Profile Photo

Borhan MahmudOffline

  • borhan.mahmud
  • Profile picture of Borhan Mahmud

    Borhan Mahmud

    3 years, 12 months ago

    চেনা মানুষ অচেনা মন

    বারান্দায় রাখা চেয়ারটায় বসে আছে খালেদ। বারান্দার গ্রীলের বাইরে মেঘ দেখছে সে। মনের মধ্যে ভাবনার জাহাজ এসে ভিড়েছে। এখন সব সামলানোর উপায় নিয়ে ভাবছে। জটিল লাগছে সব, খুব বেশী ভাবতেও পারছে না সে। কান্না করতে ইচ্ছে করছে তার, কিন্তু আজই তার কান্না আসছে না। এতদিন একা একা এই বারান্দায় বসে বসে আকাশ দেখে দেখে কতোবার কেঁদেছে সে। দিনে দিনে একটা বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে গিয়েছিল তার, অসীম ভালবাসায় কাউকে চাইলে তাকে কখনো পাওয়া যায় না। শিউলী চলে যাবার পর হতে এটাই সে বিশ্বাস করে আসছে। শিউলী চলে গিয়েছে সেই কবে? আটটা বছর! এই আট বছরে এমন কোনো দিন ছিল না, যেদিন সে শিউলীকে মনে করেনি। একা একা গুমরে গুমরে কান্নার এই আটটি বছর, আশ্চর্য এক অদ্ভুত অধ্যায়। অনেকবার এও মনে হয়েছিল, পৃথিবী অর্থহীন। বেঁচে থাকার কোন যৌক্তিকতা নেই।
    একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ সেটা টানতে লাগলো। শিউলীর চলে যাবার পরের সময়টা মনে করার চেস্টা করল। শিউলী যেদিন চলে গিয়েছে, সেদিনের সবকিছু তার মনে আছে। তার উদ্ভ্রান্তের জীবন সেদিন হতে শুরু। আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল কি? না, করে নাই। শিউলী চলে গেলেও সে কোথাও যেতে পারেনি। তাদের একমাত্র সন্তান ঝুমুরের বয়স তখন মাত্র দেড় বছর। শুধু ঝুমুরের জন্যেই সে বেঁচে রয়েছে। এ পৃথিবীতে বেঁচে যেন থাকে সে, সেই ব্যবস্থা রেখেই শিউলী চলে গিয়েছিল।
    শিউলী যখন চলে যায়, তখন তাদের বিয়ের বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর। ওর চলে যাওয়াটা যতোটা কষ্টের ছিল, ঠিক ততোটাই ছিল নিজেকে বঞ্চিত ভাবার। স্রষ্টাকে সে কোনদিন কোন দোষারোপ করেনি। স্রষ্টা কখনো কাউকে বঞ্চিত করে না। মানুষই মানুষকে বঞ্চিত করে। বেডরুমে শিউলীর একটা ছবি টাংগানো আছে। বৌ সাজে শিউলীর ছবি। প্রতিদিন সে ছবিটার সামনে এসে কথা বলে খালেদ। ছবিটার খুব সামনে এসে দাঁড়ালে তার নিজের ছায়া পড়ে সেখানে। একটা ঘোলাটে প্রতিবিম্ব পড়ে সেখানে তার নিজের। ছবিটাতে নিজের ছায়া তার চোখে একটু সয়ে এলে তখন সে তার সাথে কথা বলে। প্রতিদিন