হয়তো এমন দিনও খুব দূরে নয় যে, উত্তরাধুনিকবাদীদের মাধ্যমে এক মানবগোষ্ঠী ও এক বিশ্বসংস্কৃতি গড়ে তোলার পক্ষেই জোর দাবি উঠবে।
বলাবাহুল্য, এটাও আধুনিক পুঁজিবাদের এক ধরনের সংকট। এ সংকট চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছালে আধুনিকতার ভয়াবহ দানব পুঁজিবাদের মুনাফা অর্জনের ধারণাও ধ্বসে পড়বে। যেদিন সত্যিকার অর্থেই সেই অবস্থা তৈরি হবে, সেদিন বিশ্বসংস্কৃতির সার্বিক মিলন মহোৎসবকে আর পুঁজিবাদের নির্দিষ্ট সীমায় সংজ্ঞায়িত করাও সম্ভব হবে না। এ প্রসঙ্গে উত্তরাধুনিকাবাদকে সাদামাটাভাবে বোঝার ক্ষেত্রে রাশিদ আসকারীর মন্তব্য খানিকটা সহায়ক ভূমিকা পালন করে, তিনি বলেন :
সাধারণত উত্তরাধুনিকতাবাদ বলতে ভাবনার জগতের সেই সকল পরিবর্তন, উন্নয়ন ও প্রবণতাকে বোঝায় যেগুলো সাহিত্য, শিল্পকলা, সংগীত, স্থাপত্য, দর্শন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিশ শতকের চল্লিশ অথবা পঞ্চাশের দশকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং এখনো হচ্ছে।৮
এ বক্তব্যের সারকথা হচ্ছে, আধুনিকবাদে যেসব বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল তার বিরোধিতা বা পরিবর্তন ও উন্নয়ন প্রত্যাশাই উত্তরাধুনিকবাদের মূল প্রকল্প। অন্যভাবে বলা যায়, আধুনিকবাদের বিপরীত প্রকল্পই হচ্ছে উত্তরাধুনিকবাদ। কথাটিকে এতটা সহজভাবে গ্রহণ করলে সম্ভবত ভুল করা হবে। কারণ, উত্তরাধুনিকবাদ কখনোই আধুনকিবাদের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক কোনো তত্ত্ব নয়। তবে আধুনিকতা যেসব যুক্তি শৃঙ্খলা অনুসরণ করে এবং অতীতের ভিত্তিতে ক্রমাগত ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায়, তা উত্তরাধুনিকতা অস্বীকার করে। পূর্বেই বলা হয়েছে, উত্তরাধুনিকবাদ যুক্তির শৃঙ্খলা অস্বীকার করে ঐতিহ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণের স্বার্থে। ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা প্রান্তিক মানুষের সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা উত্তরাধুনিক তত্ত্বের অন্যতম প্রকল্প। ফলে আধুনিকতার মহা-আখ্যান বা মহাবয়ান উত্তরাধুনিকতায় এসে খণ্ড বয়ানে পরিণত হয়েছে। ধ্রুব সত্য কিংবা চিরকালীনত্ব বিষয়ক ধারণা অস্বীকার করে উত্তরাধুনিকবাদ জানাচ্ছে, স্থানিক ও আপেক্ষিক সত্য; যা অবশ্য খণ্ডকালীনও বটে। অর্থাৎ মহাবয়ান ক্ষুদ্র বয়ানের দিকে ধাবিত হচ্ছে উত্তরাধুনিক প্রকল্পে।
উত্তরাধুনিকতা পুরোপুরি আধুনিকতার সাথে সাংঘর্ষিক না হলেও অনেকটাই যে সংঘাতপূর্ণ তা আধুনিকতার প্রপঞ্চ পরিত্যাগের মধ্য দিয়ে উত্তরাধুনিকবাদে মনোনিবেশ কলে প্রতীয়মান হয়। এ কথা আমরা পূর্বেই বলেছি যে, উত্তরাধুনিকবাদের জন্ম আধুনিকতার পেটের ভেতর পুঁজিবাদী সংস্কৃতির চরমতম যান্ত্রিক বিকাশের মধ্যে নিহিত। আধুনিকতা মানুষকে শিখিয়েছে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত সবকিছুই বাস্তব। অথচ একালে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর উন্নয়ন এবং আবিষ্কারের ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রকৃতি প্রদত্ত মোটা নাকটি আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার এক সার্জারির দ্বারা পরিবর্তন করে ফেলা সম্ভব। এ ঘটনার ফলে এক ঘণ্টা আগের বাস্তবতার সাথে পরবর্তী সময়ের বাস্তবতার বিরোধ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে ঘণ্টাখানের মধ্যে সত্য পরিবর্তিত হয়েছে, অন্যদিকে পরবর্তী পর্যায়ের কৃত্রিমতাকেই বাস্তব হিসেবে গণ্য করতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ।
