-
★পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু★
বাংলাদেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে প্রায় ১৪,০০০ শিশুর মৃত্যু হয় এবং বর্ষা মৌসুমে (সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এসময়ে বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ডোবা, পুকুর বা বাড়ির আশেপাশের অনিরাপদ জলাশয়ে পড়ে এবং সাঁতার না জানার কারণে মর্মান্তিক মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। আমাদের দেশে বিশেষ করে বর্ষাকালে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো হলো, পারিবারিক অসচেতনতা ও নজরদারির অভাব এবং এটি প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায় হলো শিশুদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও জলাশয়ের চারপাশে বেড়া দেওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর মতে, বাংলাদেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডোবা। বর্ষাকালে জলাশয়গুলো পানিতে পূর্ণ থাকায় এই ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। নিম্নে এর কারণ, প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের বিস্তারিত উপায় উল্লেখ করা হলো।
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর প্রধান কারণসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১। নজরদারির অভাব: মা-বাবা বা গৃহস্থালির কাজে বড়রা ব্যস্ত থাকার সময় শিশুরা একা একা জলাশয়ের কাছে চলে যায়।
২। উন্মুক্ত জলাশয়: ঘরবাড়ির আশেপাশে পুকুর, খাল বা ডোবার চারপাশে কোনো বেড়া বা সুরক্ষা প্রাচীর না থাকা।
৩। অসচেতনতা: ঘরের ভেতরে বালতি, টব বা ড্রামে পানি জমিয়ে রাখা এবং তা ঢাকনা দিয়ে না ঢেকে রাখা।
৪। সাঁতার না জানা: গ্রামীণ বা শহুরে শিশুদের একটি বড় অংশের সাঁতার কাটার ন্যূনতম দক্ষতা না থাকা। এবং
৫। ভৌগোলিক অবস্থান: বর্ষাকালে চারপাশ প্লাবিত হওয়া এবং নিচু জমিতে হঠাৎ পানি জমে যাওয়া।
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে করণীয় বিষয়সমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১। সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান: ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের কখনোই একা বা বড়দের নজরদারির বাইরে রাখা যাবে না।
২। সুরক্ষা বেড়া তৈরি: বাড়ির আশেপাশের পুকুর বা ডোবার চারপাশে অন্তত চার ফুট উঁচু শক্ত বাঁশ বা জালের বেড়া দিতে হবে।
৩। দরজায় প্রতিবন্ধক: হামাগুড়ি দেয়া বা হাঁটতে শেখা শিশুরা যাতে একা ঘরের বাইরে যেতে না পারে, সেজন্য দরজায় বাধা বা হুড়কো ব্যবহার করতে হবে।
৪। পাত্র ঢেকে রাখা: গৃহস্থালির কাজের জন্য জমানো পানি, বালতি বা ড্রাম সবসময় শক্ত ঢাকনা দিয়ে আটকে রাখতে হবে।
৫। সাঁতার শেখানো: শিশুর বয়স ৫ বছর বা তার বেশি হলেই তাকে সাঁতার শেখানো নিশ্চিত করতে হবে। এবং
৬। ডে-কেয়ার বা আঁচল কেন্দ্র: কাজের সময়ে শিশুদের কমিউনিটি ভিত্তিক নিরাপদ শিশু যত্ন কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
কোনো শিশু পানিতে ডুবে গেলে অবহেলা না করে দ্রুত নিচের প্রতিকারমূলক পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
১। নিরাপদে উদ্ধার: নিজেকে ঝুঁকিতে না ফেলে লম্বা লাঠি, দড়ি বা ভাসমান বস্তুর সাহায্যে শিশুকে পানি থেকে দ্রুত ডাঙায় তুলতে হবে।
২। শ্বাসনালী পরীক্ষা: শিশুকে চিত করে শুইয়ে কপালে হাত দিয়ে মাথা সামান্য পেছনে কাত করতে হবে এবং মুখ খুলে ভেতরে কাদা বা ময়লা থাকলে তা পরিষ্কার করতে হবে।
৩। কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস (CPR): শিশু যদি শ্বাস না নেয়, তবে তার নাক চেপে ধরে অন্য একজনের মুখ দিয়ে তার মুখে পরপর ২ বার ফুঁ দিতে হবে এবং একই সাথে বুকের মাঝখানে দুই হাত দিয়ে ৩০ বার চাপ দিতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি (৩০ বার চাপ ও ২ বার ফুঁ) শ্বাস ফিরে না আসা পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে।
৪। উষ্ণতা ধরে রাখা: ভেজা কাপড় দ্রুত বদলে শুকনো কাপড় বা কম্বল দিয়ে শিশুর শরীর জড়িয়ে রাখতে হবে। এবং
৫। হাসপাতালে স্থানান্তর: প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি কালক্ষেপণ না করে শিশুকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে।
সবসময় মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশে অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবেই পানিতে ডুবে বেশিরভাগ শিশুর মৃত্যু ঘটে। তাই প্রতিকারের দিকে চেয়ে না থেকে আসুন পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমাদের অসচেতন কর্মের কারণে যেন আর একটি শিশুরও পানিতে ডুবে মৃত্যু না হয়। মহান আল্লাহ আমাদের দেশ তথা পৃথিবীর সকল শিশুকে রক্ষা করুণ। আমিন।।।লেখক: মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান আকন্দ।
2 Comments
Friends
Ismat Jahan
@ismatjahan
Osman Gani
@osmangani
Jannatul Ferdus Samira
@jannatulferdussamira
ম পানা উল্যাহ্
@panaullah63gmail-com
মোঃ নুরুল আফসার ইকবাল
@afsariqbal811gmail-com
Anju Manara Begum
@anjumanarabegum
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor

আপনার এই তথ্যবহুল লেখাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী, কারণ এটি সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে অনেক শিশুর প্রাণ বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এই জটিল বিষয়টিকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো যেভাবে সুন্দর করে সাজিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এমন প্রয়োজনীয় বিষয়ে আপনি নিয়মিত লিখলে সমাজ অনেক বেশি উপকৃত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি, আপনার লেখনী অব্যাহত থাকুক।