-
দুষ্টচক্র
বুধবার বিকেল। আকাশটা কালচে আর ভারী হয়ে আছে, যেন পেটের ভেতর একগাদা নোংরা জল নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে শহরের ওপর বমি করে দেবে। চট্টগ্রামের এই পোর্ট এরিয়াটায় সবসময় বাতাসের ভেতর সাগরের নোনা গন্ধ, লরিগুলোর পোড়া লুব্রিকেন্ট অয়েল, পচা মাছ আর ঘামের একটা উৎকট মিশেল থাকে। আমি একটা আধভাঙা চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে ছিলাম। আমার পায়ের কাছে, পুরনো চামড়ার সাইডব্যাগের ভেতর চার লাখ টাকা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। পুরনো, কচকচে নোট। টাকাগুলোর গা থেকে একটা অদ্ভুত গন্ধ বেরোচ্ছে— অনেকটা মানুষের লোভ আর ভয়ের গন্ধ।
কিছুক্ষণ আগে দুটো রাঘব বোয়ালের ডিল শেষ হয়েছে। ডিলটা কীসের, সেটা জানার কোনো ইচ্ছে বা দরকার আমার নেই। এ শহরে কে কাকে ঠকাচ্ছে, কে কার গলা কাটছে— তা নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে নিজের পকেট ভারী রাখাটা বেশি জরুরি। আমি দালাল। মাঝখান থেকে আমার বখরাটা বুঝে নিয়েছি। মনটা আজ ফুরফুরে। ভাবছিলাম, টাকাটা নিয়ে কয়েকদিনের জন্য পাহাড়ে চলে যাবো। সাজেকের দিকে। মেঘ আর আদিবাসী মদের ভেতরে এই শহরের নোংরা গন্ধটা হয়তো কিছুটা হলেও ধুয়ে ফেলা যাবে।
কিন্তু আগ্রাবাদ আখতারুজ্জামান সেন্টারের কাছাকাছি আসতেই, আমার দুই পায়ের মাঝখানে থাকা লোহা আর ফাইবারের যন্ত্রটা যেন হঠাৎ করেই শ্বাস নিতে শুরু করলো।
বাইকটা। আমার ভাঙাচোরা, জং-ধরা বাইক।
হ্যান্ডেলটা আমার হাত থেকে পিছলে যেতে চাইলো। যেন কোনো অদৃশ্য, বরফশীতল হাত আমার হাতের ওপর চেপে বসেছে। আমি এক্সিলারেটরে চাপ দিইনি, ইঞ্জিন বন্ধ করে ক্লাচ চেপে জ্যাম পার হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ইঞ্জিনটা একটা ক্ষুধার্ত, আহত কুকুরের মতো গোঁতগোঁত করে গর্জে উঠলো। টায়ারের নিচ থেকে ঘর্ষণের বিশ্রী আওয়াজ বেরোলো।
*শালা।* দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি। বুঝে গেছি। এই জ্যান্ত লোহাটা আবার তার খাবার খুঁজে পেয়েছে।
এই বাইকটা আমি কোনো শোরুম থেকে কিনিনি। পেয়েছিলাম রাস্তার ধারে, একটা উল্টে থাকা ডাস্টবিনের পাশে পড়ে ছিলো। প্রথম কয়েকদিন চালানোর পরই বুঝেছিলাম, জিনিসটার ভেতর এমন কিছু আছে যা বিজ্ঞান দিয়ে মাপা যায় না। এটা শুধু তেল আর মবিলে চলে না। এটা চলে একটা অদ্ভুত, অশুভ প্রেরণায়। নিজের খেয়ালে, সরসর করে বিপদের দিকে এগিয়ে যায়। আর আমাকে টেনে নিয়ে যায় সাথে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমি বাইকটা চালাই না; বরং বাইকটাই আমাকে চালায়।
আগ্রাবাদের জট কাটিয়ে শাঁই শাঁই করে এগোতে লাগলো বাইকটা। তারপর হঠাৎ— একটা স্পন্দনহীন মরা লাশের মতো ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলো।
