Profile Photo

মুহাম্মদ আস্রাফুল আলম সোহেলOffline

  • Ashraful710
  • নীলকন্ঠ / নীল জ্যাকারান্ডা (Neelkanth / Blue Jacaranda)
    ———————————————————————————
    অতিশয় ধুরন্ধর, প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন, চিৎকার-চেঁচামেচিতে পটু, প্রেমের উচ্ছ্বাসভরা সুললিত সুর, শূন্যে ধ্রুপদি নর্তক এবং চমৎকার নীলরঙা এক দুর্লভ নীলকণ্ঠ পাখি (Indian Roller/ Coracias benghalensis/ Coracias benghalensis affinis)- সে তো নয় । কিংবা হিন্দুধর্মের মূল স্তম্ভ ত্রিশক্তির (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব) মধ্যে অগ্রগণ্য, শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পরমেশ্বর ভগবান শিব সমুদ্র থেকে হলাহল নামক বিষাক্ত বিষ পান করার ফলে তার গলাতেই আটকে থাকল ও বিষে কন্ঠটা গাঢ় নীলবর্ণ হয়ে গেল । শিবের স্ত্রী পার্বতী (হিন্দু দেবী দুর্গা রূপ বা দিব্য জননী / আদি পরাশক্তি সর্বোচ্চ দেবী মহামায়া) ছুটে এসে ভগবান শিবের কন্ঠ চেপে ধরলেন যেন শিবের দেহ পর্যন্ত এ বিষ নেমে না যায় । বিষ পানের ফলে শিবের কণ্ঠ বিষে নীলবর্ণ হয়েছিল আর সে জন্যই শিবের আরেক নাম নীলকন্ঠ বা নীলকান্ত (Neelkantha) । এ হিন্দু দেবতা বা মহা ঈশ্বর বা ভগবান শিবের সে নীলকণ্ঠও নয় । অথবা বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের অমর রচনা ‘অপরাজিতার মতো নীল হয়ে, নীল হয়ে, আরো নীল হয়ে আমি যে দেখিতে চাই’: সে নীল অপরাজিতা ফুলের মতোও নয় ।
    তবে কে সে নীলকণ্ঠ?
    অপার সুনীল আকাশের গাঢ় নীল রঙে যার শুধু আকণ্ঠ নীল নয়- পুরো দেহটাই যে নীলাম্বরী, যার কাছে শরতের নীলিমায় নীল প্রজাপতিও পরাজিত । ঐশ্বর্যময়, মাহাত্ম্য এবং অভিজাত নীলাভ সৌন্দর্যের জন্যেই তো সে ”নীলকন্ঠ বা নীল জ্যাকারান্ডা” ফুল । নীলের মাঝেই তার অস্তিত্ব ।
    তবে প্রশ্ন জাগে, কেনইবা তাকে ‘নীলকন্ঠ’ বলি? যেখানে কণ্ঠই যে শুধু নীল তা কিন্তু নয়, যার দেহে পুরোটাই নীলের আধিপত্য ।
    নীলকন্ঠ ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম: Jacaranda mimosifolia D.Don ।
    আকাশি কৃষ্ণচূড়া, নীলচূড়া, নীল কৃষ্ণচূড়া, নীল পারদ, Blue Jacaranda, Neel Gulmohur, Neelkanth, Black poui, Brazilian rose wood, Mimosifolia fern tree, Caroba-guassú, Jacarandá-caroba, Jacarandá-mimoso, Palissandra, Green Ebony, Jacaranda tree ইত্যাদি নামে পরিচিত । ভারতবর্ষে এটি নীল গুলমোহর নামে পরিচিত । এটি বিদেশী ফুল । এ ফুলের আদি জন্মস্থান ব্রাজিল । Bignoniaceae পরিবার ও Tecomeae গোত্রের একটি উদ্ভিদ এবং ক্রান্তীয় আমেরিকার প্রজাতি । গাছটি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, কিউবা, জ্যামাইকা, বাহামার উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, পর্তুগাল এবং ইতালিসহ বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে হয়ে থাকে । লাতিন ভাষা থেকে এ ফুলের নাম এসেছে । এটি পত্রমোচি, পচনশীল এবং চিরহরিৎ দ্রুত বর্ধনশীল একটি শোভাময় গাছ (Ornamental tree) । দেখতে প্রায় কৃষ্ণচূড়া গাছের মতোই । বসন্তকালে গাছের ডালের