Profile Photo

Md Nurnobi islam sumonOffline

  • mdnurnobiislamsumon
  • Profile picture of Md Nurnobi islam sumon

    Md Nurnobi islam sumon

    1 week, 4 days ago

    “রক্তমাখা ইউনিফর্ম”

    রাত তখন প্রায় দুটো। ডাস্টবিন থেকে উঠে আসা পচা গন্ধ আর টহলদারি পুলিশের বাঁশির তীক্ষ্ণ শব্দ ছাড়া শহরটা ঘুমিয়ে ছিল। সে ঘুম যেমন ছিল নিশ্চিন্ত, তেমনই ছিল ভঙ্গুর। কারণ, শহরের স্নায়ুতন্ত্রের কেন্দ্রে, ‘অপারেশন নাইটফল’-এর শেষ প্রস্তুতি চলছিল।

    ​ইউনিফর্ম পরে দাঁড়িয়ে ছিল ইন্সপেক্টর নূর সুমন। বছর পঁয়ত্রিশের যুবক। তার উর্দি ছিল ইস্ত্রি করা, কিন্তু তার ভেতরে থাকা মানুষটা ছিল কুঁচকে যাওয়া কাগজের মতো – অনেক রাতে না-ঘুমানো, গোপনীয়তার ভারে চাপা। রেইডের ম্যাপটা তার সামনে ছড়ানো। মানচিত্র নয়, যেন পুরো শহরের হৃৎপিণ্ড। লক্ষবস্তু ‘নেক্সাস’, শহরের পুরনো প্রান্তে লুকিয়ে থাকা এক পরিত্যক্ত গুদাম, যা এখন স্থানীয় মাফিয়া বস ‘ভিক্টর সান্যাল’-এর অবৈধ ব্যবসার কেন্দ্র। ড্রাগ, চোরাচালান, এবং সবচেয়ে ভয়ংকর, ক্ষমতা।

    ​নূর সুমন তার দলের দিকে তাকাল। বিশজন অফিসার, সবাই অভিজ্ঞ, সবাই চুপচাপ। কিন্তু সুমন জানত, এই অপারেশনের আসল চালক তারা নয়। আসল চালক হল উপরমহলের অলিখিত নির্দেশ, যা শহরের পুরনো রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোকে রাতারাতি উল্টে দিতে চায়। এই রেইড শুধু ভিক্টরকে ধরার জন্য নয়, এটি ছিল একটি নতুন যুগের সূচনা, যেখানে শহরের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি অন্য হাতে চলে যাবে।
    ​”আমরা যাচ্ছি, কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই। কেউ বাড়াবাড়ি করলে, সে আমার দলের লোক হলেও ছাড় পাবে না। রেডি?”

    ​নূর সুমনের গলা পাথরের মতো শক্ত। সে যখন টিমের দিকে তাকাচ্ছে, তখন তার চোখ এড়িয়ে গেল না কনস্টেবল নূরনবী-র আতঙ্কিত দৃষ্টি। নূরনবী নতুন, মাত্র মাসখানেক হয়েছে চাকরিতে। তার ইউনিফর্ম এখনও ঝকঝকে, এখনও কোনো রক্তের দাগ লাগেনি। সুমনের ভয় ছিল, আজকের রাতে হয়তো সেই দাগ লেগে যাবে, আর সেই দাগ মুছতে মুছতেই নূরনবী একদিন সুমনের মতো অনুভূতিহীন হয়ে যাবে।

    ​গুদাম পর্যন্ত রাস্তাটা ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। রেইডের গাড়িগুলো হেডলাইট নিভিয়ে নিঃশব্দে এগোচ্ছে, যেন তারা শহরের গভীরের কোনো গোপন রোগের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে এগোচ্ছে।

    ​ভিক্টর সান্যাল। মানুষটা ছিল শহরের নোংরা নালার মতো সবাই জানত সে আছে, কিন্তু কেউ তাকে স্পর্শ করতে চাইত না। তার প্রভাব পুলিশের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে রাজ্যের মন্ত্রীর ড্রয়িংরুম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সুমন জানত, আজকের এই রেইড একটা অসম্ভব কাজ, কারণ হয় ভিক্টর আগেই খবর পেয়ে গেছে, না হয় ভিক্টরের লোক এই দলেই লুকিয়ে আছে।

