-
নীলকন্ঠ / নীল জ্যাকারান্ডা (Neelkanth / Blue Jacaranda)
———————————————————————————
অতিশয় ধুরন্ধর, প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন, চিৎকার-চেঁচামেচিতে পটু, প্রেমের উচ্ছ্বাসভরা সুললিত সুর, শূন্যে ধ্রুপদি নর্তক এবং চমৎকার নীলরঙা এক দুর্লভ নীলকণ্ঠ পাখি (Indian Roller/ Coracias benghalensis/ Coracias benghalensis affinis)- সে তো নয় । কিংবা হিন্দুধর্মের মূল স্তম্ভ ত্রিশক্তির (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব) মধ্যে অগ্রগণ্য, শৈব সম্প্রদায়ের প্রধান দেবতা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পরমেশ্বর ভগবান শিব সমুদ্র থেকে হলাহল নামক বিষাক্ত বিষ পান করার ফলে তার গলাতেই আটকে থাকল ও বিষে কন্ঠটা গাঢ় নীলবর্ণ হয়ে গেল । শিবের স্ত্রী পার্বতী (হিন্দু দেবী দুর্গা রূপ বা দিব্য জননী / আদি পরাশক্তি সর্বোচ্চ দেবী মহামায়া) ছুটে এসে ভগবান শিবের কন্ঠ চেপে ধরলেন যেন শিবের দেহ পর্যন্ত এ বিষ নেমে না যায় । বিষ পানের ফলে শিবের কণ্ঠ বিষে নীলবর্ণ হয়েছিল আর সে জন্যই শিবের আরেক নাম নীলকন্ঠ বা নীলকান্ত (Neelkantha) । এ হিন্দু দেবতা বা মহা ঈশ্বর বা ভগবান শিবের সে নীলকণ্ঠও নয় । অথবা বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের অমর রচনা ‘অপরাজিতার মতো নীল হয়ে, নীল হয়ে, আরো নীল হয়ে আমি যে দেখিতে চাই’: সে নীল অপরাজিতা ফুলের মতোও নয় ।
তবে কে সে নীলকণ্ঠ?
অপার সুনীল আকাশের গাঢ় নীল রঙে যার শুধু আকণ্ঠ নীল নয়- পুরো দেহটাই যে নীলাম্বরী, যার কাছে শরতের নীলিমায় নীল প্রজাপতিও পরাজিত । ঐশ্বর্যময়, মাহাত্ম্য এবং অভিজাত নীলাভ সৌন্দর্যের জন্যেই তো সে ”নীলকন্ঠ বা নীল জ্যাকারান্ডা” ফুল । নীলের মাঝেই তার অস্তিত্ব ।
তবে প্রশ্ন জাগে, কেনইবা তাকে ‘নীলকন্ঠ’ বলি? যেখানে কণ্ঠই যে শুধু নীল তা কিন্তু নয়, যার দেহে পুরোটাই নীলের আধিপত্য ।
নীলকন্ঠ ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম: Jacaranda mimosifolia D.Don ।
আকাশি কৃষ্ণচূড়া, নীলচূড়া, নীল কৃষ্ণচূড়া, নীল পারদ, Blue Jacaranda, Neel Gulmohur, Neelkanth, Black poui, Brazilian rose wood, Mimosifolia fern tree, Caroba-guassú, Jacarandá-caroba, Jacarandá-mimoso, Palissandra, Green Ebony, Jacaranda tree ইত্যাদি নামে পরিচিত । ভারতবর্ষে এটি নীল গুলমোহর নামে পরিচিত । এটি বিদেশী ফুল । এ ফুলের আদি জন্মস্থান ব্রাজিল । Bignoniaceae পরিবার ও Tecomeae গোত্রের একটি উদ্ভিদ এবং ক্রান্তীয় আমেরিকার প্রজাতি । গাছটি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, কিউবা, জ্যামাইকা, বাহামার উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, পর্তুগাল এবং ইতালিসহ বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে হয়ে থাকে । লাতিন ভাষা থেকে এ ফুলের নাম এসেছে । এটি পত্রমোচি, পচনশীল এবং চিরহরিৎ দ্রুত বর্ধনশীল একটি শোভাময় গাছ (Ornamental tree) । দেখতে প্রায় কৃষ্ণচূড়া গাছের মতোই । বসন্তকালে গাছের ডালের ডগায় ডগায় গুচ্ছবদ্ধভাবে ফুল ফোটে । জ্যাকারান্ডা বা নীলকণ্ঠ ফুল প্রাকৃতিকভাবে পূর্ব অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, হাওয়াই দ্বীপ, দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকা ও তার স্থানীয় পরিসীমায় জন্মে থাকে । নীলকণ্ঠ ফুল গাছ দক্ষিণ আফ্রিকা ও কুইন্সল্যান্ডের কিছু অংশে আক্রমনাত্মক প্রজাতি হিসেবে পরিচিত । গ্রীষ্মমন্ডলীয় উচ্চভূমি অঞ্চলগুলিতে এটি ভালো জন্মে । বৃষ্টিপাত সহ্য করলেও তুষারপাত সহ্য করে না । এ প্রজাতিগুলি বালুকাময় লোম মাটিতে ভালোভাবে বৃদ্ধি পায় । যদিও এটি দরিদ্র-অগভীর মাটিতে বেঁচে থাকে । জলাবদ্ধতা বা কাদামাটি সহ্য করে না । সিডনি এবং ব্লু পর্বতমালা অঞ্চলগুলিতে সম্ভাব্য পরিবেশগত আগাছা হিসেবেও এটি বিবেচিত হয় । যদিও শীতল অঞ্চলে এটি পরিপক্কতা অর্জন করলে কদাচিৎ তা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে । পর্ণাঙ্গের (Fern) মতো পালকযুক্ত পাতাগুলি উজ্জ্বল সবুজ রঙের । শরৎকালে গাছ থেকে পাতাগুলি পতনের আগে হলুদবর্ণ হয় । গাছে আকর্ষণীয় নীল, বেগুনী, সাদা, খয়েরি ইত্যাদি রঙের ফুল হয় এবং প্রতিটি ফুল ঘণ্টা আকৃতির । বাদামী কালো বৃত্তাকার পরিপক্ক ফল প্রায় দুই বছর পর্যন্ত গাছে ঝুলে থাকতে পারে । এ ফলটি গাছে শুকিয়ে এবং হালকাভাবে বিভক্ত হয়ে বীজ মুক্তি পায় । অঙ্কুরের জন্য সর্বোত্তম তাপমাত্রা ২৫° সেঃ । বীজ শুকিয়ে রেখে অন্তত ১২ মাস ধরে বীজ এর টেকসই বজায় রাখা যায় । পরাগায়ণের জন্য নীলকন্ঠ বা Jacaranda mimosifolia প্রজাতির ফুলগুলি মাঝারি ও বড় আকারের মৌমাছি এবং পোকামাকড়ের উপর নির্ভর করে । নীলকন্ঠ ফুলগাছের কাঠ বেশ দামি এবং সুগন্ধিযুক্ত । ব্রাজিলে ভেষজ চিকিৎসায় এ গাছের ব্যবহার রয়েছে । সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব New South Wales অঙ্গরাজ্যের রাজধানী Sydney এর প্রায় ৬৩০ কিলোমিটার উত্তরে Grafton এর সারা শহরজুরে নীল-বেগুনী হরেকরকম নীলকণ্ঠ বা জ্যাকারান্ডা ফুলের এক অপরূপ সৌন্দর্যের দেখা মেলে । বিশেষ করে পথের দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে লাগানো অসংখ্য নীলকণ্ঠ ফুল গাছের মোহনীয় ফুলের নীলরঙে ছেয়ে যায় । Grafton এবং Lismore শহরে দুটি পৃথক রাস্তার নাম Jacaranda Avenue নামকরণ করা হয়েছে । প্রতি বৎসর অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহব্যাপি ‘জ্যাকারান্ডা উৎসব’ (Jacaranda festival) হয়ে থাকে । তাই, Grafton কে অস্ট্রেলিয়ার ‘জ্যাকারান্ডার রাজধানী’ বলা হয় । দক্ষিণ আফ্রিকার Cape Town এবং Pretoria শহরে অনেক জ্যাকারান্ডা গাছ থাকার কারণে শহরগুলি জ্যাকারান্ডার শহর নামে পরিচিত । নিজস্ব সৌন্দর্যের কারণে জ্যাকারান্ডাকে নিয়ে বিভিন্ন লোককথা, গল্প, কবিতা, উপন্যাস এবং গান রয়েছে । বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ কণ্ঠশিল্পী Steve Tilston অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের সময় অসাধারণ সুন্দর জ্যাকারান্ডা ফুলগুলি তার নজর কেড়ে নেয়, ফলে তিনি জ্যাকারান্ডার প্রশংসায় Oh Jacaranda নামে জনপ্রিয় গানটি গেয়েছেন ।5 Comments
Friends
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
Md Zaker Hayat Khan [ Zaker Aditya ] [ জাকের আদিত্য ]
@md-zaker-hayat-khan
শরীফ এমদাদ হোসেন
@sharif-emdad-hossain
শায়েরুল ইসলাম
@shaerulislam
সা দি য়া (নন্দিনী)
@nandini
Mahmuda Sultana
@mahmudamahi
Arshadul Khan Tuhin
@aktuhin
Muhammad Jabed
@jabed92


অভিনন্দন!