পুঁজিবাদের চূড়ান্ত বিকাশ এবং বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়নের ফলে এ কালের মানুষকেও এক ধরনের ধাঁধাঁর মধ্যে ফেলে দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুতরাং বলা ভুল হবে না, পুঁজিবাদের চরম বিকাশের একালে মূলত এই ধন্ধ বা বিস্ময়ই উত্তরাধুনিকতাবাদ। এই বিবেচনায় সরলীকরণের মাধ্যমে বলা যায়, উত্তরাধুনিকতাবাদ হচ্ছে আধুনিকতার অনিবার্য উন্নতির ফলাফল। আধুনিকবাদে উৎপাদনকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সাফল্যে যে পরিবর্তন অকল্পনীয় ছিল, তা বর্তমানে একেবারেই মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে। হাতের নাগালের সুবিধাকে ইচ্ছে করলেও আজকের মানুষ অস্বীকার করতে পারছে না। কেউ বাধ্য হয়ে আর কেউ শখের বশে গ্রহণ করছে সেই সুবিধাকে। এদিক থেকে বলা যায়, উত্তর-আধুনিকবাদ শেষাবধি ভোগবাদকেই সমর্থন করে।
উত্তরাধুনিকতা বিষয়ক তাত্ত্বিক প্রপঞ্চের ভোগবাদের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, সেলফোনের বিস্ময়কর আবিষ্কারের ফলে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ মুহূর্তেই কয়েকটি বোতাম টিপলেই অন্য প্রান্তের মানুষের সাথে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে, এ কথা আধুনিকবাদ শুরুর দিকে যৌক্তিক শৃঙ্খলায় ভাবতেও পারে নি। ফলে উত্তরাধুনিকতায় অনিবার্যভাবে ভেঙে পড়েছে যুক্তির প্রথানুগ শৃঙ্খলা। একই সাথে প্রাপ্ত সুবিধা কিংবা নবোদ্ভাবিত আবিষ্কারের সুযোগ একালের মানুষ গ্রহণ করবে ও করছে এটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি মানুষের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আবিষ্কৃত কৃত্রিম হৃদযন্ত্রের সাহায্যে সে ক্রিয়াটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। অতি সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, কৃত্রিম উপায়ে রক্ত উৎপাদনেও সাফল্য লাভ করেছেন তাঁরা। বিজ্ঞানীদের এসব আবিষ্কার নিঃসন্দেহে একালের মানুষের যাপিত জীবনকে কল্পনাতীতভাবে সহজতর করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও সহজ করে দেবে। এই কল্পজগতের চাওয়াই যখন বাস্তব পাওয়ার ঘটনায় সংবাহিত হচ্ছে হরহামেশা; আর এসব কল্পলোকের ঘটনাবলি আত্মীকরণের মাধ্যমেই গড়ে উঠছে উত্তরাধুনিকতার তত্ত্ব ও সংস্কৃতি।
উত্তরাধুনিকবাদের এই সর্বগ্রাসী আক্রমণ থেকে চাইলেও একালের মানুষ বাঁচতে পারবে না; কিংবা একালের মানুষ এই ভোগবাদী মানসিকতা ছাড়তে পারবে না অথবা এই অনিবার্য ভোগবাদকে অস্বীকার করার উপায় বা দ্বিতীয় কোনো বিকল্পও নেই মানুষের নিকট। বরং মানুষ উত্তরাধুনিক এই ভোগবাদকে পেতে চায় জীবনকে আরও আয়াশসাধ্য করতে। যে আয়াশের কথা হয়তো বর্তমানে কল্পনাও করা সম্ভবপর হয়নি। বাস্তব-অবাস্তব এবং কল্পনার সীমারেখাহীন চিহ্ন নির্দিষ্ট করা হলে আধুনিকবাদের প্রকল্প আর টিকে থাকতে পারে না; কিংবা চাইলেও একালের মানুষ কল্পসত্যের বাস্তবতা অস্বীকার করবে না। কারণ, তার সামনেই সেই বাস্তবতার সুযোগ-সুবিধা পরিবেশিত হচ্ছে। এই সার্বিক দিকের কথা বিবেচনা করে, উত্তরাধুনিকতাবাদকে এক অর্থে পরিবেশনবাদ হিসেবেও আখ্যায়িত করা যেতে পারে।
