Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    1 week, 1 day ago

    সীমানা পেরিয়ে
    (পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

    অধ্যায় ২১
    সকালের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আগেই লারসেন ঘুম থেকে উঠে পড়েছিল। আসলে ঘুম থেকে ওঠার প্রশ্নই ছিল না। রাতের শেষ প্রহর থেকে সে বিছানায় শুয়ে ছিল, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই বহু বছরের পুরোনো কিছু দৃশ্য তার মাথার ভেতর ফিরে আসছিল। আগুনের লাল আলো, পাহাড়ের গায়ে কালো ছায়া, ছুটে চলা ঘোড়ার খুরের শব্দ, আর অন্ধকারের মধ্যে কারও চিৎকার। সেই চিৎকারের শব্দ এখন আর পরিষ্কারভাবে মনে পড়ে না তার। বহু বছর ধরে স্মৃতি নিজেই যেন কিছু অংশ মুছে দিয়েছে। কিন্তু এমন কিছু রাত আছে, যেগুলো মানুষ যতই ভুলে যেতে চায়, শেষ পর্যন্ত তারাই আবার ফিরে আসে।

    ঘরের বাইরে তখন ভোরের ঠান্ডা বাতাস বইছিল। দূরের পাহাড়গুলো ধূসর অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের পূর্ব দিকটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে উঠছে, কিন্তু সূর্যের দেখা এখনও নেই। র‍্যাঞ্চের উঠোনে রাতের শিশির জমে আছে। ঘোড়াগুলোর আস্তাবল থেকে মাঝে মাঝে নাক ঝাড়ার শব্দ ভেসে আসছে। কোথাও একটা কাঠের দরজা বাতাসে সামান্য কেঁপে উঠল।

    লারসেন বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গেল। দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। গতকাল সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বহু বছর ধরে যে পথের কথা মনে পড়লেই তার বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর নেমে বসত, এবার সেই পথেই ফিরে যেতে হবে। পার্থক্য শুধু একটাই। বহু বছর আগে সে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছিল। এবার সে সেখানে যাচ্ছে নিজের ইচ্ছায়।

    কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে মারদেকা। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার মনে দ্বিধা ছিল। এখনও আছে। ছেলেটাকে বিপদের দিকে নিয়ে যাওয়া ঠিক কি না, সে প্রশ্নের উত্তর লারসেন নিজের কাছেও পুরোপুরি দিতে পারেনি। অথচ মারদেকাকে র‍্যাঞ্চে রেখে যাওয়ার কথাও এখন আর ভাবতে পারছে না। যারা গতকাল র‍্যাঞ্চে এসেছিল, তারা ছেলেটাকে দেখেছে। তারা তার ব্যাপারে জানতে চেয়েছে। এর অর্থ একটাই, মারদেকা এখন আর এই ঘটনার বাইরে নেই।

    বরং হয়তো সে কোনোদিনই বাইরে ছিল না।

    টেবিলের ওপর রাখা দুটি কালচে ধাতব চাকতির দিকে তার চোখ গেল। দুটি চাকতি পাশাপাশি রাখা। একটির ওপরের চিহ্ন অন্যটির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, কিন্তু তাদের মধ্যে এমন একটা মিল আছে যা কেবল পুরোনো নিয়ম জানা মানুষই বুঝতে পারবে। লারসেনের আঙুল ধীরে ধীরে একটি চাকতির ওপর গিয়ে থামল। ঠান্ডা ধাতুর স্পর্শে তার মনে হলো, সে যেন বহু বছর পেছনে ফিরে গেছে।

    সে হাত সরিয়ে নিল। এখন অতীত মনে করার সময় নয়। এবার অতীতের কাছে যাওয়ার সময়। দরজার বাইরে হালকা একটা শব্দ হলো।

    লারসেন ঘুরে দাঁড়াল। “ভেতরে আসো।”

    দরজা খুলে মারদেকা ঢুকল। ছেলেটা পুরোপুরি তৈরি। পায়ে পুরোনো বুট, কোমরে ছুরি, গায়ে মোটা কাপড়ের জ্যাকেট। তার চুল এখনও পুরোপুরি আঁচড়ানো হয়নি। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ আছে। লারসেন বুঝল, সেও রাতে খুব বেশি ঘুমায়নি।

    মারদেকা ঘরে ঢুকে প্রথমেই টেবিলের ওপর রাখা চাকতি দুটির দিকে তাকাল। তার চোখে সেই অদ্ভুত পরিবর্তন আবার দেখা গেল।

    লারসেন সেটা লক্ষ্য করল। “কিছু মনে পড়ছে?”

    মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে টেবিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে চাকতিগুলোর একটিকে ছুঁতে গিয়েও থেমে গেল। “কাল রাতেও মনে করার চেষ্টা করেছি।”

    লারসেন অপেক্ষা করল।

    “কিন্তু যতবার মনে করতে যাই, সবকিছু যেন কুয়াশার মধ্যে চলে যায়।” ছেলেটা জানালার দিকে তাকাল। বাইরে পাহাড়ের দিকে। “শুধু সেই কথাটা শুনতে পাই।”

    লারসেনের মুখ শক্ত হয়ে উঠল। “দৌড়াও?”

    মারদেকা ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ঘরের মধ্যে আবার নীরবতা নেমে এল।

    লারসেন টেবিল থেকে দুটি চাকতি তুলে নিল। সেগুলো আলাদা আলাদা কাপড়ে জড়িয়ে নিজের ভেতরের জ্যাকেটের পকেটে রেখে দিল। তারপর মারদেকার দিকে তাকাল। “আমরা বের হব।”

    মারদেকার চোখ উঠল। “কোথায়?”