ডানে-বাঁয়ে তাকাতেই দেখলাম এক মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা ফুটপাতের এক কোণে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখে পলক নেই। পরনে একটা সস্তা সুতির শাড়ি, যেটা গত কয়েকদিনের বৃষ্টি আর কাদায় মাখামাখি। দৃষ্টি একেবারে ফাঁকা, যেন চোখের মণিদুটো কাঁচের তৈরি।
আমি বাইক থেকে নামলাম। “আন্টি, শুনছেন? এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”
কথাটা বলতেই তার ভেতরের কোনো একটা বাঁধ যেন ভেঙে গেলো। ভদ্রমহিলা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তার কান্নার শব্দটা এতোটাই মর্মান্তিক ছিলো যে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেলো। মনে হলো, এই কান্না কোনো জীবিত মানুষের নয়, গোরস্তান থেকে উঠে আসা কোনো প্রেতাত্মার। অসংলগ্ন কথার ফাঁকে বুঝলাম— তার নাম মাশিয়াত সওদাগর। তার মেয়ে, কানিজা, কিছুদিন আগে একটা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। কিন্তু মায়ের দাবি, ওটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়।
“ওরা আমার কানিজাকে খুন করেছে বাবা…” তিনি আমার শার্ট খামচে ধরলেন। তার হাতের নখগুলো আমার চামড়ায় বসে যাচ্ছিলো। “ও খুব সাবধানে গাড়ি চালাতো। ওভাবে ও মরতে পারে না! ওকে খুন করেছে ওরা!”
তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিলাম আমি। ট্যাক্সিটা চোখের আড়াল হতেই আকাশে প্রথম মেঘ ডাকলো। বাইকে গিয়ে চাপতেই, কোনো কিক ছাড়াই ইঞ্জিন স্টার্ট নিলো। গন্তব্য— লালদিঘী মোড়ে আমার অন্ধকার আস্তানা।
লালদিঘীর আস্তানাটায় গুমোট গরম। ছাদের সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরছে, কিন্তু তাতে বাতাসের চেয়ে শব্দদূষণ বেশি হচ্ছে। ল্যাপটপের নীল আলোয় আমার মুখটা ভৌতিক দেখাচ্ছে।
সার্চ ইঞ্জিনে কানিজা সওদাগরের নাম ফেলতেই খবরগুলো বেরিয়ে এলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবিটায় দেখলাম সাদামাটা, হাসিখুশি একটা মেয়ে। চোখের ভেতর জীবনের অদ্ভুত মায়া। এই মেয়েটা মরে যেতে পারে, এটা ভাবতেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হয়।
পুলিশের অফিশিয়াল রিপোর্ট পড়লাম। মেয়েটা একটা সাদা টাটা ন্যানো ড্রাইভ করছিলো। হাইওয়েতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পরপর তিনটা গাড়িকে ধাক্কা মারে। লাল পোরশে, সবুজ সেডান আর একটা নীল টয়োটা। স্পট ডেড।
রিপোর্টটা একেবারে নিখুঁত। এতোটাই নিখুঁত যে দেখলেই সন্দেহ হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, মেয়েটা ওভারস্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিলো। কিন্তু ছবিগুলোর ওপর জুম করতেই আমার চোখ আটকে গেলো।
টাটা ন্যানোর ড্রাইভারের পাশের জানালার কাঁচে একটা গর্ত। ছোট, গোলাকার একটা গর্ত, যেটার কিনারাগুলো মাকড়সার জালের মতো ফেটে আছে।
বুলেট।
পুলিশের খাতায় ওই গর্তটার কোনো অস্তিত্ব নেই। অ্যাক্সিডেন্ট হলে গুলিটা করলো কে? সে কি কারো কাছ থেকে পালাচ্ছিলো?
আমার জানালার শার্সিতে বৃষ্টির ছাঁট লাগতে শুরু করেছে। আমি জানি, পুলিশ ঝামেলা এড়াতে অ্যাক্সিডেন্ট ন্যারেটিভ সাজিয়েছে। তদন্ত মানেই পেপারওয়ার্ক, ডিউটি আওয়ারের বাইরে খাটনি আর উপরমহলের চাপ। আয়নায় নিজেকে দেখলাম। আমার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু তার নিচে একটা জেদ। কানিজার হাসিখুশি ছবিটার দিকে তাকিয়ে ওর মায়ের আর্তনাদটা আবার কানে বাজলো। এই কেসটা আমাকেই দেখতে হবে।
পরের কয়েক ঘণ্টা কাটলো ডাস্টবিন ঘেঁটে। কাজির দেউড়ি থানার এক কনস্টেবলকে পকেট গরম করে অরিজিনাল রিপোর্ট দেখলাম। এরপর ধরলাম ময়নাতদন্তকারী ডাক্তারকে।
লোকটার চেম্বারে লাশের পচা গন্ধ ঢাকতে ফিনাইল ছড়ানো হয়েছে, কিন্তু তাও বাতাসে একটা মিষ্টি-মিষ্টি বমি-আসা গন্ধ। একটা নীল মাছি ভনভন করে উড়ছিলো লোকটার মাথার ওপর। সিআইডির নাম ভাঙিয়ে একটু চাপ দিতেই সে ঘামতে ঘামতে সত্যিটা উগরে দিলো।
“গুলিটা একেবারে কলজে ভেদ করে গেছিলো ভাই। পেছন থেকে ফায়ার করা। অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার আগেই মেয়েটা ক্লিনিক্যালি ডেড ছিলো। আমাকে ওপরমহল থেকে চুপ থাকতে বলা হয়েছে।”
সোজা গিয়ে হাজির হলাম কাজির দেউড়ি থানায়। ইন্সপেক্টর দেলোয়ার। টেবিলের ওপাশে বসা লোকটার মুখটা থ্যাবড়া, ঘামে চকচক করছে। দাঁতের ফাঁকে পানের পিক জমে কালচে হয়ে আছে।
“ভিকটিমের গাড়িতে গুলির দাগ কেন, দেলোয়ার সাহেব? আর কলজেতে ঢোকা গুলির কথা রিপোর্টে গুম করলেন কেন?”
দেলোয়ার ফাইল থেকে চোখ তুলে তেরছা নজরে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে একটা কুৎসিত হাসি ফুটে উঠলো। “ঐ বেডি আপনের কী লাগে মিয়া? আপনে কি তার উকিল নি?”
“কেউ না। জবাব দিন।”
দেলোয়ার ফাইলটা সজোরে টেবিলে ছুঁড়ে মারলো। “ছিনতাইয়ের চেষ্টা হইসিলো। মাইয়া প্যানিক কইরা অ্যাক্সিডেন্ট করসে। ছিনতাইকারী দুইটারে ধইরা বানানি দিসি। তারা কনফেশনও দিসে। কেস ক্লোজড।”
“ভিকটিমের কাছের মানুষদের জেরা করেছেন? ওর বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত কেউ?”