শিল্পে-সাহিত্যে উত্তরাধুনিকতাবাদ কিভাবে ক্রিয়াশীল, এখন সে প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সাহিত্য যেভাবে ধর্মীয় খোলস থেকে বেরিয়ে যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানমনস্ক হয়েছিল, উত্তর-আধুনিকবাদীগণ আধুনিকতাবাদের সেই যুক্তিনির্ভরতার সীমা থেকে বেরিয়ে এসে প্রান্তিক মানুষের সংস্কৃতি ও আচার বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে চাইছে। উত্তরাধুনিকবাদী শিল্পী-সাহিত্যিকগণ মূলত বলতে চাইছেন, শিল্প-সাহিত্য শুধু এলিটদের জন্য সৃষ্ট এলিটদের সংস্কৃতি চর্চাই নয়; এখানে সমানভাবে অধিকার আছে সমাজের প্রান্তিক তথা সাধারণ মানুষেরও সংস্কৃতি চর্চার অধিকার থাকতে হবে।
অথচ পোস্ট মডার্ন শব্দটি শিল্পে-সাহিত্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছে, সেখানে অখণ্ড চেতনার ধারণা অস্বীকার করে খণ্ড খণ্ড ধারণা জন্ম দিয়েছে। সমগ্র নয়, বিচ্ছিন্ন; অর্থাৎ অখণ্ড নয়, খণ্ড। সমষ্টি নয়, ব্যক্তি। চিরকালীন নয়, সাময়িক বা স্বল্পকালীন। বিশেষত স্থানিক এবং কালিক ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন উত্তরাধুনিকবাদীরা। আধুনিকবাদে যে মহাবয়ান বা মহা-আখ্যানের কথা বলা হয়েছিল, তা উত্তরাধুনিকতায় এসে তা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বয়ান বা আখ্যানে পরিণত হয়েছে। আধুনিকতা যেভাবে মানুষকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার ব্যাপারে উস্কানি দিয়েছিল, তা সম্প্রসারিত হয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদকেই সার্থক হিসেবে মেনে নেয়ার কথা বলেছে।
আধুনিকতার এই বিবেচনা থেকে বলা যায়, উত্তরাধুনিকবাদে চূড়ান্তভাবে ব্যক্তির ভোগের কথা বলে। তবে এই ভোগবাদেরও চূড়ান্ত পরিণাম হতাশা। অর্থাৎ পরিণামে যখন উত্তরাধুনিকবাদী মানুষ ভোগের চূড়ান্ত সীমাকে স্পর্শ করে বা করবে তখন তার কাছে কল্পনা আর বাস্তবের সীমারেখা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বা যাবে। আর সেই অবস্থায় তার সামনে আশা বলে কিংবা স্বপ্ন বলে কোনো কথা বা বিষয় থাকবে না। যে মানুষের সামনে স্বপ্ন কিংবা ভবিষ্যতের কল্পনা বা আশা থাকে না চূড়ান্ত বিবেচনায় দেখা যায়, সে মানুষ ব্যক্তিজীবনের প্রতি আসক্তি হারিয়ে ফেলে। এই আকর্ষণহীন জীবনই হচ্ছে উত্তরাধুনিকবাদের চূড়ান্ত রূপ ও সংকট। এভাবে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, আধুনিকতার নৈঃসঙ্গ্য যে অর্থে মানুষেকে সংকটের মুখোমুখি ত্যাগ করেছিল এবং সেই ত্যাগজনিত সংকট ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় বর্তমানে তা উত্তরাধুনিকতাবাদ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আধুনিকবাদের সংকটে নিপতিত মানুষ এজন্য যুক্তির শৃঙ্খলা ছিঁড়ে ফেলে গণ-মানুষের আচার বিশ্বাস ও সংস্কৃতির উপর আস্থাশীল হতে চাইছে। আমরা প্রত্যাশা করি, চরম ভোগবাদী মানসিকতাজনিত সংকটের চোরাগলি অতিক্রম করে উত্তরাধুনিকবাদের অভিযাত্রা আশাবাদের দিকে অগ্রসর হবে।