    “যেখানে হয়তো তোমার প্রশ্নের কিছু উত্তর আছে।”

    মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “সেই পাহাড়ি আশ্রয়ে?”

    লারসেন তার দিকে তাকাল। ছেলেটা এখন আগের চেয়ে অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে। তাকে সব কথা বলে দিতে হয় না। বললো, “হ্যাঁ।”

    মারদেকা আর কোনো প্রশ্ন করল না।

    লারসেন ভেবেছিল, ছেলেটা হয়তো ভয় পাবে। হয়তো দ্বিধা করবে। কিন্তু তার চোখে ভয় নেই। আছে অপেক্ষা। এমন এক ধরনের অপেক্ষা, যা মানুষ তখনই অনুভব করে যখন সে বুঝতে পারে, বহুদিন ধরে যার উত্তর খুঁজছে, সেই উত্তর হয়তো খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। “তোমার ছুরিটা আছে?”

    মারদেকা কোমরের দিকে হাত দিল। “আছে।”

    “ঠিক আছে। কিন্তু মনে রেখো, ছুরি থাকার অর্থ এই নয় যে তোমাকে তা ব্যবহার করতে হবে।”

    মারদেকা সামান্য মাথা নেড়ে বলল। “আমি জানি।”

    লারসেনের মুখে ক্ষীণ একটা পরিবর্তন এল। সে জানত, ছেলেটা কথাটা মুখস্থ করে বলছে না। গত কয়েক মাসে সে অন্তত এটুকু শিখেছে। অস্ত্র হাতে থাকলে মানুষ শক্তিশালী হয় না। অনেক সময় অস্ত্র হাতে থাকার কারণেই মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।

    বাইরে তখন র‍্যাঞ্চ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। লারসেন দরজা খুলে বেরিয়ে এল। ঠান্ডা বাতাস তার মুখে লাগল। আকাশের কিনারায় সূর্যের প্রথম আলো দেখা দিয়েছে। ঘাসের ওপর শিশির চিকচিক করছে। আস্তাবলের সামনে একজন লোক ঘোড়ার জিন ঠিক করছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে।

    ইলাই আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে বড় একটা কফির পাত্র নামাচ্ছিল। লারসেনকে দেখে বৃদ্ধ মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল, সে খবরটা জানে।

    র‍্যাঞ্চে কোনো খবর বেশিক্ষণ গোপন থাকে না। বিশেষ করে যখন আগের দিন সাতজন সশস্ত্র অচেনা লোক এসে লারসেনের সঙ্গে কথা বলে চলে যায়।

    ইলাই কিছুক্ষণ লারসেনের দিকে তাকিয়ে রইল। “সত্যিই যাচ্ছ?”

    লারসেন থামল। “হ্যাঁ।”

    বৃদ্ধ এবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর আবার লারসেনের দিকে।

    “ওকেও সাথে নেবে?”

    লারসেন মাথা ঝাঁকালো।

    ইলাইয়ের মুখের ভাঁজগুলো যেন আরও গভীর হয়ে গেল। সে জানত, মারদেকা আর সেই পাহাড়ি ছেলে নেই, যে প্রথমদিকে মানুষের ভিড় দেখলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু তবু তার চোখে মারদেকা এখনও সেই ছেলেই। “পাহাড় এখন আগের মতো নেই, লারসেন।”

    লারসেন শান্ত গলায় বলল, “আমিও আগের মতো নেই।”

    ইলাই কিছু বলল না। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর সে ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল একটা কাপড়ে মোড়ানো খাবারের পুঁটলি হাতে নিয়ে। “খালি পেটে রহস্য খুঁজতে যেও না।”

    মারদেকার মুখে সামান্য হাসি ফুটল। ইলাই পুঁটলিটা তার হাতে দিল।

    র‍্যাঞ্চের অন্য পাশে বাড দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে কফির মগ। কিন্তু সে কফি খাচ্ছিল না। লারসেন ও মারদেকাকে দেখেই সে ধীরে এগিয়ে এল। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল, এই যাত্রার ব্যাপারে সে সন্তুষ্ট নয়। তবু সে জানে, লারসেন একবার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে বদলানো কঠিন। “কখন ফিরবেন?”

    লারসেন বলল, “ফিরে আসার মতো কিছু হাতে পেলেই ফিরব।”

    বাড কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আমি লোকজনকে পাহাড়ের দিকে নজর রাখতে বলেছি। গতকালের দলটা চলে গেছে, কিন্তু তাদের আশপাশে আরও লোক ছিল।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “জানি।”

    “ক্লে আর হ্যাঙ্ক পাহারার ব্যবস্থা দেখছে। রুবেন ব্ল্যাক রিভারের দিকে একজনকে পাঠিয়েছে। শহরে কোনো খবর পাওয়া গেলে জানানো হবে।”

    লারসেন এবার বাডের দিকে তাকাল। র‍্যাঞ্চে না থাকলেও সবকিছু ঠিকভাবে চলবে, এই বিশ্বাস সে বাডের ওপর রাখতে পারে। বহু বছর ধরে মানুষটাকে সে দেখেছে। বাড খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু বিপদের সময় তার মাথা ঠান্ডা থাকে। “র‍্যাঞ্চটা সামলিও।”

    বাড মৃদু গলায় বলল, “সেটা নিয়ে ভাববেন না।” তারপর চোখ গেল মারদেকার দিকে। “আর তুমি, লারসেন যা বলবে, তার বাইরে এক পা-ও যেও না।”

    লারসেন ঘুরে আস্তাবলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। দুটি ঘোড়া আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। একটি বড়, ধূসর রঙের ঘোড়া, লারসেনের। অন্যটি অপেক্ষাকৃত ছোট, কিন্তু পাহাড়ি পথে চলার জন্য শক্তপোক্ত। মারদেকা গত কয়েক মাস ধরে ঘোড়াটিকে চালিয়েছে। প্রাণীটি তার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।

    মারদেকা নিজের জিন পরীক্ষা করল। লারসেন দূর থেকে তাকিয়ে ছিল।

    ছেলেটা প্রথমে লাগাম দেখল, তারপর জিনের নিচের বাঁধন। এরপর পায়ের রেকাব। এই সবকিছু এখন সে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে। আগে ঘোড়ায় উঠতে পারলেই তার কাছে যথেষ্ট ছিল। এখন সে জানে, পাহাড়ে ছোট ভুলও বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।

    লারসেন ধীরে বলল, “কী দেখছ?”

