-
বিঃদ্রঃ ফেবুতে সাধারণত এইরকম কিছু শেয়ার করা হয় না। এখানে করি কারন এখানের সবাই কবি-সাহিত্যিক। ভালো পাঠক ও বটে। আমরা একে অন্যের লেখা পড়ি এবং মন্তব্য করি।
বেশ কয়েকদিন পর তুলটে, আজ কবিতা নয়, অন্য কিছু নিয়ে। না, গল্প ও নয়। তবে কি! আপনারা একে বলতে পারেন উপাখ্যান বা দিনলিপি। বেনামী চিরকুট ও বলতে পারেন।
আমার একান্ত ব্যক্তিগত কিছু কথা যা আমি আমার আশেপাশের কাউকে জানাতে পারি না। কাউকে তো জানাতেই হয়! দুঃখ ভাগ করে নেয়াতে সুখ মেলে জানি। তাই পত্র লিখি নিজেকেই।
আমার প্রতিদিনের দুঃখ-সুখ গাঁথা একটা চিরকুটে করে নিজেকে উৎসর্গ করি। এরকমই একটা চিরকুট আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। আরেকটা কথা, এরকম কয়েকটা চিরকুট একসাথে করে একটা বড় গল্প বা তার চেয়েও বেশি কিছু হয়ে যেতে পারে। জরুরি হচ্ছে ভালোভাবে উপস্থাপন করাটা, যেটা আমি একদমই পারি না। তবে পড়ুন, পড়ে কিছু বলুন…আ/৩২, খাঁরপাড়া, মিরাবাজার
৪ অগাষ্ট, ২০২২গতরাতে বাসায় যখন ফিরি ঘড়ির কাটা তখন ১ টা ছুঁই ছুঁই। খিদেয় পেঠ জ্বলছিল। হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হবার প্রয়োজন বোধ করিনি, বিলাসিতা হতো। রান্না ঘরে গিয়ে দেখি কড়াইয়ে আলু সহযোগে বড় মাছের শুটকির তরকারি। ছোট একটা হাড়িতে আছে আলুর ঝোল, মরিচের গুড়া প্রয়োজনের চেয়ে ঢের বেশি দেয়া হয়েছে। হৃষ্ট-পুষ্ট আলু চোখ লাল করে আমার দিকে থাকিয়ে উপহাস করছে। শুটকির গন্ধ আমার সহ্য হয়না, অভুক্ত থাকতে হলো তাই।
আমার বন্ধু যে আজ চলে গেছে, তখনও বাইরে ছিল। পাশের রুমে থাকেন শামিম ভাই। কবি ও সাংবাদিক। উনার ফোন দিয়ে কল দিয়ে ওকে বললাম (আমার বন্ধু) যেন কিছু খাবার আর পানীয় নিয়ে আসে। এতো রাতে কোনো হোটেল খোলা থাকার কথা না। ও এক প্যাকেট কেক আর আধা লিটার কোক নিয়ে আসে। ওটুকুতে আমরা পাঁচ পাঁচজন তরুণ খাদকের কি চলে!
বিঃদ্রঃ গত পাঁচদিন রান্নাঘরে শুটকি ছাড়া আর কিছু দেখিনি। আমি অতীব উচ্চ-বংশীয় একজন ব্যাচেলর। এরকম ঘটনা আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। এতটুকুতে কষ্ট পাওয়া লোক আমি না।
একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর দেয়া হয় নি। গতরাতে বাসায় ফিরেছিলাম ডান পায়ের হাটুতে গুরুতর ইনজুরি নিয়ে। ২৪ ঘন্টা পার হয়ে গেলো এখনো টিকমতো হাঁটতে পারছি না। অসহ্য ব্যাথা হচ্ছে। তার চেয়ে বেশি হচ্ছে ভয়। খারাপ কিছু হয়ে যায়নি তো! এক্সরে করানো উচিৎ ছিল কিন্ত আমার পকেট ফাঁকা। তিন-চারদিন হলো ওয়ালেট ছাড়াই বাইরে বেরুই। আজ বিকেলে ডাল-রুটি খেয়েছিলাম একটা ছোট ভাইয়ের স্পন্সরে। বন্ধুর মোটরযান সাথে থাকায় আমাকে খুব বেশি হাঁটতে হয়নি। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম। এখন এগারোটা বাজে। শামিম ভাই এলেন একটু আগে, বললেন বাসায় ডাল নেই। রান্নাঘরে গিয়ে দেখি তিন রকমের শুটকি এনে রেখেছেন ইব্রাহিম ভাই। আজ রাতেও আমার খাওয়া হচ্ছে না। ঠিক খাওয়া হচ্ছে না বললে ভুল হয়। শেষ রাত্তিরে ফ্রাইড রাইস খাওয়া যেতে পারে। সিলেটে যাকে আমরা বলি “বিরান ভাত”। অতীব সুস্বাদু খাবার।
দূর ছাই, ফালতু আলাপ বাদ। কাজের কথায় আসি…
আজ অগাষ্টের চার তারিখ। গতকাল ওয়াইফাই বিল দেয়ার কথা ছিল এখনো দেয়া হয়নি। ফোন নেই তোমাকে জানিয়েছিলাম,নেটওয়ার্ক ছাড়া পিসিটাও একেবারে অকেজো ধরা যায়। শুয়ে, আধশুয়ে, বসে আছি রুমে। কাজ-টাজ কিছু করতে পারছি না। দু-চার পয়সা যা রোজগার করি তা-ও হাওয়ায় ভর করে,অনলাইনে আরকি। বেকায়দায় পড়ে গেলাম, বুঝলে!
