Profile Photo

Md.Emamuzzaman WahediOffline

  • Emamuzzaman
  • Profile picture of Md.Emamuzzaman Wahedi

    Md.Emamuzzaman Wahedi

    2 years, 7 months ago

    অস্তাচল ও একটি রক্তিম সূর্যের গল্প
    ইমামুজ্জামান ওয়াহেদী

    আজ আমার জীবনের বিশেষ একটি দিন।
    জানি বাবা, তুমি আসবে না।
    তুমি আসবেনা বলে
    আমি মোটেও অভিমান করব না।

    খাঁচা ভেঙ্গে যে পাখি একবার উড়ে যায়,
    আমি জানি, সে পাখি ফেরেনা কভু।
    তবু আকাশের বুকে, পাখির যাবার পথের দিকে,
    অশ্রুসিক্ত, নিষ্পলক যে চেয়ে থাকা-
    তা পাখির ফিরবার আশায় নয়,
    তা কেবলই চেয়ে থাকার জন্যই চেয়ে থাকা,
    অতি অযৌক্তিক, নিষ্ফল ও হাস্যকর।
    মানুষের অধিকাংশ কাজই অযৌক্তিক।
    মানুষ হতে হলে-
    যুক্তি ছাড়াই অনেক কাজ করতে হয়।
    তাই, তুমি আসবেনা বলে
    আমি আজও তোমার সাথে অভিমান করব না।

    যেবার আমি তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হলাম,
    পরীক্ষায় ভাল করায়
    সারাদিন তুমি আমাকে ঘাড়ে করে ঘুরালে।
    সেবারের পর, কখনোই
    আমি তোমার সাথে অভিমান করিনি আর।

    যেবার তোমার কোলে চড়ে হাটে যাবার পথে
    অচেনা কে যেন আমাকে দেখিয়ে
    তোমাকে জিজ্ঞেস করল,
    “এই অদ্ভুৎ পরীটি তোমার কে হয়?”
    তুমি তখন বললে,
    “তাপদগ্ধ দিনের শেষে ঐ অস্তাচল,
    সূর্যের জন্য যেমন শীতল আশ্রয়,
    এই মেয়েটি আমার
    তেমনি এক মমতার আশ্রয়, আমার মা।”
    সেবারের পর কখনোই তোমার সাথে
    অভিমান করিনি আর।

    তারপর, ওবাড়ির টিনা, নিতু, মীম
    তাদের বাবার ঘাড়ে চড়ে হাটে গিয়েছে কতবার,
    ভীত-সন্ত্রস্ত চোখে বাবাকে জড়িয়ে ধরে
    সাঁপখেলা দেখেছে পরম তৃপ্তিতে।
    আমি মনে মনে তোমাকে খুঁজতে গিয়ে
    ভয় পাবারও সুযোগ পাইনি, বাবা।

    একবার বাড়ির পাশের নদী দিয়ে
    ইয়া বড় এক বাদাম-তোলা নৌকা চলে গেল।
    কত কত মানুষের ভীড়, সেই নৌকা দেখার জন্য।
    ভীড়ের চাপে আমার আর দেখা হল না
    বাদাম-তোলা নৌকা দেখতে কেমন।
    টিনা, নিতুরা বাবার ঘাড়ে চড়ে
    নৌকা দেখল আরাম করে।

    সেদিনও তোমার সাথে আমি অভিমান করিনি,
    রাগও করিনি।
    লোকের ভীড় কমার পরে দেখেছি
    নৌকা নেই।
    তখন শুধু হাতের উল্টো পিঠ ঘষে
    মুছে ফেলেছি চোখের পানি।

    একবার রাতে যখন তুমি
    আমাকে ঘুম না পাড়িয়েই ঘুমিয়ে গেলে,
    সেবারই ছিল তোমার সাথে আমার
    শেষ অভিমান।
    পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে
    তুমি আর আমার মান ভাঙ্গোনি।
    উঠোনে অনেক অনেক মানুষের ভীড়ে
    আমি তোমাকে খুঁজে পাইনি বাবা।
    তোমাকে পেলে তোমার ঘাড়ে চড়ে-
    এমন এক দূর অজানায় চলে যেতাম,
    যেখানে তোমার সাথে হাজার বছর ধরে
    অভিমান করা যায়।

    বাবা, আজ আমার বিয়ে,
    জানি, আজও তুমি আসবে না।
    আমার চারদিকে আজ কত কোলাহল,
    কত মানুষ, কত আনন্দ, কত হাসি।
    এরই মাঝে হঠাৎ থমকে গেলাম।
    ছোট্ট একটি মেয়ে বাবার ঘাড়ে চড়ে
    তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
    ছোট্ট দু’টি হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে
    বাবার মাথার শক্ত দু’মুঠো চুল।
    সেই দু’মুঠো চুল যেন,
    দুই শতাব্দীর আস্থার আশ্রয়।
    তার দু’টি চোখে
    মহাজগতের সমস্ত সাহস যেন পুঞ্জীভূত।
    আমি ঈর্ষায় তার দিকে তাকাতে পারিনি আর।
    তার আগেই চোখের কাজল লেপ্টে গিয়েছে গালে।
    নষ্ট কাজল মুছে ফেলেছি শুধু,
    তোমার সাথে অভিমান করিনি তবু।

    একটু পরই আমার বিয়ে পড়ানো হবে।
    বাবার নামের জায়গায় তোমার নাম
    জোরে জোরে পড়বেন কাজী সাহেব।
    তোমার নামের প্রতি অক্ষর উচ্চারণের সাথে
    পদ্মার পারের মত ধসে যাবে আমার হৃদয়।
    কি অদ্ভুৎ মানুষ তুমি বাবা।
    তবু আমার মান ভাঙ্গাতে তুমি আসবে না।
    অস্তমিত রক্তিম সূর্য হয়ে কেবলই রয়ে যাবে
    হৃদয়ের শীতল অস্তাচলে!

    ০১.১১.২০২৩ ১৭.০০

    8
    4 Comments
Skip to toolbar