Profile Photo

মৈনাকOffline

  • Mainak
  • Profile picture of মৈনাক

    মৈনাক

    • 16 hours, 33 minutes ago

    ফ্রান্ৎস কাফকা (৩রা জুলাই ১৮৮৩ – ৩রা জুন ১৯২৪) মাত্র ৪১ বছরের জীবনকালে যখন মেটামরফোসিস্‌ (১৯১৫) লিখছেন তখন সাদাত হাসান মান্টোর বছর তিনেক বয়স আর তিনি অর্থাৎ মান্টো নিজেও প্রায় ওই সময়কালের অর্থাৎ মাত্র তেতাল্লিশ বছরের জীবদ্দশায় (১১ই মে ১৯১২ – ১৮ই জানুয়ারী ১৯৫৫) অভিমানে নিজের ভারতভূমি ছেড়ে পাকিস্তানে চলে গেলেন বটে কিন্তু বেঁচে থাকার শেষ বছরে বা একদম মৃত্যুর বছরটাতে সৃষ্টি করলেন তার কালজয়ী রচনা টোবাটেক সিং, দেশভাগের কারণে তীব্র হতাশা, যন্ত্রনা বিদ্রুপের মরমী আখ্যানের এক নিদারুণ প্রতিচ্ছবি। অন্নদাশংকর রায় যে কারণে তাঁর কবিতায় বুড়ো খোকাদের তীব্র শ্লেষে বিঁধলেন, মান্টো তেমনই তার রচনায় একই উদ্দেশ্যে যেন প্রায় মৃত্যুকালীন জবানবন্দীর ঢঙে উপমহাদেশের তামাম রাজনীতিকদের উদ্দেশ্যে দেগে দিলেন মর্মব্যথার ক্ষেপণাস্ত্র।

    অন্যদিকে তাদের দুজনের থেকে প্রায় বছর দশেক বেশি বেঁচে ছিলেন বাংলা সাহিত্য তথা গোটা এপার ওপার বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ যিনি মান্টোর চেয়ে বছরখানেক আগে বিদায় নিয়ে ফেলেছেন বটে (১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯ – ২২শে অক্টোবর ১৯৫৪) তবে বাংলা সাহিত্যে তাঁর ভিনসেন্ট হয়ে যাওয়া রচনা বনলতা সেনের অনেক আগে লিখে রেখে গেছেন ‘ধূসরপাণ্ডুলিপি’র মত গভীর জীবনবোধ ও অস্তিত্বের সংকট নিয়ে লেখা কবিতাগুচ্ছ। মোটকথা আমরা যারা বাঙালি পাঠক তারা জীবনানন্দের কবিতার পরিচিতি যে যার মত সীমাবদ্ধতা নিয়ে যত্‌টুকু জানি, সমান্তরাল ভাবেই তাঁর মন, জীবনবোধ চরম হতাশা যন্ত্রনা কষ্ট আর একদম শেষের চরম পরিণতিটাও যেহেতু অজানা নয় তাই সহজেই আন্দাজ করতে পারা যায় যে জীবনানন্দ নিজে জীবন সম্পর্কে সমতুল বা তার চাইতেও হয়তো বেশি নিরানন্দ ছিলেন। আর এই তিনজনের মধ্যে মিলটা হল এখানেই যেখানে কাফকা, জীবনানন্দ এবং মান্টো একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছেন তাদের সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। অন্যদিকে তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন স্বল্পায়ু ও তাঁদের সীমিত জীবনকালে তাদের নিজের নিজের একেকটা সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে মানুষকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। আরো কি অদ্ভূত মিল তাদের জীবনযাত্রা ও আচরণগত দিকেও! অসীম প্রতিভাধর ও কীর্তিমান হয়েও জীবদ্দশায় সমাজের কাছে যাঁদের আক্ষরিক অর্থে কোনো মূল্যই ছিলনা উল্টে আপোসহীনতা, অন্তর্মুখীতা তাঁদের দিয়েছে ক্রমাগত বঞ্চনা, তাচ্ছিল্য অবহেলা যে কারণে তারা নিজেরা নিজেদের জীবন থেকে চরম হতাশা দুঃখে ক্ষোভে অভিমানে দুরে সরে যেতে চেয়েছেন আর শেষমেশ প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই হয়েছে তেমনই নিদারুন পরিণতি। কাফকা মাত্র একচল্লিশে চলে গেলেন যক্ষায়, তেতাল্লিশের মান্টো লিভার সিরোসিসে আর জীবনানন্দ আরেকটু বেশি প্রায় পঞ্চান্ন বছর বয়সে কলকাতার রাজপথে অমনযোগে চলন্ত ট্রাম থেকে নেমে গিয়ে নিজেকে ফের আরেকবার সৃষ্টিকর্তার কাছে সঁপে দিয়ে গেলেন ঠিক যেন তাঁর কবিতার লাইনের ছন্দে মিলে গিয়ে — “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল; সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।”

    এবারে একদম শেষে আসা যাক, কিছু কি মিল পাচ্ছেন, আরো ভেঙে বললে কোথাও কোনো সংযোগ কি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে? একটু ভেবে দেখুন ভারত উপমহাদেশের জীবনানন্দের বাংলায় তাঁর ভিটেমাটির অপর প্রান্তে বাংলারই অন্য আরেক অংশে তাঁর জন্মের বেশ কিছু আগে জন্ম নেওয়া মৃত্যুঞ্জয়ী চিরনবীন এক সন্ন্যাসী তাঁর দেশমাতৃকার চরণে সবটুকু উজাড় করে এমনকি সমগ্র বিশ্বকে স্তম্ভিত করে কাফকার চাইতেও কম বয়সে মাত্র ঊনচল্লিশে (১২ই জানুয়ারি ১৮৬৩ – ৪র্থ জুলাই ১৯০২) সব মায়ামোহকে অবলীলায় সরিয়ে ত্যাগ-তিতীক্ষার বীজ মন্ত্রে নিজেকে সমর্পণ করে দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন অথচ মৃত্যুর সময়ে কি পেয়েছিলেন তিনি তাঁর আপন সমাজের কাছ থেকে!? যে তিনজনের কথা ইতিমধ্যে বলা হয়েছে তাঁদের থেকে কম তো ছিলই না উল্টে গভীর ভাবে ভেবে দেখলে বরং তা ছিল আরো নির্মম এবং একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
    মৈনাক

    1
    3 Comments
    • কাফকা, মান্টো, জীবনানন্দ আর বিবেকানন্দকে একই ভাবনার সূত্রে যুক্ত করার প্রচেষ্টাটি ইনটারেস্টিং। ইতিহাসের আড়ালে থাকা মানুষগুলোকে নতুন করে ভাবতে ইচ্ছে করে।

    • মৈনাক, এই তিন মহাপ্রাণ সাহিত্যিক ও সন্ন্যাসীর জীবনবোধের সমান্তরাল বিশ্লেষণটি পড়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন এক গভীর দর্শনের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়েছি। “সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন”— জীবনানন্দের এই অমোঘ পঙ্‌ক্তিটি উদ্ধৃত করে আপনি তাঁদের অস্তিত্বের যে ক্ষণস্থায়ী অথচ প্রগাঢ় প্রভাবের কথা তুলে ধরেছেন, তা সত্যিই এক অসাধারণ সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণ। আপনার লেখায় যে গভীর বিশ্লেষণ ও অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ পেয়েছে, তা পাঠককে নতুন করে ভাবতে শেখায়; তাই এই ধারা বজায় রেখে আপনি ভবিষ্যতে আরও এমন চমৎকার লেখা উপহার দিন।

      • শুধুমাত্র তিনজন নয় এখানে একদম শেষে অপর একজনের জীবনের সাথে তাঁদের যুক্ত করা হয়েছে

Skip to toolbar