কয়েকবার। আজ ঝুমুর কি করেছে, দুপুরে খায়নি বা জ্বর এসেছে ঝুমুরের; এসব কথা। কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে আসতো কখনো কখনো। মাঝে মাঝে নিজের কথাও বলতো খালেদ। তুমি এভাবে না চলে গেলেও পারতে। তোমাকে ছাড়া আমার কোন কিছু ভাল লাগে না। নিস্তরংগ এ জীবনে তুমি ছাড়া আমার আর কেইবা ছিল। ঝুমুর ঘুমিয়ে গেলে রাতবিরোতে লাইট জ্বালিয়ে শিউলীর ছবিটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থেকেছে বছরের পর বছর। মাঝে মাঝে ঝুমুর ঘুম হতে উঠে এসে তার হাত ধরে বলেছে,
    -বাবা, ঘুমাবে না? আসো। আকাশ হতে মাতো আমাদের সবসময় দেখছেন। তুমি না ঘুমালে মা রাগ করবেন। তুমি আসো বাবা, ঘুমাবো।
    বুকের ভেতরে কষ্টটা আরো একটু দলা পাকিয়ে আসতো। মেয়েকে কিছুই বলে না। চুপচাপ মেয়েকে নিয়ে ঘুমাতে চলে এসেছে।
    ঝুমুর এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। মেয়েটা ছোট হলে কি হবে, খালেদের পৃথিবীকে অসীম মমতায় ভরিয়ে রেখেছে সে একাই। তাকে রাতদিন শাসন করে। এখন সকাল সাড়ে নয়টা বাজে। ঝুমুর এখন স্কুলে। এখন বাসায় থাকলে সিগারেট দেখে হৈ চৈ শুরু করে দিতো।
    আজকের দিনটা অদ্ভুত। কিছুক্ষণ আগে খালেদের পৃথিবীটা ভেংগেচুরে একাকার হয়ে গেছে। ঝুমুরকে স্কুলে দিয়ে এসে বাসার সামনে এসে হতভম্ব হয়ে গেছে খালেদ। দেখলো, বাসার গেটে শিউলী দাঁড়িয়ে আছে।
    শিউলীকে দেখে হতভম্ব হবার পাশাপাশি সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, বুকের ভেতর কোন আনন্দ হচ্ছে না। এক মূহুর্ত দাঁড়িয়ে চুপচাপ বাসার দরজাটা চাবি দিয়ে খুলে দরজায় দাঁড়িয়ে শিউলীকে বলল, আসো। শিউলী কিছু না বলে চুপচাপ ঘরে এসে ঢুকল।
    খালেদ কি বলবে, বুঝে উঠতে পারলো না। চুপচাপ বারান্দায় এসে সেই তখন থেকেই বসে আছে। শিউলী কেন ফিরে এলো? ও ফিরে আসাতে ওর ভেতরে কোন চাঞ্চল্য আসছে না কেন? ভালবাসার কতো কতো অদ্ভুত চেহারা। শিউলীর জন্য তার ভালবাসার পূর্ণতা ছিল শুধু কি অপেক্ষায়? সে এখন এ নিয়েও কিছু ভাবতে চাইছে না। বরং ভাবছে ঝুমুর স্কুল হতে ফিরে এলে সে কি জবাব দেবে? ঝুমুর তো জানতো, তার মা আকাশে চলে গেছে। তার মা আরেক জনকে ভালবাসতো। মা সেখানে চলে গিয়েছেন- এ কথাতো এত ছোট শিশুকে বলা সম্ভব নয়। ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। বুকের ভেতর একটা অন্যরকম শূন্যতা অনুভব করল খালেদ।

