Profile Photo

mahamuda khaunOffline

  • mahamuda
  • Profile picture of mahamuda khaun

    mahamuda khaun

    3 years, 10 months ago

    পোড়োবাড়ির_রহস্য
    পর্ব_তেরো

    যায়িদ একটা অসাধারণ কাজ করেছে। বিগত দশ বছরের অপহরণের উপর ও একটা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রথমে শুধুমাত্র ঝিনেদা জেলার বিভিন্ন স্কুলে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে একটা পরিসংখ্যান দেখানো হয়েছে তারপর ঐ সময় অন্য জেলায় ঘটে যাওয়া অপহরণের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

    তালহা মন দিয়ে পড়া শুরু করলো। এবারের ঘটে যাওয়া ঘটনা সহ গত দশ বছরে ঝিনেদায় মোট চারবার অপহরণের ঘটনা ঘটে। তবে এর আগে সবোর্চ্চ ছয় জনকে অপহরণ করা হয়েছিলো। এবার আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এই চার বারের মধ্যে আনন্দ বিদ্যাপীঠেই দুইবার অপহরণের ঘটনা ঘটে। পাঁচ বছর আগে এমন অপহরণের ঘটনা ঘটেছিলো। তবে সেবার মাত্র চারজন বাচ্চা অপহৃত হয়েছিলো। দুইজন মেয়ে আর দুইজন ছেলে। থানায় জিডি করার পাশাপাশি বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থাও নিয়োগ করা হয়েছিলো। ওরা চারজন স্কুল ভ্যানে করে বাড়ি ফিরছিলো। একজন ছাড়া বাকি তিনজনকে পরদিনই স্কুলের সামনে থেকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু নবম শ্রেণির যে ছাত্রী অপহৃত হয়েছিলো তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

    আনন্দ স্কুল ছাড়া বাকি দুইটা অপহরণের ঘটনার একটা ঘটে একটা নামকরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীদের সাথে এবং অন্যটি একটা নাচের স্কুলের শিক্ষার্থীদের সাথে। সেবার ইংরেজী মাধ্যম স্কুল থেকে তিনজন এবং নাচের স্কুল থেকে দুইজন অপহৃত হয়। এরা সবাই ছিলো নবম শ্রেণির ছাত্রী। এই দুই ক্ষেত্রেই অপহরণকারীরা অভিভাবকদের কাছে থেকে মোটা টাকা দাবী করেছিলো। এই দুইটা অপহরণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন দোষ ছিলোনা। কারণ ঘটনাগুলো ক্যাম্পাসের বাইরে ঘটেছে। পরে টাকা দিলেও মেয়েগুলোকে আর ফেরৎ পায়নি তাদের পরিবার।

    দেখা গেছে প্রতিটা অপহরণের ঘটনার আগে স্কুলগুলোতে গানের কনসার্টের আয়োজন করা হয়। ব্যাপারটা কাকতলীয়ও হতে পারে। অবশ্য সবগুলো কনসার্টে একই ব্র্যান্ড দল গান গেয়েছে তা কিন্তু না। চারটা কনসার্টে চারটা আলাদা আলাদা ব্র্যান্ডের দল অংশগ্রহণ করেছিলো। মেঘমালা, ক্লান্ত-পথিক, সারগাম এবং শেষ যেটা আনন্দ বিদ্যাপীঠে হয়েছে সেটা হলো রক শিল্পীগোষ্ঠী।

    ঝিনেদার বাইরে ঢাকা শহরে হরহামেশেই অপহরণের ঘটনা ঘটে। কিন্তু একসাথে বেশি বাচ্চা অপহরণের ঘটনা এই দশবছরে মাত্র দুইবার ঘটেছে। এটাও ঘটেছে নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের বাচ্চাদের সাথে যাদের সবাই ছিলো ধনী পরিবারের। ঐ স্কুলগুলোতে অপহরণের আগে কোন কনসার্ট হয়নি। তবে এক সপ্তাহ আগে ধানমন্ডি লেকে একটা সার্কাসের আয়োজন করা হয়। বারোটা স্কুল ঐ সার্কাসে অংশগ্রহণ করে। সার্কাসটা প্রায় এক সপ্তাহ চলে। তার ঠিক এক সপ্তাহ পরে ঢাকার দুইটা নামকরা স্কুল থেকে আটটা বাচ্চা অপহৃত হয়। এই হচ্ছে বিগত দশ বছরের অপহরণ সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন।

    কনসার্টগুলোর কোন ছবি পাসনি? তালহা যায়িদকে জিজ্ঞাসা করলো।

    হ্যা পেয়েছি, কিন্তু ছবিগুলো স্পষ্ট না। কনসার্টের ছবিতো স্কুল এ্যালবামেই থাকার কথা। আমরা ওখান থেকে সংগ্রহ করতে পারি।