    মারদেকা মাথা না তুলেই বলল, “বাঁধনটা একটু ঢিলা।”

    লারসেন কাছে এসে পরীক্ষা করল। বাঁধন সত্যিই ঢিলা ছিল। সে কিছু বলল না। শুধু নিজের ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল।

    মারদেকা লারসেনের মুখের দিকে তাকাল। প্রশংসা পাবে বলে অপেক্ষা করছিল না সে, কিন্তু বুঝতে পারল, লারসেন দেখেছে।

    কিছুক্ষণ পর দুজন ঘোড়ায় চড়ে রওনা হলো। র‍্যাঞ্চের লোকেরা দূর থেকে তাকিয়ে রইল।

    বাড বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে। ক্লে আস্তাবলের পাশে। হ্যাঙ্ক বেড়ার কাছে। এলাই রান্নাঘরের দরজায়। সকালের আলো তখন র‍্যাঞ্চের কাঠের দেয়াল, ঘোড়ার পিঠ আর ধুলোমাখা পথের ওপর পড়ছে।

    মারদেকা একবার পেছনে তাকাল। তারপর সামনে। র‍্যাঞ্চ ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।

    প্রথম দিকে পথটা পরিচিত ছিল। খোলা জমি, শুকনো ঘাস, নিচু ঝোপ আর মাঝে মাঝে পাথরের স্তূপ। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর ভূমির রং বদলাতে শুরু করল। জমি উঁচু-নিচু হয়ে গেল। দূরের পাহাড়গুলো আর শুধু দৃশ্যের অংশ নয়, ধীরে ধীরে তাদের সামনে দেয়ালের মতো উঠে দাঁড়াতে লাগল।

    লারসেন খুব বেশি কথা বলছিল না। মারদেকাও না। তাদের ঘোড়ার খুরের শব্দ, চামড়ার জিনের কড়কড় শব্দ আর মাঝে মাঝে বাতাসে শুকনো ঘাসের দুলে ওঠার আওয়াজ, এই ছিল পথের প্রধান সঙ্গী।

    কিছুদূর যাওয়ার পর লারসেন পথ থেকে সামান্য সরে গিয়ে একটা শুকনো খাতের ধারে থামল।

    মারদেকা তার পেছনে এসে ঘোড়া থামাল। “কিছু হয়েছে?”

    লারসেন ঘোড়া থেকে নামল না। নিচের মাটির দিকে তাকাল। “হয়েছে কি না, সেটা তুমি বলো।”

    মারদেকা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘোড়া থেকে নেমে এল।

    লারসেন কিছুটা দূরে সরে গেল।

    এটা পরীক্ষা, মারদেকা বুঝতে পারল। সে মাটির কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। শুকনো মাটি। তার ওপর ছড়িয়ে আছে পুরোনো ঘাস। প্রথম দেখায় কিছুই চোখে পড়ার কথা নয়। কিন্তু সে তাড়াহুড়ো করল না।

    লারসেন তাকে একটা জিনিস বারবার শিখিয়েছে, যে মানুষ প্রথম দেখাতেই উত্তর পেয়ে যায়, সে সাধারণত ভুল উত্তর পায়।

    মারদেকা মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাত দিয়ে না ছুঁয়ে চোখ দিয়ে একটা রেখা অনুসরণ করল। খাতের কিনারায় দুটো ছোট পাথর সরে গেছে। তার পাশে ঘাসের মাথা ভাঙা। আরও একটু দূরে শুকনো মাটিতে চাপ পড়েছে। সে ধীরে উঠে দাঁড়াল। “এখান দিয়ে লোক গেছে।”

    লারসেন জিজ্ঞেস করল, “কতজন?”

    মারদেকা আবার নিচে তাকাল। “একজন না।”

    সে কয়েক কদম সামনে এগোল। “তিনজন। হয়তো চারজন।”

    লারসেন এবার ঘোড়া থেকে নেমে এল। সে মাটির দিকে তাকাল, তারপর মারদেকার দিকে। নিচু হয়ে একটা চিহ্ন পরীক্ষা করল। “তুমি তিন বা চারজন বলেছ। কেন?”

    মারদেকা শুকনো খাতের দিকে ইঙ্গিত করল। “ওরা একই জায়গা দিয়ে যায়নি। একজন একটু ভারী। তার পায়ের চাপ বেশি। আরেকজন পাথরের ওপর দিয়ে গেছে।”

    লারসেন কিছু বলল না। তার মুখের ভাব দেখে বোঝা গেল, সে উত্তরটা শুনে খুশি হয়েছে। কিন্তু তারপর তার চোখ খাতের ওপাশে গিয়ে থেমে গেল।

    মারদেকাও তাকাল। সেখানে দূরে একটা শুকনো ঝোপের ডাল ভেঙে আছে। খুব বেশি বড় কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু বাতাসের দিক অনুযায়ী ডালটা এমনভাবে ভাঙার কথা নয়।

    লারসেন ধীরে কোমরের দিকে হাত নিয়ে গেল।

    মারদেকা সেটা দেখল। “কী?”

    লারসেন নিচু গলায় বলল, “আমরা একা নই।”

    বাতাস তখনও বইছে। দূরে কোথাও একটা বাজপাখি ডাকল। দুজনেই নীরব হয়ে গেল।

    মারদেকা স্বভাবতই নিজের কোমরের ছুরির দিকে হাত নিতে যাচ্ছিল। কিন্তু লারসেনের আগের কথাটা তার মনে পড়ে গেল। যা দেখবে, আগে বুঝবে। তার হাত থেমে গেল।

    সে চারপাশে তাকাল। প্রথমে সামনে। তারপর ডানদিকে পাথুরে ঢাল। তারপর বামদিকে শুকনো ঝোপের সারি। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পাহাড়ি পরিবেশে বড় হতে হতে সে জানে, কিছু না দেখা মানেই সেখানে কিছু নেই, এমন নয়।

    হঠাৎ তার নাকে একটা গন্ধ এল। খুব হালকা। ঘোড়ার ঘামের গন্ধ। মারদেকা মুখ ঘুরিয়ে ডানদিকে তাকাল। সেখানে তাদের নিজেদের ঘোড়া ছাড়া আর কোনো প্রাণী দেখা যাচ্ছে না। সে ধীরে বলল, “ওখানে ঘোড়া ছিল।”

    লারসেন এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “কোথায়?”

    মারদেকা পাথুরে ঢালের দিকে আঙুল তুলল। “ওপাশে।”

    দুজনেই কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর লারসেন লারসেন ঘোড়ায় উঠল। বললো, “চলো।”

    মারদেকা অবাক হলো। “দেখবেন না!”

    “না। কারণ যে মানুষ নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে, তার মানে সে চায় তুমি তাকে খুঁজতে যাও।”

    মারদেকা নিজের ঘোড়ায় উঠল। তারা খাতের পথ ছেড়ে আবার এগিয়ে গেল। কিন্তু এবার তাদের চলার ভঙ্গি বদলে গেছে। আগে তারা পাহাড়ের দিকে যাচ্ছিল। এখন তারা জানে, পাহাড়ও হয়তো তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

    সূর্য আরও উপরে উঠল। সকাল ধীরে ধীরে উষ্ণ হতে শুরু করল। পথ যত এগোতে লাগল, ততই চারপাশের ভূখণ্ড কঠিন হয়ে উঠল। কোথাও খাড়া পাথরের দেয়াল, কোথাও সরু গিরিখাত, কোথাও শুকনো নদীর পুরোনো পথ। মাঝে মাঝে লারসেন এমন সব বাঁক নিচ্ছিল, যেগুলো দেখে মনে হচ্ছিল সে বহু বছর আগে এই পথ মুখস্থ করে নিয়েছিল।

    মারদেকা বুঝতে পারছিল, এই মানুষটি এখন অন্যরকম। র‍্যাঞ্চে লারসেন ছিল শিক্ষক।
    এই পথে সে যেন আবার বহু বছর আগের একজন মানুষ হয়ে উঠছে। একটা সরু পথের মুখে এসে লারসেন ঘোড়া থামাল।

    সামনে পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে। নিচে পাথরের মধ্যে দিয়ে সরু একটা পথ বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়েছে। মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। “আমরা এই পথ দিয়ে যাব?”

    “একসময় যেতাম।”

    মারদেকা আবার জিজ্ঞেস করল, “কত বছর আগে?”

    লারসেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “তোমার জন্মেরও আগে।”

    মারদেকা কথাটা শুনে আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার চোখে কৌতূহল জমে রইল।

    লারসেন ঘোড়া নিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। মারদেকা তার পেছনে।

    পথটা ধীরে ধীরে আরও সরু হয়ে এল। দুপাশের পাথর এমনভাবে উঠে গেছে যে আকাশের একটা সরু ফালি ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। ঘোড়ার খুরের শব্দ পাথরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও পথের ওপর পুরোনো ধসের চিহ্ন। কিছু পাথর নতুন। কিছু বহুদিনের।

    মারদেকা হঠাৎ থেমে গেল।

    লারসেন পেছনে তাকাল। “কী হলো?”

    মারদেকা মাথা তুলল না। সে পাথরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। দেয়ালের ওপর প্রায় মুছে যাওয়া একটা চিহ্ন। প্রথম দেখায় মনে হবে সময়ের ক্ষয়ে তৈরি কোনো দাগ।

    কিন্তু মারদেকার চোখ স্থির হয়ে গেল। তার বুকের ভেতর অকারণে ধাক্কা লাগল।

    লারসেন ধীরে ঘোড়া ঘুরিয়ে তার কাছে এল। “কী দেখছ?”

    মারদেকা হাত তুলে দেয়ালের দিকে দেখাল। “এটা।”

    লারসেনের মুখ মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। পাথরের গায়ে ক্ষীণভাবে খোদাই করা সেই চিহ্নটি সে চিনতে পেরেছে। বহু বছর আগে এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় এমন চিহ্নই ব্যবহার করা হতো।

    সে ঘোড়া থেকে নেমে কাছে গেল। পাথরের ওপর হাত বুলিয়ে দেখল। পুরোনো চিহ্ন।
    খুব পুরোনো। কিন্তু তার নিচে আরও একটা জিনিস আছে। এক টুকরো কাপড়।
    পাথরের সরু ফাঁকে আটকে আছে। বাতাসে সামান্য দুলছে। লারসেন হাত বাড়িয়ে সেটি টেনে বের করল। কাপড়টা মলিন। ধুলোয় ভরা। কিন্তু তার রং এখনও বোঝা যায়। গাঢ় নীল।

    মারদেকার মুখের রং বদলে গেল। এক মুহূর্তের জন্য সে যেন আর সেই সরু পাহাড়ি পথে দাঁড়িয়ে নেই। তার চোখের সামনে অন্ধকার একটা কাঠের দেয়াল ভেসে উঠল।
    দরজা। দরজার পাশে নীল কাপড়। তারপর একটা হাত। কেউ তার হাত শক্ত করে ধরেছে। একটা কণ্ঠস্বর। আতঙ্কে ভরা। “দৌড়াও!”

    মারদেকা হঠাৎ পিছিয়ে গেল। তার ঘোড়া অস্থির হয়ে মাথা ঝাঁকাল।

    লারসেন দ্রুত তার বাহু ধরে ফেলল। “মারদেকা!”

    ছেলেটা হাঁপাচ্ছে। সে চারপাশে তাকাল। যেন কোথায় আছে, সেটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগছে। “আমি…” তার কণ্ঠ শুকিয়ে গেছে। “আমি একটা ঘর দেখেছি।”

    লারসেনের হাত আরও শক্ত হলো। “কেমন ঘর?”

    “কাঠের।”

    “আর?”

    মারদেকা চোখ বন্ধ করল। তার কপালে ঘাম জমেছে। “একটা দরজা ছিল।”

    লারসেন কিছু বলল না।

    মারদেকার ঠোঁট কেঁপে উঠল। “দরজার পাশে নীল কাপড়।”

    লারসেনের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা থেমে গেল। এই পথ। পুরোনো চিহ্ন।
    নীল কাপড়। আর মারদেকার স্মৃতি। এবার এগুলোকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।

    ঠিক তখন দূরে কোথাও পাথর গড়িয়ে পড়ার শব্দ হলো। খুব ক্ষীণ। কিন্তু এই নীরব গিরিখাতে শব্দটা স্পষ্ট শোনা গেল।

    লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলল। মারদেকাও ঘুরে তাকাল। পাহাড়ের ওপর কেউ নেই।
    তবু দুজনেই জানল, তারা একা নয়।

    লারসেন ধীরে হাত সরিয়ে কোমরের পিস্তলের কাছাকাছি রাখল। তার চোখ ঠান্ডা হয়ে গেছে।

    দুজন আবার ঘোড়ায় উঠল। কিন্তু এবার তারা আগের পথ ধরে এগোল না।

    লারসেন কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে পাথরের দেয়ালের পাশের সরু পথটার দিকে তাকাল। সেই পথ প্রায় ঝোপে ঢেকে গেছে। বহু বছর ধরে কেউ ব্যবহার করেনি বলেই মনে হয়। কিন্তু তার মুখে এমন একটা ভাব দেখা গেল, যেন সে পথটাকে চিনেছে।

    মারদেকা তার দিকে তাকাল। “ওদিকে?”

    লারসেন উত্তর দিল, “ওই পথটা পুরোনো আশ্রয়ের দিকে যায়।”

    পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। গাঢ় নীল কাপড়ের টুকরোটা লারসেনের মুঠোর মধ্যে কেঁপে উঠল। সে সেটি নিজের পকেটে রেখে দিল। তারপর ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে সেই সরু, পরিত্যক্ত পথের দিকে এগিয়ে গেল। মারদেকা তার পেছনে চলল।

    আর তাদের অজান্তেই, গিরিখাতের অনেক ওপরে, পাথরের আড়াল থেকে কেউ একজন ধীরে ধীরে সরে গেল। তার কোমরের কাছে বাতাসে এক টুকরো গাঢ় নীল কাপড় সামান্য দুলে উঠল।

    সরু পথটা এতটাই পুরোনো যে প্রথম কয়েক গজ যাওয়ার পরই মনে হলো, পাহাড়ের বুক থেকে পথটি যেন বহু বছর আগে মুছে গেছে। শুকনো ঝোপের ডাল ঘোড়ার শরীর ঘেঁষে যাচ্ছিল, কোথাও কোথাও পাথরের ধার ঘোড়ার পায়ের কাছে উঠে এসেছে। লারসেন সামনে থেকে পথ পরিষ্কার করে এগোচ্ছিল না, বরং পথটাকে নিজের মতো করে খুঁজে নিচ্ছিল। তার শরীরের ভঙ্গিতে এমন একটা কিছু ছিল, যা মারদেকা আগে খুব কমই দেখেছে। র‍্যাঞ্চের পরিচিত জমিতে লারসেনের চলাফেরা ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু এই পাহাড়ি পথে তার প্রতিটি দৃষ্টি, প্রতিটি মোড় নেওয়া, এমনকি ঘোড়ার লাগাম টানার ধরনও যেন বহু বছরের পুরোনো কোনো স্মৃতির নির্দেশ মেনে চলছিল।

    মারদেকা কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারল, তারা যে পথ দিয়ে যাচ্ছে সেটি আসলে একেবারে পরিত্যক্ত নয়। কোথাও শুকনো ঘাসের নিচে শক্ত মাটি, কোথাও পাথরের ওপর ঘষা দাগ, আবার কোথাও ঝোপের ডাল মানুষের চলাচলের কারণে সামান্য বাঁকানো। এসব চিহ্ন এত পুরোনো যে সাধারণ চোখে সেগুলো ধরা পড়ার কথা নয়। কিন্তু লারসেনের চোখও সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে না। বরং প্রতিটি চিহ্ন দেখার পর তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠছে।

    পথটা একটু ওপরে উঠে গিয়ে আবার নিচে নেমে গেল। নিচে ছোট একটা শুকনো খাত। বর্ষাকালে হয়তো সেখানে পাহাড়ি জল নেমে আসে, কিন্তু এখন পাথরের ফাঁকে শুধু ধুলা আর শুকনো পাতার স্তর। খাতের ওপারে একটা পুরোনো গাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছটার অর্ধেক ডাল শুকিয়ে গেছে, কাণ্ডের গায়ে বজ্রপাতের কালো দাগ। তার নিচে পড়ে থাকা পাথরের ওপর শ্যাওলার আস্তরণ জমে আছে।

    লারসেন হঠাৎ ঘোড়া থামাল। মারদেকাও সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।

    লারসেন কিছু বলল না। সে শুধু সামনে তাকিয়ে রইল।

    মারদেকা চারপাশ শুনতে চেষ্টা করল। বাতাসের শব্দ ছাড়া কিছু নেই। দূরে কোনো পাখি ডাকছে না। ঝোপের মধ্যে ছোট প্রাণীর চলাফেরার শব্দও নেই। পাহাড়ি জায়গায় এই ধরনের নীরবতা কখনও কখনও শব্দের চেয়েও বেশি সতর্ক করে দেয়। স্বাভাবিক পরিবেশে কোথাও না কোথাও জীবন থাকে, একটা পাখি ডাকে, কোনো শুকনো ডাল ভাঙে, টিকটিকি পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে যায়। এখানে যেন সবকিছু কিছুক্ষণের জন্য থেমে আছে।

    লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। পাথরের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে আঙুল দিয়ে ধুলা সরাল। সেখানে একটা অস্পষ্ট দাগ। মানুষের বুটের গোড়ালির মতো।

    মারদেকা ঘোড়া থেকে নেমে তার পাশে দাঁড়াল।

    লারসেন ধীরে বলল, “এটা আজকের।”

    মারদেকা নিচে তাকিয়ে রইল। দাগটা খুব গভীর নয়। কিন্তু ধুলার ওপর তার ধারগুলো এখনও ভাঙেনি। কয়েক ঘণ্টার বেশি পুরোনো হওয়ার কথা নয়। সে চারপাশে তাকাল। “তাহলে সে জানে আমরা আসছি?”

    লারসেন কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। “যে মানুষ আমাদের গতিপথ জানতে চাইছে, সে যদি এই পথও জানে, তাহলে আমাদের আসার খবর তার কাছে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে না।”

    লারসেনের কথায় ভয় ছিল না। ছিল হিসাব। মারদেকা বুঝতে পারল, বিপদের সময় এই মানুষটা ভয়কে জায়গা দেয় না। ভয়কে সে তথ্যের মতো ব্যবহার করে। কোথায় বিপদ হতে পারে, কতজন হতে পারে, কীভাবে আসতে পারে, সবকিছুকে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখে। তারা আবার চলতে শুরু করল।

    পাহাড় ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। নিচের খোলা জমি এখন অনেক দূরে। সামনে পাথরের দেয়াল উঠে এসেছে, তার গায়ে শুকনো লতাগুল্ম ঝুলছে। সূর্যের আলো সরাসরি সেখানে পৌঁছাতে পারছে না। বাতাস ঠান্ডা হয়ে এসেছে। কোথাও কোথাও পাথরের ফাঁকে বরফের মতো ঠান্ডা জল জমে আছে, যদিও অনেকদিন ধরে বৃষ্টি হয়নি।

    মারদেকা অনুভব করল, তার মনে অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হচ্ছে। সে এই জায়গায় আগে কখনও আসেনি, অন্তত তার মনে নেই। অথচ পথের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পাথরের আকার, এমনকি বাতাসের গন্ধও কোথাও যেন পরিচিত।

    সে চোখ বন্ধ করল। এক মুহূর্তের জন্য আবার সেই কাঠের ঘর। অন্ধকার। দরজার নিচ দিয়ে বাইরে থেকে আগুনের আলো ঢুকছে। কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছোট হাত একটা বড় হাতের মধ্যে আটকে। তারপর সেই কণ্ঠস্বর। “দৌড়াও!” মারদেকা চোখ খুলে ফেলল।

    ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা লারসেন তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে বুঝতে পেরেছে। “আবার দেখেছ?”

    মারদেকা ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ।”

    “একই ঘর?”

    “হ্যাঁ।”

    “কিছু বদলেছে?”

    মারদেকা কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “এবার আগুন দেখেছি।”

    লারসেনের মুখের ওপর যেন হঠাৎ একটা ছায়া নেমে এল। সে আর প্রশ্ন করল না। ঘোড়ার লাগাম টেনে সামনে তাকাল।

    মারদেকা বুঝতে পারল, আগুনের কথাটা লারসেনের কাছে নতুন কিছু নয়। বরং সে যেন এমন একটা শব্দ শুনেছে, যার অর্থ সে অনেক আগেই জানত।

    পথ আরও সরু হয়ে গেল। কিছুদূর পর একটা পাথুরে দেয়াল পথের সামনে এসে দাঁড়াল। দেয়ালের এক পাশে এতটুকু ফাঁক যে ঘোড়া কষ্ট করে ঢুকতে পারবে। লারসেন ঘোড়া থেকে নেমে লাগাম হাতে নিল। সে প্রথমে নিজে ফাঁকটা দিয়ে গেল, তারপর ঘোড়াকে টেনে নিয়ে গেল। মারদেকাও একইভাবে অনুসরণ করল।

    ফাঁকটা পেরিয়ে তারা এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছাল, যেখান থেকে নিচের পুরো গিরিখাত দেখা যায়। ওপরে আকাশ এখন সরু একটা নীল ফালি। নিচে পাথর, ঝোপ আর ছায়া। দূরে তারা যে পথ দিয়ে এসেছিল, সেটাও দেখা যাচ্ছে।

    লারসেন দাঁড়িয়ে গেল।

    মারদেকা নিচের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো মানুষ নেই। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর সে একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল। নিচের একটা পাথরের ওপর সূর্যের আলো পড়েছে। তার পাশে যেন একটা ছোট কালো বিন্দু নড়ল।

    মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকাল। একটা পাখি নয়। একটা মানুষ। পাথরের আড়াল থেকে মাথাটা সামান্য উঠেছিল। তারপর আবার অদৃশ্য। সে লারসেনের হাত ছুঁয়ে নিচের দিকে দেখাল।

    লারসেন তাকাল। তার চোখে কোনো বিস্ময় দেখা গেল না। বরং ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য কঠিন রেখা ফুটে উঠল। সে হাত তুলে মারদেকাকে নিচু হতে ইশারা করল। দুজনেই পাথরের আড়ালে সরে গেল। কিছুক্ষণ তারা নড়ল না।

    নিচে যে লোকটি ছিল, সে এবার বেরিয়ে এল। দূরত্ব এত বেশি যে মুখ দেখা যায় না। লোকটি ঘোড়ার কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর নিজের কোমরের কাছে হাত নিয়ে কিছু একটা ঠিক করল। বাতাস হঠাৎ তার পোশাকের একটা অংশ উড়িয়ে দিল। গাঢ় নীল।

    মারদেকার বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। লারসেনের চোখ সরু হয়ে গেল।

    লোকটি কিছুক্ষণ পর ঘোড়ায় উঠল এবং অন্যদিকে চলে গেল। সে তাদের দেখতে পায়নি। অথবা দেখেও এমন ভান করেছে যেন পায়নি।

    লারসেন দীর্ঘক্ষণ তার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল।

    “সে আমাদের দেখেছে?” মারদেকা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

    লারসেন ধীরে বলল, “আমি জানি না।”

    “তাহলে?”

    “এখন জানার দরকারও নেই।”

    লারসেন ঘোড়ার লাগাম ধরল। তার মুখে এমন এক স্থিরতা এসেছে, যা মারদেকা বহুবার দেখেছে, কিন্তু আজ তার অর্থ অন্যরকম মনে হলো। এতক্ষণ তারা শত্রুকে খুঁজছিল। এখন লারসেন বুঝেছে, শত্রুও তাদের পথ দেখছে।

    পথের শেষ অংশে পৌঁছাতে তাদের আরও প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। সূর্য তখন মাথার অনেকটা ওপরে। কিন্তু পাহাড়ের ভেতর আলো ছায়ায় ভেঙে গেছে। কোথাও তীব্র রোদ, কোথাও দিনের মাঝখানেও সন্ধ্যার মতো অন্ধকার। শেষ পর্যন্ত একটা খোলা জায়গা দেখা গেল।

    মারদেকা প্রথমে বুঝতে পারল না, জায়গাটার বিশেষত্ব কী। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখে পড়ল, পাথরের দেয়ালের নিচে কাঠের কিছু ভাঙা অংশ পড়ে আছে। কিছু পুরোনো কড়িকাঠ, অর্ধেক মাটির নিচে ঢুকে থাকা দরজার মতো একটা কাঠের ফ্রেম, আর পাশে পাথর দিয়ে তৈরি নিচু দেয়ালের অবশিষ্ট অংশ।

    লারসেন ঘোড়া থামিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। মারদেকা বুঝল, এটাই সেই জায়গা। পুরোনো আশ্রয়।

    কিন্তু আশ্রয় বলার মতো কিছুই আর নেই। সময়, বরফ, বৃষ্টি, আগুন আর মানুষের হাত মিলে জায়গাটাকে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। তবু ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বোঝা যায়, একসময় এখানে একটা কাঠের ঘর ছিল। পাহাড়ের গায়ে এমনভাবে বানানো হয়েছিল, বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না। সামনে একটা সরু পাথুরে চত্বর। তার এক পাশে গভীর খাদ। অন্য পাশে পাহাড়ের দেয়াল।

    লারসেন ঘোড়া থেকে নামল। সে অনেকক্ষণ কোনো কথা বলল না। তার চোখ ধীরে ধীরে ঘরের অবশিষ্ট অংশের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কোথায় ছিল দরজা, কোথায় জানালা, কোথায় আগুন জ্বলত, কোথায় ঘোড়া বাঁধা হতো, যেন সবকিছু তার চোখের সামনে এখনও অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

    মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে প্রথমবার বুঝল, লারসেন শুধু একটা পুরোনো জায়গায় ফিরে আসেনি। সে নিজের জীবনের এমন একটা অংশে ফিরে এসেছে, যেটাকে বহু বছর ধরে নিজের ভেতর কবর দিয়ে রেখেছিল।

    লারসেন ধীরে ধীরে ভাঙা কাঠের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। একটা পাথরের নিচে হাত ঢুকিয়ে ধুলো সরাল। কিছুই পেল না। তারপর অন্য জায়গায় গেল। সেখানে একটা কালো হয়ে যাওয়া লোহার টুকরো পড়ে ছিল। সে সেটি তুলে নিল।

    মারদেকা কাছে এসে দাঁড়াল।

    লারসেন লোহার টুকরোটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানেই আগুন লেগেছিল।”

    মারদেকার বুকের ভেতর আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতি ফিরে এল। সে ভাঙা কাঠের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার আঙুল কাঠের ওপর ছুঁতেই শরীরের ভেতর যেন বিদ্যুৎ ছুটে গেল। একটা ঘর। ধোঁয়া। চিৎকার।

    একজন মানুষ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাত রক্তে ভেজা। আর একটা ছোট ছেলে দৌড়াচ্ছে।

    মারদেকা হঠাৎ পিছিয়ে এল। “আমি এখানে ছিলাম।”

    লারসেন স্থির হয়ে গেল। “কী বললে?”