টীকা ও তথ্যসূত্র :
———————–
১. রেহনুমা আহমেদ, ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গে’, বক্তৃতা : জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা : প্রতিরুদ্ধের প্রকাশনা (শ্রুতিলিপি), ২৮ মে, ২০০২; পৃ.৫
২. মিশেল ফুকো, ‘রচয়িতা বলতে কি বোঝায়’, অনুবাদ : আফজালুল বাসার, শেখ সালাহউদ্দিন সম্পাদিত, প্রতিপদ, ৩য় সংখ্যা, ঢকা : মার্চ ২০০৬; পৃ.১৬১
৩. রেহনুমা আহমেদ, ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ প্রসঙ্গ’, পূর্বোক্ত, পৃ.১৮
৪. তদেব, পৃ.১০
৫. তদেব, পৃ.১১
৬. তদেব, পৃ.১২
৭. তদেব
৮. রাশিদ আসকারী, ‘উত্তরাধুনিকতাবাদ : মহান আখ্যান থেকে ক্ষুদ্র উপাখ্যান’, আবুল হাসনাত সম্পাদিত, কালি ও কলম, ৩য় বর্ষ : ১২শ সংখ্যা, ঢাকা : জানুয়ারি ২০০৭; পৃ.২৪8 Comments-
উত্তরাধুনিকতাবাদ নিয়ে অনেক কিছুই সহজ ভাষায় লিখেছেন তবুও কেন জানি এই তত্ত্বটি খুব জটিল মনে হচ্ছে। তবে, নিচের উদাহরণ থেকে অনেক কিছুই বুঝতে সহজ হয়েছে।
“অতি সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, কৃত্রিম উপায়ে রক্ত উৎপাদনেও সাফল্য লাভ করেছেন তাঁরা। বিজ্ঞানীদের এসব আবিষ্কার নিঃসন্দেহে একালের মানুষের যাপিত জীবনকে কল্পনাতীতভাবে সহজতর করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও সহজ করে দেবে। এই কল্পজগতের চাওয়াই যখন বাস্তব পাওয়ার ঘটনায় সংবাহিত হচ্ছে হরহামেশা; আর এসব কল্পলোকের ঘটনাবলি আত্মীকরণের মাধ্যমেই গড়ে উঠছে উত্তরাধুনিকতার তত্ত্ব ও সংস্কৃতি।”
তবে, আমারো একি প্রত্যাশা আধুনিকতার নামে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে উত্তরাধুনিকবাদের অভিযাত্রা আশাবাদের দিকে অগ্রসর হোক!-
উত্তর আধুনিকতত্ত্ব খানিকটা জটিল। তবে আমার পক্ষে যতটা সহজ করা সম্ভব হয়েছে, ততটা করার চেষ্টা ছিল। এখানে আপনার জটিলতা খানিকটা সহজ করার জন্য একটা উদাহরণ দেয়া যাক : ফরাসি দার্শনিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জ্যাঁ বদ্রিলা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় আমরা যা দেখেছি; তার সবকিছু সত্য নয়। এখানে জুরাসিক পার্ক সিনেমার মতো অনেক কিছুই ভার্সুয়াল রিয়ালিটি হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা আমরা বিশ্বাস করেছি। কিন্তু জুরাসিক পার্কের ক্ষেত্রে সেটা করি নি। কেননা, ডাইনোসর সম্পর্কে আমাদের পূর্বেই জানা ছিল যে, তা পৃথিবীতে এখন নেই। ফলে সেটা বিশ্বাস্য ছিল না। কিন্তু গলফ ওয়ারের ক্ষেত্রেও এরকমটা ঘটেছে বলে বদ্রিলার বিশ্বাস। তার পোস্ট মডার্ন জগৎ অনেকাংশেই ভার্সুয়াল, হাইপার রিয়ালিটির জগৎ।
-
Friends
রাহুল চন্দ্র দাস
@rahulchandradas13011994gmail-com
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
নির্জন প্রহর
@nirjanprohor
Shomik Adhikary Nandon
@shomikadhikarynandon
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
আয়েশা সিমা
@ayesha-sima
Neel tripura
@neel
Drako Shajib
@drako



কতগুলো কাক এলোমেলো ওড়ে/ কতগুলো কাক তীর্থের কাক।