ডগায় ডগায় গুচ্ছবদ্ধভাবে ফুল ফোটে । জ্যাকারান্ডা বা নীলকণ্ঠ ফুল প্রাকৃতিকভাবে পূর্ব অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, হাওয়াই দ্বীপ, দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও তার স্থানীয় পরিসীমায় জন্মে থাকে । নীলকণ্ঠ ফুল গাছ দক্ষিণ আফ্রিকা ও কুইন্সল্যান্ডের কিছু অংশে আক্রমনাত্মক প্রজাতি হিসেবে পরিচিত । গ্রীষ্মমন্ডলীয় উচ্চভূমি অঞ্চলগুলিতে এটি ভালো জন্মে । বৃষ্টিপাত সহ্য করলেও তুষারপাত সহ্য করে না । এ প্রজাতিগুলি বালুকাময় লোম মাটিতে ভালোভাবে বৃদ্ধি পায় । যদিও এটি দরিদ্র-অগভীর মাটিতে বেঁচে থাকে । জলাবদ্ধতা বা কাদামাটি সহ্য করে না । সিডনি এবং ব্লু পর্বতমালা অঞ্চলগুলিতে সম্ভাব্য পরিবেশগত আগাছা হিসেবেও এটি বিবেচিত হয় । যদিও শীতল অঞ্চলে এটি পরিপক্কতা অর্জন করলে কদাচিৎ তা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে । পর্ণাঙ্গের (Fern) মতো পালকযুক্ত পাতাগুলি উজ্জ্বল সবুজ রঙের । শরৎকালে গাছ থেকে পাতাগুলি পতনের আগে হলুদবর্ণ হয় । গাছে আকর্ষণীয় নীল, বেগুনী, সাদা, খয়েরি ইত্যাদি রঙের ফুল হয় এবং প্রতিটি ফুল ঘণ্টা আকৃতির । বাদামী কালো বৃত্তাকার পরিপক্ক ফল প্রায় দুই বছর পর্যন্ত গাছে ঝুলে থাকতে পারে । এ ফলটি গাছে শুকিয়ে এবং হালকাভাবে বিভক্ত হয়ে বীজ মুক্তি পায় । অঙ্কুরের জন্য সর্বোত্তম তাপমাত্রা ২৫° সেঃ । বীজ শুকিয়ে রেখে অন্তত ১২ মাস ধরে বীজ এর টেকসই বজায় রাখা যায় । পরাগায়ণের জন্য নীলকন্ঠ বা Jacaranda mimosifolia প্রজাতির ফুলগুলি মাঝারি ও বড় আকারের মৌমাছি এবং পোকামাকড়ের উপর নির্ভর করে । নীলকন্ঠ ফুলগাছের কাঠ বেশ দামি এবং সুগন্ধিযুক্ত । ব্রাজিলে ভেষজ চিকিৎসায় এ গাছের ব্যবহার রয়েছে । সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব New South Wales অঙ্গরাজ্যের রাজধানী Sydney এর প্রায় ৬৩০ কিলোমিটার উত্তরে Grafton এর সারা শহরজুরে নীল-বেগুনী হরেকরকম নীলকণ্ঠ বা জ্যাকারান্ডা ফুলের এক অপরূপ সৌন্দর্যের দেখা মেলে । বিশেষ করে পথের দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে লাগানো অসংখ্য নীলকণ্ঠ ফুল গাছের মোহনীয় ফুলের নীলরঙে ছেয়ে যায় । Grafton এবং Lismore শহরে দুটি পৃথক রাস্তার নাম Jacaranda Avenue নামকরণ করা হয়েছে । প্রতি বৎসর অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহব্যাপি ‘জ্যাকারান্ডা উৎসব’ (Jacaranda festival) হয়ে থাকে । তাই, Grafton কে অস্ট্রেলিয়ার ‘জ্যাকারান্ডার রাজধানী’ বলা হয় । দক্ষিণ আফ্রিকার Cape Town এবং Pretoria শহরে অনেক জ্যাকারান্ডা গাছ থাকার কারণে শহরগুলি জ্যাকারান্ডার শহর নামে পরিচিত । নিজস্ব সৌন্দর্যের কারণে জ্যাকারান্ডাকে নিয়ে বিভিন্ন লোককথা, গল্প, কবিতা, উপন্যাস এবং গান রয়েছে । বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ কণ্ঠশিল্পী Steve Tilston অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের সময় অসাধারণ সুন্দর জ্যাকারান্ডা ফুলগুলি তার নজর কেড়ে নেয়, ফলে তিনি জ্যাকারান্ডার প্রশংসায় Oh Jacaranda নামে জনপ্রিয় গানটি গেয়েছেন ।

    5
    5 Comments
Skip to toolbar