দেলোয়ার এবার টেবিলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে এলো। তার নিঃশ্বাসে পুরোনো সিগারেটের উৎকট গন্ধ। “শোনেন মিয়া, হোগা দিয়া পাহাড় ঠেলতে যায়েন না। থার্ড ডিগ্রি খাইসেন কখনো? আইসেন থানায়, চামড়া তুইলা লবণে ডুবায়া রাখুম। আপনে যে কী মানুষ, সেইটা আমি জানি। দালালির পয়সায় চলেন, ওইটাই করেন। পুলিশের কাজে নাক গলাইলে এই চট্টগ্রামে থাকা মুশকিল হইয়া যাইবো।”
আমি কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এলাম। লোকটার চোখে আমি দুর্নীতি দেখিনি, দেখেছি একটা নোংরা সিস্টেমের অহংকার।
রাত বাড়ছে। বৃষ্টিটা থেমে গেছে, কিন্তু আকাশ এখনো ভারী মেঘে ঢাকা। একটা তারারও দেখা নেই। যেন মহাকাশটাও আজ চোখ বন্ধ করে আছে এই শহরের পাপ না দেখার জন্য।
আস্তানায় ফিরে সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। মাথার ভেতর দপদপ করছে। কী দরকার আমার এসবের? থার্ড ডিগ্রি খাওয়ার কোনো শখ আমার নেই। কানিজা আমার কেউ নয়। আমি দালালি করে খাই, সেটাই তো আমার জগৎ। আমি কোনো সুপারহিরো নই।
বাইরে এসে বাইকটাতে বসলাম। প্যাডেলে পা রাখার আগেই লোহাটা নড়ে উঠলো। চলতে শুরু করলো একা একাই।
শহরের রাস্তায় জনমানব নেই। কেমন একটা দমবন্ধ নীরবতা, যেন চারপাশটা একটা বিশাল কফিনের ভেতর আটকা পড়েছে। হঠাৎ মনে হলো, রাস্তার পাশের অন্ধকার গলিগুলো থেকে শত শত ছায়া বেরিয়ে আসছে। তারা মিছিলের মতো আমার বাইকের পাশ দিয়ে হাঁটছে।
“নাহ! মনের ভুল!” আমি চোখ কচলালাম। কিন্তু না, ছায়াগুলো সত্যি। তাদের মাঝে মাথা নিচু করে হেঁটে চলা কানিজাকেও দেখলাম আমি। মেয়েটার শরীর থেকে টপটপ করে রক্ত ঝরছে রাস্তায়। ওর ঘাড়টা অস্বাভাবিকভাবে একদিকে হেলে আছে।
বাইকটা থামলো একটা পুরনো গোরস্তানের সামনে। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দেখলাম, সেখানে আরও অনেকের মতো— কানিজারও একটা নতুন কবর আছে। কবরের মাটি এখনো ভেজা।
হঠাৎ টের পেলাম, পাশের ল্যাম্পপোস্ট থেকে কিছু একটা ঝুলছে। বেঁটেখাটো, কুচকুচে কালো একটা অবয়ব।
“ওস্তাদ? এসেছেন?” গলাটা আমার নিজের কানিতেই অচেনা ঠেকলো।
লোকটার নাম বিলাই। এই বাইকটা পাওয়ার এক সপ্তাহ পর তার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। লোকটার হাঁটাচলা বিড়ালের মতোই নিঃশব্দ।
“ভাগতেছস? ভাগা আর বন্ধ করলি নারে, হতভাগা!” বিলাইয়ের গলাটা যেন ভেজা কবরস্থান থেকে উঠে আসা বাতাসের মতো শোনালো। “মাইয়াটার শরীর কব্বরে পইচা যাওনের আগে, সেটার হক আদায় কর! দেরি করিস না।”
“পুলিশ আমাকে থার্ড ডিগ্রির হুমকি দিয়েছে! আমি এসব চাই না! আপনার বাইক আপনি ফেরত নিয়ে যান! আমি এর কামলা খেটে খেটে মরে যাচ্ছি!” আমি প্রায় চিৎকার করে উঠলাম গোরস্তানের নিস্তব্ধতা ভেঙে।
বিলাই এক লাফে ল্যাম্পপোস্ট থেকে নিচে নামলো। “ভাবছোস এই শহরে তুই একাই আকেলমন্দ? তুই একটা আমানত পাইছস! এই পঙ্খীরাজ ইনসাফ করনের হাতিয়ার! তোর পয়লা বাটপারিটার কথা ইয়াদ আছে? আরিচা ঘাটে এক হতভাগা বাপেরে বুদ্ধু বানাইয়া মাইয়াটার সওদা করসিলি তুই, হারামখোর! তুই কয়টা আদমের বাচ্চার হক আদায় করছোস? এখনো ওই মাইয়ার খুনের হক আদায় হয় নাই! তোর হাত দ্যাখ!”
আরিচা ঘাট। সেই কালরাত্রি। বৃষ্টির ভেতর একটা হতভাগা বাবার মুখ, যে আমাকে বিশ্বাস করে তার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলো ঢাকায় নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য। আর আমি… টাকার লোভে মেয়েটাকে তুলে দিয়েছিলাম একদল জানোয়ারের হাতে।
আমি চমকে নিজের হাতের দিকে তাকালাম। নিয়ন আলোতেও দেখলাম, আমার দুই হাত কনুই পর্যন্ত টকটকে লাল রক্তে মাখা। রক্তগুলো আঠালো, আর তা থেকে কসাইখানার মতো কাঁচা মাংসের গন্ধ বেরোচ্ছে। পকেট থেকে টিস্যু বের করে পাগলের মতো ঘষতে লাগলাম। কিন্তু দাগ মুছলো না। আরিচা ঘাটের সেই পাপ আমি ভুলতে চেয়েছি। শহরের অন্ধকার গলিতে দালালি করে সেই স্মৃতি ঢাকতে চেয়েছি। কিন্তু এরা আমাকে ভুলতে দেবে না। বাইকটা আমাকে দিয়ে সেই পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত করাচ্ছে।
ফিরে তাকাতেই দেখলাম, ল্যাম্পপোস্ট খালি। বিড়ালের মতো লাফ দিয়ে ছাদের কার্নিশ ধরে মিলিয়ে গেছে বিলাই।
পরদিন সকালে উঠেই আবার তদন্ত। কানিজার কেসের ডিটেইলস ঘাঁটতে শুরু করলাম। তিনটা গাড়ির মধ্যে টাটা ন্যানোর সবচেয়ে কাছে ছিলো কে?
নীল টয়োটা! পুলিশ টয়োটার মালিককে ট্রেস করতে পারেনি। নম্বর ভুয়া।
সোজা গেলাম দৈনিক আজাদীর অফিসে। ফটোগ্রাফার আবদুল আলীম আমার পুরনো দোস্ত। ওকে নিয়ে ডার্করুমে ঢুকলাম। ডার্করুমে লাল আলো জ্বলছে। বাতাসের ভেতর ডেভলপার কেমিক্যালের তীব্র গন্ধ।
“দোস্ত, কানিজা সওদাগর কেসের ফটোগুলা দেখা। তোকে আজ স্পেশাল কাচ্চি খাওয়াবো।”
ছবিগুলো দেখলাম। নীল টয়োটার মালিক হুডি দিয়ে মুখ ঢেকে আছে।
“আলীম, নম্বর প্লেটটায় একটু জুম কর তো।”নম্বর প্লেটের ঝাপসা লেখাটা পরিষ্কার হতেই সেটা টুকে নিলাম। বিআরটিএ-তে আমার সোর্সের মাধ্যমে জানলাম— গাড়ির মালিক মুহিতুল হক, বাসা সার্সন রোডের বেভারলি হিলস আবাসিকে।
সেখানে গিয়ে মুহিতুল সাহেবের সাথে কথা বলে ধাক্কা খেলাম। তার গাড়ি গত ছয়মাস ধরে গ্যারেজে বসা। টায়ারে হাওয়া নেই, ইঞ্জিনে ধুলোর আস্তরণ। তবে নম্বর প্লেটটা গায়েব। স্ক্রুগুলোর জায়গা পরিষ্কার, মানে চুরিটা সপ্তাহ দুয়েক আগের ঘটনা।
আস্তানায় ফিরে আরেকটা জিনিস খেয়াল করলাম। কানিজা জামাল খানে ‘পালংকী’ নামের একটা রেস্টুরেন্টে কাজ করতো। ডে শিফট।
সেখানে গিয়ে ম্যানেজারকে ধরলাম। রেস্টুরেন্টের ভেতর বিরিয়ানি আর কাবাবের গন্ধের নিচে একটা চাপা ভয়ের গন্ধ পাচ্ছিলাম আমি।
“কানিজা একটা রিলেশনে ছিলো ভাই।” ম্যানেজার এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললো। “ছেলেটার নাম টিটু। আস্ত একটা সাইকো! প্রথম দিকে জেন্টলম্যান ছিলো, পরে ক্রিপের মতো করা শুরু করে। ব্রেকআপের পর ছেলেটা একটা রয়াল এনফিল্ড নিয়ে ছায়ার মতো ঘুরতো ওর পেছনে। মেয়েটা ভয়ে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে ভেগেছিলো। আর মাঝপথেই…”
ম্যানেজারের কাছ থেকেই কানিজার রুমমেট জিনিয়া নাজনীনের ঠিকানা পেলাম। চৌধুরীহাটে বাসা।
জিনিয়ার সাথে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম, মেয়েটা কিছু লোকাচ্ছে। পুলিশের শেখানো বুলি আওড়াচ্ছে সে।
“আমি কিছুই জানি না। কানিজা আমার সাথে তেমন কথা বলতো না। টিটু সম্পর্কেও আমার কোনো আইডিয়া নেই। ও নাকি সিলেটে জব করে, ব্যস এটুকুই জানি।”মেয়েটার হাত কাঁপছিলো। চোখ দুটোতে ভয়, কোনো কিছু লোকানোর ভয়। ক্যাম্পাসে খোঁজ নিয়ে জানলাম, টিটুর বর্ণনার সাথে নীল টয়োটার হুডি পরা লোকটার হুবহু মিল। ঝাঁকড়া দাড়ি, বেগুনি হুডি।
হঠাৎ ফোন বাজলো। স্ক্রিনে দেলোয়ারের নম্বর।
“ক্লোজ কেসে শনির দশা ক্যান লাগাইতেসেন? জিনিয়া ম্যাডাম আপনের নামে হ্যারাসমেন্টের কমপ্লেইন করসে। থার্ড ডিগ্রির কথাটা কি আসলেই ভুইলা গেলেন?”
লাইনটা কেটে গেলো। তার মানে জিনিয়াই পুলিশকে জানিয়েছে। পাজলের টুকরোগুলো মিলতে শুরু করেছে। খুনি ভিকটিমের এক্স বয়ফ্রেন্ড টিটু। নীল টয়োটা চালিয়েছে। প্রমাণ লোপাট করতে নম্বর প্লেট চুরি করেছে। কিন্তু ওকে পাবো কোথায়?
মাঝরাতে একটা কড়া চা খেয়ে বাইকের কাছে গেলাম। ইঞ্জিনের গায়ে হাত বুলিয়ে, বিলাইয়ের শেখানো কায়দায় ফিসফিস করে বললাম, “এদের মধ্যে কে খুনির খোঁজ জানে?”
এই ক্যারিয়ারটাও আরেক আজব জিনিস। ক্যারিয়ারের ভেতর থেকে একটা পুরনো ক্যাশমেমো বেরিয়ে এলো। উল্টোদিকে জিনিয়ার হাতের লেখায় একটা ফোন নম্বর আর ঠিকানা। চৌধুরীহাট।
মাঝরাতে বাইক ছোটালাম চৌধুরীহাটের দিকে। আকাশ আবার মেঘ করে এসেছে। সামাদ ভিলা নামের বাড়িটা খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না। তিনতলা বিল্ডিংয়ের চারপাশে পুলিশ গিজগিজ করছে। সামনে দিয়ে ঢোকার চেষ্টা বৃথা।
কাঁধের ব্যাগ থেকে সিল্কের কর্ড আর স্টেইনলেস স্টিলের হুক বের করলাম। পেছনের দেয়াল বেয়ে, দড়ি ছুঁড়ে দোতলার কার্নিশে আটকে দিলাম। হুকটা কংক্রিটে কামড় বসাতেই বাঁদরের মতো ঝুলে পড়লাম। পেশিতে টান পড়ছে, বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা হাতুড়ির মতো পেটাচ্ছে। জানালার ঘুলঘুলির কাছে পৌঁছাতেই ভেতরে চাপা গলায় কথা কাটাকাটির আওয়াজ পেলাম।
জিনিয়ার গলা: “তুমি এদিকে কেন আসছো ভাইয়া? আমি পুলিশ ডাকসি। ওই লোকটা খুব ছোঁক ছোঁক করছে। তুমি হুডিটা পুড়িয়েছো?”
টিটুর গলা: “টয়োটার রঙ তুলে ফেলসি আমি। দেলোয়ার আমাকে ব্যাকআপ দিচ্ছে। একটা সস্তা দালালের ভয়ে আমি লুকাবো না!”
জিনিয়া: “তোমার কি আক্কেলজ্ঞান নেই? একটা খুন করেছো, এবার কি জেলেও যাবে? কয়েকদিন ডুব মেরে থাকো না!”পকেট হাতড়ে ডার্টগানটা বের করলাম। জানালার ঘুলঘুলি দিয়ে জিনিয়ার কাঁধ সই করে ফায়ার করলাম।
“আহ…” ধপ করে মেঝেতে পড়লো জিনিয়া। ট্র্যাঙ্কুইলাইজারের ডোজটা কড়া ছিলো।
“জিনিয়া? কী হইসে?” টিটুর আতঙ্কিত গলা শোনা গেলো। “আমি আসতেসি! যাইস না!”আমি দড়ি বেয়ে নিচে নেমে সোজা গ্যারেজের দিকে গেলাম। স্কেলিটন কী দিয়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম তিনটা গাড়ি। তার মধ্যে একটা নীল টয়োটা, তবে সেটার গায়ের রঙ চেঁছে ফেলা হয়েছে। নতুন লাগানো একটা ভুয়া নম্বর প্লেট জ্বলজ্বল করছে। ছবি তুলে একটা বার্নার ফোন থেকে দেলোয়ারকে মেসেজ করলাম— “চৌধুরীহাট সামাদ ভিলা। কানিজার কেসের লিড আর আপনার আসামির গাড়ি। জলদি আসেন, নইলে প্রমাণসহ কাল সকালের পত্রিকায় আপনার আর টয়োটার ছবি উঠবে।”
গ্যারেজ থেকে বেরোতেই দেখলাম গেট দিয়ে একটা রয়াল এনফিল্ড ঢুকছে। টিটু।
ও আমাকে দেখেই রিয়ারভিউ মিররে দেলোয়ারের দেওয়া বর্ণনার সাথে মিলিয়ে নিলো। এক মুহূর্ত দেরি না করে বাইক ঘুরিয়ে স্পিড বাড়ালো সে।
আমার জ্যান্ত বাইকটা গর্জে উঠলো। ইঞ্জিন থেকে আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে যেন। শাঁই শাঁই করে তাড়া করলাম ওকে।
“টিটু মিয়া, লাভ নাই! পুলিশ টয়োটার খোঁজ পেয়ে গেছে! তুমি শেষ!”টিটু চলন্ত অবস্থায় আমার বাইকের টায়ার সই করে একটা লাথি মারার চেষ্টা করলো। বাইকটা একটু টলে উঠলো, কিন্তু থামলো না। আমি ডার্টগান দিয়ে ওর দিকে ফায়ার করলাম, কিন্তু অন্ধকারে মিস হলো।
ঠিক তখনই, চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ করে জমে বরফ হয়ে গেলো। রাস্তার নিয়ন বাতিগুলো দপ করে নিভে গেলো। অন্ধকার, গাঢ় এবং দুর্গন্ধযুক্ত একটা অন্ধকার নেমে এলো রাস্তায়। মনে হলো শত শত ছায়া পিলপিল করে আমাদের চারপাশ দিয়ে ছুটছে।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, একটা কুচকুচে কালো অতিকায় ঘোড়ায় চেপে— আমার ঠিক পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে কানিজা! ঘোড়াটার চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল, আর তার খুর থেকে রাস্তায় আগুনের ফুলকি ঝরছে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই এনফিল্ডের সামনে এসে দাঁড়ালো ঘোড়াটা। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ছিটকে পড়লো টিটু। রাস্তায় ঘষটে গিয়ে ওর হেলমেটটা ছিটকে গেলো।
আমি বাইক থামিয়ে দেখলাম, কানিজা ঘোড়া থেকে নেমেছে। ওর মুখটা কাগজের মতো সাদা, আর চোখদুটো সম্পূর্ণ কালো, কোনো মণি নেই সেখানে। ও আমাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে টিটুর শার্টের কলার চেপে ধরলো। তারপর হিড়হিড় করে জমাটবাঁধা অন্ধকারের ভেতর টেনে নিয়ে যেতে লাগলো। টিটু চিৎকার করার চেষ্টা করছিলো, কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোলো না। আমি দৌড়েও তাদের নাগাল পেলাম না। মেয়েটার গতি অবিশ্বাস্য।
থানার সদর দরজায় গিয়ে মেয়েটা আর টিটু হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।
উপসংহারঃ
ইন্সপেক্টর দেলোয়ার সামাদ ভিলা থেকে টয়োটা উদ্ধার করতে বাধ্য হয়। প্রমাণ লোপাটের দায়ে জিনিয়া আর খুনের দায়ে টিটুকে অ্যারেস্ট দেখানো হয়। মিডিয়ার চাপে দেলোয়ারকে ওপরমহল থেকে সাসপেন্ড করা হয় দায়িত্ব অবহেলার কারণে।
কয়েক মাস পর, আমি টিটুর ফাঁসি দেখতে গিয়েছিলাম। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছেলেটার চোখদুটো ছিলো উন্মাদারের মতো, যেন সে এমন কিছু দেখেছে যা মানুষের দেখার কথা নয়। লিভার টানার পর দড়ির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা আমার কানের ভেতর অনেকক্ষণ বাজছিলো।
আরিচা ঘাটের সেই পাপ পুরোপুরি মুছেছে কি না আমি জানি না। আমার হাত ধুলে এখনো মাঝে মাঝে কসাইখানার গন্ধ পাই। হয়তো আরও অনেক মুশকিল বাকি আছে। আরও অনেক রাত আমাকে এই পঙ্খীরাজের কামলা খাটতে হবে। কিন্তু কানিজার কেসটা হাতে নেওয়ার পর, সে রাতেই প্রথম আমি শান্তিতে ঘুমিয়েছিলাম। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছিলো, আর আমি জানতাম, বাইকটা গ্যারেজে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। নতুন কোনো মুশকিলের আশায়।
2 Comments
Friends
মোঃ রাকিবুল হাসান
@rakibwriter
মোঃ জাহিদুল ইসলাম জীবন
@jibon
apu azad
@apuazad
নুসরাত শাইরিন কন্ঠি
@rafinrahnin
মোঃ মাজহারুল ইসলাম
@majharulislam1842003gmail-com
Rafi Shams
@rafishams
MD IKRAMUL HASSAN
@md-ikramul-hassan
rukaiya rakhi
@rukaiyarakhi
Syed Farah
@syedfarah


জং-ধরা পঙ্খীরাজের পিঠে চড়ে প্রায়শ্চিত্তের রাত….🖤