-
আমার এক আকাশ জোছনা তুমি
ফাগুনের শীতলতা শেষে শুরু হয়েছে চৈত্রের উন্মত্ততা। চৈত্রের খরতাপে অস্থির যাপিত জীবন। মাঝে মাঝে জানান দিচ্ছে কালবৈশাখীর আগমন বার্তা। সকালের ট্রেনে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছি। আমার খুব প্রিয় একজনের কাছে যাচ্ছি। বিদেশে পি এইচ ডি করতে যাওয়াতে পাঁচ বছর তার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নেই। দেশে ফিরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষে এক মূহুর্তও অপেক্ষা না করে ছুটে যাচ্ছি আমার জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির কাছে। সিটে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছি আমি।
গরীব ভূমিহীন কৃষকের ছেলে আমি। অন্যের জমি চাষ করে মাসে মাত্র বারো থেকে চৌদ্দ হাজার টাকা আয় করতো, তা দিয়েই আমাদের সংসার চালাতো বাবা। পড়ালেখায় ভালো ছিলাম বিধায় স্কুলের সব স্যারই আমাকে খুব পছন্দ করতেন। তবে যেই মানুষটা সবসময় আমার পাশে ছায়ার মত ছিলেন তিনি হলেন আমার সুজন স্যার। তার বলা প্রতিটা কথা আমাকে বারংবার নতুন জীবনের স্বাদ আস্বাদন করিয়েছে।
স্যার সবসময় বলতেন, ‘কখনোই নিজের অবস্থার জন্য সংকোচবোধ করবেনা। মানুষকে নয়, সব সময় আল্লাহ্কে খুশি করার চেষ্টা করবে। কারণ তুমি কখনই মানুষকে খুশি করতে পারবেনা।’
বিজ্ঞানে পড়লেও কোন স্যারের কাছে পড়ার সামর্থ্য ছিলোনা আমার। স্যার একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘মাহির আমি তোমাকে পড়িয়ে আমার জ্ঞানের পরিসীমা বাড়াতে চাই।’
কথাটা শুনে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। অবাক হয়ে গিয়েছিলাম উনার শব্দচয়নে। উনি বলতে পারতেন তোমার আর্থিক সংকোটের কথা চিন্তা করে আমি তোমাকে ফ্রি পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু না, উনি আমার আত্মসম্মানের কথা চিন্তা করে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এতো সুন্দর করে কথাটা বলেছিলেন।
অতীতের নানা ভাবনার মাঝে চট্টগ্রাম পৌঁছে গেলাম। বাস থেকে নেমে গ্রামের মেঠো পথ ধরে যখন হাঁটা শুরু করলাম তখন অতীত স্মৃতিগুলো আমার চোখের পাতায় ভেসে উঠতে শুরু করলো। নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে ঢুকলাম। ফরজ নামাজের পরে একটা জানাজার নামাজও পড়ানো হলো। নামাজ শেষে জানতে পারলাম আমি আর কেউ নয়, আমার প্রিয় সুজন স্যারের জানাজা পড়েছি। কথাটা শুনে মনে হলো কেউ যেন আমার গলা চেপে ধরেছে আর আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মসজিদে ঢোকার সময় ভেবেছিলাম স্যারের সাথে দেখা হবে, কিন্তু এমন দেখা হওয়া কাম্য ছিলোনা। পরিচিত অনেকের সাথে দেখা হলেও কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করলোনা। কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা খাটিয়ার কাছে চলে গেলাম। সাদা কাপড়টা সরিয়ে অপলক প্রিয় মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর আদবের সাথে তার কপালে একটা ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দিলাম। আমি নিজ হাতে তাকে কবরে নামালাম। কবর দেওয়ার পর সেখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিরবে চোখ ভিজিয়ে দোয়া করলাম। তারপর স্যারের বাসার উদ্দেশে রওনা দিলাম।
স্যারের বাসায় ঢুকে ছোটবেলার বন্ধু তুষারের সাথে দেখা হল। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম কি দিয়ে কি হলোরে?
আমাকে নিয়ে একটা চেয়ারে বসিয়ে ও বলা শুরু করলো। চার মাস আগে চাচীর ক্যান্সার ধরা পড়ে। উনার চিকিৎসা করতে গিয়ে স্যার ঋণের কবলে পড়ে যায়। এসময় উনি কাউকে পাশে পাননি। এমনকি উনার একমাত্র ছেলে জুবায়েরকেও না। গত দুই বছর ধরে জুবায়ের স্যারের সাথে কোন যোগাযোগ করেনা। স্যারের মৃত্যুর একমাস আগে মেয়ে জায়নাবের স্বামী মারা যায়। মেয়ের ঘরে দুই বছরের একটা নাতিও আছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্বশুর বাড়ির লোকেরা চায়নি জায়নাব ঐ বাড়ি থাকুক। তাই ওদের দেওয়া গহনা এবং দামী জিনিসপত্র রেখে ওকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। চাচীকে শেষ পর্যন্ত বাচানো যায়নি। চাচী মারা যাওয়ার এক মাস পর স্যার সবার সাথে কথা বন্ধ করে দেয়। গতকাল রাতে ঘুমের মধ্যেই মারা যান উনি।
আমি অসহায়ের মত করে বললাম, আমি একটা অপদার্থ। আমি কীভাবে এতদিন উনার খোঁজ না নিয়ে থাকলাম! পি এইচ ডি করতে ক্যানাডায় গিয়েছিলাম। বাবা মা ছাড়া আর কারোর সাথে কথা বলা হতোনা আমার। কিন্তু তুষার, আমি কীভাবে অকৃতজ্ঞের মতো আমার জীবনে তার অবদানের কথা ভুলে গিয়েছিলাম! আমার অবহেলার কারণে আল্লাহ্ আমাকে তার শেষ স্পর্শটুকু থেকেও বঞ্চিত করলো।
অশান্ত মনে মাথা নিচু করে বসে আছি, ভেতর থেকে দুই বছরের একটা বাচ্চা এসে আমার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলো।
এটা যে স্যারের নাতি তা বুঝতে পারলাম। ওকে কোলে বসিয়ে ওর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়া শুরু করলাম।
প্রিয় মাহির,
ইদানিং তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। জানিনা আমাদের আর দেখা হবে কিনা। এই মুহুর্তে তোমাকে আমার ভীষণ প্রয়োজন। এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে। কিন্তু আমি নিরুপায়। আমার একমাত্র ছেলেকে আমি মানুষ করতে পারিনি। ও আমদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আজ তিন দিন হয় তোমার চাচী মারা গেছে। উনার চিকিৎসা করতে গিয়ে আমি কিছু ঋণ করে ফেলেছি। বিলকিসের অসুখে ওকে হারিয়ে ফেলার চিন্তায় আমি যখন মরিয়া হয়ে আছি, তখন আমার একমাত্র মেয়ে যায়নাব বিধবা হয়ে আমার কাছে চলে আসে। সবরকম চেষ্টা করেও বিলকিসকে বাচাতে পারলামনা। আমার এই কঠিন সময়ে আমি কাউকে কাছে পাইনি বলে আমার কোন আক্ষেপ নেই কিন্তু আমার মেয়েটাকে নিয়ে আমি শঙ্কায় আছি। আমার ঋণের অংকটা লিখে গেলাম। তুমি অনেকদিন আসোনা, তা নিয়ে আমার কোন কষ্ট নেই। কারণ আমি জানি তুমি ব্যস্ততা কমলে ঠিকই আমার কাছে ছুটে আসবে। আমার বাড়ির দলিলটা আমার মেয়ের কাছে রেখে গেলাম। বাড়ির অর্ধেকটা বিক্রি করে ঋণটা শোধ করে দিও। বাকি অংশটাতে আমার মেয়েটা অনায়াসেই থাকতে পারবে। পারলে কাউকে বলে মেয়েটার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিও। স্বার্থপরের মতো তোমার দারস্থ হলাম কারণ তুমিই যে আমার একমাত্র ভরসাস্থল।
তোমার সুজন স্যার
চিঠিটা পড়ে আর কান্না ধরে রাখতে পারলামনা। আশেপাশের যারা এসেছিলো তারা সবাই চলে গেছে। আমি মুহূর্তেই একটা অভিনব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। মনে হলো স্যারের ঋণ শোধ এবং নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে হলে এর থেকে ভালো সিদ্ধান্ত আর কি হতে পারে? তুষারকে বললাম, আমি জায়নাবকে বিয়ে করতে চাই।
আমার কথা শুনে তুষার অবাক হয়ে বললো, তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে, নাকি মেয়ের অভাব পড়েছে? এই পাড়া গাঁয়ের এক বাচ্চাওয়ালা বিধবা মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছিস কোন দুঃখে? এই আমাকেই দেখনা? তোর নখেরও যোগ্য না। কিন্তু বিয়ের কনেরা সব আমার জন্য লাইন ধরে দাঁড়াতো। আমিও দেখে শুনে রূপে, গুনে ও ধনে এগিয়ে আছে এমন মেয়েকেই বিয়ে করেছি।
আমি স্মিত হেসে বললাম, যেকোন সময় যেকোন মানুষের জন্য বিয়ে করাটা আসলেই কোন ব্যাপার না। যাদের কাছে বিয়ে কেবল একটা সামাজিক ও শারীরিক দায়বদ্ধতা, তাদের যেকোন একটা বিয়ে করলেই চলে। কিন্তু আমার কাছে বিয়ে সামাজিক আর শারীরিক প্রয়োজনের গন্ডি পেরিয়ে একটা বড় রকমের এবাদতও বটে। যেকোন মুহূর্তেই আমি সুন্দরী, ধনী, জ্ঞানী একজন নারীকে জীবনসঙ্গী করতে পারি। কিন্তু আমি এমন একজনকে বিয়ে করতে চাই যার আমাকে খুব দরকার। যায়নাবকে এখানে একা রাখা সম্ভব না। স্যারের ঋণ আমি কখনোই শোধ করতে পারবোনা। স্যারকে হারিয়ে আমার যে পীড়ন হচ্ছে যায়নাবকে বিয়ে করলে তার অনেকটাই লাঘব হবে। আর তাছাড়া এতিম এবং বিধবাদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেয়া অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ। তারপর খুব সাধাসিধে আয়োজনের মাধ্যমে আমি যায়নাবকে বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে আসি।
ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তটা ছিলো আমার জীবনে নেওয়া সবথেকে সুন্দর এবং বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত। যায়নাবকে বিয়ে করার পর আমাকে অনেকের অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে। কোন কিছুই আমি গায়ে মাখিনি। অসীম ভালোবাসার সাথে আমাদের বিবাহিত জীবনের দশ বছর পার করেছি।
অফিস থেকে বাসায় এসে দেখলাম ছেলেমেয়েরা খেলছে। রুমে যায়নাবকে দেখতে না পেয়ে ছাদে চলে গেলাম। রেলিঙয়ে ভর দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলো যায়নাব। কাছে গিয়ে ঘাড়ে হাত দিতেই চমকে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। চোখের কোণে জমে থাকা পানি দেখে বুঝলাম কান্না করছিলো। আঙুলের ডগা দিয়ে পানি মুছে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, মন খারাপ কেন তোমার?
ও আমার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার মত একটা মেয়েকে বিয়ে করে আপনি যে দয়া দেখিয়েছেন, তার ঋণ আমি কখনও শোধ করতে পারবোনা।
এক হাতে ওকে জড়িয়ে কাছে টেনে বললাম, তোমাকে দয়া দেখানোর মত সাহস কোথায় আমার? তোমাকে বিয়ে করে আমি তোমাকে নয়, আমাকে দয়া করেছি। তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষের রেখে যাওয়া আমানত, যাকে ভালোবাসা যায় , আগলে রাখা যায়, কিন্তু করুণা করা যায়না।
তোমাকে বিয়ে করে আমি শুধু দুনিয়া না, আখিরাতের পাথেয়ও কামিয়েছি। আমার জীবনে তোমার আগমন চৈত্রের খরায় অতিষ্ট জীবনে আগত বৃষ্টির মত। শুক্লপক্ষের ঘোর অমানিশা কাটানো আমার এক আকাশ জোছনা তুমি।
সমাপ্ত6 Comments
Friends
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
Morsalin Islam Shouradip
@morsalinshouradip
জাস্রা জুমান
@nmafin4gmil-com
Hijbullah hiju
@hijbullah
মোঃ রিদওয়ান আল হাসান
@mridwanalhasan
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam


চমৎকার গল্প। বাক্যের খেলা আছে। অনেক শুভকামনা।