পরশুদিন আম্মা কল দিয়েছিলেন, বললেন হাত একেবারে খালি। কোনো উপায়ান্তর দেখছেন না। আমি কিছু করতে পারি কি না! ফোনে কথা শুনতে না পারার অজুহাতে কেটে দিলাম। বললাম, পরে কল দিচ্ছি। কাল থেকে কল দিয়েই যাচ্ছেন, আমি রিসিভ করতে পারছি না। রিসিভ করে কি-ই বা বলতে পারি! আমার অসহায়ত্বের কথা, দুঃখ গাঁথা? পা যে খারাপ হয়েছে সেটা জানানো যায়। কিন্ত ও কথা মা’র জানার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে! ঘরে বাজার নেই, খাবার নেই, ছোট বোনের হাত খরচের টাকা নেই, রোগ আছে কিন্ত পথ্য নেই, ইন্সটলমেন্টের মাসিক কিস্তি পরিশোধের ডেডলাইন পার হয়ে গেছে…
নিজেকে এতো একা আর অসহায় মনে হয়নি কখনো। যেন পৃথিবীর কোথাও কোনোখানে আমার কেউ নেই, কারো কোনো দায়বদ্ধতা নেই! আমি পৃথিবীর অংশ নই। আমি কাপুরুষ, অক্ষম, অগ্রাহ্য,অচ্ছুৎ।
কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে বসে আছি। ছাইপাশ লিখছি তোমাকে, বন্ধু। কোনোভাবেই কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারছিনা। না পারছি কিছু করতে, না সইতে! আমার সকল যাতনা মানসিক কিংবা মনস্তাত্ত্বিক। পেঠের জ্বালা আমার সয়ে যায়। কিন্ত বাড়িতে যে চারটা জলজ্যান্ত মানুষ রেখে এসেছি, ওরা পেঠের জ্বালা সইবে কেমন করে, ওরা ত অভ্যস্ত না! ওদের জ্বালা যতোটা না মানসিক তার চেয়ে বেশি শারীরিক। ছোট বোনটি কেমন আছে? চাঁদমুখী বোন আমার।
এক ঈদের রাতে ও এসেছিল আমাদের ঘরে। জীবনের সবচেয়ে খুশির ঈদ, সে আমার বোন। আমাদের এত দূর আসতে পারা ওর মুখের দিকে চেয়ে। সত্যি বলছি ভাই, আমাদের মাঝে ও না এলে কি বিতিকিচ্ছিরি অবস্থাই না হতো!
আমার সেই বোনটির প্রিয় চিপস, কি যেন নাম… ক’দিন হল আম্মা ওটা আনাতে পারেননি বোধ হয়! আমার বোনটি গতকালই বোধহয় আম্মাকে বলেছিল, আম্মা, কতদিন হলো মাংস খাই না!শুনলাম, ফার্মের মুরগীর কেজি নাকি ১৯০ টাকা ছাড়িয়েছে!
আমি আছি, আবার নেই। একপ্রকার গাঁ ঢাকা দিয়ে আছি। এটা কি পাপ নয়? নিশ্চয়ই পাপ। এই কাদা-মাটির নরম শরীর আর কত সইবে মায়ের?
এতটুকুও সুখ লেখা নেই মায়ের কপালে? একটু আগেও আম্মা কল দিলেন, ধরছি না। ওপাশে আম্মার মলিন চেহারা আমার চোখের সামনে ভাসছে। ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত সে মুখ, চোখ। ভীষণ অসহায়, একা।বন্ধু, আজ তোমায় মনে করে মনে বিষাদ মাখছি না। এ বড় পাপ হবে, পাপ। শুধু পাপ নয় বিলাসিতাও বটে। যাকে বলে পাপ বিলাস, দুঃখ বিলাস। আমি আরো বেশি দুঃখ বিলাসী হতে চাই না। পারলে আমাকে সুখের হাটের সন্ধান জানাও, যেখানে বিনে পয়সায় সুখ কেনা যায়। নয়তো ছিনতাইকারী হবো। হা হা, এখানেও আমি অক্ষম।
ভালো থেকো, আসছি।
ইতি
তোমার কায়া।8 Comments-
কী বলবো বুঝতে পারছি না! যে অবস্থাই হোক বা যত অপারগতাই থাক মায়ের ফোনটা ধরবেন! অর্থ সংকটের চেয়ে সন্তানের নীরবতা মাকে বেশী কষ্ট দেয়। কিছু বানানে সতর্ক হবেন। বাকীটা মন ছুঁয়ে গেলো।
-
-
একটু রেসিস্টের মত করে বলি, একমাত্র ছেলেরাই পাড়ে প্রবল কষ্টে নিজের উপর নিজে হাসতে! ভাল লাগলো লেখাটি! আশা করি পরের চিঠি শীঘ্রই পাব! শুভেচ্ছা নেবেন!
-
Friends
ইয়াসিন আরাফাত
@easir-arafat
মো: আতাউল্লাহ
@mdataullah
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
Rokail Diluk
@diluk
অরণ্য মিথিল
@aronnonaim
সুশান্ত সরকার
@sushanto
Md. Anower Hossain Sagor
@sagor2022



অভিনন্দন।