    পেছনে একটা শব্দ হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে শিউলী বারান্দায় এসেছে। হাতে দুকাপ চা। খালেদ অবাক হয়ে শিউলীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। শিউলীর মুখে কোন ভাবান্তর নেই। এক কাপ চা এগিয়ে দিলো খালেদের দিকে। খালেদ যেন বাক্য হারিয়ে ফেলেছে। শিউলী আগের মতোই আছে। চারপাশের ঘটনা তার মধ্যে কোন প্রভাব ফেলে না। কিন্তু আজকের ঘটনাটা তো চারপাশের নয়। এটি ওর নিজেরও।
    চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে নিলো খালেদ। শিউলী তার পাশে রাখা চেয়ারটাতে বসল। খালেদ আড়চোখে সে চেয়ারটার দিকে তাকালো। বিয়ের পরপরই এ দুটো চেয়ার কিনেছিল ওরা দুজন মিলে। বারান্দায় রেখে সেখানে বসে একসাথে চা খাবে বলে। তখন খালেদের বাবা মা দুজনেই বেঁচেছিলেন। সময়ের ফেরে আজ তারা দুজনেই পরপারে। একমাত্র সন্তান হিসেবে খালেদ পারিবারিক এ বাড়িতেই থেকে গেছে। তাছাড়া এ বাড়ির আনাচে কানাচে শিউলীর হাজার হাজার স্মৃতি। ঝুমুরের তখন যে বয়স, তখন তাকে নিয়ে দুরে কোথাও যাবার উপায় ছিল না। শিউলী চায়ে চুমুক দিয়েই বলল,
    -চা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছ নাকি? চা খাচ্ছোনা যে?
    -ও হ্যাঁ, বলেই খালেদ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর এবার শিউলীই বলে উঠলো
    -কিছু জিজ্ঞেস করবে না আমাকে? কোথায় ছিলাম? কেন চলে গিয়েছিলাম বা আবার আজ কেন ফিরে এলাম?
    খালেদ এক মূহুর্ত চুপ থেকে বলল,
    -কি বলব?
    -কিছুই জানার ইচ্ছে হচ্ছে না তোমার?
    কথাটার জবাব না দিয়ে খালেদ এবার পালটা জিজ্ঞেস করল,
    -কেমন আছ তুমি? ভাল ছিলে এতদিন?
    শিউলী কথাটার জবাব দিলোনা। জিজ্ঞেস করল,
    -ঝুমুর কেমন আছে
    -ও এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে।
    -আমার কথাটার জবাব দিলেনা যে? শিউলী এবার জিজ্ঞেস করল।
    -আমাদের দুজনের পরস্পরের কোন কথার জবাব দেয়ার জন্য কি কোন দায়বদ্ধতা আছে কারো? খালেদ পালটা প্রশ্ন করল। এতক্ষণে সে একবারও শিউলীর দিকে তাকায়নি। সামনে রাস্তার দিকে তাকিয়েই কথা বলে যাচ্ছে।
    -তোমার কি কিছুই জানার ইচ্ছে হচ্ছে না?
    -নাহ। ছোট করে জবাব দিল খালেদ।
    -তাহলে আমি চলে যাই?
    -তুমি তো চলেই গেছ, আবার চলে যাবার কথাটা আসছে কেন? খালেদ এবার বলল।
    শিউলী কোন কথা বলল না। আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো। খালেদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
    -দাও, চায়ের কাপটা দাও।
    খালেদ কিছু না বলে চায়ের খালি কাপটা এগিয়ে দিল।
    শিউলী চায়ের কাপ দুটো নিয়ে ঘরে চলে গেল।
    খালেদ সার্বিক ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করল। শিউলী ফিরে এসেছে কেন? সে যেখানে গিয়েছিল, সেখান হতে ফিরে এসেছে কেন? তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। বুকের ভেতরে একটা ছোট মেঘ যেন আস্তে আস্তে বড় হয়ে যাচ্ছে। ঝড়ের আগে আকাশে যেমন হয়! আজ এতোগুলো বছরের পর ও ফিরে এলো কেন?
    আজ ঝুমুর এতটা বড় হয়ে গেছে। ঝুমুর তো তার মা নেই, এ মর্মে অন্য কথা জানে। আজ বাসায় এসে মা’কে দেখলে সে কি মনে করবে? তাকে তখন কি বলবে, এসব নিয়েই খালেদ ভাবতে লাগলো।
    সব মানুষই তার জীবনে মাঝে মাঝে অতীতের সম্মুখীন হয়। আজ যেমন খালেদ নিজে সে পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। ফিরে আসা অতীতকে আবার আঁকড়ে ধরার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। সেটা বরং জীবনকে আরো জটিল করে তোলে।
    খালেদ কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।
    -খালেদ।
    শিউলীর কণ্ঠে তার ভাবনা ছুটে গেলো। শিউলীর দিকে তাকাল সে।
    -দুপুরে কি খাবে তুমি? ঝুমুর কি খেতে পছন্দ করে?
    এ প্রশ্নে খালেদ এবার বেশ অবাক হলো। এর মানে কি দাঁড়াচ্ছে? শিউলী কি এখানে থেকে যাবার জন্য এসেছে?খালেদ কিছু বলবে না বলে ঠিক করল। এ কথার জবাব দেয়ার মানে হলো, শিউলীর এখানে থাকাটা সে মেনে নিচ্ছে বা থাকুক ধরণের কিছুতে সে সম্মতি দিয়েছে।
    -কিছু বলছ না যে?
    -কি বলব? এবার জবাব দিলো খালেদ।
    -কি রান্না করব তোমাদের জন্য?
    -কিছু রান্না করতে হবে না। খাবার রাখা আছে, ফ্রিজে। সেটা গরম করে নেবো আমরা।
    শিউলী কিছু বলল না। চলে গেলোনা। চুপ করে সেখানেই দাঁড়িয়েই রইল। খালেদ হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। একটু পরেই তাকে বেরোতে হবে ঝুমুরকে স্কুল হতে আনার জন্য।
    খালেদকে ঘড়ির দিকে তাকাতেই এবার শিউলী বলে উঠলো, ঝুমুরকে আনতে যাবে তো? আমিও যাবো তোমার সাথে।
    -নাহ, তুমি যাবে না। কথাটা বলেই খালেদের মনে হলো, এত জোরে কথাটা বলা ঠিক হলো কিনা! ঝুমুর তো তারও মেয়ে।

    শিউলী নির্বিকার ভাবে খালেদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুই বলল না। অনেক কিছুই ওকে স্পর্শ করেনা। নির্বিকার থাকার এক অসামান্য দক্ষতা আছে ওর। যদি ওকে স্পর্শই করত, তাহলে নিজের দেড় বছরের শিশুকে রেখে চলে যেতে পারত না। মানুষের নিষ্ঠুরতার একটা সীমা থাকে, তবে শিউলীর এ কাজটাকে একটা ভয়ংকর নিষ্ঠুর কাজ হিসেবেই সে মনে করে। খালেদ শিউলীকে অন্তত সেভাবেই দেখে। খালেদ এবার বলল,
    -না তুমি যাবে না। আমি ওকে নিয়ে আসব।
    -আচ্ছা। ছোট করে জবাব দিলো সে।
    -তুমি কি এ সময়টা এখানেই থাকবে? খালেদ এবার জিজ্ঞেস করল।
    -তুমি যদি চাও তবে আমি চলে যাব।
    এ কথার জবাবে খালেদ কিছু বলল না। কি বলবে সে? নিজের ভেতর অনেকগুলো প্রশ্ন এসে হাজির হয়েছে তার। আজ মেয়েকে কি বলবে? শিউলী ফিরল কেন? এত বছর সে কোথায় ছিল? যার কাছে গিয়েছিল, সেখান হতে ফিরে এলো কেন? কোন কিছুরই জবাব পাচ্ছে না সে। আনমনে ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ালো। রুমের ভেতর গিয়ে গাড়ির চাবিটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো খালেদ। শিউলী রয়ে গেল সেখানে।
    গাড়ি বের করতে করতে বুঝলো, আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে। অন্যদিনগুলোতে সে আরো পনের মিনিট পর বের হয়। তাড়াতাড়ি বের হলো কেন? শিউলীর উপস্থিতি কি তার ভাল লাগছিল না? সে কি শিউলীর ফিরে আসাটা চায়নি? নাকি সে শিউলীর মুখোমুখি হতে চাচ্ছে না? নাকি তার বর্তমান নিস্তরঙ্গ জীবনে নতুন কোন ঝড় আসুক সে চায়না? মনের ভেতরটাতে একটা গুমোট গুমোট অনুভূতি হচ্ছে।
    ঝুমুরের স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সমগ্র পরিস্থিতি নিয়ে ভাবছে খালেদ। জীবন বড় অদ্ভুত, অকস্মাৎ অতীত কেন ফিরে এলো সামনে? না এলেও তো হতো। অথচ এতগুলো বছর প্রতিদিন সারাবেলা তো সে শিউলীর কথাই ভেবেছে, গভীর ভালোবাসায় সে তো শিউলীকেই মনে প্রাণে চেয়েছে।
    অথচ আজ ও ঠিকই ফিরে এসেছে, কিন্তু তার মন সায় দিচ্ছে না কেন শিউলীর ফিরে আসা। মন মানছে না কিছুই। খালেদের মনে হলো, মানুষ ভাবনাতে যা চায়, সেগুলোর অধিকাংশকেই সে গ্রহণের যোগ্যতা রাখে না। ভাবনার আকাঙ্ক্ষা আর প্রাপ্তির বাস্তবতায় অনেক ফারাক। আজ সে নিজে সেটা অনুধাবন করছে।
    ঝুমুরের স্কুল ছুটি হয়েছে। মেয়েকে নিয়ে গাড়িতে উঠেই খালেদ জিজ্ঞেস করল,
    -আইসক্রিম খাবে তুমি, ঝুমুর?
    অপ্রত্যাশিত আইসক্রিমের প্রস্তাবে ঝুমুর খুশী হয়ে উঠল।
    -হ্যাঁ, বাবা। খাবো।
    -চলো আমরা আজ আইসক্রিম খাবো। খালেদ বলল।
    ঝুমুর খুশীতে হাততালি দিয়ে উঠলো। খালেদের মাথায় অন্য ভাবনা। সে ভাবছে, একটু সময় নিয়ে বাসায় যাবো। তাছাড়া ঝুমুরকে কিভাবে সে বলবে, সেটা নিয়েও ভাবছে সে।
    ঝুমুরের আইসক্রিম খাওয়া শেষ হয়ে গেল। ডাবল স্কুপ পেস্তাচিও খেয়েছে একটা। খেয়ে বলল, বাবা আর খেতে পারব না। বাসায় চলো।
    খালেদ কিছু না বলে মেয়েকে নিয়ে বাসায় রওনা হলো। ঝুমুরকে কিছুই বলা হলোনা, তার মায়ের ফিরে আসার ব্যাপারে। মনের ভেতর ঝড়টা বয়েই চলেছে। মনে মনে ঠিক করল, যা হবার হবে। যা সত্য তার মুখোমুখি তো হতেই হবে, তাদের তিনজনকেই। সত্যটা সামনে নিয়ে এসেছে শিউলী নিজে, সে সত্যটা এতদিন মেয়ের কাছে লুকিয়ে রেখেছিল সে আর ছোট এই মেয়েটা এ সত্যকে কিভাবে নেবে, সেটাই তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
    বাসার সামনে এসে গাড়ি থামতেই ঝুমুর বেরিয়ে এলো তার বরাবরের অভ্যাসে। বাবার কাছ হতে মেইন গেটের চাবি নিলো। স্কুল হতে এসে প্রতিদিন সে এ কাজটা করে। প্রতিদিন যে স্বাচ্ছন্দ্যে খালেদ গেটের চাবি দিয়ে দেয় ঝুমুরকে, আজ সেটাতে কেন যেন মন সায় দিচ্ছিল না।
    মেয়েটা দৌড়ে চলে গেল চাবিটা নিয়ে। পেছনে পেছনে খালেদ মেয়ের স্কুল ব্যাগ নিয়ে উঠে এলো। আজ মেয়েটা নিজের জীবনের কঠিনতম সত্যটার মুখোমুখি হবে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক চিরে।

    ঝুমুর এক দৌড়ে দোতলায় চলে গেল। খালেদ তখন মাত্র এক তলার সিঁড়িতে পা দিয়েছে। মেয়েটা দোতলায় দরজার কাছে গিয়ে জোরে ডেকে উঠলো,
    -বাবা।
    খালেদ দৌড়ে চলে এলো দোতলায় মেয়ের কাছে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই ঝুমুর বলল, বাবা আজ তুমি দরজা বন্ধ করে যাওনি। কথাটা বলেই বাবার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন বাবা একটা বিরাট বোকামি করে ফেলেছে। দরজার নবে চাবি দিতেই ঝুমুর বুঝে ফেলেছে, দরজা খোলা ছিল।
    খালেদের কপালে ঘাম জমেছে। ঘরে ঢুকলেই মেয়েটা যে দৃশ্যের সম্মুখীন হবে সেটা নিয়েই সে ভাবছে। ঝুমুর তো দেখলেই মা’কে চিনে ফেলবে। শিউলীর চেহারা তেমন পাল্টায়নি। দেয়ালে রাখা ছবির মতোই এখনো সে। ঝুমুর কি মা’কে দেখেই দৌড়ে জড়িয়ে ধরবে মাকে? নাকি চিৎকার করে উঠবে? খালেদ কিছুই ভাবতে পারছে না।
    ঝুমুর বলল,
    -বলতো বাবা, তুমি দরজা বন্ধ রেখে বেরিয়েছিলে কেন? খুব একটা শাসন করার ভঙ্গীতে দু হাত কোমরে রেখে জিজ্ঞেস করল।
    খালেদ কি বলবে, বুঝতে পারল না। আমতা আমতা করে বলল,
    -ওহ মা, বিরাট ভুল হয়ে গিয়েছিল।
    -এটাতো ঠিক হয়নি বাবা। খুব খারাপ হয়ে গেল তোমার এ কাজটা। বাসায় কতো জরুরী জিনিসপত্র আছে, কিছু যদি চুরি হয়ে যেতো? ঝুমুর বলল।
    -জরুরী কি আছে? খালেদ এবার জিজ্ঞেস করল।
    -বাহ! কি বলো বাবা? মায়ের ছবি আছে না। ঝুমুর বলল।
    কথাটা শুনেই খালেদের মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটার জন্য একটা নিদারুণ রূঢ় ব্যাপার বাসার ভেতর অপেক্ষা করছে। একটু পর মেয়েটার মনের উপর কি ঝড়টা আসবে সেটা নিয়েই যে চিন্তায় পড়ে গেল।
    –আসো, বাইরে দাঁড়িয়েই থাকবে নাকি? ঝুমুর কথাটা বলার মধ্যেই একটা ফোন এলো। খালেদ পকেট হতে ফোনটা বের করে দেখল একটা অপরিচিত নাম্বার। কি মনে করে ফোনটা ধরেই বলল,
    -হ্যালো।
    -আপনি খালিদ সাহেব বলছেন? ওপাশ হতে জিজ্ঞেস করলেন একজন অপরিচিত কণ্ঠের মানুষ।
    -জ্বী, বলছি।
    -আমি মাহবুব বলছি। ওপাশের মানুষটা নিজের পরিচয় দিতেই খালেদ একটা ভয়ানক ধাক্কা খেল। শিউলী যে লোকের সাথে চলে গিয়েছিল, তার নাম ছিল মাহবুব। এই লোক কি সে লোকই? শিউলী আজ এখানে চলে এসেছে বলেই কি লোকটা আজ ওকে ফোন করেছে?
    -ভাই, আপনাকে ফোন করে বিব্রত করার জন্য লজ্জিত। কিন্তু বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে আপনার নাম্বারটা কালেক্ট করেছি। ওপাশ হতে মাহবুব সাহেব বললেন।
    -জ্বী বলুন। কণ্ঠে একটা কাঠিন্য চলে এসেছে খালেদের। ঝুমুর তার দিকে তাকিয়ে আছে।
    -খালেদ সাহেব, আজ সকালে শিউলী হ্যাড এ ম্যাসিভ এটাক। শি হ্যাজ এক্সপায়ার্ড। কথাটুকু বলেই ওপাশের মানুষটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, সকাল নটায়।
    এটুকু বলেই ওপাশে ফোনটা কেটে দিল।
    খালেদ হতভম্ব হয়ে ফোনটা কানেই ধরে রেখেছে।
    ঝুমুর বলল, বাবা, ঘরে আসোতো। এখানেই দাঁড়িয়েই থাকবে নাকি? কথাটা বলে ঝুমুর বাসায় ঢুকল। পেছনে পেছনে খালেদ ভেতরে এলো। ভেতরে ঢুকেই ডাইনিং টেবিলের দিকে চোখ পড়ল তার। ঘোর লাগা মানুষের মতো ডাইনিং টেবিলের পাশে এসে দাঁড়ালো। তলানিতে কিছু চা সহ সেখানে দুটা চায়ের কাপ সেখানে।

    সমাপ্ত
    বোরহান মাহমুদ

    3
    2 Comments
Skip to toolbar