Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    2 months, 2 weeks ago

    আড়ালে তার সূর্য হাসে

    অনেকক্ষণ ধরেই পাশের বাড়ি থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। চিৎকারের ফাঁকে ফাঁকে একটা মেয়ের চাপা কান্না, ফোঁপানির শব্দ, যেন কেউ প্রাণপণে কাঁদা থামিয়ে রাখতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। খোকন বিছানায় বসে আছে। সবে বাইরে থেকে ফিরেছে। সারা শরীরে ক্লান্তি জমে আছে, তবু আজ বিশ্রাম নিতে পারছে না। এই কান্নার শব্দ তার বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা তৈরি করছে। এ দৃশ্য তার কাছে নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিনই সে এই বাড়ি থেকে মেয়েটার চিৎকার শুনে। প্রথম প্রথম সে ভেবেছিল, অন্যের পারিবারিক বিষয় নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। মানুষ তাকে ভয় পায়, তার নাম শুনলে রাস্তা ছেড়ে দেয়, কিন্তু সে কখনো কোনো মেয়েলি ঝামেলায় নিজেকে জড়ায় না। তার নিজেরও কিছু নিয়ম আছে। কিন্তু আজ কেন জানি নিজেকে আটকে রাখতে পারছে না। মেয়েটার কান্না আজ যেন তার বুকের মধ্যে এসে বাজছে। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। পাশের বাড়ির একটা ঘরে আলো জ্বলছে। আলোটা বারবার কেঁপে উঠছে, মনে হচ্ছে ভেতরে ধস্তাধস্তি চলছে। তারপর আবার সেই চিৎকার, “মাফ করে দেন… আমি আর করব না…” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই একটা প্রচণ্ড আঘাতের শব্দ ভেসে আসে। খোকনের মুখের পেশি শক্ত হয়ে ওঠে। তার দুই চোখ রক্তের মতো লাল হয়ে যায়। হঠাৎ তার মনে হয়, এই কান্না সে আর শুনতে পারছে না। আজ কিছু একটা করতেই হবে।

    খোকন দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। রাত অনেক হয়েছে। চারপাশে নীরবতা। দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠছে। কিন্তু পাশের বাড়ির সেই কান্না সমস্ত নীরবতাকে ভেঙে দিচ্ছে। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বাড়িটার দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই যে দৃশ্যটা দেখে, তাতে তার সমস্ত শরীর আগুন হয়ে ওঠে। ঘরের মাঝখানে একটা সতেরো-আঠারো বছরের মেয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। মেয়েটার চুল এলোমেলো, গায়ের ওড়না সরে গেছে, ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির কর্তা মফিজ সাহেব। হাতে একটা মোটা বাঁশের লাঠি। তিনি একের পর এক আঘাত করে চলেছেন। পাশে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী রহিমা বেগম মুখ বিকৃত করে বলছেন, “আজ তোকে মেরেই ফেলব। চোর কোথাকার! টাকা চুরি করে আবার মুখের ওপর মিথ্যা কথা বলিস!”

    মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “আমি টাকা নিই নাই। আল্লাহর কসম, আমি নিই নাই।”

    কিন্তু কেউ তার কথা শুনছে না।

    মফিজ সাহেব আবার লাঠি তুলতেই খোকন আর নিজেকে সামলাতে পারে না। এক লাফে সামনে গিয়ে লাঠিটা তার হাত থেকে টেনে নেয়। এত দ্রুত সবকিছু ঘটে যে কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারে না। তারপর সেই লাঠি দিয়েই সে সজোরে একটা বাড়ি বসিয়ে দেয় মফিজ সাহেবের পিঠে। লোকটা ব্যথায় চিৎকার করে মেঝেতে বসে পড়ে। খোকনের মুখ তখন পাথরের মতো শক্ত।

    সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “একটা মাইয়ার গায়ে হাত তুলতে তোর লজ্জা করে না?”

    মফিজ সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে আতঙ্ক। “খোকন! তুমি…”

    কথা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা বাড়ি পড়ে তার কাঁধে। পাশ থেকে রহিমা বেগম ছুটে এসে স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তিনি খোকনের হাত চেপে ধরে চিৎকার করে বলেন, “খোকন থাম, উনারে মারতাছো কেন?”

    খোকন তাকে এক ঝটকায় সরিয়ে দেয়। মহিলাও আবার সামনে এসে দাঁড়ান। তখন রাগে অন্ধ হয়ে খোকন তাকেও দুই তিনটা বাড়ি মেরে দেয়। মহিলা চিৎকার করে পেছনে সরে যান। পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। শুধু মেয়েটার ফোঁপানির শব্দ শোনা যায়।

    খোকন লাঠিটা ফেলে দিয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে। মনে হচ্ছে এবার বুঝি সেও মার খাবে। খোকন ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বসে।

    “তোর নাম কী?”

    মেয়েটা কাঁপা গলায় বলে, “লায়লা।”

    “তোর কেউ নাই?”

    মেয়েটা মাথা নিচু করে ফেলে।

    “বাবা-মা নাই। শুধু নানী আছে।”

    খোকন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর আবার জিজ্ঞেস করে, “এই বাড়িতে কীভাবে আসছিস?”

    লায়লা চোখ মুছতে মুছতে বলে, “গ্রাম থেকে আনছে। কইছিল নিজের মেয়ের মতো রাখবে।”

    এই কথাটা শুনেই খোকনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই বয়সে একটা মেয়ের চোখে এত ভয়, এত কষ্ট থাকা উচিত নয়। তারপর সহসাই মেয়েটার হাত ধরে টেনে তুলে দাঁড় করায়। “আমার সঙ্গে যাবি?”

    পেছন থেকে মফিজ সাহেব আবার চিৎকার করে ওঠেন, “ও আমাদের কাজের মেয়ে। ওকে নিয়ে যাওয়ার সাহস করবি না।”

    খোকন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। তারপর এমন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায় যে লোকটা আর একটা কথাও বলতে পারে না।

    সে আবার লায়লার দিকে ফিরে বলে, “চল আমার সাথে?”

    লায়লা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন বুঝতেই পারছে না কী বলবে। “কোথায় যাব?”

    “এই জাহান্নাম থেকে দূরে।”

    মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর খুব আস্তে করে মাথা নাড়ে।

    খোকন তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখে। মেয়েটার শরীর কাঁপছে। সে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে। পেছন থেকে রহিমা বেগম গালাগাল করতে থাকেন, মফিজ সাহেব চিৎকার করতে থাকেন, কিন্তু খোকন একবারও ফিরে তাকায় না। সে মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে।

    রাস্তায় তখন হালকা বাতাস বইছে। দূরের আকাশে মেঘ জমেছে। একটা রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। খোকন লায়লাকে নিয়ে তাতে উঠে বসে। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না। লায়লা শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। খোকন তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে, এই মেয়েটা জীবনে কোনোদিন নিরাপদ আশ্রয় পায়নি।

    অনেকক্ষণ পর সে ধীরে বলে, “তুই যদি আবার ওই বাড়িতে যাস, ওরা তোকে মেরে ফেলবে।”

    লায়লা মাথা নিচু করে থাকে। “আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই।”

    খোকন জানে, কথাটা সত্যি। এই শহরে এত বড় পৃথিবীর ভেতরেও মেয়েটার কোনো জায়গা নেই।

    হঠাৎ সে বলে ওঠে, “আমারে বিয়া করবি?”

    লায়লা যেন আকাশ থেকে পড়ে। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে যায়। “আপনি আমারে চেনেন না।”

    খোকন একটু হাসে। “চিনতে কতদিন লাগে? মানুষের চোখ দেখলেই অনেক কিছু বুঝা যায়।”

    লায়লা চুপ করে থাকে।

    খোকন আবার বলে, “তোরে আর কেউ মারতে পারবে না। এই কথা দিতেছি।”

    এই কথাটা শুনে মেয়েটার চোখ আবার ভিজে ওঠে। জীবনে প্রথমবার কেউ তাকে রক্ষা করার কথা বলছে।

    রিকশা এসে থামে কাজী অফিসের সামনে। রাত গভীর হলেও কাজী সাহেব এখনও জেগে আছেন। খোকনকে দেখে তিনি অবাক হয়ে যান। সব কথা শোনার পর অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর লায়লার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “তোমার সম্মতি আছে?”

    লায়লা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আস্তে করে বলে, “এই মানুষটা যদি আমারে আর কাঁদতে না দেয়, তাহলে আমার আপত্তি নাই।”

    খোকনের বুকটা কেমন করে ওঠে। সে প্রথমবার মেয়েটার দিকে ভালো করে তাকায়। মেয়েটার মুখে এখনও আঘাতের দাগ, কিন্তু চোখের মধ্যে একটা অদ্ভুত বিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে।

    সেই রাতেই তাদের বিয়ে হয়ে যায়। কাগজে দুটো নাম লেখা হয়, দুজন সাক্ষী সই করে। কোনো আয়োজন নেই, কোনো গান নেই, কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। তবু লায়লার মনে হয়, এই ছোট্ট ঘরটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কারণ আজ থেকে তাকে আর কেউ লাঠি দিয়ে মারবে না, চোর বলবে না, না খাইয়ে রাখবে না।

    সেদিন রাতেই খোকন তাকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। ছোট্ট টিনের ঘর, কিন্তু আশ্চর্য রকম পরিপাটি। দেয়ালে একজন বয়স্ক মহিলার ছবি ঝুলছে।

    লায়লা জিজ্ঞেস করে, “উনি কে?”

    খোকন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “আমার মা।”

    তারপর ধীরে ধীরে জানায়, ছোটবেলায় সেও তার মাকে শশুর বাড়িতে কাজের মেয়ের মতই কাজ করতে দেখেছে, অপমান সহ্য করতে দেখেছে, কান্না করতে দেখেছে। কিন্তু তখন সে কিছুই করতে পারেনি। হয়তো সেই কারণেই আজ আর একটা মেয়ের কান্না তার সহ্য হয়নি।

    লায়লা চুপ করে শুনতে থাকে।

    বাইরে তখন রাত আরও গভীর হয়। আকাশে মেঘ সরে গিয়ে চাঁদ উঠেছে। জানালা দিয়ে সেই চাঁদের আলো ঘরে এসে পড়ছে।

    খোকন ধীরে বলে, “আজ থেইকা তুই একা না।”

    লায়লার চোখ ভিজে ওঠে।

    সে মনে মনে একটা কথাই ভাবে, পৃথিবীতে সব মানুষ খারাপ নয়। কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যের কান্নাকে নিজের কষ্ট মনে করে। আর সেই রাত থেকেই শুরু হয় তাদের নতুন জীবন, যেখানে লাঠির শব্দ নেই, অপমান নেই, আছে শুধু দুটো ভাঙা মানুষের একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা।

    (খোকন ভাই আমার আত্মীয়। উনার বাস্তব জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই এই গল্পের অবতারনা।)

    3
    3 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar