Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    3 years, 11 months ago

    পোড়োবাড়ির রহস্য
    তিন
    আধঘণ্টার মধ্যে তারা রাজবাড়ি এসে পৌঁছাল। গাড়ি থেকে রাজবাড়ির সামনে এসে মুসায়েব থ বনে গেল। তালহাকে উদ্দেশ্য করে বলল, এটাকেতো আমার রাজবাড়ি মনে হচ্ছেনা। কেমন মনে হচ্ছে একটা পিকনিক স্পট। ব্যবসা করার জন্য কেউ বানিয়েছে, না?
    আরে না, এটাই নলডাঙ্গা রাজবাড়ি। এর শেষ রাজা ছিলেন প্রমথ ভূষণ রায় বাহাদুর। একসময় এখানে সৈন্যবাহিনী ছিল, পরিখা ছিল, ভবন ছিল।
    সেগুলো কোথায়? যায়িদ আর মুসায়েব উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
    তার কিছুই এখন আর অবশিষ্ট নেই, তালহা বলল। পাশের এই বেগবতী নদীটাই দেখনা, এর সাথে এখানে একটা সুড়ঙ্গ করা হয়েছিল, তাও মাটির সাথে মিশে গেছে। এখন শুধু এই সাতটি মন্দির রাজবাড়ীর সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে।
    তাহলে এই বিল্ডিংটা নতুন তৈরি করা হয়েছে, না? বলল যায়িদ।
    হ্যা, পুরানো রাজবাড়ীর দালান ভেঙ্গে রাজবাড়ীর আদলে তৈরি করা হয়েছে এই রিসোর্ট ও গবেষণা কেন্দ্র। সাথে এই বিনোদন পার্কও।
    কথা বলতে বলতে তারা রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। জানুয়ারী মাস হলেও এখানে শীতের প্রকোপ খুব একটা নাই। তবে আবছা কুয়াশায় ঢেকে আছে প্রকৃতি। সম্পূর্ণ রিসোর্ট যেন সবুজে মুড়ে রাখা হয়েছে। দূরে রয়েছে দু-একটা দৃষ্টিনন্দন বাগান। ডালিয়া, গাদা, চন্দ্রমল্লিকা, গ্লাডিওলাস হরেকরকম শীতের ফুল ফুটে আছে বাগানে।
    পিকনিক করার জন্য আরও অনেক মানুষ এসেছে। চারিদিকে সবাই আনন্দে লাফালাফি করছে। অনেকে এই শীতেও পুকুরে নেমে গোসল করছে। তাদের দেখে তালহাদের গোসল করার ইচ্ছা জাগলেও এই শীতে তাদের শরীর অনুমতি দিলনা।
    রাজবাড়িটা ঘুরে দেখছে আর অবাক হচ্ছে যায়িদ। সারিবদ্ধ করে বাঁশ, মেহগনি, আরও কতরকমের গাছ দিয়ে যে বাড়িটা সাজিয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।
    মুসায়েব বলল, এদিকটায় এতো গাছ! মনে হচ্ছে যেন অরণ্যে হেটে বেড়াচ্ছি।
    গাছের প্রতি আমার আলাদা একটা ভালো লাগা আছে ,বলল তালহা। আর তোরাতো জানিস ইসলামে গাছ লাগানোকে একটা ইবাদাত হিসাবে গণ্য করা হয়। গাছ লাগানো নিয়ে একটা অসাধারণ হাদিস আছে,
    ‘কিয়ামাত কায়েম হয়ে গেলেও, তোমাদের কারো হাতে যদি কোন গাছের চারা থাকে এবং সে তা এর আগেই রোপন করতে সক্ষম হয়, তবে যেন তা রোপন করে ফেলে’।
    রাজবাড়ির ভেতরটাতো দেখা হল সেখান বের হয়ে বাইরে বেগবতী নদীর কাছে চলে আসল তারা। রাজবাড়ি ঘুরতে আসবে বলে গতরাতেই তালহা রাজবাড়ি ও এর চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে পড়াশুনা করে এসেছে। তার মেজোচাচা তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে।
    তালহার এই স্বভাব মুসায়েবের অজানা নয় তাই নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, তালহা রাজবাড়ির পর এবার আমরা নদী সম্পর্কে তোর কাছ থেকে জানতে চাই।
    প্রায় একজন গম্ভীর শিক্ষকের মত তালহা বলা শুরু করল, এই নদীর দৈর্ঘ্য ৫৩ কিলোমিটার আর প্রস্থ ৩২ মিটার। খেয়াল করে দেখেছিস নদীটা কিন্তু সর্পিলাকার। নদীটি কুমারবাড়ির বিলাঞ্চল হতে উৎপত্তি হয়ে, বিভিন্ন উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ফটকি নদীতে গিয়ে মিশেছে। এখন শীতকাল, তাই পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কম আছে। কিন্তু বর্ষাকালে এই নদীর কারনে এখানে রীতিমত বন্যা হয়।
    নদীর পানি কমে যাওয়ায় জায়গায় জায়গায় চর তৈরি হয়েছে। ওদের থেকে কিছু দূরে একটা চরের উপর প্রায় ৪ ফুট লম্বা চারটা পাখি দাঁড়িয়ে আছে।
    পাখিগুলোকে দেখিয়ে তালহা বলল, এই পাখির নাম কে বলতে পারবে?
    যায়িদ বলল, পাখি! আমি পাখি টাখি চিনিনা। তুই বলতে পারবি মুসায়েব? তুইতো আবার পাখি বিশারদ।
    পাখি বিশারদ বললে বেশি হবে। আমি পাখির সম্পর্কে পড়তে পছন্দ করি। তাই নানারকম পাখি সম্পর্কে মোটামোটি একটা ধারণ আছে বলা যায়। কিন্তু পাখি বিশারদ বললে অত্যুক্তি হবে। এই পাখিটা অবশ্য আমার চেনা পাখির মধ্যেই পড়ে। এগুলো হল ‘সাদা মানিকজোড়’। এটা একটা বিরল প্রজাতির পারিয়াযী পাখি। বাংলাদেশে এরা আসে শীতকালে। তবে সংখ্যায় খুব বেশী নয়, দু-চার জোড়া দেখা যায়। একা বা জোড়ায় জোড়ায় ঘুরতে পছন্দ করে এরা।
    বাহ্‌! তোরতো দেখছি পাখির উপর ভালোই জ্ঞান। মুগ্ধ হয়ে তালহা বলল।
    অতিথি পাখির উপর একটা বই পড়েছিলাম। সেখান থেকে জেনেছি শীতকালে বাংলাদেশে প্রচুর বিরল প্রজাতির পাখি আসে। কিন্তু মানুষের অসাধুতার কারণে বছর বছর অতিথি পাখির পরিমান হ্রাস পাচ্ছে।
    নাদীর তীরে বসে বেশ কিছু সময় কেটে যাওয়ার পর যায়িদ বলল, আমরা কিন্তু এক জায়গায় অনেকক্ষণ বসে আছি। জায়গাটা বেশ সুন্দর। তাই বলে এই জায়গায় বসে সময় কাটালে হবে? চল আশপাশটা ঘুরে দেখি। বিকালের আগেই শেষ করতে না পারলে আর দেখাই হবেনা। তাছাড়া শীতের বেলা। সন্ধ্যাও তাড়াতাড়ি হয়। সন্ধ্যা হলে ঘোর অন্ধকার নেমে আসবে। তারপর অন্ধকারে হাতড়ে মরতে হবে। আর গাড়ি থাকলেও আমাদের একা ঘোরাঘুরি করা ঠিক হবেনা।
    যায়িদ ঠিকই বলেছে, বলল মুসায়েব। সন্ধ্যা হলে আমাদের আর কিছুই দেখা হবে না।
    তালহা বলল, আমার এখানে ভালই লাগছে। আবার জায়গাটাও ঘুরে দেখার দরকার। চল সামনে এগোই।
    নদীর তীর থেকে উঠে সামনের দিকে হাটা শুরু করে দিল তালহারা। আশেপাশে পুরানো আমলের বেশ কয়েকটি পুরানো বাড়ি দেখা গেল। কোন কোনটার এমনই ভগ্নদশা অবস্থা যে ভেতরে ঢুকে কিছুই দেখতে পেলনা তারা। ঘুরতে ঘুরতে তারা আরও একটা পুরানো বাড়ির সন্ধান পেল যা আগেরগুলো থেকে অনেকটাই অন্যরকম। সামনের দিক থেকে যতটা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে প্রায় এক একর জমি জুড়ে বাড়িটার বিস্তৃতি।বাড়িটার একপাশ ধ্বসে পড়ছে। বাইরের পাঁচিলটাও ভাঙ্গা। পলেস্তারা খসে পড়লেও বাড়ির নামটা জ্বলজ্বল করছে, ‘শান্ত কুটির’।
    তালহা বলল, অন্য বাড়িগুলো থেকে এই বাড়ির অবস্থা এখনও বেশ ভালই আছে। ভেতরে কেউ থাকে বলে মনে হয়না। তবে এটার বয়সও কম হবেনা। এসব পুরানো বাড়ি দেখতে আমার খুব ভাল লাগে। যদি কোন জমিদারের বাড়ি হয় তাহলেতো কথা নেই। এসব বাড়িতে জমিদারদের ব্যবহৃত পুরানো আমলের জিনিসপত্র দেখতে পাওয়া যায়। এগুলোর দেওয়াল জুড়ে নানারকম চিত্রকর্মও থাকে যা তাদের অতীত ঐতিহ্য বহন করে। এ-ধরণের বাড়ি ঘিরে নানারকম রহস্যও থাকতে পারে।
    ওরে বাবা! এতক্ষণতো ভালো ভালো কথা বলছিলি এখন আবার কিসব রহস্যের কথা বলা শুরু করলি। এরকম হলে আমি এর ভিতরে ঢুকবোনা। মুসায়েবের পা কাঁপা শুরু হয়ে গেল। আর তাছাড়া দেখছিসনা এটা একটা পোড়ো বাড়ি। হয়তো কোন একসময় মানুষ ছিল কিন্তু এখন সেসব মানুষ মরে নিশ্চয় ভুত হয়ে বসবাস করছেবাড়িটাতে।
    কি বলিস এসব? যায়িদ বলল। ভুত বলে কিছু আছে নাকি! তুই আবার কবে থেকে ভুতে বিশ্বাস করা শুরু করলি?
    ভুত না থাক, জীনতো আছে। কেন তুই জীন বিশ্বাস করিসনা? না করলে না করিস কিন্তু আমি যাবনা। তোদের ইচ্ছা হলে তোরা যা।
    আমরা তিনজনই যাব, বলল তালহা। আমাদের মনে রাখা উচিৎ আমরা গোয়েন্দা হতে যাচ্ছি। তাই আমাদের ভয়কে জয় করতে হবে। আর রহস্য টহস্য থাকলেতো আমাদের পোয়াবারো। আমরা ঘুরতে এসেছি যখন এখানকার সবই ঘুরে ঘুরে দেখব।
    তালহার কথার মধ্যে সবসময় একরকম দৃঢ়তা থাকে। মুসায়েবের না বলার সাহস হলনা।
    বাড়ির মূল ফটকটা ভেঙ্গে পড়ে আছে। ফটক পেরিয়ে বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়ল তারা। দোতলা একটা বাড়ি। ভেতরে যাওয়ার জন্য দুইটা কাঠের দরজা আছে। দুইটারই ভগ্নদশা। পলেস্তারা বিহীন দেয়ালগুলো অশ্বত্থ গাছ আর আগাছায় ভরে গেছে। বাড়ির কোল ঘেঁসে দাঁড়ানো কৃষ্ণচূড়া গাছের অর্ধেকটাই বাড়ির ছাদ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। ডানপাশের দরজাটা কাঠের। হ্যাঁচকা টান দিতেই সেটা খুলে গেল। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই বিকালের আলোয় ঘরটি সামান্য আলোকিত হয়ে পড়ল।
    ঘরে প্রবেশ করতেই একরাশ মাকড়শার জাল ওদের মাথা-মুখ সব জড়িয়ে ধরল।
    মুসায়েব বলল, এই ঘরের জানালা যে কতদিন খোলা হয়নি তা আল্লাহই ভালো জানেন। বিকট গন্ধে নাক ধরে আসল ওদের। বের হয়ে যেতে ইচ্ছা করল মুসায়েবের। কিন্তু তালহাকে বলার সাহস হলনা। তালহার দিকে তাকিয়ে দেখল নির্বিকারভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঘরের ভেতরের দিকের একটা দরজা খুলে ফেলল তালহা। দরজা খুলতেই একটা লম্বা বারান্দা চোখে পরল। বারান্দার সামনেই বড় একটা উঠান। পাতার কারণে উঠানের মাটি দেখা যাচ্ছেনা। সাঁই করে একটা কি যেন মুসায়েবের কান ঘেঁসে চলে গেল। ভয়ে ফ্যাঁকাসে হয়ে গেল মুসায়েবের মুখ। খুজতে লাগল চারিদিকে। চিউ চিউ আওয়াজ শুনে মাথার উপর তাকিয়েই দেখতে পেল চড়ুইটাকে। জনমানবহীন বাড়িটা এখন ওদের দখলে। তাই কারও অনুপ্রবেশ পছন্দ করছেনা তারা। বাড়ির ঘুলঘুলি এখন ওদের রাজত্বে। হাসি পেল মুসায়েবের। তার মত ভীতুর পক্ষে গোয়েন্দা হওয়া কীভাবে সম্ভব?
    উঠানের পাশেই একটা পরিত্যক্ত কুয়া। উঠান পার হয়ে সামনেই আর একটা দোতলা দালান দেখতে পেল তারা। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল তালহারা। এটার দোতলার অবস্থা আরও শোচনীয়। বারান্দা জুড়ে পড়ে আছে ভাঙ্গা কতগুলো চেয়ার। ঘরের মধ্যে পুরানো আমলের খাট বিছানো আছে। একপ্রস্থ ময়লা জমে আছে তাতে। ঘরের দেয়ালে নানারকম ছবি টানানো আছে। ধূলার কারণে কোন ছবি স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছেনা। বারান্দা থেকে ভেতরের দিকে একটা সিঁড়ি একতলায় নেমে গেছে। দোতলার সব ঘরে ঘুরে ঘুরে দেখল তালহারা। সবগুলো ঘরই অগোছালো পড়ে আছে। মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন এখানে কারোর পা পড়েনি, বলল তালহা। অনেকদিন আগে হয়তো কেউ বাস করত। তবে একটা ব্যাপার আমার ভাবনায় ফেলছে তা হল এতো জায়গা জুড়ে থাকা একটা বাড়ি এভাবে পড়ে আছে কেন?
    মুসায়েব বলল, কেন তুই কি এখানে কোন রহস্যের গন্ধ পাচ্ছিস? এই পোড়োবাড়ি দিয়ে কি আমাদের গোয়েন্দাগিরির অভিষেক ঘটাতে চাস?
    তা মন্দ হয়না। তিনদিন হয়ে গেল ভদ্রলোকের কাছ থেকে কোন খবর পেলামনা। বোঝাই যাচ্ছে ঐ কাজটা আর পাবনা। আমাদের মত অনভিজ্ঞ গোয়েন্দাদের কেউই কাজ দিবেনা। এখন নিজেদের প্রচারের জন্য নিজেদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। কি বলিস তোরা, বলল তালহা।
    হয়েছে আর প্রচারে কাজ নেই। আমি এখন এখান থেকে বের হতে চাই।
    তালহা বলল, তোর ভয় দূর করতে চাই মুসায়েব। এখনও অন্ধকার হয়নি। আর তুই ভয়ে কাবু হয়ে যাচ্ছিস।
    এরকম করছিস কেন? ওর একটা হাত টেনে ধরে যায়িদ বলল, এখনও বাড়ির বেশিরভাগই দেখা হয়নি। চল আগে দেখে নেই, তারপর যদি কি করব না করব তা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। মুসায়েবের হাত ধরেই তালহার পেছন পেছন সিড়ি দিয়ে নামা শুরু করল যায়িদ। সিড়ি দিয়ে তারা প্রথম যে ঘরটায় নামল সেটা একটা হলঘরের মত। একটু সামনে এগোতেই অনেকগুলো পাশাপাশি ঘর চোখে পড়ল।
    ঘরগুলো কেমন স্কুলঘরের আদলে তৈরি করা, তাইনারে? পুরানো বাড়িগুলোতে এরকম ঘর দেখা যায়, বলল তালহা।
    হ্যা। দোতলটা যেমন সুন্দর নীচটা কিন্তু তেমন আকর্ষণীয় না। যায়িদ উত্তর দিল।
    সামনের দিকে হাটা শুরু করল তালহারা। তখনও মুসায়েবের হাত শক্ত করে ধরে আছে যায়িদ। শেষ প্রান্তের ঘরগুলোর কাছাকাছি আসতেই শোনা গেল আওয়াজটা। ঠিক কোথা থেকে আওয়াজটা আসছে বোঝার চেষ্টা করল তালহা।
    কীসের শব্দ?
    চলবে

    6
    2 Comments
Skip to toolbar