    কিন্তু অনেক আগে হওয়া অনুষ্ঠানের ছবি কি পাওয়া যাবে? যদি ম্যাগাজিন থাকে তাহলে হয়তো পাওয়া যেতে পারে। পুরানো ম্যাগাজিন অনেক সময় বিক্রিও করে দেওয়া হয়।

    আচ্ছা আমরা একটা কাজ করতে পারি। ব্র্যান্ডগুলোর নাম লিখে সার্চ দিতে পারি। তাহলেতো ওদের ছবিও নিশ্চয় বের হয়ে আসবে।

    মুসায়েবের কথাটা শুনে ওকে বাহবা দিলো তালহা। তারপর জায়িদ আর মুসায়েবকে এই সংক্রান্ত তথ্য খুঁজতে বলে ও কিডন্যাপ সংক্রান্ত শেষ খবর জানার জন্য নিউজ চ্যানেলগুলো ঢু মারলো তালহা। সব চ্যানেলে মোটামোটি কিডন্যাপের খবর প্রচার করছে। খবর থেকে জানা গেলো যে দশটা বাচ্চা অপহৃত হয়েছে তারা সবাই স্কুলের মাইক্রোতে করেই যাওয়া আসা করে। মাইক্রোর ড্রাইভারকে অচেতন অবস্থায় পালবাড়ি ঝোপের মধ্যে পাওয়া গেছে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে একটা মাইক্রো এসে ওদের পথরোধ করে দাঁড়ায়। তারপর দুইজন এসে ওর নাকের কাছে কি একটা ধরে। এরপরের ঘটনা ওর অজানা। স্কুলের মাইক্রোটাও ওখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

    মাত্র সংবাদ পাওয়া গেলো নবম এবং দশম শ্রেণির চারটা ছাত্রী ছাড়া বাকিদেরকে স্কুল গেটের সামনে হাত পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে কেউ একজন স্কুল কর্তৃপক্ষকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি। ফোন কেটে গেলে পুণরায় ফোন করে নাম্বারটা বন্ধ পাওয়া যায়।

    এই সংবাদটা পড়ার পর তালহা আবার জায়িদের বানানো প্রতিবেদনটায় চোখ বুলালো। একটা ব্যাপার ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেলো তা হলো অপহরণকারীদের মূল ফোকাস মেয়েদের উপর। অর্থাৎ ১৭ থেকে ১৮ বছরের মেয়ে।

    যায়িদ সবগুলো ব্র্যান্ড দলের ছবি বের করে একটা ফোল্ডার তৈরি করলো। তারপর তিনজন মিলে ছবিগুলো নিয়ে গবেষণা করতে বসলো। প্রতিটা দলে আটজন করে সদস্য। প্রতিটি দলের সাতজন সদস্যকে আলাদা মনে হলেও একজনকে কেন যেন প্রতিটা দলে একই মানুষ মনে হচ্ছে তালহার। অবশ্য তার পোশাক এবং সাজ সজ্জা দেখে কারোরই ধরার উপায় নেই চারটা ব্র্যান্ড দলে বিভিন্ন রূপে থাকা এই মানুষটি আসলে একজন লোক। কোনটাতে গাঁয়ের রঙ কালো এবং বড় চুল, কোনটাতে ফর্সা এবং ছোট চুল, কোনটাতে সানগ্লাস এবং মাস্ক পড়া অবস্থায় আছে আবার কোনটিতে মাথা নিচু থাকায় চেহারা ঢেকে আছে। বন্ধুদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল, আমার কেন যেন এই লোকটাকে একজন মনে হচ্ছে। প্রতিটা দলে একজন লোককে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল তালহা। যায়িদ আর মুসায়েব ভালো করে দেখে তালহার সাথে দ্বিমত পোষন করলো।

    তালহা বলল, চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই। যে দুইটা দিক দেখে আমার এই চারজনকে একই মানুষ মনে হয়েছে তার একটা হলো চারজনই বাম হাত দিয়ে গীটার ধরে ডান হাতে বাজাচ্ছে এবং প্রত্যেকের বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলের নখের নিচের একটা তিল আছে। কথাটা বলে ওদের দুজনকে ছবিটা জুম করে তিলটা দেখালো তালহা। চারজনের এমন মিল থাকাটা অস্বাভাবিক মনে হয়না?

    মুসায়েব অবাক হয়ে বলল, এই তিলটা তোর চোখে পড়লো? তোকেই গোয়েন্দা হওয়া মানায়। এবার বল আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?

    আপাতত এই ব্র্যান্ড দলগুলোর সম্পর্কে যতটুকু সম্ভব খোঁজ নেই। তারপর দেখি কি করা যায়। যায়িদ তুই দেখতো ওদের প্রতিটা দলের কনসার্টের শিডিউল বের করতে পারিস কিনা।

    যায়িদ বেশ কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করে বলল, নাহ্‌ এমন কোন তথ্য কোথাও দেওয়া নেই।

    আচ্ছা থাক দেখতো দলের সবার নাম আলাদাভাবে পাওয়া কিনা। তালহার কথা অনুযায়ি প্রতিটা দলের নাম লিখে আবার সার্চ দিলো যায়িদ। দলগুলোর সদস্যদের নাম বের হয়ে আসলো। প্রতিটা দলেই সবার আলাদা নাম। সেখান থেকে কোনটা কার নাম বের করা সম্ভব না। আরও কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করে আলাদা আলাদা ছবিসহ নাম বের করা গেল। দেখা গেলো ছদ্মবেশ ধারণকারী ছেলেটার নাম কোথাও জন, কোথাও পল, কোথাও টগর আর রক ব্র্যান্ডে ওর নাম ড্যানি।

    যায়িদ বলল, ছেলেটা কি বিদেশী নাকি সব বিদেশী নাম রেখেছে। দেখেতো খাস বাঙ্গালী মনে হচ্ছে।

    আরে সবগুলোই ছদ্মনাম। সেকারণের এমন বিদেশী নাম বেছে নিয়েছে। এর একটাও আসল নাম না। যায়িদ এবার তুই রক ব্র্যান্ডের খুঁটিনাটি বের কর।

    যায়িদ রক ব্র্যান্ডের বিস্তারিত বের করে পড়া শুরু করলো। এই ব্র্যান্ড দলের উৎপত্তি বেশি দিনের না। ২০১৮ তে এরা দল গঠন করে। তখন দলের সদস্য ছিলো পাঁচজন ২০২০ সালে সাতজন আর ২০২২ এ গিয়ে সদস্য সংখ্যা আট এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে ওদের সাথে যোগ দেয় তুখোড় গীটারিস্ট ড্যানিয়েল।

    তালহাকে খুব চিন্তিত দেখালো। একটা ঘটনার সাথে অন্য ঘটনার কোন সংযোগ আছে কিনা তা মিলানোর চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা কাজে যোগদান করা থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যায়িদকে নোটবুকে নোট করতে বলল তালহা।
    ১। রওশন মজুমদার কেন পোড়োবাড়িতে গোয়েন্দা নিয়োগ করতে চেয়েছেন? তার সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নিতে হবে।
    ২। তালহাকে কারা ধরে নিয়ে গেছে ? তাদের সাথে পোড়োবাড়ির কি সম্পর্ক?
    ৩। অপহরণের সাথে ঐ বাড়ির কোন সম্পর্ক আছে কিনা। ড্যানিয়েলের খুঁটিনাটি জানা।

    প্রথমে আমরা রওশন মজুমদারের ব্যাপারে খোঁজ নিবো। এখনই আমরা ঝিনেদা চলে যাবো।

    তালহার কথা শুনে মুসায়েব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, ঝিনেদায় যাবো কেন? পোড়োবাড়ির ব্যাপারটা সুরাহা না করে অন্য একটা কেস নিয়ে লাফালাফি করছিস কেন?

    আমাদের পোড়োবাড়ির ব্যাপার নিয়েই আছি। আপাতত দুদিন আমরা ঝিনেদা থাকবো। কারণ এখন আমাদের যা কাজ আছে সব ঝিনেদাকেন্দ্রিক।

    নানুবাড়ির গাড়ি করেই ওরা তিনজন একাই ঝিনেদা চলে আসে। এতো তাড়াহুড়ো করাতে তালহা নানু বাড়ির সবাই অবাক হয়েছে কিন্তু সেটা দেখার সময় নেই এখন ওদের।

    বিকালের মধ্যে ঝিনেদা চলে আসে ওরা। গাড়ি নিয়ে সোজা রওশন মজুমদারের বাড়ির কাছে চলে যায়। ভেতরে ঢুকতে চাইলে দারোয়ানের কাছ থেকে সহজেই অনুমতি পাওয়া যায়। দারোয়ান ওদেরকে নিয়ে বসার ঘরে বসালো। তারপর ওদেরকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমরা বস, আমি স্যারকে খবর দিচ্ছি।

    দারোয়ান চলে গেলে মুসায়েব অবাক হয়ে তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে বলল, ব্যাপার কি? এতো সহজেই ভেতরে ঢুকতে দিলো!

    আমার মনে হয় কারোর আসার কথা ছিলো। দারোয়ান আমাদেরকে তারা ভেবে ভুল করেছে, নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে তালহা বললো।

    সিকদার ওরা এসেছে?

    জি স্যার আমি বসার ঘরে বসিয়েছে। বাইরে থেকে দারোয়ান আর রওশন মজুমদারের কথা শুনতে পেলো ওরা।

    কিছুক্ষণ পর পদশব্দ শুনতে পেয়ে বুঝতে পারলো লোকটা এদিকেই আসছে। নড়েচড়ে বসলো ওরা। বসার ঘরে

    ঢুকে রওশন মজুমদার ওদের দেখে অবাক হলেন। বজ্রকন্ঠে সিকদার সিকদার বলে ডাকতে লাগলো।

    চলবে

    8
    3 Comments
Skip to toolbar