    ​গুদামের সামনে এসে গাড়ি থামল। চারিদিক নিস্তব্ধ। সুমন হাত দিয়ে নির্দেশ দিল। দরজা ভাঙার দলটা ধাতব শব্দ করে তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। সুমনের দল অনুসরণ করল।
    ​ভেতরের দৃশ্যটা ছিল সিনেমার সেট-আপের মতো। সারি সারি বাক্স, তাতে কিসের চিহ্ন তা অনুমান করা কঠিন। একপাশে বেশ কিছু কম্পিউটার আর মনিটর, বোঝা যায় এখান থেকেই পুরো অবৈধ নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রিত হতো। কিন্তু, গুদামটা ছিল একদম খালি। ভিক্টর নেই, তার লোক নেই, এমনকি চোরাচালানের মালও নেই।

    ​সুমনর শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। উপরমহল চেয়েছিল সে ভিক্টরের ঘাঁটিতে যাক, প্রমাণ করুক যে ভিক্টরের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু ভিক্টর পালিয়ে গেছে, এবং যাওয়ার আগে একটা ফাঁদ পেতে গেছে।
    ​ঠিক তখনই, গুদামের পিছনের দরজা থেকে তীব্র গুলির শব্দ শুরু হলো।

    ​সুমন দেয়ালের আড়ালে ঝাঁপ দিল, ঠিক তার পেছনেই নূরনবী। নূরনবী ভয়ে কাঁপছে।
    ​”স্যার, এ তো অ্যামবুশ! ওরা কোত্থেকে এলো?” নূরনবী ফিসফিস করে বলল।
    ​”চুপ! পিছনে ফিরে দেখার সময় নেই। নূরনবী, তুমি এই গেটের দিকে দেখবে। আর গুলি চালানোর আগে নিশ্চিত হবে, ওটা তোমার লক্ষ্য!” সুমন চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল।

    ​পিছনের দরজা দিয়ে একে একে ভিক্টরের প্রায় পঁচিশ-ত্রিশজন অস্ত্রধারী লোক ভেতরে ঢুকতে শুরু করেছে। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট – কাউকে জীবিত রাখা নয়।
    ​সংঘর্ষটা ছিল ভয়াবহ। গুদামের মধ্যে ধাতব প্রতিধ্বনি তুলে গুলির আওয়াজ, কাঁচ ভাঙার শব্দ আর মানুষের চিৎকার। সুমন ছিল পুরনো ধাঁচের পুলিশ অফিসার, যিনি শ্যুটিং-এর চেয়ে স্ট্র্যাটেজিতে বেশি বিশ্বাস করতেন। কিন্তু আজকের রাতে স্ট্র্যাটেজির জায়গাটা বুলেট নিয়ে নিয়েছে।

    ​সুমন নেতৃত্ব দিল, এক কোণ থেকে অন্য কোণে যাওয়া, আড়াল নেওয়া, এবং অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পাল্টা ফায়ার করা। সে জানত, এই অন্ধকার গুদামে তারা শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বারুদেও পিছিয়ে আছে।
    ​হঠাৎ, ডানদিকে এক চিৎকার। কনস্টেবল প্রীতম বুক চেপে ধরে পড়ে গেল। তার ইউনিফর্ম মুহূর্তে রক্তে ভিজে উঠল। নূরনবী চিৎকার করে তার দিকে যেতে চাইল, কিন্তু সুমন তাকে টেনে ধরল।

    ​”যেতে পারবে না! ওটা শেষ!” সুমনর গলায় কোনো আবেগ ছিল না। সে শুধু দেখছিল, কীভাবে একটা তাজা প্রাণ শেষ হয়ে গেল।
    ​এই সময়, ভিক্টরের লোকগুলো ভেতরে গ্রেনেড নিক্ষেপ করল। প্রথম গ্রেনেডটা ফাটতেই গুদামের কংক্রিটের ছাদ কেঁপে উঠল। ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সুমন বুঝতে পারল, তার দলটা ভেঙে যাচ্ছে।

    ​সময় দ্রুত চলে যাচ্ছিল। বাইরে পুলিশের আরও গাড়ি আসছে, সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই গুদামের ভেতরে, সুমন আর তার বাকি দশজন অফিসার একা।

    ​ভিক্টরের লোকেরাও এখন মরিয়া। তারা জানে বাইরে থেকে আরও সাহায্য আসছে।
    ​সুমন চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য ভাবল। সে এখন জানে কেন এই রেইড ফাঁদ ছিল। উপরমহল জানত ভিক্টর আজ রাতে নেই। কিন্তু তারা চেয়েছিল, ভিক্টরের দল এবং সুমনের দল দু’পক্ষের মধ্যেই একটি বড় সংঘর্ষ হোক। ফলস্বরূপ, শহরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর সুযোগ নেবে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তি, যারা এই বিশৃঙ্খলার সুযোগে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করবে।
    ​সুমনর রাগ তার ভয়কে ছাপিয়ে গেল। সে দেয়াল থেকে উঠে দাঁড়াল।
    ​”নূরনবী! আমার পেছনে এসো! ওরা ভেবেছে আমরা মরব! আমরা মরব না! আমরা ওদের শেষ দেখব!”

    ​সুমন ফায়ার করতে করতে সামনের দিকে এগোতে শুরু করল। সে কোনো হিসেব করছিল না, শুধু বাঁচতে এবং বাকিদের বাঁচাতে চাইছিল। তার ইউনিফর্মে তখন প্রীতমের ছিটকে আসা রক্ত, আর তার কপালে নিজের ঘাম। সেই মুহূর্তে তার ইউনিফর্ম হয়ে উঠল এক রক্তমাখা প্রতীক, যা প্রমাণ করছিল এই যুদ্ধে কেউই নৈতিকভাবে জয়ী নয়।

    ​একটি কঠিন মুহূর্ত। সুমন দেখল, দুজন অস্ত্রধারী গুদামের মুখ্য কন্ট্রোল রুমের দিকে ছুটছে। তারা নিশ্চিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ডিভাইস ধ্বংস করতে চাইছে।
    ​সুমন নূরনবীকে কন্ট্রোল রুমের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিল।

    ​”ওখানে যাও! ওদের থামাও! ওই কন্ট্রোল রুম ওদের শেষ চাল, নূরনবী!”
    ​নূরনবী দ্বিধাগ্রস্ত, কিন্তু সুমনের চোখে দেখল এক তীব্র প্রতিজ্ঞা। সে মাথা নেড়ে গুদামের বামপাশ ধরে কন্ট্রোল রুমের দিকে ছুটল।

    ​সুমন আর বাকি অফিসারদের কভার ফায়ারের সুযোগ নিয়ে নূরনবী কন্ট্রোল রুমে পৌঁছাল। ভেতরে দুজন লোক তখনও ফাইল ছিঁড়ছে এবং কম্পিউটার হার্ড ড্রাইভ ভাঙছে। নূরনবী তার বন্দুক হাতে ভেতরে ঢুকল। ভিক্টরের লোকগুলো তাকে দেখে চমকে উঠল।

    ​প্রথম লোকটা বন্দুক তোলার আগেই নূরনবী গুলি করল। নির্ভুল নিশানায় লোকটা পড়ে গেল। অন্যজন টেবিলের ওপর থেকে লাফিয়ে এসে নূরনবীকে ধাক্কা দিল।
    ​নূরনবী-র ইউনিফর্ম দেওয়ালে ঘষা খেল। তাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হলো। নূরনবী নতুন হলেও তার ট্রেনিং ছিল কঠিন। সে লোকটার হাত মুচড়ে ধরল, এবং ঠিক সেই সময়ে, তার বন্দুকের নল লোকটার দিকে তাক করে গুলি করল।

    ​কন্ট্রোল রুমের মধ্যে তখন ধোঁয়া আর রক্তের গন্ধ। নূরনবী দেখল, একটি ভাঙা হার্ড ড্রাইভ মেঝেতে পড়ে আছে। কিন্তু একটি ছোট ইউএসবি ড্রাইভ তখনও কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত। এটা নিশ্চয়ই তাদের শেষ চেষ্টা ছিল।
    ​নূরনবী কাঁপতে কাঁপতে ইউএসবি ড্রাইভটা বের করল এবং সেটা তার জ্যাকেটের ভেতরের পকেটে রাখল। এই ড্রাইভেই ছিল ভিক্টরের সাম্রাজ্যের সমস্ত তথ্য।
    ​বাইরে, গুলির শব্দ কমে এসেছে। পুলিশের অতিরিক্ত বাহিনী এসে গেছে। ভিক্টরের লোকগুলো এখন আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, অনেকেই ধরা পড়েছে, বাকিরা মরেছে।

    ​ভোর হচ্ছে। কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। গুদামের বাইরে তখন সাংবাদিক, পুলিশের উঁচু কর্মকর্তারা আর সাধারণ মানুষের ভিড়। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর ফ্ল্যাশলাইট পুরো এলাকাটাকে একটা যুদ্ধক্ষেত্রের মতো দেখাচ্ছে।

    ​সুমন গুদামের বাইরে বেরিয়ে এল। তার ইউনিফর্ম ছেঁড়া, রক্তে মাখা – নিজের রক্ত নয়, সহকর্মীর রক্ত। সে দেখল, কমিশনার নিজে এসেছেন।

    ​কমিশনার সুমনের দিকে এগিয়ে এলেন। তার চোখে কোনো কৃতজ্ঞতা বা উদ্বেগ ছিল না, শুধু ছিল হিসেব।

    ​”ইন্সপেক্টর সুমন, আপনি বীরত্বের পরিচয় দিয়েছেন। অপারেশন নাইটফল সফল। ভিক্টরের সাম্রাজ্য আজ থেকে শেষ।”
    ​সুমন ক্লান্ত চোখে কমিশনারের দিকে তাকাল।
    ​”স্যার, প্রীতম মারা গেছে। আরও দুজন গুরুতর আহত।”

    ​কমিশনারের মুখ থেকে কোনো অভিব্যক্তি এল না। “দেশের জন্য এটাই স্বাভাবিক। তবে চিন্তা করবেন না, আমরা সবকিছু ঢেকে দেব। ভিক্টর সান্যালকে ‘পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলি করে মারা গেছে’ বলে দেখানো হবে।”
    ​সুমন বুঝতে পারল। ভিক্টর সান্যাল আজ থেকে কেবল একটি নাম নয়, একটি শহীদ—নতুন ক্ষমতার উত্থানের জন্য এক বলিদান। আজকের রেইড ভিক্টরকে শেষ করতে আসেনি, এসেছিল ক্ষমতাকে এক হাত থেকে অন্য হাতে তুলে দিতে। এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটায়, সুমনের ইউনিফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে রক্ত লেগেছে।

    ​সুমন চুপচাপ তার দলের দিকে তাকাল। নূরনবী তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে। তার চোখ শুকনো, কিন্তু ভেতরে এক নতুন ধরনের ভয়।
    ​সুমনর দৃষ্টি গেল তার নিজের ইউনিফর্মের দিকে। রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আসছে। সে হঠাৎ নূরনবীকে ফিসফিস করে বলল, “নূরনবী, তুমি ইউএসবি ড্রাইভটা কাউকে দেখাবে না। এটা তোমার কাছে থাক। এটা প্রমাণ, আসল নকশাটা এখনও আমরা জানি না।”

    ​নূরনবী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। সে বুঝল, এই শহরের নকশা কেবল গুদামের মানচিত্রে আঁকা ছিল না, তা ছিল প্রতিটি ইউনিফর্মের রক্তমাখা দাগে লেখা। এক রাতের রেইড শহরটার কেবল বাহ্যিক কাঠামোই নয়, এর নৈতিক কাঠামোটাও বদলে দিয়েছে। আর সেই নতুন, রক্তমাখা নকশার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকল সুমন আর নূরনবী।

Skip to toolbar