    মারদেকা নিজের বুকের ওপর হাত রাখল। তার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে। “আমি… এখানে ছিলাম।”

    লারসেন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তার মুখের সমস্ত কঠোরতা সরে গিয়ে এক ধরনের গভীর, ক্লান্ত ভাব ফুটে উঠল। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আশ্রয়ের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো। খুব ক্ষীণ। কাঠের নিচে কিছু যেন নড়ল।

    দুজনেই থেমে গেল।

    লারসেন সঙ্গে সঙ্গে মারদেকার সামনে এসে দাঁড়াল। তার ডান হাত পিস্তলের ওপর। চোখ ধ্বংসস্তূপে স্থির। কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। তারপর আবার। একটা শুকনো কাঠ ভাঙার মতো শব্দ।

    লারসেন মারদেকাকে পেছনে থাকতে ইশারা করল। সে ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপের দিকে এগিয়ে গেল। পাথরের আড়াল, ভাঙা কাঠ, শুকনো মাটি, সবকিছু একবার করে পরীক্ষা করল। তারপর একটা ভারী কাঠ সরাল। নিচে একটা ছোট গর্ত। গর্তের ভেতর অন্ধকার।

    লারসেন নিচু হয়ে তাকাল। তার চোখে এমন একটা পরিবর্তন দেখা গেল, যা মারদেকা আগে কখনও দেখেনি। সে হাত বাড়িয়ে গর্তের ভেতর থেকে একটা পুরোনো চামড়ার থলে বের করল। থলেটা ধুলায় ঢাকা। চামড়া শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু মুখটা এখনও বাঁধা। লারসেন থলেটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

    মারদেকা এগিয়ে এল। “ওটার ভেতরে কী?”

    লারসেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে থলেটার ওজন বুঝতে চেষ্টা করল। তারপর মুখের বাঁধন খুলল।

    ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটা পুরোনো কাগজ, কিছু কালচে হয়ে যাওয়া মুদ্রা, আর একটা ভাঁজ করা কাগজের টুকরো। লারসেন কাগজটা খুলল।

    মারদেকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কাগজে লেখা অক্ষরগুলো বয়সের কারণে অনেকটাই মুছে গেছে। তবু কয়েকটি শব্দ স্পষ্ট। লারসেন পড়তে পড়তে হঠাৎ থেমে গেল।

    মারদেকা বলল, “কী আছে?”

    লারসেন কাগজটা তার হাতে দিল না। বরং চোখ তুলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আশ্রয়ের দিকে তাকাল। “যে জিনিসের জন্য এত বছর পর মানুষগুলো ফিরে এসেছে, তার একটা অংশ এখনও এখানেই ছিল।”

    মারদেকা চুপ করে রইল। দূরে পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে গেল। তারপর খুব দূর থেকে ভেসে এল ঘোড়ার খুরের শব্দ। একবার। দুবার। তারপর দ্রুত।

    লারসেন মাথা তুলল। শব্দটা আশ্রয়ের দিকে আসছে না। আসছে পাহাড়ের অন্য দিক থেকে। তার চোখ মুহূর্তের মধ্যে কঠিন হয়ে গেল। সে কাগজটা ভাঁজ করে নিজের পকেটে রাখল, চামড়ার থলেটা তুলে নিল এবং মারদেকার দিকে তাকাল। “আমাদের এখানে আসার খবর পৌঁছে গেছে।”

    মারদেকা কিছু বলল না। তার চোখ তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর। ভাঙা কাঠের নিচে একটা ছোট ধাতব জিনিস দেখা যাচ্ছে। সে নিচু হয়ে সেটি তুলে নিল। তারপর তার মুখের রং বদলে গেল।

    ধাতব জিনিসটার ওপর খোদাই করা ছিল সেই একই চিহ্ন, যা সে পাথরের দেয়ালে দেখেছিল। কিন্তু চিহ্নটার নিচে আরও একটা দাগ ছিল। একটা ছোট অক্ষর। মারদেকা অক্ষরটা পড়তে পারল না।

    লারসেন তার হাত থেকে জিনিসটা নিয়ে দেখল। কয়েক সেকেন্ড পর তার চোখে যে আতঙ্ক ফুটে উঠল, সেটা এত ক্ষণিকের ছিল যে মারদেকা নিশ্চিত হতে পারল না সে সত্যিই তা দেখেছে কি না।

    লারসেন ধাতব টুকরোটা মুঠোয় বন্ধ করে ফেলল। “চলো।”

    “কোথায়?”

    লারসেন পাহাড়ের অন্য ঢালের দিকে তাকাল। “এই আশ্রয়ে আমরা একা নই।”

    দূরে আবার ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। এবার আরও কাছে।

    লারসেন মারদেকার ঘোড়ার লাগাম ধরল। তার মুখে ফিরে এসেছে সেই পুরোনো কঠোরতা। কিন্তু এবার তার চোখে শুধু অতীতের ভয় ছিল না। ছিল নিশ্চিত জ্ঞান। কেউ তাদের অনুসরণ করে এখানে এসেছে।

    আর সেই মানুষটি শুধু লারসেনের পুরোনো পথ জানে না, সে জানে এই আশ্রয়ের নিচে কী লুকিয়ে আছে।
    (চলবে)

    4
    3 Comments
    • লারসেন-মারদেকার সম্পর্কটা এত সুন্দর গড়ে উঠেছে—শিক্ষক-ছাত্র থেকে যেন একটা গভীর বন্ধনে পরিণত হচ্ছে।

    • ভাবনাটা দারুণ!

    • মঞ্চে আপনার এই উপস্থিতির জন্য ধন্যবাদ! আমাদের এই গ্রুপে অনেক সুন্দর সুন্দর লেখা আসছে, আপনিও অন্যদের লেখায় একটু সময় নিয়ে লাইক আর কমেন্ট করলে সবার সাথে বেশ ভালো একটা আড্ডা জমে উঠবে।

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar